শিশুতোষ গল্প- 'টুনটুনির ছানা'

শিশুতোষ গল্প- 'টুনটুনির ছানা'

টুনটুনির ছানা


মো. রহমত উল্লাহ্‌


বাড়ির উঠানে বেগুন গাছ। উঠানে খেলা করে মুনা। খেয়াল করে টুনটুনির আনাগুনা। দু’টি টুনটুনি। ফুড়ুত ফুড়ুত আসে। বেগুন গাছে বসে। লুকায় পাতার নিচে। চুপচাপ থাকে। আবার ফুড়ুত ফুড়ুত যায়। গাছের কাছে যায় মুনা। দেখে, টুনটুনির বাসা। অনেক খুশি হয় সে।


কয়েকদিন পর। বাসা দেখতে আসে মুনা। ফুড়ুত ফুড়ুত। উড়ে যায় টুনটুনি। মুনা উঁকি দেয় বাসায়। দেখে, সাদা দু’টি ডিম। ওয়াও! আরো খুশি হয় সে।


আরো কয়েকদিন পর। ডিম দেখতে আসে মুনা। ফুড়ুত ফুড়ুত। উড়ে যায় টুনটুনি। মুনা উঁকি দেয় বাসায়। দেখে, ফুটফুটে দু’টি ছানা। আলুর মতোগোল গোল। লালচে গায়ের রং।  দেখা যায় নাপা। ইঁদুরের মতো হা করে। চিঁউ চিঁউ করে।ওয়াও! আরো খুশি হয় সে। মনেমনে বলে, বড় হোক। তারপর নিবো।  খাঁচায় রাখবো।  খাবার দিবো। পানি দিবো। লালন করবো।


কিছুদিন পর। ছানাদের দেখতে আসে মুনা। ফুড়ুত ফুড়ুত। উড়ে যায় টুনটুনি। মুনা উঁকি দেয় বাসায়। দেখে, বড় হয়নি ছানারা। কিছুটা লুম হয়েছে গায়ে। তালের শুকনা বিচির মতো। কিছুটা বাদামি হয়েছে রং। নাড়ানাড়ি করে পাখা। হা করে বার বার। ডাকে চিঁউ চিঁউ করে। ওয়াও, ওয়াও! খুব ভালো লাগে মুনার। কথা বলেনিজে নিজে। আরো বড় হোক। তারপর নিবো।


আরো কিছু দিন পর। ছানাদের দেখতে আসে মুনা। ফুড়ুত ফুড়ুত। উড়ে যায় টুনটুনি। মুনা উঁকি দেয় বাসায়। দেখে, ছানাদের।  কিছুটা বড় হয়েছে ছানারা। বড় হয়েছে গায়ের লুম। খড়ের মতোহয়েছে রং। কিছুটা বড় হয়েছে পালক। ওয়াও, ওয়াও!  আরো ভালো লাগে মুনার। কথা বলেএকা একা। আর একটুবড় হোক। তারপরই নিয়ে নিবো। রাখবো ভাইয়ার খাঁচাটায়।  খালিইতো পড়ে আছে সেটি।  চমক লাগাবো ভাইয়াকে।


দু'একদিন পর। ছানাদেরনিতে আসে মুনা। উড়ে না টুনটুনি। করেনা ফুড়ুত ফুড়ুত। মুনা উঁকি দেয় বাসায়। না, ছানারা নেই।আফসোস করে।  ইস, চলে গেছে। সেদিন নিয়ে নিতাম যদি। মন খারাপ হয় মুনার। অনেক দিনের সখ। পাখি লালন করবে। রাখবে খঁচায়। খাবার দিবে। পানি দিবে। কাছে থেকে দেখবে। কীভাবে খায়। কীভাবে ডাকে। কীভাবে খেলা করে। তা আর হলো না। ভাবে, কী করা যায় এখন।জাগে অনেক রাত।


পরদিন সকাল। উঠানে বসে আছে মুনা। দূরে রেখেছে পাখির খাঁচাটা। খুলে রেখেছে খাঁচার দুয়ার। ভিতরে দিয়েছে পাখিদের খাবার। তাকিয়ে আছে খাঁচার দিকে। আসে কি না পাখি। ঢুকে কি না খাঁচায়। দেখে, একটি পাখি এসেছে। খুব খুশি হয় মুনা। খাঁচার পাশে বসে পাখিটা। তাকায় খাঁচার দিকে। খাবার দেখে। খাঁচায় ঢুকে না। উড়ে যায় দূরে। মন খারাপ হয় মুনার।


তার পরদিন সকাল। উঠানে বসে আছে মুনা। গত দিনের মতো। দূরে রেখেছে পাখির খাঁচা। খুলে রেখেছে খাঁচার দুয়ার। ভিতরে দিয়েছে পাখিদের খাবার। আসেপাশেও দিয়েছে কিছু। তাকিয়ে আছে খাঁচার দিকে। আসে কি না পাখি। ঢুকে কি না খাঁচায়। দেখে, দু’টি পাখি এসেছে। বসেছে খাঁচার পাশে। খেয়ে চলেছে খাবার। খুব খুশি হয় মুনা। পাখিরা ডাকাডাকি করে। আরো পাখি আসে। খাবার খায়। নাচানাচি করে। আরো খুশি হয় মুনা। খেলা করে পাখিরা। তবে খাঁচায় ঢুকে না। উড়ে যায় খাবার শেষে।


এভাবেই চলে কিছুদিন। আসে অনেক পাখি। খুশি হয় মুনা। ভাব হয় পাখিদের সাথে। সে কাছে যায় পাখিদের। উড়ে যায়না পাখিরা। ভয় পায়না তাকে। আপন হয় তারা। অনেক ভালো লাগে মুনার। ভালোলাগে পাখিদের উড়া উড়ি।


বেশ কয়েকদিন পর। টুনটুনি আসে বেগুন গাছে। খেয়াল করে মুনা। ভাবে অনেক কিছু। টুনটুনি আবার ডিম দিবে। আবার ছানা হবে। ছানারা বড় হবে। আকাশে উড়ে যাবে।  ছানাদের ধরবে নামুনা। আটক করবে না খাঁচায়।<


[সংশোধিত- ডিসেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা যুক্তবর্ণ বিহীন এই গল্পটির কোন বাক্যে ৪টির অধিক শব্দ নেই।)

শিশুতোষ গল্প- শহিদমিনার

শিশুতোষ গল্প- শহিদমিনার

শহিদমিনার

মো. রহমত উল্লাহ্

ফুল জোগাড় করছে তিনজনে। বাড়ির পাশেই শিমুল গাছ। গাছের নিচে অনেক ফুল। তবে এগুলো তাজা নয়। তাজা ফুল চাই। শহিদমিনারে যাবে কাল। খুব ভোরে। ফুল দিবে। কী করা যায়। অনেক বড় শিমুলগাছ। সব ফুল আগডালে। গাছেই উঠা যায়না। আগডালে যাওয়াতো দূরের কথা। কী করা যায়? এগিয়ে যায় বাঁশবাগানের দিকে।



বিশাল বাঁশবাগান।পাখিদের কলরব। এখানে কয়েকটা পলাশগাছ। বেশি বড় হয়নি এখনো। তবে ফুল দিয়েছে অনেক। লাল টকটকে ফুল। আগুনের মতো ঝলঝল করে। মন ভরে উঠে। তবে হাতের নাগালে নয়। সামান্য উপরে। একটা চিকন ডাল। এতে অনেক ফুল। নাগাল পাওয়া যায় না। কী করা যায়?



নাসিফেরকাঁধে উঠে নায়িম। নাসিফ মোটা। নায়িম পাতলা। বয়সে প্রায় সমান। সাত কি আট। সে তুলনায় ছোট মুনা। তবে সে চালাক বেশি। খুব হাসিখুশি। সে-ই বলেছে, কাঁধে উঠো। নাসিফের কাঁধে নায়িম। নায়িমের নাগালে পলাশ ফুল। ছিড়ে আর ছিড়ে। দেয় মুনার হাতে। সবাই খুব খুশি। নেমে আসে নায়িম। অনেক ফুল। ভাগাভাগি করে তিনজনে। তবে আরো ফুল চাই। অন্য ফুল। কী করা যায়? কী করা যায়? মুনা বলে, বাড়ি চলো। এখনই রাত হবে।



বাড়ি ফিরছে তিনজন। পথের পাশে রানিদের বাড়ি। তাদের কলপাড়ে ফুলগাছ। জবাফুল। অনেক ফুটেছে। লাল হয়ে আছে গাছ। নুয়ে আছে মাটির কাছাকাছি। দৌড়ে যায় মুনা। ছিঁড়ে নেয় জবাফুল। অনেক গুলো নেয়। ভাগাভাগি করে। হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে। কথা হয় আবার। দেখা হবে কাল ভোরে।



পরদিন সকাল। একশে ফেবরুয়ারি। শহিদদিবস। বটতলায় মিলে তিনজনে।  হাতে হাতে ফুল। তাড়াতাড়ি হাঁটে। দেরি হয়ে গেছে। সবার আগে মুনা। আসে খালের পাড়ে। ওপারে কলেজ। কলেজের মাঠে শহিদমিনার। যেতে হবে সেখানে। এপারে নেই তেমন কিছু। মাত্র কয়েকটা বাড়ি। খালের উপরে বাঁশের সাঁকু। খুঁটির উপরে একটামাত্র বাঁশ। এতেই যাওয়া আসা। বড়রা একা একা পারে। ছোটরা একা একা পারেনা। যেতে হয় বড়দের সাথে। হাত ধরে ধরে।



পথের দিকে তাকায় তিনজনে। আসেন কিনা বড়রা কেউ। নাহ, কেউ আসে না। চলে গেছে সবাই। পার হওয়া যাবে না সাঁকু। যাওয়া যাবে না ওপারে। ফুল দেওয়া হবে না শহিদমিনারে। কী করা যায়? কী করা যায় এখন? মুখ খুলে মুনা। চলো আমাদের বাড়ি যাই। দেখি, কী করা যায়। হাঁটে মুনাদের বাড়ির দিকে।



মুনাদের বাড়ির উঠান। খুঁটি গাড়ে তিনজনে মিলে। তিনটি খুঁটি পাশাপাশি। মাঝে বড় একটি। দুইপাশে ছোট দুইটি। মায়ের ওড়না আনে মুনা। কালো ওড়না। ছড়িয়ে দেয় খুঁটির উপর। মনে হয় শহিদমিনার। এতেই ফুল দেয় তিনজনে। দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। মুখ খুলে নায়িম। এমন হবে না আগামী বছর। আগেই বানাবো শহিদমিনার। মাঠের বটতলায়। বানাবো আরো ভালো করে। ফুল দিবো সেখানেই। নাসিফ বলে, তাই হবে। সেখানেই ফুল দিবো প্রতিবার। মুনা বলে, তাই হবে। সবাইকে নিবো আমাদের সাথে।<


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


 (শিশুদের জন্য লেখা এই গল্পের কোন বাক্যে ৪ টির বেশি শব্দ নেই এবং কোন শব্দে যুক্তবর্ণ নেই।)

শিশুতোষ গল্প- 'পাখি তাড়ানো'

শিশুতোষ গল্প- 'পাখি তাড়ানো'

পাখি তাড়ানো


মো. রহমত উল্লাহ্


পাখি তাড়ায় পনির। কয়েকদিন ধরে এটি তার কাজ। সকাল, দুপুর, বিকেল। পাখি আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। ছোট ছোট পাখি। খেয়ে যায় ধান। পাকাধান যেন সোনার দানা। জমির আইলে পনির। হাততালি দেয় জোরে। উড়ে যায় কাছের পাখিরা। গিয়ে বসে আরেক পাশে। শুরু করে ধান খাওয়া। পনির যায় সেখানে। হাততালি দেয় আবার। উড়ে যায় সেখানের পাখি। বসে গিয়ে আরেক পাশে। শুরু করে ধান খাওয়া। পনির যায় সেই পাশে। হাততালি দেয়। হিস... করে। পাখিরা যায় আগের পাশে। এভাবেই চলে তার কাজ। খুব রাগ ধরে। ইস, ভালো লাগে না। কবে যে কাটা হবে ধান। আর কত ছোটাছুটি। আর কত হাততালি।



পরদিন। আইলে দাঁড়ায় পনির। বাঁশি বাজায়। পুর, পুর, পুর...। উড়ে যায় পাশের পাখিরা। বসে গিয়ে আরেক পাশে। সেই পাশে যায় পনির। বাঁশি বাজায় আবার। আগের পাশে যায় পাখি। এভাবেই চলে। পনিরের পাখি তাড়ানো। আর পাখিদের ধান খাওয়া। কী করবে, ভাবে পনির। ভাবে আর পাখি তাড়ায়। লেগে যায় পানি পিপাসা। পনিরের বয়স আট বছর। গায়ের রং ফরসা। সুঠাম দেহ। কালো চুল। ডাগর চোখ। বড় কান। সবল হাত। উঁচু বুক। মজবুত পা। 



পরদিন। গুলতি নিয়ে আসে পনির। চুপচাপ বসে থাকে আইলে। উড়ে আসে পাখির দল। খাওয়া শুরু করে ধান। পনির তাক করে গুলতি। ছোট ছোট অনেক পাখি। লাগবে কোনোটার গায়ে। জোরে টানে রাবার। ছুড়ে মারবেল গুলি। উড়ে যায় পাখির দল।  খেতের ভিতর যায় পনির। দেখে ছটফট করছে চড়ুই। পনির হাতে নেয় সেটি। অনুতাপ লাগে। চড়ুই তার খুব প্রিয়। বাসা বাঁধে ঘরের চালায়। তাদের ঘরেও আছে বাসা। জানালায় বসে। উঠানে নামে। খাবার খায়। খেলা করে দুটি চড়ুই। মাতিয়ে রাখে বাড়ি। খুব ভাল লাগে পনিরের। আহত চড়ুই নিয়ে যায় বাড়িতে। খুব মায়া লাগে তার। তাকিয়ে থাকে। সেবা করে। পানি দেয় মুখে। খাবার দেয়। সময় নেয়। আবার পানি দেয়। খাবার দেয়। সারিয়ে তুলে। ভালো লাগে। উড়িয়ে দেয় আকাশে। ভাবে, পাখিদের আঘাত করবে না আর।



পরদিন। পনির আসে পাখি তাড়াতে। তাকে দেখেই ভয় পায় পাখি। উড়ে যায় দূরে। যেন পাখিদের মনে পড়ে গতদিন। আবাক হয় সে। বিপদের কথা ভুলে না পাখিরা। তাইতো। হুম। একটা কাজ করা যাক তাহলে। নতুন কৌশল আসে মাথায়। শুরু করে কাজ। যেই ভাবনা সেই কাজ। দু’টি লাঠি আনে। একটি দড়ি আনে। একটি লাঠি গাড়ে ধানখেতে। গাড়ে খাড়া করে। সেটিতে বাঁধে আরেকটি লাঠি। ভূমির সমান করে। লাঠিতে পরায় নিজের জামা। ঝুলিয়ে দেয় গুলতিটা। হয়ে যায় কাকতাড়োয়া। যেন দাঁড়িয়ে আছে পনির। দু’হাত ছড়িয়ে। খেতের মাঝ খানে। পনিরের মতো কাকতাড়োয়া।



পনির ফিরে আসে আইলে। বসে থাকে ঘাপটি মেরে। সে এখন খলি গায়ে। পাখিরা আসে। দেখতে পায় না তাকে। দেখে কাকতাড়োয়া। খেতের মাঝ খানে। দেখে পনিরের জামা। ভাবে এটিই পনির। ভয় পায়। গুলতির গুলির ভয়। চলে যায় তাড়াতাড়ি। আরো পাখি আসে। দেখে কাকতাড়োয়া। ভাবে এটিই পনির। ভয় পায়। উড়ে যায় দূরে। নামে না ধানখেতে। ভয়ে চলে যায় সব পাখি। খায় না পাকা ধান। সফল হয়েছে পনিরের কৌশল। সহজ হয়েছে পাখি তাড়ানো। নিজেকে বিজয়ী ভাবে পনির। বাড়িতে ফিরে যায় ভাবনাহীন।<


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা এও গল্পটির কোন শব্দে যুক্তবর্ণ নেই এবং কোন বাক্যে ৪ টির বেশি শব্দ নেই।]

শিশুতোষ গল্প- মেলার ঘুড়ি

শিশুতোষ গল্প- মেলার ঘুড়ি

মেলার ঘুড়ি

মো. রহমত উল্লাহ্

বকুলদের বাড়ির কাছেই ফাঁকা মাঠ। মাঠের বটতলায় বসে বৈশাখী মেলা। পাশের নদীতে হয় নৌকা বাইচ। মেলায় আসেন অনেক মানুষ। ছোট, বড়, ছেলে, মেয়ে সবাই। খুব আনন্দ হয় এখানে।


আজ  পহেলা বৈশাখ। মেলায় এসেছে বকুল। সাথে আছেন বাবা ও ভাইয়া। বকুল অনেককিছু কিনবে আজ। যা চাইবে তাই কিনে দিবেন বাবা। কেননা, শ্রেণিতে প্রথম হয়েছে সে। এমনই কথা ছিলো বাবার সাথে।


প্রথমেই নাগরদোলায় চড়ে বসলো তিনজন। কেঁও কেঁও শব্দ করে ঘুরতে লাগলো নাগরদোলা। ভয়ে কাঁপছে বকুল। সবার উপরে উঠে গেলো তারা। বাঃ, কী সুন্দর মেলার দৃশ্য!


নিমিষেই কেটে গেলো বকুলের ভয়।


এর পর এলো নদীর তীরে। নদীতে চলছে নৌকা বাইচ। ছুটে আসছে দীর্ঘ-চিকন নৌকা। হেইও হেইও করছে মাঝির দল। ছফাত ছফাত করে পানিতে পড়ছে বৈঠা। জোরছে বাজছে ঢোল-বাঁশি, পড়ছে হাততালি। নেচে গেয়ে ফুরতি করছে সবাই! ছুটছে অনেক নৌকা। দেখাযাক, কার আগে কে যায়।


মাথায় ময়ূর বানানো নৌকাটি হয়েছে প্রথম। বাবা বললেন, এটির নাম ‘ময়ূরপংখি’ নৌকা।গ


তার পর সারকাস দেখতে এলো বকুল। নিমিষেই দেখা হয়ে গেলো অনেক জায়গা। সুন্দরবন, সোনার গাঁ, পাহাড়পুর, ময়নামতি...। আরো দেখলো- লালবাগ কেল্লা, যাদুঘর, চিড়িয়াখানা...।


বকুল বললো-  ‘খুব সুন্দর, তুমিও দেখো ভাইয়া’। বড়দের মতো ভাব দেখালো ভাইয়া। বললো- ‘আমি এসব দেখেছি অনেক’।


বাঁশির দোকানে এলো এর পর। একটা বাঁশি হাতে নিলো ভাইয়া। পোঁ করলো বকুলের কানের কাছে। ভাইয়ার পেটে ঘুষি দিলো বকুল। নিজের ও ভাইয়ার জন্য কিনলো অনেক কিছু। বাঁশের বাঁশি, পাতার বাঁশি, বেলুন বাঁশি, শামুক বাঁশি।


এবার মাটির জিনিসের দোকানে এলো বকুল। কিনলো নানান রকম পুতুল। হা করা বাঘ, পাল তোলা নৌকা, পাখা মেলা দোয়েল...।


ভাগাভাগি করে নিলো ভাইয়ার সাথে।


পাশেই কাঠের জিনিসের দোকান। কত রকম খেলনা যে আছে এই দোকানে! পশু, পাখি, ঢেঁকি, পিঁড়ি, পালকি, লাটিম, বেলনা... । অনেক খেলনা কিনলো ভাইয়া।


বকুলকে দিলো গরুগাড়ি। বাবাকে দিলো শহিদমিনার।


তার পর কিনতে এলো বাঁশ-বেতের জিনিস। মায়ের জন্য কিনলো অনেক জিনিস। ঝুড়ি, পুড়া, ডালা, কুলা, খাড়ি, পাখা, চালনি...।


মাটির ও কাঠের খেলনা গুলো ঝুড়িতে রাখলো বকুল।


এর পর এলো শুকনা খাবারের দোকানে। কিনলো অনেক শুকনা খাবার। চিড়া, মুড়ি, মুড়কি, মোয়া, মনডা, খাজা, গজা, মুড়ালি...।


বাবা বললেন: ‘খুব ভালো খাবার এসব। নিজেরাও খাওয়া যাবে, মেহমানকেও দেওয়া যাবে’।


একটা মনডার অর্ধেক বকুলের মুখে পুরে দিলো ভাইয়া।


ঘুড়ির দোকানে এলো সব শেষে। আকাশে উড়ছে নানা রকম ঘুড়ি। মাছ-ঘুড়ি, পাখি-ঘুড়ি, প্রজাপতি-ঘুড়ি...। সুতাভর্তি লাটাই আর প্রজাপতি-ঘুড়ি কিনলো ভাইয়া।


ফেরিওয়ালার নিকট থেকে চারটি বেলুন কিনলো বকুল।


এবার বাড়িতে ফিরছে তারা। ফিরার পথে ফসলের ফাঁকা মাঠ। ঘুড়ি উড়াতে চাইলো ভাইয়া। অনুমতি দিলেন বাবা।


ঘুড়ি উড়াতে লাগলো ভাইয়া। সূতা ছাড়ছে তো ছাড়ছে। আকাসে অনেক দখিনা বাতাস। অনেক উপরে ভাইয়ার ঘুড়ি। অনেক হাসি ভাইয়ার মুখে।


হঠাৎ ছিড়ে গেলো সুতা!


ঘুড়ির পিছনে ছুটছে ভাইয়া। সাথে ছুটছেন বাবা। ভাইয়া..., বাবা... বলে চিৎকার করছে বকুল। খুব জোরছে ছুটছে ভাইয়া। পড়ছে, উঠছে আবার ছুটছে!


অবশেষে নিচে নেমে এলো ঘুড়ি। মাটিতে পড়ার আগেই লাফিয়ে ধরলো ভাইয়া। ফিরে এলো জয়ের খুশিতে নেচে নেচে। হাতে করে নিয়ে এলো ঘুড়ি। হাঁপাতে হাঁপাতে এলেন বাবা। বললেন, ‘বসো, এবার জিরিয়ে নিই’। তাকালেন ভাইয়ার দিকে। দেখলেন, ছুলে গেছে ভাইয়ার হাঁটু আর কনুই! রাগ করলেন ভাইয়ার সাথে। এখন ভাইয়া অনূভব করলো সেই আঘাতের ব্যথা! চোখ মুছলো বার বার।


বকুল বললো, ‘কী দরকার ছিলো এতো ছুটার? আরেকটি ঘুড়ি কিনলেই হতো।’


ভাইয়া বললো, ‘সেটি কি আর এটি হতো?’


বাড়িতে এসে, মাকে সবকিছু খুলে বললো বকুল। মা জড়িয়ে ধরে আদর করলেন ভাইয়াকে। আবার হাসি ফুটে উঠলো ভাইয়ার মুখে। ঘুড়ি ফিরে পাওয়ার সেই হাসি! //


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা এই গল্পটির কোন শব্দে যুক্তবর্ণ নেই এবং কোন বাক্যে ৭ টির বেশি শব্দ নেই।)

শিশুপাঠ্য গল্প- 'মার্বেল' -যায়যায়দিন- ১৫ জুন ২০১৬

শিশুপাঠ্য গল্প- 'মার্বেল' -যায়যায়দিন- ১৫ জুন ২০১৬

IMG_20180425_152647_1


যায়যায়দিন- ১৫ জুন ২০১৬


মার্বেল


মো. রহমত উল্লাহ্‌


মার্বেল খেলছে চারজন। কনক, ঝলক, গগন, পবন। বটতলায় তাদের খেলার মাঠ।  উঠানের মতো টনটনে মাটি।  ঘাস বিহীন সমান জায়গা।  ছোট মার্বেল, ছোট মাঠ।


প্রথমে একের দানের খেলা। চারজনে জমা দেয় মার্বেল। যতোর দান ততোটি করে। একের দানে একটি করে। জমা হয় চারটি। মিলায় একের দান। খেলায় নামে কনক।সে এখন শিকারি। হাতে নেয় পাঁচটি মার্বেল। একের দানের চারটি। আর নিজের গুলি একটি। মোট পাঁচটি। দাঁড়ায় নির্ধারিত দাগে। মাঠে ছড়ায় চারটি মার্বেল। হাতে রাখে একটি। এটিকেই ছুড়তে হবে। এটির নামই গুলি। লাগাতে হবে মাঠের একটিতে। যেটি দেখাবে প্রতিযোগীরা। লাগাতে হবে ঠিক সেটিতেই। সেটির নাম শিকার। সাদা মার্বেলটি দেখায় একজনে। বলে, এটি শিকার। একমত হয় সবাই। শিকারে লাগলেই জিত। অন্যটিতে লাগলে হার। কোনটিতেই না লাগলে বাতিল। নিশানা ঠিক করে কনক। না, ঠিক থাকে না। কেঁপে ওঠে হাত। ভয় লাগে মনে। না পারার ভয়। নিশানা ঠিক করে আবার। ছুড়ে মারে। কেঁপে ওঠে হাত। না, লাগেনি। শিকারে লাগেনি। তাই জিতেনি। অন্যটিতেও লাগেনি। তাই হারেওনি। কোনটিতেই লাগেনি। তাই বাতিল হয় সে।শেষ হয়না একের দান। বদল হয়শিকারির পালা। শিকারি হয় অন্যজন। সরে যায় কনক। ভার হয় তার মন। কালো হয় তামাটে মুখ। চুপসে যায় চওড়া বুক।


এবার ঝলকের পালা। ঝলক এখন শিকারি। হাতে নেয় মার্বেল। একের দানের চারটি। সাথে নেয় নিজের একটি। এটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় মার্বেল। চারটি মাঠে। আর গুলিটি হাতে। মাঠের লালটি দেখায় একজনে। বলে, এটি শিকার। এতে একমত হয় সবাই। গুলি ছুড়তে হবে এটিতেই। নিশানা ঠিক করে ঝলক। ভয় ভয় লাগে তার। নড়ে যায় নিশানা। আবার ঠিক করে। টুক টুক করে বুক। হাত কাঁপে। হারায় মনের জোর। ভাবে, পারবেনা। হারবে বা হারাবে দান। কিছুটা সময় নেয়। দম নেয় ঘনঘন। ছুড়ে মারে গুলি। আহ্ হা। লেগেছে অন্যটিতে। অন্যটিতে লাগলেই হারতে হয়। হারাতে হয় গুলি। হতে হয় বাতিল। হারাতে হয় পালা। হেরে গেছে ঝলক। হারিয়েছে তার গুলি। সেটি এখন দানের মার্বেল। দানে এখন পাঁচটি মার্বেল। শেষ হয়নি একের দান। জিতলেই শেষ হয় দান। নাহয় চলে আরো। আবার বদল হয় খেলোয়াড়।


এবার পালা গগনের। হাতে নেয় ছয়টি মার্বেল। একের দানের পাঁচটি। আর নিজের একটি। নিজেরটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দান। মাঠে পাঁচটি মার্বেল। নীল মার্বেলটি দেখায় একজনে। বলে, এটি শিকার। এতে সায় দেয় সবাই। নিশানা ঠিক করে গগন। ভয় পায়না মোটেও। হাসিখুসি মুখ।  ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক শিকারে। হাহ্ হা। জিতে যায় গগন। কুড়ায় পাঁচটি মার্বেল। ঢোকায় নিজের পকেটে। শেষ হয় একের দান। কেউ জিতলেই দান শেষ।


এবার খেলবে পবন। দুয়ের দান। মার্বেল দেয় দুইটি করে। যতোর দান ততোটি করে। চারজনে দেয় আটটি। পবন হাতে নেয় নয়টি। আটটি দুইয়ের দানের। আর একটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দান। মাঠে আটটি মার্বেল। হলুদটি দেখায় একজনে। বলে, এটি শিকার। তাতে একমত হয় সবাই। নিশানা ঠিক করে পবন। ভাবে না তেমন। ভয় পায়না মোটেও। যেনো দুধভাত। যেনো জিতবেই। ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক ঠিক। হাহ্ হা। জিতে যায় পবন। তুলে নেয় আটটি মার্বেল। পকেটে রাখে আর হাসে। শেষ হয় দুয়ের দান। কেউ জিতে গেলেই দান শেষ।


আবার কনকের পালা। সবার এক পালা শেষ। কনক খেলবে আবার। এবার তিনের দানের খেলা। মার্বেল দেয় চারজনে। একেকজনে দেয় তিনটি করে। বারোটি হয় দানের মার্বেল। তেরোটি মার্বেল কনকের হাতে। বারোটি তিনের দানের। আর একটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দানের মার্বেল। মাঠে বারোটি। কনকের হাতে একটি। সবুজ মার্বেলটি দেখায় একজনে। বলে, এটি শিকার। একমত হয় সবাই। হাত তাক করে কনক। ভাবে, জিততে হবে এবার। এটি তিনের দান। মার্বেল মোটামুটি বেশি। চারজনের খেলা। চারের বেশি দান নেই। চারের দানেই বেশি মার্বেল। তবে খেলবে পরের জন। তাই জিততে হবে এটিতেই। খেলতে হবে সাহস করে। যেমন খেলে গগন। যেমন জিতে পবন। ভয় পেলে চলবে না। ভয় পেলেই হারতে হয়। গগন পারে, আমিও পারবো। পবন পারে, আমিও পারবো। পারতেই হবে এবার। সাহসে ভরে ওঠে বুক। বেড়ে যায় গায়ের বল। অপলক বড় বড় চোখ। একটুও কাঁপে না হাত। বয়স তার সাত বছর। এখন মনে হয় সতেরো। ঠিক করে নিশানা। ভাবে, লাগবেই। ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক শিকারে। হাহ্ হা। হুর রে। এবার জিতে যায় কনক।


এখন চারের দানের খেলা। খেলবে ঝলক।<


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা এই গল্পটির কোন বাক্যে চারটির বেশি শব্দ নেই এবং কোন শব্দে যুক্ত বর্ণ নেই।)

শিশুতোষ গল্প- 'মাছ ধরা'

শিশুতোষ গল্প- 'মাছ ধরা'

মাছ ধরা


মো. রহমত উল্লাহ্‌


শিমুল আর বকুল। ভাই আর বোন। শিমুলের বয়স সাত। গায়ের রং তামাটে। সবল দেহ। মাঝারি গড়ন। বকুলের বয়স পাঁচ। গায়ের রং ফরসা। হালকা পাতলা গড়ন। হাসিখুশি মুখ। স্কুলে যায় দুজন। সবুজ ধানক্ষেত। ক্ষেতের পাশে আইল। আইল ধরে পথ। এ পথে চলে না সবাই। এটি সরু পথ। সাময়িক পথ। বর্ষা এলেই অচল। কিছুদিন স্কুলে যাওয়া-আসা। তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। তাড়াতাড়ি হাঁটছে শিমুল। তার পিছু পিছু বকুল


কী যেন চড়চড় করছে! দাঁড়ায় দুজন। খেয়াল করে। হ্যাঁ, ধানক্ষেতে। কাছেই। চড়চড়, পুটপুট। আইলে রাখে বইখাতা। ক্ষেতে নামে শিমুল। নরম কাদা। এগিয়ে যায় কিছুদূর। পানি লাগে পায়ে। বেড়ে যায় চড়চড়, পুটপুট। ফাঁক করে ধানগাছ। নিচে তাকায় শিমুল। দেখে অনেক ছোট মাছ। ওয়াও! কত মাছ। বেড়ে যায় মাছেদের ছোটাছুটি। মাছ আর মাছ। খুব কম পানি। গাদাগাদি মাছ। শুকিয়ে এসেছে ক্ষেত। এখানেই কিছুটা নিচু। এখানেই কিছুটা পানি। এতেই জমেছে মাছ।


খুব খুশি শিমুল। শুরু করে মাছ ধরা। টাকি মাছ। গুতুম মাছ। কই মাছ। শিং মাছ। টাকি মাছই বেশি। পানি কম। পালাতে পারে না মাছ। ধরা যায় সজেই। ধরে কপকপ। রাখে পকেটে। ডাকে বকুলকে। আসে বকুল। ওয়াও! কত মাছ। সেও শুরু করে ধরা। রাখে শিমুলের পকেটে। ভরে যায় পকেট। কী করবে এখন। কোথায় রাখবে মাছ। ভাবে, দুজনে। ফ্রক খোলে বকুল। গিঁঠ দেয় এক মাথা। ফ্রক হয় থলে। হা হা হা…। রাখতে থাকে মাছ। কপকপ ধরছে শিমুল। অনেক খুশি। মাছ ধরা তার শখ। আগেও ধরেছে মাছ। বাবার সঙ্গে। বড়শি দিয়ে। চাঁই দিয়ে। ঠুঁইয়া দিয়ে। এত মাছ পায়নি। আজই বেশি মাছ। যেন মাছের দিন। শিমুলের খুশির দিন। ধরছে আর ধরছে। গুনগুন করছে। মাছ ধরা খুব মজা। মাছ ধরা খুব মজা। উহু করে শিমুল। কেঁদে ওঠে হঠাৎ। ওপরে উঠায় হাত। হাতে শিং মাছ। ফুটিয়েছে কাঁটা। অনেক ব্যথা। ঝেড়ে ফেলে মাছ। ব্যথা বাড়ে। নেমে আসে চোখের জল। উহু, আহ, ইহ। কোঁকায় শিমুল। চোখ মোছে বকুল। থেমে যায় মাছ ধরা।



বাড়ি ফিরে দুজন। উঠানে রাখে মাছ। দেখে সবাই। দাদা দাদি ফুফু। সবাই খুশি। শিমুলকে দেখে না কেউ। মা আসেন। মাকে ধরে শিমুল। তার চোখে জল। খেয়াল করেন মা। হাত দেখায় শিমুল। বুঝতে পারেন মা। এটি কাঁটার ঘা। শিং মাছের কাঁটা। কঠিন ব্যথা। চোখ মোছে শিমুল। আদর করেন মা। হাত ধরেন শিমুলের। নিয়ে যান রান্নাঘরে। হাতে নেন হলুদবাটা। লাগান শিমুলের হাতে। বলেন, এমন করো না। এসব ঠিক না। স্কুলে যাওনি আজো। এভাবে আর কতদিন? মুখ খোলে শিমুল। এমন হবে না আর।<


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা এই গল্পটির কোন শব্দে যুক্তবর্ণ নেই এবং কোন বাক্যে ৪ টির বেশি শব্দ নেই।)


 

শিশুতোষ গল্প- 'আম কুড়ানো'

শিশুতোষ গল্প- 'আম কুড়ানো'

আম কুড়ানো


মো. রহমত উল্লাহ্


স্কুল থেকে ফিরছে দুই ভাই। তানভির, সাবির। পথে বিশাল সবুজ বাগান। বাগানে আম, জাম, কাঁঠালের গাছ। তাদের খুব পরিচিত এ বাগান। পাখির গান, গাছের ছায়া, রাখালের বাঁশি। খুব আপন এই গোপিন দাদার বাগ। এপথ ধরেই স্কুলে যাওয়া আসা তাদের।


গুড়ুম, গুড়ুম, গুড়ুম। ডাকছে আকাশ। নেমে এসেছে অনেক নিচে। হয়েছে আঁধার কালো। সাঁই, সাঁই, সাঁই। ছুটছে বাতাস। দোলছে সবুজ গাছপালা। বাড়ির দিকে ছুটছে তানভির, সাবির। না, বেশি দূর যাওয়া গেলো না। শুরু হলো ঝড়বাদল। দাঁড়ালো গরুর গোয়ালে। খড়ের উপর রাখলো বইখাতা। ভাবনায় পড়ে গেলো দুজন। কে জানে, কখন থামে এই ঝড়বাদল। ভয়ে ধুক ধুক করছে বুক।ণ


বৈশাখ মাসের বিকাল। আম পড়ছে গাছ থেকে। খেয়াল করলো তানভির। ছুটে গেলো আম কুড়াতে। সাথে গেলো সাবির। কে মানে ঝড়বাদল। জুড়ে দিলো গান। ‘আয় আয় ঝড়, আরো আম পড়’। ‘আয় আয় ঝড়, আরো আম পড়’। আম কুড়াতে লাগলো দুজন। খুশিতে উড়ে গেলো সব ভয়।


 গাছের পাতা ছিড়ে পড়ছে। উড়ছে খড়কুটা। গুরুম গুরুম ডাকছে আকাশ। চিলিক চিলিক করছে বিজলি। ঝম ঝম করে পড়ছে পানি। গায়ে যেনো বিঁধছে পানির ফোঁটা। বাতাসে নড়ছে ভিজা চুল। ভ্যা ভ্যা করছে মাঠের ছাগল। দড়ি ছিড়ে গোয়ালে যেতে চাইছে গরু। ভয় লাগছেনা তবু তানভির ও সাবিরের। আরো বেশি তোফান চাই। আরো আম পড়া চাই। ছোট আম নয়, বড় আম চাই।


 ছুটে যায় আরেক গাছের নিচে। না, বড় আম পড়েনি। ভাবে, ঝড় বাড়ছেনা কেনো। ছুটে যায় আরেক গাছের নিচে। সাবির পেয়ে যায় একটা আধাপাকা আম। সে আম খপ করে নেয় তানভির। কিছুটা মন খারাপ হয় সাবিরের।


 ছুটে যায় আরেক গাছের নিচে। খুব বড় বড় এ গাছের আম। তারা জানে, এটি কাচামিঠা গাছ। কাচাই মিঠা হয় এ গাছের আম। হুড়রে! পড়েছে অনেক। তবে কুড়ানো কঠিন। গাছের নিচে অনেক ছনবন, কাঁটাঝুপ। আম পড়েই গড়িয়ে যায় ঢালে। চলে যায় শেয়ালের গর্তে। হারিয়ে যায় ছনের নিচে। খুঁজতে গেলেই বিপদ! গর্তে আছে শেয়াল। বাইরে আছে বেতকাটা। তবে এখন লাগেনা শেয়ালের ভয়। টের পায়না কাঁটার আঘাত। দুইভাইয়ে চালায় আম কুড়ানো প্রতিযোগিতা। জমা করে অনেক আম।


 এখন ভাবনা, এত আম রাখবে কোথায়। বাড়িতে নিবে কীভাবে। দুজনেই চুপচাপ ভাবে কিছু সময়। হুররে, বলে লাফিয়ে উঠে সাবির। খুলে ফেলে গায়ের জামা। গিঁট দিয়ে বানিয়ে নেয় থলি। সেই থলিতে ভরে নেয় আম। একই কাজ করে তানভির। অবাক হয় সাবিরের কৌশল দেখে। সাবির ছোট। বয়স সাত। হালকা পাতলা গড়ন। গায়ের রং ফরসা। অনেক বুঝে। তানভির বড়। বয়স নয়। সবল দেহ। গায়ের রং তামাটে। খেলাধুলায় এগিয়ে। খুব মিল দুই ভাইয়ের। একে অপরের খেলার সাথী।


 কিছু সময় পর থামে ঝড়বাদল। দুজনেই হাতে নেয় আম আর বইখাতা। নেচে নেচে ফিরে আসে বাড়িতে। মাকে ডাকে তানভির। বলে, দেখো, কত আম নিয়ে এসেছি। তাদের দেখে খুশি হননি মা। বলেন, একি দশা হয়েছে তোমাদের! খালি গায়ে কেন? এভাবে ভিজেছো কেন? অসুখ হবে যে! আমের কি দরকার ছিলো? মায়ের কথায় মন খারাপ দুই ভাইয়ের।


 এমন সময় আসেন বাবা। কথা বলেন আরো রেগে। বলেন, এসবতো আমাদের গাছের আম নয়। বলো, কার গাছের আম? কী কাজ করেছো তোমরা! কার গাছের আম নিয়ে এসেছো? কথা বলছোনা কেনো? এবার মুখ খুলে সাবির। বলে, এসব গোপিন দাদুর গাছের আম। ঝড়ে পড়েছে। আমরা কুড়িয়ে এনেছি। গাছ থেকে পেড়ে আনিনি। সাবিরের কথায় আরো রেগে যান বাবা। বলেন, কুড়িয়ে এনেছো, তাতো বুঝলাম। যার গাছ তাঁকে বলে এনেছো? ঝড়ে পড়েছে বলে কি হয়েছে? গোপিনের আম কি তোমাদের হয়ে গেছে? না বলে এনেছো কেনো? যাও, এখনই নিয়ে যাও। গোপিনের আম গোপিনের বাড়িতে দিয়ে আসো।


 আমের পুটলি নিয়ে হাঁটা দেয় দুইভাই। এখন টের পায় সেই কাঁটার আঘাত! হাজির হয় গোপিনের বাড়িতে। তারা একই এলাকার মানুষ। একে অপরের খুবই পরিচিত। তবু তানভির সাবিরের মনে জাগে অপরাধ বোধ। ভয়ে কাঁপতে থাকে বুক। ভেবে পায়না কী বলবে। উঠানে দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ।


 তাদের দেখে অবাক হয় গোপিন। ডেকে নেয় কাছে। আদর করে বসতে দেয় ঘরে। কেটে যায় তাদের ভয়। ঘটনা খুলে বলে সাবির। শুনে অভিভূত হয় গোপিনের বাড়ির সবাই। তাদের খইদই খেতে দেয় গোপিনের বউ। খুব মজা করে খায় দুইভাই। আমের পুটলি খালি করে গোপিনের ছেলে। রেখে দেয় ঝড়ে পড়া আমগুলো। দিয়ে দেয় পাকা পাকা ভাল ভাল আম। বিদায় দেয় গায়ে হাত ভুলিয়ে।


 হাসিমুখে তারা হাঁটা দেয় বাড়ির পথে। খুব খুশি লাগে তাদের। এ যেনো মহা বিজয়ের খুশি। ভাবে, না বলে আর কখনো ধরবেনা অপরের জিনিস।<


[সংশোধিত- নভেম্বর ২০১৭]


(শিশুদের জন্য লেখা এই গল্পটির কোন শব্দে যুক্তবর্ণ নেই এবং কোন বাক্যে ৮ টির বেশি শব্দ নেই।)