Education today: The curriculum we need Md. Rahamot Ullah Deshkal News, 10 March 2026

Link of paper

Education today: The curriculum we need

Md. Rahamot Ullah

Deshkal News, 10 March 2026

Bangladesh is moving forward with the hope of becoming a developed country in the future. In this journey, the greatest asset of the nation is human resources. Therefore, to develop skilled and humane citizens who can compete at the international level, we need a modern, multidimensional, and practical curriculum. Education for the new era should not only focus on exams and academic knowledge. It should also build life skills, moral values, technological abilities, and a sense of global citizenship. A comprehensive educational framework with these qualities is now essential.


First, morality and humanity must be at the heart of the education system. The goal of education is not only to produce skilled workers but also to develop honest, responsible, and patriotic citizens. Values such as empathy, tolerance, environmental awareness, and social responsibility should be effectively included in the curriculum. In addition to textbook lessons, activities like community service, social engagement, and volunteer work should also be recognized and evaluated.


Second, the curriculum should be competency-based. It is more important what students can do with their knowledge than what they simply know. Skills such as problem-solving, critical thinking, communication, and teamwork should be central to the curriculum. Along with theoretical knowledge, students should have opportunities for project-based learning, presentations, fieldwork, and internships to gain real-life experience. At the same time, students should also practice memorizing or internalising important lessons/theories where necessary.


Third, technology and digital literacy must become an essential part of the curriculum. In the era of the Fourth Industrial Revolution, students need basic knowledge of artificial intelligence, data analysis, coding, and robotics to stay competitive globally. However, along with technological skills, it is equally important to teach cyber ethics and responsible digital behavior.


Fourth, technical and vocational education should be integrated into mainstream education. In Bangladesh, there has long been an invisible divide between general education, religious education, and technical education, both in the system and in people's mindset. In many developed countries, skill-based education and training are highly respected. Therefore, from the secondary level, students should have the opportunity to choose different educational tracks according to their interests and abilities.


Fifth, a balance between global outlook and local relevance is necessary. To maintain international standards, students must learn about world history, global economics, science, and cultures. At the same time, they should also develop a deep understanding of Bangladesh’s history, heritage, language, culture, nature, the spirit of the Liberation War, and genuine religious values. This balance will help students become true global citizens who remain connected to their roots.


Sixth, the assessment system needs reform. Instead of depending only on written examinations, greater importance should be given to continuous assessment, oral presentations, project work, and practical tests. This will reduce rote learning and encourage creativity. However, in the context of Bangladesh, careful consideration is needed regarding how much practical assessment should be assigned to teachers at different levels.


Finally, teacher training and the leadership of institution heads are extremely important. A modern curriculum may look impressive on paper, but it cannot succeed without skilled teachers and capable institutional leaders. Therefore, opportunities for teachers’ professional development, research, and technological training must be expanded.

Education for the new era demands a curriculum that combines knowledge, skills, and human values. To build patriotic, ethical, and competent citizens who can compete globally, comprehensive reform in our education system has become a necessity of the time.


Md. Rahamot Ullah: Former Principal, Educationist, and Children's Author.




শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন জরুরি মো. রহমত উল্লাহ্ প্রথম আলো, ১৪ মার্চ ২০২৬

 শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কেন জরুরি

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রথম আলো, ১৪ মার্চ ২০২৬ 


একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নির্ধারণ হয় শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মাধ্যমে নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, নীতিনিষ্ঠতা এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষকেরা পাঠদান করেন, কিন্তু সেই শিক্ষার উপযোগী পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে মূলত পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। শিক্ষকেরা কতটা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে কাজ করবেন, শিক্ষার্থীরা কতটা নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে পড়াশোনা করবে, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কতটা স্বচ্ছ থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকাংশে নির্ভর করে পরিচালনা কমিটির ওপর।


বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি পরিচালনা কমিটির হাতে নেই। তবু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, পদোন্নতি–সংক্রান্ত সুপারিশ, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণ, পুরস্কার প্রদান কিংবা প্রয়োজন হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, এসব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এখনো পরিচালনা কমিটির অধীনেই রয়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়ভারও মূলত এই কমিটির ওপর বর্তায়। ফলে পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের যোগ্যতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়িত্ববোধ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক মান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।


বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিচালনা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ। তাই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতির জন্য স্নাতক ডিগ্রির বাধ্যবাধকতা শিথিল বা বাতিল করার বিষয়ে সম্প্রতি যে আলোচনা চলছে, তা শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে।


বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নয়; বরং শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। শিক্ষা এখন আর শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদান, সৃজনশীলতা বিকাশ, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাচর্চা ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠন। নতুন কারিকুলাম, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য শুধু নীতিনির্ধারণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে সচেতন ও দক্ষ নেতৃত্ব।


সরকার বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতিনির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু সেই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ওপর। ফলে এই কমিটির নেতৃত্ব কতটা সৎ, শিক্ষিত, সচেতন ও দূরদর্শী, তা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদি পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ড শিথিল করা হয়, তবে কিছু বাস্তব সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।


প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা অনুধাবনে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কারিকুলাম, মূল্যায়ন পদ্ধতি, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা দক্ষতা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বোঝার জন্য একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত ভিত্তি প্রয়োজন। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে এসব বিষয় সঠিকভাবে উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে পড়ে।


দ্বিতীয়ত, শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। বর্তমানে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব পরিবর্তনের সফল বাস্তবায়নের জন্য পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু নেতৃত্ব যদি এসব বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না হয়, তবে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা বা তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।


তৃতীয়ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অযৌক্তিকতা বা আবেগপ্রবণতা দেখা দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনেক সিদ্ধান্ত সূক্ষ্ম ও বিশ্লেষণনির্ভর। পর্যাপ্ত জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা না থাকলে অনেক সময় সিদ্ধান্তগুলো যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হয়।


চতুর্থত, প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতার ঝুঁকি বাড়ে। পরিচালনা কমিটি প্রতিষ্ঠানের অর্থব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব পালন করে। এ ক্ষেত্রে অনেকেই স্বেচ্ছাসেবী না হয়ে স্বেচ্ছাচারী ও স্বার্থবাদী হয়ে ওঠে। তাঁরা লাভজনক মনে করেই কমিটিতে থাকার জন্য মরিয়া হন! সৎ, দক্ষ, সুশিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির আশঙ্কা তৈরি হয়। এমন সুযোগ আছে বলেই কমিটির পদ নেওয়ার এত প্রতিযোগিতা।


বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনেক সময় দেখা যায়, স্থানীয় প্রভাব বা রাজনৈতিক বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়। তাঁরা অনেকেই প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে থাকেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায় এবং শিক্ষার পরিবেশ চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এমন অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যেই রয়েছে।


মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকেন, তখন শিক্ষকসমাজ অনেক সময় অস্বস্তি বোধ করেন এবং নিজেদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করেন।


অন্যদিকে পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে সৎ, শিক্ষিত ও সচেতন ব্যক্তিরা থাকলে সাধারণত একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়। তাঁরা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে অধিক সচেতন থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


একই সঙ্গে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তুলনামূলক সহজ হয়। আইন ও নীতিমালা সম্পর্কে সচেতন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর সুশৃঙ্খল করতে পারে। ফলে শিক্ষকেরা পেশাগত মর্যাদা অনুভব করেন এবং শিক্ষার্থীরাও একটি স্বাস্থ্যকর শিক্ষা পরিবেশ পায়।


এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বোঝা প্রয়োজন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া এবং একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়া একই বিষয় নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়, দ্বিতীয়টি মূলত প্রশাসনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যতের ওপর। তাই এ ধরনের দায়িত্বে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।


বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল নতুন কারিকুলাম প্রণয়ন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন এমন নেতৃত্ব, যারা শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য ও গুরুত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সেই নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।


তাই পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড বজায় রাখা কেবল প্রশাসনিক শর্ত নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। কারণ, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, আর সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব যদি দুর্বল হয়, তবে শক্ত ভিত্তির ওপর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের সততা, ভদ্রতা, নিরপেক্ষতা, ন্যায়পরায়ণতা, দূরদর্শিতা এবং উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অত্যাবশ্যক।


* লেখক: মো. রহমত উল্লাহ্, সাবেক অধ্যক্ষ




শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি: সৎ, শিক্ষিত, নিরপেক্ষ, শিক্ষানুরাগীদের অগ্রাধিকার দিন মো. রহমত উল্লাহ্ দৈনিক বাংলা, ১৬.০৩.২০২৬

 শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি: 

সৎ, শিক্ষিত, নিরপেক্ষ, শিক্ষানুরাগীদের অগ্রাধিকার দিন 

মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক বাংলা, ১৬.০৩.২০২৬

>বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নীতি বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা ও মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে সভাপতি ও সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই তাঁদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা অসৎ, কম শিক্ষিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও অদূরদর্শী হলে সম্ভাব্য অসুবিধা-

১. শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা অনুধাবনে সীমাবদ্ধতা: আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পাঠদান নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কারিকুলাম উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং মানোন্নয়ন কার্যক্রম। পর্যাপ্ত শিক্ষাগত ভিত্তি না থাকলে এসব বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করা ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়।


২. নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা: বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, নতুন কারিকুলাম, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশ ইত্যাদি। এসব পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নেতৃত্ব যদি শিক্ষাগতভাবে প্রস্তুত না থাকে, তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনীহা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে।


৩. অযৌক্তিক বা আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তের ঝুঁকি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা অনেক সময় সূক্ষ্ম ও জটিল সিদ্ধান্তের বিষয়। পর্যাপ্ত জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা না থাকলে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হতে পারে -যা সুশিক্ষার জন্য সহায়ক নয়।


৪. প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের আশঙ্কা: পরিচালনা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক তদারকি। সৎ, সুশিক্ষিত ও দক্ষ নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, অস্বচ্ছতা, অনিয়মের বা দুর্নীতির ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক-কর্মচারীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বর্তমানে অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হতে আসেন না; বরং বিভিন্ন স্বার্থ হাসিলের জন্য আসেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই সভাপতি বা সদস্য হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন! তারা দলীয় হলে, শিক্ষা অনুরাগী না হলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাচর্চার চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড বেশি হয়। 


৫. মানব সম্পদ উন্নয়নে অনাগ্রহ:

কম শিক্ষিত ও কম দূরদর্শী নেতৃত্ব অনেক সময় মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে সরাসরি অর্থসংশ্লিষ্ট বস্তুগত উন্নয়নে অধিক আগ্রহী থাকেন। তারা নতুন শিক্ষাপদ্ধতি, প্রযুক্তি বা দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেন না। শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। ফলে প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারে না।


৬. শিক্ষক সমাজের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষকরা পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যান। নেতৃত্ব যদি শিক্ষাগতভাবে দুর্বল হয়, নিরপেক্ষ না হয়, শিক্ষানুরাগী না হয়, তবে অনেক সময় শিক্ষক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এলাকায় এমন লোক আছেন যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকগণ অসম্মানিত বা নিগৃহীত হবার সম্ভাবনায় আতঙ্কিত থাকেন।


৭. আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহ: বর্তমান যুগে ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়োজিতরা বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অজ্ঞ থাকলে, অনাগ্রহী থাকলে, প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষা ও কাঙ্খিত যোগ্যতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়। 


৮. প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্বলতা: একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত যোগ্য-দক্ষ নেতৃত্ব ব্যতীত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। 


শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে সৎ, নিরপেক্ষ, দূরদর্শী, উচ্চশিক্ষিত সভাপতি ও সদস্য থাকলে সম্ভাব্য সুবিধা-

১. শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য ও দর্শন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা: উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা সাধারণত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন। 


২. শিক্ষাসংস্কার বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা: সরকার বা শিক্ষামন্ত্রণালয় যে নতুন নীতি ও পরিবর্তনের কথা বলছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষিত, তথ্যসমৃদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্ক, দূরদর্শী নেতৃত্ব এসব নীতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।


৩. পরিকল্পিত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব:

উচ্চশিক্ষিত যথাযোগ্য সভাপতি ও সদস্যরা সাধারণত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। কেননা, তারা জাতীয় শিক্ষানীতি ও আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে কম/বেশি জ্ঞান রাখেন। এতে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সহজ হয়।


৪. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি: যখন পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষিত, সচেতন, মননশীল, শিক্ষানুরাগী, গুণীমানুষ থাকেন, তখন শিক্ষকরা পেশাগতভাবে সম্মানিত বোধ করেন। কেননা, তারা সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকদের পুরস্কার ও তিরস্কার প্রদান করে ভালোদের উৎসাহিত করতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য কাঙ্খিত অনুকূল শিক্ষাপরিবেশ তৈরি হয়।


৫. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি: উচ্চশিক্ষিত দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সাধারণত আইন, নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে সচেতন থাকে। নিজের এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে অবহিত থাকেন। ফলে ইচ্ছে করলে তারা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে পারেন। 


৬. আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার: ডিজিটাল শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব সাধারণত অধিক আগ্রহী থাকে। এতে প্রতিষ্ঠান আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবার দিকে এগিয়ে যায়।


৭. সমাজে শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি:

যখন একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে সুশিক্ষিত, সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা থাকেন, তখন সমাজেও শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং অভিভাবকদের আস্থা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকগণ অধিক সম্মানিত বোধ করেন। শিক্ষার্থীরা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পায় এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য ঊর্ধ্বমুখী হয়।


৮. স্থানীয় উন্নয়ন ও জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা: শিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব স্থানীয় সমাজের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ গঠন এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সমন্বিত করতে পারে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব অধিক পূর্ণতা পায়।


বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সৎ, যোগ্য, দক্ষ, সচেতন, দূরদর্শী, দায়িত্বশীল শিক্ষানুরাগী নেতৃত্ব -যাদের অবশ্যই থাকতে হবে যৌক্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা। মাঠপর্যায়ে সেই নেতৃত্বে নিয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ও ক্ষমতাবান অংশ হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি। তাই সে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষা, সততা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতা নিশ্চিত করা মানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান, জবাবদিহিতা ও সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা -যা শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত।<


লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক





শিক্ষা ক্ষেত্রে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও প্রতিকার


পত্রিকার লিংক     পত্রিকার লিংক

শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও প্রতিকার 

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রকাশিত: জাগো নিউজ২৪.কম, ২৮ জুলাই ২০২৫ এবং

দৈনিক বাংলা, ৯ আগস্ট ২০২৫ 

>বিগত বেশ কয়েক বছর যাবত বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে! ভর্তিতে, লেখাপড়ায়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণে, পাশের হারে ও ফলাফল অর্জনে সব দিক থেকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। কমেছে মেয়েদের ড্রপ আউটের পরিমাণ। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় কম হলেও ভালো ফলাফলে অর্জনে মেয়েরাই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। মেয়েদের এগিয়ে যাওয়া যেমন আনন্দের, ছেলেদের পিছিয়ে পড়া তেমনি উদ্বেগের! 


আমাদের উচিত ছেলেদের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার সকল কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ চিহ্নিত করে ব্যাপক পর্যালোচনা করে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের পথ উদঘাটন করা ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাস্তবে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার অনেক ছোট-বড় কারণ বিদ্যমান। এ স্বল্প পরিসরে সবকিছু তুলে ধরে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বা বাস্তবতা তুলে ধরে এর সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 


একটু পিছনে তাকালেই দেখা যাবে ছেলেদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল আমাদের মেয়েরা। মেয়েদের এগিয়ে আনার জন্য আমরা গ্রহণ করেছি বিভিন্ন পদক্ষেপ। অর্জন করেছি ব্যাপক সফলতা। যেতে হবে আরো অনেক দূর। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরা এখন ছেলেদের তুলনায় সংখ্যায় ও ফলাফলে অনেক এগিয়ে। আমরা মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়া, উপবৃত্তি দেয়া, অভিভাবকদের সচেতন করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা, শিশুশ্রম রোধ করা ইত্যাদি কার্যক্রম চলমান রেখেছি। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান শুরু করা হয়। ২০০২ সালে তা উন্নীত করা হয় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে। আমাদের কন্যা শিশুরা এই কার্যক্রম গুলোর অধিক সুফল অর্জন করেছে তাই তাদেরকে ধন্যবাদ। অথচ প্রায় ১৫ বছর পরে ২০০৯ সালে এসে দরিদ্র পরিবারের ছেলে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে! রাষ্ট্রীয়ভাবে মেয়েদের প্রতি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ছেলেদেরকে অবহেলা করা হয়েছে কিনা তা কিন্তু আমরা ভেবে দেখিনি! 


কন্যা শিশুদের এখন আর সেই আগের মত বাসা-বাড়িতে থেকে কাজ করতে দেখা যায় না। প্রায় সবাই উপবৃত্তির টাকা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত স্কুলে যায়। এটি অবশ্যই একটি শুভ লক্ষণ। এর জন্যই তো আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে আসুক পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে সকল শিশু। কিন্তু এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি পুত্র শিশুরা টেম্পুতে, গ্যারেজে, কারখানায়, নৌকায়, মাছ ধরায়, ইটভাটায়, হাটবাজারে, দোকানপাটে, মাঠে-ঘাটে, ক্ষেত-খামারে, টি-স্টলে হোটেল-রেস্টুরেন্টে ইত্যাদি অগণিত ক্ষেত্রে কায়িক শ্রম দিয়ে সামান্য উপার্জন করে নিজে জীবন ধারণ করছে ও পরিবারকে সহায়তা করছে। এমন অনেক শিশুর সঙ্গে আমি কথা বলে জেনেছি, তারা লেখাপড়া করতে চায়, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না! নানান ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত এমন পুত্রশিশুরা স্কুলে ভর্তি হয় না। কেউ কেউ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। আবার অনেকেই স্কুলে/ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে দুএক বছর পরেই ঝরে পড়ে।   


অপরদিকে মেয়ে শিশুদের তুলনায় অধিক সংখ্যক ছেলেশিশু বাইরে বেশি সময় কাটায়, নেশাগ্রস্থ হয়ে থাকে, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা করে, বেপরোয়া মোটরবাইক হাঁকায়, কিশোর গ্যাংএ জড়িত থাকে, চাঁদাবাজি করে, রাজনৈতিক নেতাদের পিছনে সময় ব্যয় করে, ঝগড়া বিবাদে জড়িত থাকে, নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করে, সারাক্ষণ গেইম চালায়, সারাদিন খেলাধুলা করে, আনন্দ আয়োজন করে, ফার্মের মুরগি চুরি করে, কৃষকের ফল-ফসল চুরি করে, দলে দলে ঘুরে বেড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছুতেই অধিক হারে ছেলেরা জড়িয়ে পড়ায় অনেক বেশি পিছিয়ে পড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এমন অশুভ চিত্র দেখা যায়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি মাত্রায় বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত বিধায়, শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে বেশি বেয়াদবি করে বিধায় ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় আমরা হাল ছেড়ে দিচ্ছি কিনা তা ভাবতে হবে বিশেষভাবে। তা না হলে আরো বেশি সংখ্যক ছেলেরা কর্মের অনুপযোগী হয়ে বেকারত্বে নিমজ্জিত হয়ে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে তুলবে বহুগুণ! আমরা যদি অসহায়ের মত বা দায়িত্বহীনের মত বসে থাকি তাহলে আর রক্ষা পাবো না কেউ।


এমন এক সময় ছিল যখন এলাকার সকল ছেলেদের শাসন-বারণ করার অধিকার ছিল সকল বড়দের। স্বার্থহীন আদর-স্নেহ দিয়ে অর্জন করে সেই অধিকার প্রয়োগ করতো বড়রা; আর নির্দ্বিধায় তা মেনে নিত ছোটরা। একজনের সন্তানের কল্যান চিন্তায় সক্রিয় থাকত শতজন অভিভাবক। বড়দের নেতৃত্বে ছোটরা করতো খেলাধুলা, শিক্ষামূলক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ। আমি নিজেও কর্মী হয়ে অংশ নিয়েছি এবং পরে নেতৃত্ব দিয়েছি এমন অনেক কাজে। আমাদের প্রিয় শিক্ষকগণও অংশ নিতেন আমাদের সাথে। তখন শিশুরা বেড়ে উঠত অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার মানসিকতা নিয়ে। কেউ বিপথে গেলে সবাই মিলে তাকে আনা হতো সুপথে। তেমন মানসিকতা নিয়ে আবার এগিয়ে আসতে হবে সবার। 


উল্লিখিত কারণগুলোর পাশাপাশি খুঁজে দেখতে হবে ছেলেদের ড্রপ আউট হবার ও পিছিয়ে পড়ার অন্যান্য কারণ। তবে মনে রাখতে হবে, এখন পাল্টে গেছে পরিবেশ ও পরিস্থিতি। সেই সাথে পাল্টে গেছে ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণ কৌশল। তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবশ্যই শিখতে হবে স্মার্ট পেরেন্টিং, ইফেক্টিভ টিচিং। সবার আগে সক্রিয় হতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। পর্যাপ্ত সাপোর্ট দিয়ে তৈরি করতে হবে আরো যোগ্য-দক্ষ সফল শিক্ষক। ছেলেমেয়েদের লালন-পালন তথা শিক্ষাদানে ঘরে-বাইরে থাকতে হবে আরো অনেক বেশি সতর্ক ও সক্রিয়। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে কার্যকর পরিকল্পনা। থাকতে হবে সরকারের সদিচ্ছা। মেয়ে বা ছেলে কাউকে দমিয়ে রেখে নয়, উভয়কে এগিয়ে এনে অর্জন করতে হবে সমতা। উভয়কেই এগিয়ে নিতে হবে সমান তালে। রাখতে হবে সঠিক পথে।


লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক

Email - rahamot21@gmail.com 




পত্রিকার লিংক: 

https://www.jagonews24.com/opinion/article/1039672 



https://epaper.dainikbangla.com.bd/home/display

page/news_2025-08-09_5_15_b 

বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ: নিবন্ধন নয়, নিয়োগ পরীক্ষা হোক

 



পত্রিকার লিংক

বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ:

আর নিবন্ধন নয়, নিয়োগ পরীক্ষা হোক

মো. রহমত উল্লাহ্

বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে শূন্যপদ ছিল ১ লাখ ৮২২টি। এর বিপরীতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন জমা পড়েছে ৫৭ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৪৩ হাজার পথ শূন্য থাকবে। চাহিদা দিয়েও শিক্ষক পাবে না অনেক প্রতিষ্ঠান। ক্লাস থেকে বঞ্চিত হবে শিক্ষার্থীরা! এ ব্যাপারে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে, আবেদন কালে প্রার্থীদের বয়স ৩৫ এর বেশি এবং নিবন্ধন সনদের মেয়াদ ৩ বছরের বেশি গ্রহণ না করার কারণে আবেদন কম পড়েছে। অর্থাৎ আরো কিছু ছাড় দেওয়া হলে আরো কিছু বেশি প্রার্থী আবেদন করতে পারত। বয়সে ও যোগ্যতায় বারবার ছাড় দিয়ে আবেদনের সুযোগ দিয়ে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ করা কোন উত্তম সমাধান নয়। ছাড় দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা মানেই দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি করা। একজন কম যোগ্য শিক্ষক তার শিক্ষকতা জীবনে তৈরি করেন অগণিত কম যোগ্য নাগরিক-কর্মী। তুলনামূলক কম যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অধিক যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির প্রত্যাশা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবাস্তব! 


শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি এখন আর গ্রহণযোগ্য থাকা উচিত নয়। সরকারি এমনকি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও এখন আর তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণিধারী প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ থাকে না। নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স সীমা ও বাছাই প্রক্রিয়া অন্যদের তুলনায় বেসরকারি শিক্ষকদের শিথিল করা হলে এর অর্থ এমন দাঁড়ায় না যে বেসরকারি শিক্ষক তুলনামূলক কম যোগ্য হলেও চলে? এতে কি তাদের মান ও মর্যাদা হ্রাস পায় না? দেশের ৯৫ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীদের পাঠদানকারী বেসরকারি শিক্ষকদের অধিক যোগ্য হওয়া কি অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়? তারা তো আমাদের সন্তানদেরই শিক্ষক হন। তারা অধিক যোগ্য হলেই তো আমাদের সন্তানরা অধিক যোগ্য হবার সম্ভাবনা অধিক থাকে। অর্থাৎ বয়সে, যোগ্যতায়, পরীক্ষায় ছাড় দিয়ে তুলনামূলক কম যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে নয়; বরং দ্রুত আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে অধিক যোগ্যদের আকৃষ্ট করে শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়াই অধিক মঙ্গলজনক।   


সার্বিক বিবেচনায় বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থাটিকে অতীতের ধারাবাহিকতায় আরও উন্নত করা আবশ্যক। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকলে তা সহজেই সম্ভব। সে লক্ষ্যে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের অনুরূপ শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স সীমা ও বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়া উচিত। অর্থাৎ শূন্য পদের বিপরীতে সরাসরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উত্তম বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উত্তম প্রার্থী বাছাই করে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। নিবন্ধনধারী সবাইকেই যদি নিয়োগ দিতে হয় তাহলে এটিকে নিবন্ধন পরীক্ষা না বলে নিয়োগ পরীক্ষা বলা ও কার্যকর করা অধিক যুক্তিযুক্ত নয় কি? তুলনামূলক কম নম্বর প্রাপ্ত নিবন্ধন ধারীরাও নিয়োগের দাবিদার হয়, নিয়োগের জন্য সোচ্চার হয়, বয়সের শিথিলতা দাবি করে, অশান্তি তৈরি করে। এমনকি অকৃতকার্যরাও আন্দোলন করে! অথচ সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষায়/ প্রক্রিয়ায় কম নম্বর পেয়ে বাদ পড়ে যাওয়ারা আর নিয়োগের দাবিদার হতে পারে না, বয়সের শিথিলতা দাবি করতে পারে না, অশান্তি তৈরি করতে পারে না। 


অপরদিকে একবার নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া, আবেদন নেওয়া, পরীক্ষা নেওয়া, তালিকা করা, সনদ দেওয়া এবং পরবর্তীতে আবার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া, বাছাই করা, তালিকা করা, নিয়োগ করা ইত্যাদি নিয়োগ কর্তৃপক্ষ ও নিয়োগ প্রার্থী উভয়ের জন্যই দ্বিগুণ কষ্টসাধ্য ও সময় সাপেক্ষ। তদুপরি নিয়োগ প্রার্থীর জন্য দ্বিগুণ ব্যয় সাপেক্ষ। অধিক সংখ্যক শূন্য পদে নিয়োগ প্রার্থীদের বাছাই কেন্দ্রীয়ভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে জেলা প্রশাসকগণের দায়িত্বে ঐ জেলার সরকারি স্কুল-কলেজের সুযোগ্য শিক্ষকগণের সহযোগিতা নিয়ে সারাদেশে একই প্রশ্নে ও প্রক্রিয়ায় বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের বাছাই দ্রুত সম্পাদন করা সম্ভব হয় কিনা তা ভেবে দেখা যেতে পারে। যেমন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর করে থেকে।


অন্যান্য চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বয়স ও যোগ্যতার চেয়ে অধিক বয়স্কদের ও কম যোগ্যদের শিক্ষকতায় প্রবেশের সুযোগ দেওয়া মোটেও উচিত নয়। কিছুদিন পরপর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করতে চাইলে বারবার অধিকতর যোগ্য ফ্রেশ ক্যান্ডিডেট পাওয়া যাবে। একজন ইয়ং এনার্জিটিক মেধাবী শিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে তৈরি করতে ও পূর্ণ উদ্যমে দীর্ঘদিন পাঠদান করতে যতটা সক্ষম একজন বয়স্ক লোক ততটা সক্ষম না হওয়াই স্বাভাবিক। ব্যতিক্রম নগণ্য। একজন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের প্রকৃত সফল শিক্ষক হয়ে উঠতে অনেক সময়, শ্রম, মেধা, চর্চা, উদ্যম, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা লাগে। কেউ শিক্ষক হয়ে উঠতেই যদি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন তো সফল পাঠদানে নিরলস থাকবেন কীভাবে, কতদিন? 


আলোচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অধিক যুক্তিযুক্ত উন্নত নীতিমালা প্রণয়ন করে ঢেলে সাজানো উচিত সকল শিক্ষক নিয়োগের বাছাই প্রক্রিয়া। মূল্যায়নে বিবেচনা করা উচিত প্রার্থীর শিক্ষা জীবনের কর্মকাণ্ড ও ডেমো ক্লাসের মান। দ্রুত দূর করা উচিত একই দায়িত্ব-কর্তব্যে নিয়োজিত সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স সীমা, বাছাই প্রক্রিয়া এবং আর্থিক সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত সকল বৈষম্য। অর্থাৎ বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য আর নিবন্ধন পরীক্ষা নয়, নিতে হবে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষা। সেই সাথে বৃদ্ধি করতে হবে আর্থিক সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে হবে সর্বাধিক যোগ্যদের। 



লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট 

rahamot21@gmail.com 


৩১.৭.২০২৫




জাগো নিউজ: 

https://www.jagonews24.com/m/opinion/article/1041481?fbclid=IwQ0xDSwL9c5hjbGNrAv1zB2V4dG4DYWVtAjExAAEeoGlpJ_XPitpNKL41px6uW6mkIGD53rWMKjU56oAyIlDFYltqULrlCuMKx18_ae

m_17Vn_q5UfFwFj-fiatclOQ 

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের জন্য পরামর্শ


পত্রিকার লিংক

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের জন্য পরামর্শ 

মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক ইত্তেফাক, ০১ আগস্ট ২০২৫

প্রিয় শিক্ষার্থী, তোমরা যারা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারোনি তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সমবেদনা। হ্যাঁ, অবশ্যই শুভেচ্ছা, অর্থাৎ শুভ ইচ্ছা তোমাদের জন্য। শুভেচ্ছা বা শুভকামনা তো তোমাদের জন্যই বেশি প্রয়োজন। মন খারাপ করো না, হতাশায় নিমজ্জিত হয়ো না, জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না। কারো তিরস্কারে কান দিও না। আবেগকে নিয়ন্ত্রিত কর, বিবেককে জাগ্রত কর। জীবন অনেক দীর্ঘ ও মূল্যবান। অগণিত পরীক্ষায় ও সম্ভাবনায় ভরপুর মানুষের জীবন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার একটি প্রচলিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা মানে জীবন ব্যর্থ হয়ে যাওয়া নয়। কৃতকার্য হওয়ার অর্থ হচ্ছে কোন কাজে সফল হওয়া। মানুষের সফল হওয়ার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। 


নিজের ভুলগুলো চিহ্নিত করো, সংশোধনের জন্য প্রতিজ্ঞা করো, পরিকল্পনা করো, বাস্তবায়ন করো। নিয়মিত ক্লাসে যাও, শিক্ষকগণের সহযোগিতা নাও। কাউকে দোষারোপ করো না। সমস্যা থাকবেই, প্রতিকূলতা থাকবেই। সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে যাও, প্রতিকূলতা মোকাবিলা করো। পিতা-মাতাকে সম্মান করো। পিতা-মাতার শাসনকে কল্যাণ মনে করো। রাগ-অভিমান করো না। মনে রেখো, যে তোমার কল্যাণ চায়, সেই তোমার মন্দে মন খারাপ করে, তোমাকে উপদেশ দেয়, বকাবাদ্য করে। এর গভীরে জমা থাকে অনেক আদর। ধৈর্য বৃদ্ধি করো, নিজেকে পরিশুদ্ধ করো, দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাও। এবার উত্তীর্ণ হলে যে ফলাফল করতে, আগামীবার এর চেয়ে ভালো ফলাফল করে উত্তীর্ণ হও। তবেই জিতে যাবে তুমি। জিতে যাবে তোমার শিক্ষক, অভিভাবক। 


যারা কোন কারণে পুনরায় এসএসসি বা সমমান পরীক্ষা দিতে পারবে না তাদেরও হতাশ হবার কিছু নেই। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে তোমরাও হতে পারো সফল। ছয় মাসেই নিতে পারো কুকিং, টেইলারিং, ওয়েল্ডিং, ইলেকট্রিক্যাল, এসি-ফ্রিজ রিপেয়ার, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, হেয়ার কাটিং, কম্পিউটার বা গ্রাফিক ডিজাইন, গাড়ি মেরামত, নির্মাণ, কৃষি ও পশুপালন ইত্যাদি প্রশিক্ষণ। এসব প্রশিক্ষণ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে বা স্বল্প খরচে দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজ করতে পারো দেশে ও বিদেশে। উদ্যোক্তা হয়ে গড়ে তুলতে পারো নিজের প্রতিষ্ঠান। করতে পারো নিজের ও অন্যের কর্মসংস্থান। ছোট থেকে তোমার প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারে অনেক বড়। এর পাশাপাশি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেকোনো বয়সে দিতে পারো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এবং নিতে পারো উচ্চশিক্ষা। আবার ভিন্ন ভাষা শিখে প্রায় বিনা খরচে চলে যেতে পারো বিদেশে। উপার্জন করতে পারো অনেক অর্থ। দেখবে, একদিন যারা তিরস্কার করেছিল, তারাই বাহবা দিবে, ভালোবাসা দিবে, পুরস্কার দিবে। 


ভালো করার ইচ্ছা রাখো, সর্বাধিক চেষ্টায় থাকো, সঠিক পথে এগিয়ে যাও; অবশ্যই ভালোভাবে উত্তীর্ণ হবে পরবর্তী পরীক্ষায় বা প্রশিক্ষণে। এর পাশাপাশি জয়ী হও এ+ মানুষ হবার পরীক্ষায়। সৎ হও, নীতিবান হও, বিবেকবান হও, পরিশ্রমী হও, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হও। তবেই তুমি হবে অধিক কৃতকার্য।


লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক


পত্রিকার লিংক:

https://epaper.ittefaq.com.bd/m/471335/688b78e5e26fb


[লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উপকৃত করতে পারেন]

শিক্ষা ক্ষেত্রে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও প্রতিকার



পত্রিকার লিংক

শিক্ষাক্ষেত্রে ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও প্রতিকার 

মো. রহমত উল্লাহ্

বিগত বেশ কয়েক বছর যাবত বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা অনেক পিছিয়ে পড়েছে! ভর্তিতে, লেখাপড়ায়, পরীক্ষায় অংশগ্রহণে, পাশের হারে ও ফলাফল অর্জনে সব দিক থেকেই ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। কমেছে মেয়েদের ড্রপ আউটের পরিমাণ। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে অর্থাৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও এমনটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় কম হলেও ভালো ফলাফলে অর্জনে মেয়েরাই উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে। মেয়েদের এগিয়ে যাওয়া যেমন আনন্দের, ছেলেদের পিছিয়ে পড়া তেমনি উদ্বেগের! 


আমাদের উচিত ছেলেদের ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ার সকল কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ চিহ্নিত করে ব্যাপক পর্যালোচনা করে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের পথ উদঘাটন করা ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাস্তবে শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের দেশে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের পিছিয়ে পড়ার অনেক ছোট-বড় কারণ বিদ্যমান। এ স্বল্প পরিসরে সবকিছু তুলে ধরে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বা বাস্তবতা তুলে ধরে এর সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। 


একটু পিছনে তাকালেই দেখা যাবে ছেলেদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল আমাদের মেয়েরা। মেয়েদের এগিয়ে আনার জন্য আমরা গ্রহণ করেছি বিভিন্ন পদক্ষেপ। অর্জন করেছি ব্যাপক সফলতা। যেতে হবে আরো অনেক দূর। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরা এখন ছেলেদের তুলনায় সংখ্যায় ও ফলাফলে অনেক এগিয়ে। আমরা মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়া, উপবৃত্তি দেয়া, অভিভাবকদের সচেতন করা, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা, শিশুশ্রম রোধ করা ইত্যাদি কার্যক্রম চলমান রেখেছি। ১৯৯৪ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান শুরু করা হয়। ২০০২ সালে তা উন্নীত করা হয় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে। আমাদের কন্যা শিশুরা এই কার্যক্রম গুলোর অধিক সুফল অর্জন করেছে তাই তাদেরকে ধন্যবাদ। অথচ প্রায় ১৫ বছর পরে ২০০৯ সালে এসে দরিদ্র পরিবারের ছেলে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে! রাষ্ট্রীয়ভাবে মেয়েদের প্রতি তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে ছেলেদেরকে অবহেলা করা হয়েছে কিনা তা কিন্তু আমরা ভেবে দেখিনি! 


কন্যা শিশুদের এখন আর সেই আগের মত বাসা-বাড়িতে থেকে কাজ করতে দেখা যায় না। প্রায় সবাই উপবৃত্তির টাকা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত স্কুলে যায়। এটি অবশ্যই একটি শুভ লক্ষণ। এর জন্যই তো আমরা অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম শিশুশ্রম থেকে বেরিয়ে আসুক পুত্র-কন্যা নির্বিশেষে সকল শিশু। কিন্তু এখনো আমরা দেখতে পাচ্ছি পুত্র শিশুরা টেম্পুতে, গ্যারেজে, কারখানায়, নৌকায়, মাছ ধরায়, ইটভাটায়, হাটবাজারে, দোকানপাটে, মাঠে-ঘাটে, ক্ষেত-খামারে, টি-স্টলে হোটেল-রেস্টুরেন্টে ইত্যাদি অগণিত ক্ষেত্রে কায়িক শ্রম দিয়ে সামান্য উপার্জন করে নিজে জীবন ধারণ করছে ও পরিবারকে সহায়তা করছে। এমন অনেক শিশুর সঙ্গে আমি কথা বলে জেনেছি, তারা লেখাপড়া করতে চায়, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না! নানান ধরনের অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে! দারিদ্র্যের কষাঘাতে নিষ্পেষিত এমন পুত্রশিশুরা স্কুলে ভর্তি হয় না। কেউ কেউ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। আবার অনেকেই স্কুলে/ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে দুএক বছর পরেই ঝরে পড়ে।   


অপরদিকে মেয়ে শিশুদের তুলনায় অধিক সংখ্যক ছেলেশিশু বাইরে বেশি সময় কাটায়, নেশাগ্রস্থ হয়ে থাকে, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা করে, বেপরোয়া মোটরবাইক হাঁকায়, কিশোর গ্যাংএ জড়িত থাকে, চাঁদাবাজি করে, রাজনৈতিক নেতাদের পিছনে সময় ব্যয় করে, ঝগড়া বিবাদে জড়িত থাকে, নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করে, সারাক্ষণ গেইম চালায়, সারাদিন খেলাধুলা করে, আনন্দ আয়োজন করে, ফার্মের মুরগি চুরি করে, কৃষকের ফল-ফসল চুরি করে, দলে দলে ঘুরে বেড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছুতেই অধিক হারে ছেলেরা জড়িয়ে পড়ায় অনেক বেশি পিছিয়ে পড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও এমন অশুভ চিত্র দেখা যায়। মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা বেশি মাত্রায় বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত বিধায়, শিক্ষক ও অভিভাবকের সঙ্গে বেশি বেয়াদবি করে বিধায় ছেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ায় আমরা হাল ছেড়ে দিচ্ছি কিনা তা ভাবতে হবে বিশেষভাবে। তা না হলে আরো বেশি সংখ্যক ছেলেরা কর্মের অনুপযোগী হয়ে বেকারত্বে নিমজ্জিত হয়ে পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা বাড়িয়ে তুলবে বহুগুণ! আমরা যদি অসহায়ের মত বা দায়িত্বহীনের মত বসে থাকি তাহলে আর রক্ষা পাবো না কেউ।


এমন এক সময় ছিল যখন এলাকার সকল ছেলেদের শাসন-বারণ করার অধিকার ছিল সকল বড়দের। স্বার্থহীন আদর-স্নেহ দিয়ে অর্জন করে সেই অধিকার প্রয়োগ করতো বড়রা; আর নির্দ্বিধায় তা মেনে নিত ছোটরা। একজনের সন্তানের কল্যান চিন্তায় সক্রিয় থাকত শতজন অভিভাবক। বড়দের নেতৃত্বে ছোটরা করতো খেলাধুলা, শিক্ষামূলক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজ। আমি নিজেও কর্মী হয়ে অংশ নিয়েছি এবং পরে নেতৃত্ব দিয়েছি এমন অনেক কাজে। আমাদের প্রিয় শিক্ষকগণও অংশ নিতেন আমাদের সাথে। তখন শিশুরা বেড়ে উঠত অন্যের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার মানসিকতা নিয়ে। কেউ বিপথে গেলে সবাই মিলে তাকে আনা হতো সুপথে। তেমন মানসিকতা নিয়ে আবার এগিয়ে আসতে হবে সবার। 


উল্লিখিত কারণগুলোর পাশাপাশি খুঁজে দেখতে হবে ছেলেদের ড্রপ আউট হবার ও পিছিয়ে পড়ার অন্যান্য কারণ। তবে মনে রাখতে হবে, এখন পাল্টে গেছে পরিবেশ ও পরিস্থিতি। সেই সাথে পাল্টে গেছে ডিজিটাল যুগের ছেলেমেয়েদের নিয়ন্ত্রণ কৌশল। তাই অভিভাবক ও শিক্ষকদের অবশ্যই শিখতে হবে স্মার্ট পেরেন্টিং, ইফেক্টিভ টিচিং। সবার আগে সক্রিয় হতে হবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের। পর্যাপ্ত সাপোর্ট দিয়ে তৈরি করতে হবে আরো যোগ্য-দক্ষ সফল শিক্ষক। ছেলেমেয়েদের লালন-পালন তথা শিক্ষাদানে ঘরে-বাইরে থাকতে হবে আরো অনেক বেশি সতর্ক ও সক্রিয়। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে কার্যকর পরিকল্পনা। থাকতে হবে সরকারের সদিচ্ছা। মেয়ে বা ছেলে কাউকে দমিয়ে রেখে নয়, উভয়কে এগিয়ে এনে অর্জন করতে হবে সমতা। উভয়কেই এগিয়ে নিতে হবে সমান তালে। রাখতে হবে সঠিক পথে।


লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক

Email - rahamot21@gmail.com 




পত্রিকার লিংক: 

https://www.jagonews24.com/o

pinion/article/1039672