গণপাঠ্য ছড়া - সং সংকল্প / সঙ সঙ্কল্প

 সঙ সঙ্কল্প


মো. রহমত উল্লাহ্


থাকবো আমি বদ্ধ ঘরে

দেখবো না আর জগতটাকে

কেমন করে ঘুরছে মানুষ

মরন ফাঁদের ঘুর্ণিপাকে!


দেশ হতে দেশ দেশান্তরে

নারী শিশু পাচার করে

ড্রাগের নেশায় কেমন করে

মরছে মানুষ লাখে লাখে

কিসের আশায় করছে বরণ

যৌন রোগের যন্ত্রণাকে!


কেমন করে ধর্ষিতারা

জীবনটাকে নিচ্ছে মেনে

কেমন করে মানবতা

নিয়ম-নীতি লুটায় বনে!


সাধারনের মুখের খাবার

কোন্ সবলে নিচ্ছে কেড়ে

সব অশুভ ইঙ্গিত কোন্

উপর থেকে আসছে তেড়ে!


অন্ধ বধির থাকবো অমি

খুলবো না আর দৃষ্টিটারে

দেখতে গেলে শুনতে গেলে

প্রতিদিনই কষ্ট বাড়ে!


: ওরে অতি চালাক চাচা

এই ভাবে কি যাবে বাঁচা?

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও কোচিং-বাণিজ্য। খোলা কাগজ, ২২ জুন ২০২১

পত্রিকার লিংক

শিক্ষকদের বেতন-ভাতা ও কোচিং-বাণিজ্য

মো. রহমত উল্লাহ্‌

খোলা কাগজ, ২২ জুন ২০২১


আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে যতটুকু অগ্রগতি তথা অনুকূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ও হচ্ছে তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন ও আছেন শিক্ষক সমাজ। অন্যথায় এই সফলতাটুকু অর্জন সম্ভব ছিল না মোটেও। আর এই শিক্ষকদের প্রায় ৯৭ ভাগ হচ্ছেন বেসরকারি। তাদের প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় সংসার চলে না, এটি এখন সবাই জানেন ও বোঝেন। শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানোর জন্য। তাই তারা যোগ্যতানুসারে বেছে নিয়েছেন অতিরিক্ত কাজ করে সামান্য আয়ের পথ। কেউ কেউ প্রাইভেট পড়ানো, নোট-গাইড লেখা, বিভিন্ন ব্যবসা, ঠিকাদারি, রাজনীতি ইত্যাদি করছেন। আবার কেউ বাবার/স্বামীর ধন খাচ্ছেন। সেসব খাতের আয়ের ওপর যেহেতু তাদের জীবনধারণ অনেকাংশে নির্ভর করছে; সেহেতু তারা ঐ কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ঐ কাজেই বেশি সময়, শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকতায় তাদের মনোযোগ না থাকা বা কম থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াই বাস্তব। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট না পড়ে বা কোচিং না করে শিক্ষার্থীরা পারবে কীভাবে? তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চেয়ে যারা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন বা কোচিং করাচ্ছেন তারা তো ব্যক্তিগতভাবে হলেও শিক্ষকতাই করছেন। নিজের পাঠদানের বিষয়টি নিয়মিত চর্চা করছেন কমবেশি। অন্যরা তো তা-ও করছেন না।  এই প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেনি এবং শিক্ষকদের কাম্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই হয়তো যুগ যুগ ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের ব্যাপারে নমনীয় নীতি অনুসরণ ও নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বার বার।


সাবেক শিক্ষামন্ত্রীর মহোদয়ের আমলে প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের জন্য গত ২০ জুন ২০১২ তারিখে যে নমনীয় নীতিমালা জারি করা হয়েছিল সেই নীতিমালাকেই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর মহোদয়ের আমলে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গত ০৮ ফেব্রু়ারি ২০১৯ তারিখে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বিভিন্ন উপ-ধরাসহ মোট ১৪টি ধারা সংযুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে:

১/ক. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: সরকারি ও বেসরকারি সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বুঝাবে।


১/গ. শিক্ষক: সরকারি ও বেসরকারি সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল শিক্ষককে বুঝাবে।


১/ঘ. শিক্ষার্থী: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে অধ্যয়নরত সকল ছাত্র-ছাত্রীকে বোঝাবে।


১/চ. কোচিং: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চলাকালীন শিক্ষকের নির্ধারিত ক্লাসের বাইরে বা এর পূর্বে অথবা পরে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে/বাহিরে কোন স্থানে পাঠদান করাকে কোচিং বোঝাবে।


১/ছ. কোচিং বাণিজ্য: উপানুচ্ছেদ চ অনুযায়ী বিভিন্ন জাতীয়/ দৈনিক/ স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, পোস্টার, ফেস্টুন, লিফলেট, ব্যানার, দেয়াল লিখন অথবা অন্যকোন প্রচারমাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করাকে বুঝাবে। 


১/জ. প্রাইভেট টিউশনি: প্রাইভেট টিউশনি বলতে শিক্ষকের নিজগৃহে কিংবা শিক্ষার্থীর গৃহে পাঠদানকে বুঝাবে।


২. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম চলাকালীন শ্রেণি সময়ের মধ্যে কোন শিক্ষক কোচিং করতে পারবেন না।


২/ক. আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের পূর্বে বা পরে শুধুমাত্র অভিভাবকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান প্রধান অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।


২/খ. এক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে মেট্রোপলিটন শহরে মাসিক সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা, জেলা শহরে ২০০ টাকা এবং উপজেলা বা স্থানীয় পর্যায়ে ১৫০ টাকা রশিদ এর মাধ্যমে অতিরিক্ত সময় ক্লাস পরিচালনার জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে গ্রহণ করা যাবে; যা সর্বোচ্চ ১,২০০ টাকার অধিক হবে না। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান স্ববিবেচনায় এই হার কমাতে/মওকুফ করতে পারবেন। একটি বিষয়ে মাসে সর্বনিম্ন বারোটি ক্লাস অনুষ্ঠিত হতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে প্রতি ক্লাসে সর্বোচ্চ ৪০ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করতে পারবে।


২/গ. এই নীতিমালার আওতায় সংগৃহীত ফি প্রতিষ্ঠান প্রধানের নিয়ন্ত্রণে একটি আলাদা তহবিলে জমা থাকবে। প্রতিষ্ঠানের পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং সহায়ক কর্মচারীদের ব্যয় বাবদ ১০%  অর্থ রেখে অবশিষ্ট অর্থ অতিরিক্ত ক্লাসের কাজে নিয়োজিত শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করা হবে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, অতিরিক্ত সময় ক্লাস পরিচালনার অন্যান্য খরচ উল্লিখিত অর্থের বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট থেকে আদায় করা যাবে না। এছাড়া কোনক্রমেই উক্ত খাতের অর্থ অন্য কোন খাতে ব্যয় করা যাবে না।


৩. কোন শিক্ষক তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানের পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে দৈনিক বা প্রতিদিন অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানের সীমিত সংখ্যক (১০ জনের বেশি নয়) শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে লিখিতভাবে ছাত্র-ছাত্রীর তালিকা (রোল, শ্রেণি উল্লেখসহ) জানাতে হবে।


৪. কোন শিক্ষক বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোন কোচিং সেন্টারে নিজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারবেন না বা নিজে কোন কোচিং সেন্টারের মালিক হতে পারবেন না বা কোচিং সেন্টার গড়ে তুলতে পারবেন না।


৫. কোন শিক্ষক কোন শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে উৎসাহিত বা উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করতে পারবেন না। এমনকি কোন শিক্ষক/শিক্ষার্থীর নাম ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন/প্রচারণা চালাতে পারবেন না।


৬. কোন শিক্ষক কোন শিক্ষার্থীকে কোচিংয়ে আসার জন্য তার নিজ নামে বা কোচিং সেন্টারের নামে কোনরকম প্রচারণা চালাতে পারবেন না।


৭. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি কোচিং বাণিজ্য রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।


৮. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান প্রয়োজনীয় প্রচারণা ও অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।


৯. কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং বাণিজ্য পরিচালনা করা যাবে না।


১০. কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রণীত নীতিমালায় বর্ণিত পদক্ষেপ কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অর্থ সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহন করবে।


১১. কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রণীত এই নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ৮/৯ সদস্যের একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে। যার প্রধান থাকবেন ক্ষেত্রমতে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার বা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহি অফিসার।


১২. কোচিং বাণিজ্য বন্ধে প্রণীত নীতিমালার প্রয়োগ এবং এ ধরনের কাজকে নিরুৎসাহিত করার জন্য সরকার সচেতনতা বৃদ্ধি সহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।


১৩/ক. এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার এমপিও স্থগিত, বাতিল, বেতন-ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তিমুলক ব্যবস্থা কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবেন।


১৩/খ. এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিও বিহীন কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন-ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


১৩/গ. এমপিও বিহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত বেতন-ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন একধাপ অবনমিত করণ, সাময়িক বরখাস্ত, চূড়ান্ত বরখাস্ত ইত্যাদি শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


১৩/ঘ. কোচিং বাণিজ্যের সাথে জড়িত শিক্ষক এর বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সরকার পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পাঠদানের অনুমতি, স্বীকৃতি অধিভুক্তি বাতিল করতে পারবে।


১৩/ঙ. সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫ এর অধীনে অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করে শাস্তি মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইত্যাদি…। 

এখনো বলবত আছে সেই নীতিমালা। কিন্তু তা কখনোই কার্যকর হয়নি শতভাগ। অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রকারান্তরে কোচিং বাণিজ্যকেই বৈধতা দেওয়া হয়েছে। 


উল্লিখিত নীতিমালার ব্যাপক প্রতিফলন পুনরায় লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০২০ এ। এতে বলা হয়েছে, "কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট-টিউশনের মাধ্যমে পাঠদান করতে পারবেন না। কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন পদ্ধতিতেও প্রাইভেট টিউশন বা কোচিংয়ের মাধ্যমে পাঠদান করতে পারবেন না। করলে তা অসদাচরণ বলে গণ্য ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হবে। তবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের লিখিত সম্মতি সাপেক্ষে স্কুল সময়ের পরে বা আগে সরকার কর্তৃক প্রণীত বিধি বা নীতিমালা অথবা জারিকৃত পরিপত্র বা নির্বাহী আদেশ অনুসরণপূর্বক অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করতে পারবেন। তাছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট টিউশনের মাধ্যমে পাঠদানের উদ্দেশ্যে কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা বা কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করা এ আইনের অধীন নিষিদ্ধ হইবে না। এক্ষেত্রে দুটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এক. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলাকালীন সময় সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত কোচিং সেন্টার পরিচালনা করা যাইবে না। করা হলে উক্ত কোচিং সেন্টারের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল করা যাবে। দুই. কোচিং সেন্টারে কোনো শিক্ষক তার নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীকে পাঠদান করতে পারবেন না। করলে তা অসদাচরণ হিসেবে শাস্তিযোগ্য হবে। ইত্যাদি..."


এসব নীতিমালা ও আইনের ফলে যে অবস্থা তৈরি হতে পারে তা হচ্ছে, অতীতে কেবল কঠিন বিষয়ে কোচিং হতো ভবিষ্যতে হবে সব বিষয়ে। অতীতে কেবল পরীক্ষার্থীদের কোচিং হতো ভবিষ্যতে হবে সকল শ্রেণির কোচিং। কারণ বিশেষ কিছু শ্রেণির ও বিষয়ের শিক্ষক কোচিং ফি পাবেন আর অন্যরা পাবেন না তা তো হবে না! তাই ক্লাসের না পড়িয়ে বা কম পড়িয়ে এবং পরীক্ষায় ফেল করিয়ে বা কম নম্বর দিয়ে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ে সম্মতি দিতে বাধ্য করতে পারেন অতি সহজ বিষয়ের জটিল স্যারেরাও। ভবিষ্যতে হয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় কোচিং করতে বাধ্য হবে সকল শ্রেণির সকল বিষয়ের শিক্ষার্থীরা! মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, 'কোচিংয়ের পুরোটাই তো খারাপ নয়, কোচিংয়ের দরকার নেই তাও নয়, কোচিংয়ের দরকার হতে পারে।' সুতরাং যা করলে শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত ক্লাসের বাইরে বা এর পূর্বে অথবা পরে অতিরিক্ত ক্লাস তথা কোচিং দরকার হয় শিক্ষকগণ তাই করতে পারেন। কেননা, প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় শিক্ষকগণের ন্যূনতম জীবনধারণ কোনভাবেই সম্ভব নয় বিধায় বাড়তি টাকার প্রয়োজন সকল শ্রেণির সকল বিষয়ের শিক্ষকেরই। ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ ভুলে যায় আইনের ভয়ে! এক্ষেত্রে পূর্ণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা খুবই কঠিন। কেননা, শিক্ষকের কাজ ইট ভাঙার কাজের মতো গুনে দেখা সম্ভব নয় যে, তিনি কতটা করেছেন, আর কতটা করেননি। শিক্ষক যদি প্রস্তুতি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যেয়ে সন্তুষ্টচিত্তে বিবেকের তাড়নায় স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বেচ্ছায় নিজেকে উজাড় করে না দেন তো শিক্ষার্থীরা সঠিক শিক্ষা নিতে পারে না, পারবে না এটাই বাস্তবতা। 


অপরদিকে নিজের বাসায় বসে বা শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে কোন শিক্ষক কখন কতজন কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তা মনিটর করা আমাদের জন্য দুরূহ কাজ। আমরা তো এখনও আমাদের নিত্যদিনের ওপেন ও প্যাকেট খাবারগুলোই ভেজাল এবং ফরমালিনমুক্ত করতে পারছি না। প্রকাশ্যে সদর রাস্তায় চলা মিটারবিহীন অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব বন্ধ করতে পারছি না। সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে চেষ্টাও করছি না। অথচ কোথায় কোন গ্রামেগঞ্জে, শহরে কোন ঘরে বসে বা অন্যের ঘরে গিয়ে কবে কখন সকাল-বিকেল রাতে কোন প্রতিষ্ঠানের কতজন শিক্ষার্থীকে কোন প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন বা দিবেন তা খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন আর প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ হবে এমনটি অবাস্তব নয় কি?


যদি কোচিং ভালো হয়, বাণিজ্য ভালো হয়, তো ক্লাসরুমের পড়া আর কতটুকু ভালো থাকে? শিক্ষকগণ যদি নীতিমালা বা আইন মেনেই ক্লাসরুটিনের আগে ও পরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কোচিং করাতে পারেন এবং আরও অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিতে পারেন বা বাসায় প্রাইভেট পড়াতে পারেন তো এসব করে অর্থ উপার্জন করবেন না কেন? সমাজের আর সকলের মত শিক্ষকদেরও তো অর্থের প্রয়োজন আছে। সুতরাং ভোরে বাসায় প্রাইভেট পড়াবেন। সকালে প্রতিষ্ঠানে এসে প্রথমে কোচিং করাবেন। পরে ক্লান্ত হয়ে মাথা গরম করে দু'একটি দায়সারা রুটিনক্লাস করাবেন। দুপুরে বাসায় যেয়ে খেয়েদেয়ে রেস্ট নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিকালে আবার কোচিং সেন্টারে বা বাসায় পড়াবেন। হয়তো ক্লাসে এমন ভাবে পড়াবেন যেন শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক কোচিংয়ে আসতে বাধ্য হয়! আবার প্রাতিষ্ঠানিক কোচিংয়েও হয়তো এমন ভাবেই পড়াবেন যেন শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারে বা বাসায় যেতে বাধ্য হয়! শুধু স্কুল-কলেজেই নয়; এই অবস্থা চলতে পারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মাদ্রাসাতে এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও। সেক্ষেত্রে প্রায় সকল অভিভাবককেই গুনতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ভর্তি ও বেতন-ফিস, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত কোচিং ফিস এবং কোচিং সেন্টারে বা বাসায় প্রাইভেট পড়ার ফিস! তদুপরি পরিশোধ করতে হবে শিক্ষা সামগ্রীর বিস্তর ব্যয়। ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করবে শিক্ষা বাণিজ্য! ধোপা বাড়ির কাপড়ে পরিণত হবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের জীবন!


আসলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সঠিকভাবে পড়াচ্ছেন কি না, তদারকি করা প্রয়োজন সেটি। তা না করে শিক্ষকরা সরকারি নিয়ম মেনে প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন কি না। এ যেন ‘চোখের অপারেশন পায়ে’। একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে অনেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য হয়তো বাসায়ই নিয়োগ দেওয়া আছে একাধিক টিচার। বিশেষ করে নামকরা টিচারের বাসা ও কোচিং-সেন্টারের আশেপাশের রাস্তায় যেসব দামি দামি গাড়ির ভিড় লেগে থাকে সেগুলোর অধিকাংশই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিদের ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিদের। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যাদের দিয়ে এই প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য বন্ধের তদারকি করানো হবে তাদের কারও সন্তানই যে প্রাইভেট পড়েনি, পড়ছে না এবং পড়বে না, তা নিশ্চিত করবে কে? 


বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা প্রাইভেট-কোচিং করানো বন্ধ করতে বাধ্য হলেও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিং না করে পারবে না। কারণ শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত। আর এ বিষয়টি যেন আমরা অনেকটা মেনেই নিয়েছি যে, ক্লাসরুমে পড়া হয় না, হবে না! এমন ব্যর্থ ভাবনাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধ্বংসের অন্যতম কারণ। ফলে অশিক্ষকের কাছ থেকে প্রাইভেট-কোচিং নিতে বাধ্য হবে শিক্ষার্থীরা। অশিক্ষকদের তো আর শাস্তি নেই। সে হবে আরও বেশি ক্ষতির কারণ। কিন্তু এভাবে তো আর চলতে পারে না। শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকায় ভর্তি হবে, বেতন-ফি পরিশোধ করবে, আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোচিং ক্লাস করে রিকভার করতে বাধ্য হবে নির্ধারিত ক্লাসের ঘাটতি পড়া! তদুপরি ক্লাসের বাইরে গিয়েও পড়তে হবে প্রাইভেট, করতে হবে কোচিং! অথচ সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ পাঠদান করাই তো শিক্ষকদের চাকরি। কিন্তু শিক্ষকরা এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করছেন কি না তা তদারক করা জরুরি। একজন শিক্ষক দৈনিক কত ঘণ্টা প্রতিষ্ঠানে থাকবেন, কত ঘণ্টা থাকছেন তার কি কোনো হিসাব নেওয়া হয়? 


আমি জানি, আমার এ কথাগুলো পছন্দ হবে না অনেকেরই। এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যারা এক শহরে/গ্রামে বসবাস করে বা অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থেকে চাকরি করছেন গিয়ে অনেক দূরের অন্য শহরের/গ্রামের সরকারি/বেসরকারি স্কুল/কলেজে/মাদ্রাসায়। সিনিয়র হলে সপ্তাহে যাচ্ছেন ৩-৪ দিন। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস নিচ্ছেন দিনে দু'য়েকটি মাত্র। বাস্তবে ক্লাসে/ প্রতিষ্ঠানের ক্লাসে তাদের মাসিক কর্মঘণ্টা  ৩২-৪০ ঘণ্টার বেশি নয়। শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি আছে এমন কলেজের একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন চল্লিশ মিনিটের দুটি করে ক্লাস সপ্তাহে ছয় দিনই নেন তবুও তার প্রতিষ্ঠানের ক্লাসে মাসিক কর্মঘণ্টা হবে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা। এর বাইরে হয়তো কিছু প্রস্তুতি নেওয়া, পরীক্ষা নেওয়া আর খাতা দেখা। দৌড়ে এসে ক্লাস আবার ক্লাস শেষ হলেই দৌড়। এক কাজ থেকে এসে আবার ছুটছেন বা ছুটতে বাধ্য হচ্ছেন অন্য কাজে। এই লেখা বা পত্রপত্রিকা পড়ার সময় এবং ধৈর্যও নেই অনেকেরই। গবেষণা তো অনেক দূরের কথা। শিক্ষকগণ এমন সার্ভিস দিলে শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? কমবেশি একাদশ শ্রেণির ১২০ এবং দ্বাদশ শ্রেণির ১২০ জনসহ মোট ২৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজনমাত্র ইংরেজি শিক্ষক যথেষ্ট কি না তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থা থেকে শিক্ষার উত্তরণ ঘটাতে চাইলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও বাড়াতে হবে শিক্ষকদের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা এবং সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে তাদের বাস্তবিক কর্মঘণ্টা। আর সেটি আন্তরিক ভাবে মেনে নিতে হবে শিক্ষকদের। উন্নত বিশ্বের শিক্ষকগণ তাদের শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত ক্লাসেই দিয়ে থাকেন পরিপূর্ণ শিক্ষা। স্কুলের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় না ক্লাসের পড়া। 


আমাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমত নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয়ত শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে আরো বেশি সময় প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেন শিক্ষকদের না থাকে বেতন-ভাতার অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের ধান্দা এবং শিক্ষার্থীদের না থাকে ক্লাসরুমের বাইরে ক্লাসের বিষয় পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা। তদুপরি কোচিং/ কোচিং বাণিজ্য/ প্রাইভেট টিউশনি বন্ধে নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতে না হয় শিক্ষা প্রশাসনের। তা না হলে বন্ধ করা সম্ভব হবে না প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ধ্বংসকারী এই কোচিং/ কোচিং বাণিজ্য/ প্রাইভেট টিউশনি, নিশ্চিত করা যাবে না মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদন করা যাবে না বিশ্বমানের যোগ্য নাগরিক-কর্মী।


মো. রহমত উল্লাহ্: শিক্ষক, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।


[অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। ১৭ জুন ২০২১]


http://www.kholakagojbd.com/public-opinion/


79659 



এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপদেশ। দৈনিক শিক্ষা, ২৬ মার্চ ২০১৮

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপদেশ। দৈনিক শিক্ষা, ২৬ মার্চ ২০১৮

 পত্রিকার লিংক

এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উপদেশ

মো. রহমত উল্লাহ্ | দৈনিক শিক্ষা, 

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভ কামনা। তোমরা যারা ২০১৮ খিস্টাব্দের এইচএসসি পরীক্ষার্থী তারা নিশ্চয়ই এখন অনেক ব্যতী-ব্যস্ত চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে। হ্যাঁ, এমনটি হওয়াই উচিত। শেষ ভালো যার সব ভালো তার। মোটেও অপচয় করা যাবে না এই শেষ সময়টুকু। এখনকার সামান্য অবহেলায় কিন্তু হতে পারে ‘তীরে এসে তরী ডুবানো’র মত অসামান্য ক্ষতি। তাই অন্য কোন দিকে ফিরানো চলবে না মনোযোগ। এখন পরীক্ষার চেয়ে বড় কোন আনুষ্ঠানিকতা নেই তোমাদের। আর এই আনুষ্ঠানিকতায় সফল হওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে, ঐকান্তিক ইচ্ছা নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করা।

লেখাপড়াই শিক্ষার্থীর প্রধান কাজ। যে প্রধান কজে সফল সে সবার কাছেই পুরস্কৃত। পৃথিবীতে বিদ্যাই হচ্ছে একান্ত নিজের ধন। এটি কেউ কেড়ে নিতে পারে না, বিলিয়ে দিলে কমে না, পালিয়ে চলে যায় না। সুশিক্ষা অর্জন ও প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ লাভ করতে পারে ইহ এবং পরকালের পরম শান্তি। তাই লেখাপড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া চলবে না কখনো। বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র- এই ব্রত নিয়ে সুশিক্ষা অর্জনে থকতে হবে আমরণ আন্তরিক।

মনে রাখতে হবে ‘বিশ্রাম কাজেই অঙ্গ এক সাথে গাঁথা, নয়নের অঙ্গ যেমন নয়নের পাতা’। কাজের গতি ও উদ্যম বৃদ্ধির জন্য বিশ্রাম ও বিনোদন অপরিহার্য। আর এ সময়েই তুমি পড়ে বা শুনে নিতে পারো তোমাদের গুরুজনদের কিছু জরুরি উপদেশ। করে নিতে পারো উপাসনা। পূর্ণ করে নিতে পারো ঘুম। নিশ্চিত করতে পারো মন ও দেহের সুস্থতা। সে জন্যই থাকা চাই একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বা রুটিন এবং সে মত সম্পাদন করা চাই দৈনন্দিন লেখাপড়া, নাওয়া-খাওয়া, উপাসনা, নিদ্রা, বিশ্রাম, বিনোদন।  অবশ্য সারা বৎসর যারা নিয়মিত ক্লাস করেছো এবং প্রিয় শিক্ষক ও অভিভাবকগণের পরামর্শ অনুসারে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করেছো তাদের পরীক্ষা নিয়ে সামান্য চিন্তা থাকলেও দুশ্চিন্তার তেমন কোন কারণ নেই। অব্যাহত প্রচেষ্টার সুফল অভিসম্ভাব্য।

আর হ্যাঁ। পরীক্ষার আগে খুঁজতে যেওনা পরীক্ষার প্রশ্ন। এটি অন্যায় ও অনৈতিক। এতে বিনষ্ট হবে তোমার অর্জিত প্রস্তুতি, সৎ সাহস ও নীতি-নৈতিকতা। পরীক্ষার আগে পেয়ে যাওয়া প্রশ্ন যদি পরীক্ষায় না থাকে তো সেটি হবে তোমার পরীক্ষা খারপ হওয়ার প্রধান কারণ। কেননা, অসৎ উদ্দেশ্য সংগ্রহ করা এই প্রশ্নই ভুলিয়ে দিবে তোমার দুই বছরের কষ্টার্জিত প্রস্তুতি। নিশ্চিত ধ্বস নেমে আসবে তোমার পরীক্ষার ফলাফলে। ভেঙে চূড়মার হয়ে যাবে তোমার সকল উচ্চাশা। তুমি পরিণত হবে সকলের অবহেলার পাত্রে। অপরদিকে অসৎ উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা কোন প্রশ্ন যদি পরীক্ষায় থাকে এবং তুমি সেই অবৈধ সুবিধা নিয়ে পরীক্ষা দিয়ে ভাল ফলাফল করো, তো সেই ভাল ফলাফল তোমার না। এতে আজীবন নিজের কাছে ছোট থাকবে তুমি। হারাবে মনের বল ও সৎ সাহস। বাড়তে থাকবে তোমার অযোগ্যতা। নিজের সন্তানকেও দিতে পারবে না সৎ উপদেশ।  অবশ্যই কোন এক সময় তোমার মনে জেগে উঠবে এই পাপ/অপরাধ বোধ। তখন আর কোথাও ফিরিয়ে দিতে পারবে না অবৈধভাবে অর্জিত তথাকথিত ভাল রেজাল্ট। সেই রেজাল্ট দিয়ে যে কর্ম করবে, বৈধ হবে না সেই কর্মের উপার্জন। মহান সৃষ্টিকর্তাও শুনবেন না তোমার প্রার্থনা। সুতরাং কোনভাবেই মাথায় আনবে না প্রশ্ন ফাঁস করে বা নকল করে পরীক্ষায় ভাল করার অনৈতিক চিন্তা।          

তোমরা নিজের উপর আস্থা নিয়ে এগিয়ে যাও সুদৃঢ়ভাবে। মনের গভীরে উচ্চারণ করো- আমাকেও ভালো করতে হবে। আমিও পারবো। অন্যরা পারলে আমি পারবো না কেন? আমাকেও পারতে হবে। অবশ্যই আমি পারবো। অবশ্যই আমি পারবো। মনে রেখো, সব ভয়কে জয় করেই ছিনিয়ে আনতে হয় সকল সফলতা। জীবনের প্রতিটি কাজে জয়ী হওয়ার জন্য থাকা চাই আন্তরিক প্রচেষ্টা ও সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাস। দুশ্চিন্তার কোন সুফল নেই। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো সব দুশ্চিন্তা। এখন কাজ একটাই, পরীক্ষায় ভালো করা। ভালো ভাবে আয়ত্ত্বে রাখো প্রতিটি বইয়ের প্রত্যেকটি চ্যাপ্টারের সকল খুটিনাটি বিষয়/দিক গুলো।

তোমরা নিশ্চয়ই জানো, কারো সাজেশনে কেবল বাছাই করা প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করে পরীক্ষায় ভালো করার দিন এখন আর নেই। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য তোমাকে সঠিক ভাবে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং আত্মস্ত করতে হবে নির্ধারিত পাঠ্যসূচির সকল বিষয়। এমন অনেকেই অছো, যারা একসাথে অনেক কিছু মনে রাখতে পারো না বলে পরীক্ষায় খারাপ করার ভয়ে চিন্তিত। তোমরা স্যারের সহায়তায় বাছাই করে নাও গুরুত্বপূর্ণ ও সহজবোদ্ধ  কয়েকটি অধ্যায়। খুব ভালো ভাবে আয়ত্ব করো অধ্যায় গুলোর সবকিছু। যেনো এই অধ্যায়ের যে কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারো তুমি। সহজেই তুলে নিতে পারো পাস নম্বরের চেয়ে অনেক বেশি নম্বর। শুধু পড়লেই চলবে না। লিখতেও হবে বারবার। মনে রেখো, একবার লেখা দশবার পড়ার চেয়ে বেশি ফলপ্রসূ। পড়ে জেনে নাও বিস্তারিত। মুখস্ত করার চেয়ে উত্তম নিজের মত করে লিখতে শিখা। লিখ। মিলিয়ে দেখ। ভুল শুধরে নাও। আবার লিখ। আবার মিলিয়ে দেখ। ভাবো। আবার লেখ। দেখবে বইয়ের মতো হুবহু না হলেও সঠিক হয়েছে তোমার উত্তর। এতে লেখাপড়ায় পাবে অনেক আনন্দ আর পরীক্ষা নিশ্চিত পাবে অধিক নম্বর। আবারো বলছি, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থায় বাছাই করা প্রশ্নের তৈরি করা উত্তর মুখস্ত করে বা নকল করে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। সকল পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য সচ্ছ ভাবে আত্মস্থ থাকা চাই নির্ধারিত চ্যাপ্টারের খুঁটিনাটি সবকিছু এবং সেই সাথে থাকা চাই যে কোন প্রশ্নের সঠিক উত্তর নির্ভুল বানানে লেখার নিজস্ব ক্ষমতা। আশাকরি সবাই লিখতে পারবে সকল প্রয়োজনীয় প্রশ্নের উত্তর এবং ভালো হবে তোমাদের পরীক্ষার ফলাফল।

লেখক : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

দীর্ঘ ছুটিতে চরম ঝুঁকিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা। খোলা কাগজ, ৩০ মে ২০২১




দীর্ঘ ছুটিতে চরম ঝুঁকিতে আমাদের শিক্ষার্থীরা

মো. রহমত উল্লাহ্

খোলা কাগজ, ৩০ মে ২০২১

>মহামারি করোনার কারণে গত ১৭ মার্চ ২০২০ তারিখ থেকে ১৪ মাস ধরে বন্ধ হয়ে আছে আমাদের দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রত্যক্ষ প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত হয়ে আছে শিক্ষার্থীরা। তাই সবাইকে অটোপ্রমোশন দিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে উপরের ক্লাসে, পরীক্ষা ব্যতীতই দেওয়া হয়েছে সরকারি পরীক্ষায় পাসের সনদ! শিক্ষার্থীরা বুঝে গেছে পরীক্ষায় পাসের জন্য লেখাপড়ার প্রয়োজন নেই! তাই তারা ছেড়ে দিয়েছে লেখাপড়া। যদিও নেওয়া হয়েছে কিছু অনলাইন ক্লাস এবং বেতার-টিভিতে সম্প্রচার করা হয়েছে কিছু পাঠ। বাস্তবে বিভিন্ন কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বঞ্চিত রয়েছে এ সকল অনলাইন ক্লাস ও বেতার-টিভির পাঠগ্রহণ থেকে। যারা সুযোগ পেয়েছে তারাও আগ্রহ দেখায়নি এসকল ভার্চুয়াল ক্লাসে। অতি অল্প কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এখনো এসকল ভার্চুয়াল ক্লাসে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের হার অত্যন্ত কম এবং যারা উপস্থিত হয় তারাও হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে যায় প্রায় সবাই। ভার্চুয়াল ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও দক্ষতা দেশের সকল শিক্ষকের এখনো নেই এটি স্বীকার করতেই হবে। অপরদিকে নিচের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে পূর্ণ শিক্ষাদান প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ অভিভাবক এসকল ব্যবস্থায় অজ্ঞ ও অক্ষম। এমতাবস্থায় ভার্চুয়াল ক্লাসের সংখ্যা ও পরিধি যতই বৃদ্ধি করা হোক; সময়, শ্রম ও অর্থব্যয় যতই বৃদ্ধি করা হোক; সকল শিক্ষার্থীর কাছে অনলাইন ও বেতার-টিভির ক্লাস সফল করা সহসা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। তাই লেখাপড়া থেকে শিক্ষার্থীরা দূরেই থেকে যাচ্ছে।


বারবার ঘোষণা দিয়েও করোনার ভয়ে যাওয়া যাচ্ছে না খোলা যাচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যাওয়া যাচ্ছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারেকাছে। যদিও যাওয়া যাচ্ছে কারখানায়, গার্মেন্টসে, শপিংমলে, লঞ্চে, বসে, পার্কে, হাটে, মাঠে, ঘটে ও  অন্যান্য অনেক স্থানেই।   কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যতীত শিক্ষার্থীরাও যেতে পারছে সর্বত্র। দিতে পারছে আড্ডা, খেলতে পারছে গেম, করতে পারছে ঘুরাঘুরি, মারামারি এবং আরো অনেক কিছুই।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই দীর্ঘ ছুটিতে কেমন আছে শিক্ষার্থীরা? কেমন আছে আমাদের সন্তানেরা? কেমন আছে এদেশের ভবিষ্যত নাগরিকেরা? কেমন কাটছে তাদের দিন কাল? শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘ ছুটিতে কোন দিকে যাচ্ছে তারা, কোন দিকে যাচ্ছে আমাদের দেশ?


একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে বা অলিতে-গলিতে, ঝোপ-ঝাড়ে, মাঠে-ঘাটে, কালভার্টে অত্যন্ত গাদাগাদি হয়ে বসে/দাঁড়িয়ে আছে অনেক শিক্ষার্থী। সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন, সবার দৃষ্টি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে, সবাই খেলছে অনলাইন গেম 'পাবজি' বা 'ফ্রি ফায়ার'। তারা এভাবেই কাটিয়ে দেয় দিন। কীভাবে যে সংসার চলে খোঁজ রাখে না তারা। বাবা-মা ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন কারোর খোঁজ রাখার সময় নেই, মানসিকতা নেই তাদের। এগিয়ে যেতে চায় না কারো বিপদে। এমনকি ফোন করলেও ধরে না, ধরলেও কথা লম্বা করে না। ফিরিয়ে ফোন করা তো অনেক দূরের কথা। দিনে দিনে তারা হয়ে উঠছে চরম স্বার্থপর! তাদের চাহিদা পূর্ণ করতে, তাদের মন খুশি রাখতে সদা ব্যস্ত-তটস্থ থাকতে হয় বাবা-মায়ের। প্রয়োজনীয় টাকার অভাব হলেই চড়াও হয় বাবা-মায়ের ওপর। কেউ কেউ বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ! 


এর চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা বিরাজ করছে রাতে! সারারাত জেগে ছেলেমেয়েরা খেলছে এসব গেম এবং সাঁতরে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবীর পর্নো জগতে। ডুবে যাচ্ছে কূল-কিনারহীন  নীল নেশার অতল সাগরে। এসব অনলাইন খেলায় ও সীমাহীন পর্নো আদান-প্রদানে যোগ দেয় দেশ-বিদেশে অবস্থিত জানা-অজানা অনেক ছেলেমেয়ে। এভাবে তারা বিনিময় করে তাদের চিন্তা-চেতনা। একে আয়ত্ত করে, অনুসরণ করে, অনুকরণ করে অন্যের চলন-বলন। ধ্বংস করে নিজের পারিবারিক ও সামাজিক কৃষ্টি, কালচার, মূল্যবোধ। শিখে না অথবা ভুলে যায় আবশ্যকীয় ম্যানার্স এন্ড এটিকেটস।


অনেক শিক্ষার্থী জড়িয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন অপরাধকারী গ্যাং এর সঙ্গে। চলে গেছে অভিভাবকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তারা সঙ্গবদ্ধ হয়ে করছে বিভিন্ন অপরাধ। গ্রুপে গ্রুপে করছে মারামারি। মেগাবাইট ও নেশাখাদ্য ক্রয়ের টাকা সংগ্রহের জন্য হানা দিচ্ছে নিজেদের ঘরে, অন্যের ফলের বাগানে, ফসলের মাঠে, মাছের পুকুরে, মুরগির ফার্মে, গাড়ির গ্যারেজে, পথচারীর পকেটে! এরই মধ্যে হয়তো একদল জড়িয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনের সঙ্গে। শিক্ষার্থীদের অবসর মস্তিষ্কে ঢুকে যাচ্ছে বিভিন্ন বৈধ-অবৈধ সংগঠনের মতাদর্শ এবং হিসাবহীন অর্থ হস্তগত করার নেশা।


সারারাত জেগে, সারাদিন ঘুমিয়ে মেজাজ খিটখিটে করে নিকটজনের সঙ্গে করছে খারাপ ব্যবহার। অমনোযোগী হয়ে গেছে লেখাপড়ায়। হারিয়ে ফেলছে সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষমতা। হয়ে পড়ছে চরম ধৈর্যহীন! কেউ কেউ হয়ে পড়ছে অত্যধিক হিংস্র! আবার কেউ কেউ হয়ে পড়ছে একেবারে নির্জীব। আক্রান্ত হয়ে পড়ছে চরম বিষন্নতায়। নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে হতাশায়। হারিয়ে ফেলছে কর্ম উদ্যম। হয়ে যাচ্ছে নেশাগ্রস্ত!


নিকটজনের সঙ্গে যখন তখন করছে চরম দুর্ব্যবহার। সঠিকভাবে করছে না নাওয়া-খাওয়া। হচ্ছে না স্বাস্থ্য সচেতন। অর্জন করছে না রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। অর্জন করছে না প্রয়োজনীয় শক্তি-সাহস। চরমভাবে হয়ে পড়ছে দায়িত্ব-কর্তব্য হীন। নিজের প্রতি যেমন যত্ন নিচ্ছে না, তেমনি অন্যের প্রতি দায়িত্ব পালনে হচ্ছে না সচেতন। কারো অসুস্থতার খবর, মৃত্যুর খবর এদের মনে কোন প্রভাব ফেলে না। এসব এরা শুনে আর ভুলে যায়। এদের স্মরণশক্তি হ্রাস পাচ্ছে অতি দ্রুত। 


দেশের প্রতি তাদের কোন ভালবাসা তৈরি হচ্ছে না। জাতির প্রতিও কোন ভালবাসা তৈরি হচ্ছে না। সামাজিক দায়-দায়িত্ব থেকেও এরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মননশীল বই থেকে সরে গেছে অনেক দূরে। জানে না তাদের পাঠ্য বইয়ের ও চ্যাপ্টারের নাম। অর্জন করছে না মনের উদারতা। তাদের অনেকেই আবার খেলার মাঠ থেকে চলে গেছে পথের ধারে বা অন্ধকার ঘরে। তারা নিচ্ছেনা সূর্যের আলোর পরশ, মুক্ত বাতাসের ছোঁয়া। দীর্ঘ ছুটিতে আমাদের ঘরে-বাইরে নিরবে তৈরি হচ্ছে শিক্ষাহীন এক অসার ও অপরাধী জেনারেশন। দ্রুত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ ও জাতি!


এমতাবস্থায় আবারও সবিনয়ে বলছি, আর বৃদ্ধি করবেন না ছুটি। এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিন। অন্ততপক্ষে করোনামুক্ত গ্রামসমূহের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলক ভাবে আগে খুলে দিন। গ্রামের একটি শিক্ষার্থীও যদি বিপথ থেকে মুক্ত থাকতে পারে, লেখাপড়ায় এগিয়ে যেতে পারে তো সে এদেশেরই সম্পদ হবে। গ্রামের অবস্থার অবনতি না হলে পর্যায়ক্রমে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিন। সেইসাথে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নিন। সবই তো চলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর বন্ধ থাকবে কেন? শিশু শিক্ষার্থীদের উপযোগী পর্যাপ্ত টিকা পাওয়া তো এখনো অনিশ্চিত। দেশের প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর টিকা নিশ্চিত করতে যদি আরও কয়েক বছর সময় লাগে তো ততদিন কি বন্ধ রাখা হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান? যদি তাই হয় তো কোথায় গিয়ে ঠেকবে এ জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? অদূর ভবিষ্যতে কাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে এ দেশ?


মো. রহমত উল্লাহ্ 

শিক্ষক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

Email- rahamot21@gmail.com


কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষ করে শিক্ষক। ইত্তেফাক, ১০ জুন ২০২০

কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষ করে শিক্ষক। ইত্তেফাক, ১০ জুন ২০২০

 পত্রিকার লিংক

কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষকরে শিক্ষক  

-মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক ইত্তেফাক >আলোকপাত, ১০ জুন, ২০২০

>গুজব ছড়ানো রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় কোনো দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো সাধারণ বিবেকবান মানুষ এটি করতে পারেন না। যারা প্রকৃত ধর্মপ্রাণ, দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক তারাতো কখনোই এটি করবেন না। গুজব ছড়ানো বা অপপ্রচার করা মানেই মিথ্যা বলা। ইসলাম ধর্মে বলা আছে, তোমরা নিশ্চিত না হয়ে কিছুই বলবে না এবং কোনো কিছুকে এক রত্তিও কমিয়ে বা বাড়িয়ে বলবে না। অন্য সব ধর্মই সমর্থন করে এই বক্তব্য। কেননা সব ধর্মমতেই মিথ্যা বলা মহাপাপ।


অথচ অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতিনিয়ত ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন বা সোসাল মিডিয়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চালাচ্ছে অনেক অপপ্রচার, ছড়াচ্ছে নানান গুজব। তারা অসত্ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ের ভুল বা বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, দিচ্ছে উসকানি, তৈরি করছে অশান্তি! এসব আবার ভাইরাল করে অতি চালাকরা উপার্জন করছে অর্থ। সেগুলোকে দ্রুত লাইক ও শেয়ার দিচ্ছে তাদের গ্রুপভুক্ত সমমনারা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক পদবিধারীরাও করছে হেন কাজ! এসব দেখে হুজুগে পড়ে, তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত না হয়ে, গভীরভাবে চিন্তাভাবনা না করে, ভালোমন্দ বিবেচনা না করে, সেগুলোকে লাইক ও শেয়ার করে মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়াচ্ছেন অনেক সাধারণ শিক্ষক।


এক্ষেত্রে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক থাকা উচিত সব শিক্ষকের। ফেসবুক-মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন অনলাইন বা সোসাল মিডিয়াতে যা পাওয়া যায় তার সবই অন্ধের মতো বিশ্বাস করা, লাইক করা, শেয়ার করা কোনো বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষের তথা শিক্ষকের কর্ম হতে পারে না কোনোভাবেই। একটি সঠিক সংবাদ/সার্কুলার বিকৃতভাবে বা ভিন্ন কৌশলে উপস্থাপন করে অন্যকে উসকে দেওয়া অথবা বিভ্রান্ত করাও অপরাধ। শিক্ষকের সদাই মনে রাখতে হবে, তিনি একজন শিক্ষক। তার আছে অগণিত শিক্ষার্থী। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবচেয়ে বেশি। শুধু আইনের কাছে নয়, নিজের বিবেকের কাছেও তার জবাবদিহিতা অপরিসীম। তাই এমন কোনো কিছুকেই তিনি পোস্ট, লাইক ও শেয়ার দিতে পারেন না; যার দ্বারা সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং যা আইনসিদ্ধ নয়।


যিনি মনেপ্রাণে শিক্ষক তিনি কোনোভাবেই কোনো অবস্থাতেই ছড়াতে পারেন না কোনো রকম অপপ্রচার বা গুজব। অন্যভাবে বলা যায়, যিনি গুজব ছড়ান তিনি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকই নন। নিয়োগপত্র পেলেই, ছাত্রছাত্রী পড়ালেই, বেতন-ভাতা পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। শিক্ষকতা চাকরি নয়, মহান ব্রত। অনেক কিছু পাওয়ার মধ্যে নয়, ভালো কিছু দেওয়ার মধ্যেই শিক্ষকতার আনন্দ ও সফলতা। শিক্ষকের থাকতে হয় সর্বোচ্চ সম্মানবোধ, ন্যায়নীতিবোধ ও সতাদর্শ।


লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা


https://www.ittefaq.com.bd/print-edition/opinion/157044/%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%9C%E0%A6%AC-%E0%A6%9B%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%89

প্রবন্ধ - দান ও দানগ্রহীতার সম্মান। খোলা কাগজ, ০৭ মে ২০২১

পত্রিকার লিংক

দান ও দানগ্রহীতার সম্মান

খোলা কাগজ, ০৭ মে ২০২১

মো. রহমত উল্লাহ্


ইসলাম ধর্মের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে গরিব মানুষের প্রতি সদয় হওয়া, অসহায় মানুষকে সহায়তা দেওয়া, অনাহারী মানুষকে খাবার দেওয়া। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে- রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দানকারী আল্লাহর নিকটতম, বেহেশতের নিকটতম এবং মানুষের নিকটতম হয়ে থাকে। আর দূরে থাকে জাহান্নাম থেকে।' পবিত্র রমজান মাসে এই দানের সোয়াব ৭০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। পবিত্র কোরআন শরিফ নাজিলের এই রমজান মাসেই নবিজি সর্বাধিক দান-সদকা করতেন। তাই আমাদেরও উচিত নবিজিকে অনুসরণ করা।


সমাজের গরিব-দুঃখী অনাহারী মানুষের কষ্ট অনুভব করার জন্যই ফরজ করা হয়েছে রোজা। রোজার সময় আমরা সবাই অনুভব করতে পারি অনাহারে থাকার যন্ত্রণা! এই যন্ত্রণা অনুভব করেই আমাদের সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে হবে অনাহারী মানুষের প্রতি। বাড়িয়ে দিতে হবে সাহায্যের হাত। রোজার শিক্ষা হচ্ছে- নিজে ভোগ-বিলাস, লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বিরত থাকা এবং অন্যের কল্যাণে তথা সাহায্য-সহযোগিতায় নিবেদিত থাকা। 


পবিত্র রমযানের এই শিক্ষা নিয়ে সচ্ছলরা প্রতিজ্ঞা করব যে, আমরা নিজেরা এগিয়ে যাব গরিব দুঃখী মানুষকে সহায়তা করার জন্য। আমরা নিজেরাই খোঁজ নিয়ে জানবো আমাদের পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কারা অভাবগ্রস্ত আছেন। প্রকৃত অভাবিদের প্রতি আমরা আমাদের সাধ্যমত চুপি চুপি এগিয়ে দেবো সাহায্যের হাত। আমাদের অধীনস্থ শ্রমিক-কর্মচারী বা কাজের লোকদের প্রতিও আমরা সহানুভূতিশীল হব। তাদের আর্থিক অবস্থা জেনে প্রয়োজনে সাধ্যমত সহায়তা করব। সর্বক্ষেত্রেই বজায় রাখব সর্বাধিক গোপনীয়তা ও সাহায্য গ্রহীতার সম্মান।


এই করোনা মহামারীর কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক মানুষ। একসময়ের অনেক সচ্ছল মানুষও এখন অসচ্ছল। সম্মানবোধের কারণে তারা হাত বাড়াতে পাচ্ছেন না সবার কাছে। আমাদের পরিচিত এমন কেউ থেকে থাকলে তাকে একান্ত গোপনে সাহায্য করবো এবং সচ্ছলদের বলবো তাকে সাহায্য করার জন্য। সম্ভব হলে পরিচিত ধনীদের কাছ থেকে সাহায্য সংগ্রহ করে পরিচিত গরিবদের পৌঁছে দিব। 


রাস্তাঘাটে ও হাটবাজারে অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি সংখ্যক ভিক্ষুক দেখা যাচ্ছে। মহামারি করোনার কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় ভিক্ষুকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা বারবার আমাদের সামনে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। আমাদের সাধ্যমত তাদেরকে সামান্য সাহায্য দিব। কাউকে সাহায্য দিতে না পারলেও তাকে অপমান করবো না, তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করব না। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করাও মাহে রমজানের শিক্ষা। 


কাউকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে তার নিকট থেকে বিনিময়ে কোন কিছু প্রত্যাশা করবো না। এমনকি সাহায্য গ্রহীতা আমার প্রতি অতিরিক্ত সম্মান প্রদর্শন করুক, নমনীয়তা প্রদর্শন করুক, এমন চিন্তাও করবো না। আমাদের দান-সাহায্যের বিনিময় আল্লাহর নিকট থেকেই প্রত্যাশা করব। আমরা সব সময় মনে রাখবো, গরিব মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করা মানে তাকে খুশি করা নয়, মহান আল্লাহকে খুশি করা। এই রোজার মাসে দান-সাহায্য করলে আল্লাহতালা অতি খুশি হন, অধিক পুরষ্কার প্রদান করেন। একজন রোজাদারকে সামান্য ইফতার করালেই একটি সহি রোজার সোয়াব দান করেন। তাই এই রমজান মাসে, এই করোনাকালে আমরা সর্বাধিক দান-সাহায্য করবো ইনশাআল্লাহ।


মো. রহমত উল্লাহ্

সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

Email- rahamot21@gmail.com


http://ekholakagoj.com/epaper/m/187601/6094181d17d29




প্রবন্ধ - সর্বাত্মক লকডাউন এর বিকল্প। খোলা কাগজ, ২৭ এপ্রিল ২০২১

 পত্রিকার লিংক

সর্বাত্মক লকডাউনের বিকল্প



মো. রহমত উল্লাহ্ | 

খোলা কাগজ, ২৭ এপ্রিল ২০২১


বারবার সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হলে অনাহারে মরে যাবে অনেক খেটে খাওয়া মানুষ। যারা একদিন উপার্জন করতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হয় তারা ১০-১৫ দিন লকডাউন মানবে কেমন করে? কাজ করতে না পারলে কোথায় পাবে টাকা, কী খেয়ে বেঁচে থাকবে পরিবার-পরিজন নিয়ে? আমাদের দেশে তো দৈনিক খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যা অনেক। রিকশাচালক, ভ্যানচালক, গাড়িচালক, দোকানের কর্মচারী, হোটেলের কর্মচারী, গাড়ির হেলপার, রাস্তাঘাটের হকার, উন্নয়ন কাজের লেবার, সেলুনের কর্মী, জুতা সেলাই কর্মী, বাসা-বাড়ির কাজের বুয়া ইত্যাদি অনেক রকম খেটে খাওয়া মানুষ আছেন আমাদের দেশে যাদের পরিবার চলে তাদের দৈনিক আয়ের উপর। এক দিন সর্বাত্মক লকডাউন মানেই তাদের পরিবারের সবাই এক দিন না খেয়ে থাকা!

 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৭) অনুযায়ী, আমাদের দেশে মোট ৬ কোটি ৮ লাখ লোক মজুরির বিনিময়ে কোনো না কোনো কাজ করেন। এর মধ্যে ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমিকের কাজ স্বাভাবিক অবস্থাতেই অনানুষ্ঠানিক বা অনিশ্চিত। করোনাকালে তাদের অবস্থা আরও অনেক বেশি ভয়াবহ! অগণিত ভিক্ষুকের অবস্থা তো আরও বেশি খারাপ! অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ ডলার থেকে ৫০ ডলারের মধ্যে তারা মধ্যবিত্ত। এই হিসাবে বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি। উপার্জন বন্ধ থাকলে তারা না চাইতে পারেন, না খাইতে পারেন!


নিত্য খেটে খাওয়া মানুষের ক্ষুধার রাজ্যে নেই কোনো মরণের ভয়। একজন সেলুনকর্মী আমাকে বলছিলেন- ‘স্যার, কাজ না করলে খাব কী? না খেয়ে মারা গেলে সন্তান অভিশাপ দেবে, জাতির বদনাম হবে, দেশের বদনাম হবে। তারচেয়ে করুণায় মারা যাওয়া ভালো। কত রোগেই তো মারা যায় মানুষ। মাস্ক পরি, হাত ধুই, সেভলন লাগাই। চেষ্টা করি বেঁচে থাকার। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।’ তার এই অল্প কথায় নিহিত আছে অনেক কথা। নিহিত আছে পরিবার-পরিজনের প্রতি দায়িত্ববোধ, দেশ ও জাতির প্রতি সম্মানবোধ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রতি আনুগত্য এবং নিজের উপার্জন খেয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছা। কিন্তু সর্বাত্মক লকডাউনে কোথায় পাবে সে কাস্টমার?


২০২০ সালে মাত্র ৫০ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবারকে ২৫০০ টাকা হারে এককালীন অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এই সহায়তার পরিমাণ অত্যন্ত কম। তদুপরি বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষকে দিনের পর দিন প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করার সক্ষমতাও আমাদের নেই। তাই জীবিকার পথে বারবার দীর্ঘ লকডাউন এলে অনেকেরই না খেয়ে মরতে হবে নিশ্চিত। সেজন্যই ভাবতে হবে সর্বাত্মক কঠোর লকডাউনের বিকল্প।


লকডাউনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা। অর্থাৎ জনসমাগম বন্ধ করা বা মানুষের সঙ্গে মানুষের শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। ২০২০ সালের শুরুর দিকে যখন আমরা করোনার ভয়ে তটস্থ ছিলাম, স্বেচ্ছায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে ছিলাম তখন আমাদের আক্রান্তের হার ছিল কম, মৃত্যুর হার ছিল দৈনিক ১০ থেকে ১৫ জন। পরে যখন আমরা উদাসীন হয়ে গেলাম, যত্রতত্র জমায়েত শুরু করে দিলাম, ছোটাছুটি শুরু করে দিলাম, আনন্দ উৎসব করতে শুরু করে দিলাম, মাস্ক পরিহার করলাম, হাত ধোয়া বন্ধ করলাম তখনই দেখা দিল ভয়াবহ রূপ! করোনায় আক্রান্ত হয়ে দৈনিক মৃত্যুর হার উঠে গেল এক শ’তে। আবার কঠোর লকডাউনে যেতে বাধ্য হলো সরকার।


আমরা নিজেরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলব না। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মরে গেলে সরকারকে দায়ী করব। সরকার লকডাউন দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে গেলেও আমরা মানতে চাইব না। দল বেঁধে বাড়িতে ছুটব, গাদাগাদি করে গাড়িতে চড়ব, ঠেলাঠেলি করে লঞ্চে উঠব, নিয়ম ভেঙে রাস্তায় নামব, সামান্য বিষয়ে অসামান্য বিবাদে জড়াব। আর সবকিছুর জন্যই সরকারকে দায়ী করব। কঠোর লকডাউন দিয়ে সরকার আমাদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করলে আমরা কর্মহীন হয়ে যাব, অর্ধাহারে কষ্ট পাব, অনাহারে মারা যাব এবং এখানেও সরকারকেই দায়ী করব। এই দুরবস্থা তো বেশিদিন চলতে পারে না কোনোভাবেই।


আমাদের মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি, সরকারকেও ভাবতে হবে সর্বাত্মক লকডাউনের বিকল্প। যার টাকার প্রয়োজন সে ব্যাংকে যাবেই। যার চাল-ডাল প্রয়োজন সে বাজারে যাবেই। যার ভিক্ষা করা প্রয়োজন সে বাইরে বেরোবেই। যার যেখানে যাওয়ার প্রয়োজন সে সেখানে যাবেইÑ একদিন আগে হোক আর দুদিন পরে হোক। মালিক ও শ্রমিকরা যানবাহন চালাতে চাইবেই, কারখানা খোলা রাখতে চাইবেই, ব্যাংক-বীমা খোলা রাখতে চাইবেই, দোকানপাট খোলা রাখতে চাইবেই। ছাত্র-শিক্ষক স্কুল-কোচিংয়ে যেতে চাইবেই। এটাই বাস্তবতা, এটাই প্রয়োজনীয়তা। দীর্ঘদিন এসব বন্ধ রাখাও যাবে না, অল্পদিনে করোনামুক্ত হওয়াও যাবে না। এই মহামারী করোনা মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।


বাস্তবতার আলোকে প্রণয়ন করতে হবে পরিকল্পনা। ভেবে দেখতে হবে সপ্তাহে দুই দিন ২ ঘণ্টা করে ব্যাংক খোলা রেখে গাদাগাদি করে ২ হাজার মানুষের সেবা দেওয়া অধিক স্বাস্থ্যসম্মত নাকি মাসে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা করে খোলা রেখে শারীরিক দূরত্ব বজায় ২ হাজার মানুষের সেবা দেওয়া অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। এমন আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ও ক্ষেত্র আছে যেগুলো বেশি সময় খোলা রাখলেও বেশি মানুষ যাবে না আবার কম সময় খোলা রাখলেও যাদের প্রয়োজন তারা যাবেই। এমন বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সার্বক্ষণিক খোলা/ চালু রাখার বিষয় বিবেচনা করা উচিত। আবার যে সকল ক্ষেত্র আংশিক চালু/ খোলা রাখা হলে আংশিক লোকের উপস্থিতি ঘটবে এবং যে সকল ক্ষেত্র সাময়িক বন্ধ রাখা হলেও মানুষের তেমন অসুবিধা হবে না সেগুলো চালু/ খোলা বা বন্ধ রাখার শিডিউল সেভাবেই প্রণয়ন করা উচিত। অর্থাৎ সর্বাত্মক লকডাউন পরিহার করে যে ক্ষেত্রে যখন যা না করলেই নয় তাই করা উচিত। ক্ষেত্র বিবেচনায় বিধি নিষেধ, লকডাউন, কঠোর লকডাউন, যাই দেওয়া হোক না কেন, থাকতে হবে জীবন ও জীবিকা দুই-ই বাঁচানোর সর্বাধিক যৌক্তিক প্রচেষ্টা।


সর্বোপরি সবাই মিলে সর্বত্র শতভাগ নিশ্চিত করতে হবে বিদ্যমান স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সেই সঙ্গে উদ্ভাবন করার চেষ্টা করতে হবে করোনাকে পরাস্ত করার অধিক কার্যকর কৌশল। অবশ্যই অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বিজয়ী হবে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ।


মো. রহমত উল্লাহ্ : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা