সুশিক্ষায় প্রেষণা বনাম শাসন-বারণ

সুশিক্ষায় প্রেষণা বনাম শাসন-বারণ 

দৈনিক ইত্তেফাক > ১৭ আগস্ট ২০১২


মো. রহমত উল্লাহ্  

সন্তানের ভালো-মন্দ নিয়ে মায়েদের দুশ্চিন্তা যেন চিরন্তন। মানব সন্তানের মানুষ হয়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রথমত মা-বাবার এবং দ্বিতীয়ত শিক্ষকগণের ভূমিকাই মুখ্য। বিশেষ করে মায়েরা হচ্ছেন সন্তানের সর্বপ্রথম সার্বক্ষণিক শিক্ষক। নেপোলিয়ন যথার্থই বলেছেন- আমাকে শ্রেষ্ঠ মা দাও আমি শ্রেষ্ঠ জাতি দিবো। কেননা মায়ের অজান্তেও সন্তান আত্মস্থ করে মায়ের অনেক গুণাগুণ (দোষ-গুণ)। 

‘মায়ের আদর বাবার শাসন’ এর মধ্যদিয়ে আমাদের বেড়ে উঠা। কিন্তু আমাদের সন্তানরা কি পাচ্ছে তেমনটি? যদিও আগের তুলনায় এখনকার মায়েরা লেখাপড়া বেশি জানেন। সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে মায়েরা ইদানিং এতই আগ্রহী যেন নিজেরাই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। দিন-রাত লেগে থাকেন সন্তানের পিছনে। কথা ফোটার আগেই শিখাতে থাকেন ইংরেজি। আর গর্ব করে বলেন- আমার বাবু এ বি সি ডি বলতে পারে। তারপর শুরু করেন ছুটাছুটি। ভালো-মন্দ যা-ই হোক, নামকরা স্কুলে ভর্তি করা চাই তার সন্তান। অহঙ্কার করে বলতে হবে- আমার ছেলে-ময়ে অমুক স্কুলে পড়ে। মাসে বেতন পাঁচ হাজার টাকা। দশটা বই পড়ায়। প্রতিদিন অনেক বাড়ির কাজ দেয়। বাসায় তিনজন মাস্টার রেখেছি। এই মায়ের কথা শুনে নেমে পড়েন অন্যরাও। যে বাবার আর্থিক সঙ্গতি কম তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়েন মায়েরা। ‘সবাই পারে, তুমি পারবে না কেন?’ বিশেষ করে শহরেই বেশি হচ্ছে এমনটি । সকাল-বিকাল দেখা যায় বাসে/টেম্পোতে ছোট্ট ছোট্ট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে অনেক দূরের কোন ভালো(?) স্কুলে যাচ্ছেন বা বাসায় ফিরছেন মায়েরা। সকালে শিশুদের ঘুমঘুম চোখ আর বিকালে একরাশ ক্লান্তিতে নেতিয়ে পড়া মলিন চেহারাগুলো দেখলে খুব কষ্ট হয়। বাসায় ফিরে আবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দূরের কোন ভালো(?) কোচিং সেন্টারে। সেখান থেকে এনে আবার তুলে দেয়া হয় একেএকে দুই/তিনজন গৃহশিক্ষকের হাতে। এরই ফাঁকে ফাঁকে সময়ে অসময়ে গিলিয়ে দেয়া হয় মায়ের পছন্দের সব খাবার। তদুপরি বিধি-নিষেধের অন্ত নেই। ক্লাসের এই এই ছেলে-মেয়ের সাথে কথা বলা যাবে না, বিকালে মাঠে খেলতে যাওয়া যাবে না, সাইকেল চালানো যাবে না, রাস্তায় হাঁটা যাবে না, ছাদে ঘুরতে যাওয়া যাবে না, মায়ের পছন্দের সিরিয়াল ছাড়া টিভি দেখা যাবে না, আউট বই ও পত্র-পত্রিকা পড়ে সময় নষ্ট করা যাবে না, পাশের বাসার কারো সাথে মিশা যাবে না, লেখাপড়ার ক্ষতি করে ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যাওয়া যাবে না, ফোনে কারো সাথে কথা বলা যাবে না, বাসায় ছুটাছুটি করা যাবে না, মেহমানদের সাথে বেশি সময় দেয়া যাবে না, বড়দের কথায় কান দেয়া যাবে না, দু’ভাই-বোনে গল্প করা যাবে না, হাসির বিষয়েও হাসাহাসি করা যাবে না, মার দিলেও জোরে কান্না করা যাবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই ক্লাসে ফার্স্ট হতে হবে। কেউ সেকেন্ড/থার্ড হতে পারবে না। 

আনন্দহীন শিক্ষা ক্ষণস্থায়ী আর আনন্দঘন শিক্ষা চিরস্থায়ী। শিশু শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রেষণা হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। তিরস্কার না করে ধন্যবাদ দিন, সামান্য কৃতিত্বে অসামান্য পুরস্কার দিন, ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বুঝতে দিন, দেখবেন তেমন প্রয়োজন নেই শিশুদের শাসন-বারণ। আমরা শিশুদের যতটা অবুঝ মনেকরি শিশুরা ততটা অবুঝ নয়। তারা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি সবুজ। তাদের কল্পনার জগত্ আমাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। তারা মিথ্যা জানে না; আমরা জানাই। তারা ফাঁকি বুঝে না; আমরা বুঝাই। তারা নিষ্ঠুর নয়; আমাদের কারণেই নিষ্ঠুর হয়। তারা স্বনির্ভরভাবে দাঁড়াতে চায়; আমরাই পরনির্ভর করে তুলি। শিশুরা দুষ্টুমি জানে না; আমরা জানাই। আমরা যাকে দুষ্টুমি বলি, তা শিশুদের অত্যন্ত জরুরি কাজ বা অতি আনন্দের খেলা। এটি সে আজীবন করবে না। তাকে অন্য কাজ দিন, খেলা দিন। এজন্য শাস্তি দিলে নিরানন্দময় হয় শিশুর জীবন। প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে তার কোমল মন। হারায় তারুণ্য। আক্রান্ত হয় বিষণ্নতায়। শিশুরা দেখে-শুনে-ঠেকে-জেনে, যা বোঝে, যা শিখে তা-ই করে। তাদের অনুকরণ ও অনুসরণ ক্ষমতা অনেক বেশি। আমরা সবাই যদি সঠিক পথে চলি তো আমাদের শিশুরা অবশ্যই সঠিক পথে চলবে। থাকবে না এত বেশি শাসন-বারণ-শাস্তির প্রয়োজন। //  

মো. রহমত উল্লাহ্ : লেখক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। ফোন- ০১৭১১১৪৭৫৭০, Email- rahamot21@gmail.com

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিক্ষিপ্ত ভাবনা > দৈনিক শিক্ষা, ০৫ অক্টোবর ২০২১

পত্রিকার লিংক

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বিক্ষিপ্ত ভাবনা 

দৈনিক শিক্ষা > ০৫ অক্টোবর ২০২১



মো. রহমত উল্লাহ্

১. শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। এই মানুষ গড়ার কারিগর যত বেশি যোগ্য হবেন, সুদক্ষ হবেন ততবেশি যোগ্য নাগরিক পাবো আমরা। তাইতো জীবনের সকল পরীক্ষায় অতি উত্তম ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি একজন শিক্ষককে চলায়, বলায়, সাজে, পোশাকে, চিন্তায়, চেতনায়, জ্ঞানে, দক্ষতায়, মেধায়, নীতিতে, আদর্শে, দেশপ্রেমে, জাতীয়তাবোধে, আধুনিকতায়, হতে হয় উত্তম। এসব বিবেচনায় যার উত্তম হবার ইচ্ছা আছে, যোগ্যতা আছে, শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে নেওয়ার মানসিকতা আছে তাকে বাছাই করার কাজটি আসলেই কঠিন। আমাদের দেশে শিক্ষক বাছাইয়ের প্রচলিত প্রক্রিয়া কতটা মানসম্মত তা ভেবে দেখা উচিত। বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বাছাই ক্ষমতা এনটিআরসিএ এর হাতে নেওয়ার ফলে আগের তুলনায় কিছুটা অধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন সারাদেশে। তথাপি সেই মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। এখনো কিছু কিছু বিষয়ে এমন অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ পাওয়া যাচ্ছে যাদের সাধারণ জ্ঞান ও বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরতা ও প্রায়োগিক ক্ষমতা অত্যন্ত কম এবং তারা জানেন না ও পারেন না অনেক অনেক শব্দের সঠিক বানান ও উচ্চারণ! শ্রেণিকক্ষেও পরিহার করতে পারেন না আঞ্চলিক ভাষা! সঠিক পাঠদান তো অনেক দূরের কথা! প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিটি স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য অবশ্যই আরো উন্নত করতে হবে শিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়া। সকল স্তরেই বৃদ্ধি করতে হবে শিক্ষক হওয়ার নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বাছাইয়ে মূল্যায়ন করতে হবে আরো অনেক বিষয়। তদুপরি শিক্ষক বাছাইকালে অবশ্যই প্রার্থীদের অংশগ্রহণ করাতে হবে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ও প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসে। যেন মূল্যায়ন করা যায় তাদের লেখার, বলার ও পাঠদানের দক্ষতা। চিহ্নিত করা যায় অযোগ্যতা বা দুর্বলতা।


২. আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষককে থাকতে হয় সমৃদ্ধ। জানতে হয় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার, সুফল-কুফল এবং সে আলোকে শিক্ষার্থীকে দিতে হয় সঠিক দিকনির্দেশনা। শিক্ষা লাভে শিক্ষককে সদা সর্বদা থাকতে হয় সক্রিয়। হতে হয় বই ও প্রকৃতির একনিষ্ঠ পাঠক এবং সেভাবেই গড়ে তুলতে হয় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষক নিজে হতে হয় সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী। যিনি নিজে শিক্ষার্থী নন, তিনি অন্যের শিক্ষক হবেন কী করে? শিক্ষাদান শিক্ষকের একান্ত কর্তব্য। আর শিক্ষাগ্রহণ শিক্ষকের গুরুদায়িত্ব। শিক্ষাদানের পূর্বশর্তই শিক্ষা গ্রহণ। প্রতিনিয়ত শিক্ষাদান কার্যের পূর্বপ্রস্তুতি হচ্ছে প্রতিনিয়ত শিক্ষা গ্রহণ। অবশ্যই থাকতে হবে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ। যে শিক্ষক ভাববেন, আমি কেবল পড়াব, পড়ব না; সে শিক্ষক কখনো ভালো শিক্ষক হবেন না। শিক্ষক নিজের মধ্যে শিক্ষার সঠিক চর্চা করেই সঠিক পরিচর্যা করবেন শিক্ষার্থীর। ভালো শিক্ষক নিজের মধ্যে জ্ঞানের চর্চা করবেন প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ, আজীবন। নিরলসভাবে অর্জন ও বিতরণ করবেন নতুন নতুন জ্ঞান। শিক্ষার্থী ও সমাজের সব মানুষকে করবেন জ্ঞানে-গুণে সমৃদ্ধ। আলোকিত করবেন দেশ ও জাতি।


একজন ভালো শিক্ষক হবেন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। তার থাকবে নিজেকে উজাড় করে দেয়ার মতো মন-মানসিকতা। ভোগের চেয়ে ত্যাগের ইচ্ছাই থাকবে বেশি। তিনি কী পেলেন, তার চেয়ে বেশি ভাববেন কী দিলেন এবং কী দিতে পারলেন না। ভোগের চেয়ে ত্যাগেই বেশি আনন্দিত হবেন তিনি। বস্তু প্রাপ্তির নয়, জ্ঞান প্রাপ্তি ও প্রদানের সংগ্রামে অবতীর্ণ থাকবেন শিক্ষক। কেবল বস্তুগত প্রপ্তির আশায় যিনি শিক্ষক হবেন ও শিক্ষকতা করবেন তিনি কখনো প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠবেন না। কেননা, প্রকৃত শিক্ষাদানের অন্তর্নিহিত অনাবিল আনন্দ ও শিক্ষাদানের অফুরান পুণ্য থেকে তিনি বঞ্চিতই থেকে যাবেন। শিক্ষকতার প্রকৃত পরিতৃপ্তি লাভের অতল সাগরে কোনোদিন যাওয়া হবে না তার। শিক্ষার্থীর জন্য যিনি নিবেদিতপ্রাণ তিনিই পরম শ্রদ্ধেয়। তাকেই শ্রদ্ধাভরে আজীবন মনে রাখে শিক্ষার্থী।


একজন ভালো শিক্ষক আজীবন লালন করবেন জানার এবং জানানোর ঐকান্তিক ইচ্ছা। শিক্ষককে জ্ঞানার্জনে হতে হবে নিরলস। অত্যন্ত সমৃদ্ধ হতে হবে নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে। শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অত্যন্ত ভালোভাবে জানা থাকতে হবে শিক্ষার সংজ্ঞা, শিক্ষার উদ্দেশ্য ও শিক্ষাদানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি।


অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হবেন শিক্ষক। তিনি হবেন সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল ও বাস্তববাদী। তার আয়ত্তে থাকবে শিক্ষাদানের মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞান ও আধুনিক কলাকৌশল। একজন ভালো শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর মন-মানসিকতা, যোগ্যতা-অযোগ্যতা, আগ্রহ-অনাগ্রহ বোঝার অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। নিজের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সবদিক থেকে প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন করবেন শিক্ষক। সেই মূল্যায়নের আলোকেই দেখাবেন শিক্ষার্থীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ। 


দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে পরিপূর্ণ হবেন শিক্ষক। ভালোভাবে জানবেন দেশ-জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য। নিজের মধ্যে গভীরভাবে লালন ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সচেতনভাবে সঞ্চালন করবেন দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা। দেশপ্রেমে ও জাতীয়তাবোধে উজ্জীবিত করবেন শিক্ষার্থীদের। 


প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিক্ষকের থাকতে হবে প্রাকৃতিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা। প্রকৃতির একনিষ্ঠ ছাত্র হবেন শিক্ষক। থাকতে হবে প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ঐকান্তিক ইচ্ছা। নিজে শিখবেন এবং নিজের শিক্ষার্থীদের শিখাবেন প্রকৃতির পাঠ। সেই সঙ্গে শিখিয়ে দেবেন প্রকৃতির পাঠ রপ্ত করার কৌশল। শিক্ষার্থী যেন প্রকৃতিকে বানাতে পারে তার জীবনের নিত্য শিক্ষক। 


৩. যতই আধুনিক শিক্ষা উপকরণ যুক্ত করা হোক, উন্নত সুযোগসুবিধা সম্বলিত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হোক; শিক্ষকের মান বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। শিক্ষকের মান বৃদ্ধি করা খুবই কঠিন কাজ বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে সর্বোচ্চ মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসেননি, আসছেন না যুগ যুগ ধরে। টাকা হলে রাতারাতি শিক্ষা উপকরণ বদল করা যায়, পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়; কিন্তু শিক্ষকদের বদল বা মান বৃদ্ধি করা যায় না। শিক্ষকের মান বৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। শিক্ষকের বেতন সর্বোচ্চ নির্ধারণ করে দেওয়ার সাথে সাথেই আমাদের সকল শিক্ষকের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে যাবে এমনটি অবাস্তব। কেননা, এই আমি যতদিন আছি ততদিন দিয়েই যাবো ফাঁকি, রেখেই যাব কম দক্ষতার স্বাক্ষর। তথাপি বৃদ্ধি করতে হবে আমার তথা শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা। প্রশিক্ষিতদের দিতে হবে আরো বর্ধিত বেতন। শিক্ষকতায় আনতে হবে সর্বোচ্চ মেধাবী ও যোগ্যদের। কোনরকম কোটা সংরক্ষণ করে তুলনামূলক কম যোগ্যদের শিক্ষক হবার সুযোগ দেওয়া মোটেও উচিত নয়। কেননা, শিক্ষক অযোগ্য হলে জাতি অযোগ্য হয়। আমাদের সর্বাধিক মেধাবী ও যোগ্য সন্তানেরা যেদিন সাগ্রহে এসে দখল করবে আমাদের স্থান সেদিনই উন্নীত হবে আমাদের শিক্ষকদের কাঙ্খিত মান। সেটি যতই সময়সাপেক্ষ হোক এখন হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না কোন অজুহাতেই। ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিয়ে যথাসম্ভব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে হবে আমার মত বিদ্যমান শিক্ষকদের মান। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে শিক্ষক হবার জন্য মাস্টার অফ টিচিং ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। তিনি যে পর্যায়ের, যে বিষয়ের শিক্ষকই হতে চান না কেন তার নিজস্ব বিষয়ে ডিগ্রির পাশাপাশি মাস্টার অফ টিচিং ডিগ্রি থাকতেই হবে। অর্থাৎ পাঠদানের বৈজ্ঞানিক কৌশল না জেনে কেউ শিক্ষক হতে পারেন না। অথচ আমাদের দেশে যে কেউ যে কোনো সময় শিক্ষক বা হুজুর হয়ে যাচ্ছেন! শিক্ষক হবার জন্য শিক্ষকতা শিক্ষা করার অর্থাৎ শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও পাঠদানের আধুনিক কলাকৌশল আয়ত্ত করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই! তাই আমাদের বিদ্যমান শিক্ষক বা ওস্তাদদের যতটুকু সম্ভব প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানে। এর কোনো বিকল্প নেই বর্তমান বাস্তবতায়।


৪. আমাদের তুলনায় উন্নত বিশ্বে শিক্ষকগণের আর্থিক সুবিধা অনেক অনেক বেশি। হ্যা, একথা অবশ্যই সঠিক, আমাদের দেশের শিক্ষকগণের আর্থিক সুবিধা অত্যন্ত কম; যা বৃদ্ধি করা জরুরি। আসন্ন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী যোগ্য ও দক্ষ নাগরিক-কর্মী তৈরি করার জন্য অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে আমাদের শিক্ষার মান। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্যই নিয়োগ করতে হবে সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক, বাড়াতে হবে শিক্ষকগণের আর্থিক সুবিধা। সেই সাথে করতে হবে বিদ্যমান সুবিধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। পর্যাপ্ত প্রার্থী থাকায় বর্তমান স্বল্প সুবিধার মধ্যেও শুরু করা সম্ভব আরও অধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া। সেজন্য পুনঃনির্ধারণ করতে হবে সর্বস্তরে শিক্ষক নিয়োগের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অগ্রাধিকার। শিক্ষকতার জন্য মূল বিষয়াদির পাশাপাশি শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিকে অগ্রাধিকার দেওয়া শুরু করা হলে কয়েক বছর পরেই আর অভাব হবে না এই ডিগ্রিধারী প্রার্থীর। যারা শিক্ষক হতে চান তারা অনেক আগে থেকেই মনেপ্রাণে লালন করবেন শিক্ষকতা পেশাকে এবং যে বিষয়ের শিক্ষক হতে চান সে বিষয়ে প্রয়োজীয় ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি অর্জন করবেন শিক্ষায় ব্যাচেলর ডিগ্রি। সবাই সব কাজের যোগ্য হবেন না এটাই স্বাভাবিক। মনে রাখতে হবে অতি দুর্বলকে বারবার প্রশিক্ষণ দিয়েও কাঙ্খিত মানে উন্নীত করা সম্ভব হয় না। একজন অযোগ্য শিক্ষক সারাজীবনে তৈরি করেন অসংখ্য অযোগ্য নাগরিক-কর্মী। হয়তো সঠিক যোগ্যতার অভাবে নিজের অজান্তে, অনিচ্ছায় আমিও করছি তাই। শিক্ষক অযোগ্য হলে, সাধারণের অজান্তে সমাজের সর্বত্র তৈরি হয় গভীর ক্ষত, জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায় দেশ ও জাতির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি! তাই অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষকগণের সর্বোচ্চ আর্থিক সুবিধা। কেননা, অধিক যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির জন্যই শিক্ষককে হতে হবে সর্বোচ্চ যোগ্য।


৫. আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে যতটুকু অগ্রগতি তথা অনুকূল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ও হচ্ছে তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন ও আছেন শিক্ষক সমাজ। অন্যথায় এই সফলতাটুকু অর্জন সম্ভব ছিল না মোটেও। আর এই শিক্ষকদের প্রায় ৯৭ ভাগ হচ্ছেন বেসরকারি। তাদের প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় সংসার চলে না, এটি এখন সবাই জানেন ও বোঝেন। শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানোর জন্য। তাই তারা যোগ্যতানুসারে বেছে নিয়েছেন অতিরিক্ত কাজ করে সামান্য আয়ের পথ। কেউ কেউ প্রাইভেট পড়ানো, নোট-গাইড লেখা, বিভিন্ন ব্যবসা, ঠিকাদারি, রাজনীতি ইত্যাদি করছেন। আবার কেউ বাবার/স্বামীর ধন খাচ্ছেন। সেসব খাতের আয়ের ওপর যেহেতু তাদের জীবনধারণ অনেকাংশে নির্ভর করছে; সেহেতু তারা ঐ কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ঐ কাজেই বেশি সময়, শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকতায় তাদের মনোযোগ না থাকা বা কম থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াই বাস্তব। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট না পড়ে বা কোচিং না করে শিক্ষার্থীরা পারবে কী ভাবে? তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চেয়ে যারা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন বা কোচিং করাচ্ছেন তারা তো ব্যক্তিগতভাবে হলেও শিক্ষকতাই করছেন। নিজের পাঠদানের বিষয়টি নিয়মিত চর্চা করছেন কমবেশি। অন্যরা তো তা-ও করছেন না।  এই প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেনি এবং শিক্ষকদের কাম্য বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে পারেনি বলেই হয়তো যুগ যুগ ধরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের ব্যাপারে নমনীয় নীতি অনুসরণ ও নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বার বার।


দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থা থেকে শিক্ষার উত্তরণ ঘটাতে চাইলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদেরও বাড়াতে হবে শিক্ষকদের প্রকৃত আর্থিক সুবিধা এবং সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে তাদের বাস্তবিক কর্মঘণ্টা। আর সেটি আন্তরিক ভাবে মেনে নিতে হবে শিক্ষকদের। উন্নত বিশ্বের শিক্ষকগণ তাদের শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত ক্লাসেই দিয়ে থাকেন পরিপূর্ণ শিক্ষা। স্কুলের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় না ক্লাসের পড়া। 


মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমত নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয়ত শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে আরো বেশি সময় প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেন শিক্ষকদের না থাকে বেতন-ভাতার অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের ধান্দা এবং শিক্ষার্থীদের না থাকে ক্লাসরুমের বাইরে ক্লাসের বিষয় পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা। 


মো. রহমত উল্লাহ্

প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। 


০১ অক্টোবর ২০২১


https://lm.facebook.com/l.php?u=https%3A%2F%2Fwww.dainikshiksha.com%2F%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25B6%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25AC-%25E0%25A6%25B6%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B7%25E0%25A6%2595-%25E0%25A6%25A6%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25B8%25E0%25A7%2587-%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%2595%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25B7%25E0%25A6%25BF%25E0%25A6%25AA%25E0%25A7%258D%25E0%25A6%25A4-%25E0%25A6%25AD%25E0%25A6%25BE%25E0%25A6%25AC%25E0%25A6%25A8%25E0%25A6%25BE%2F216999%2F&h=AT0rnl2I_kKG-qVllaubGJePcrliiJVHALb_QrGwirt1crKVqikKTHXzemRBYET9Rr4VRoScsGdjOH5HsI86W8Rl4Md2yG_GQ38mJI0inyDnTm7Cmpe49IxVDKAzGSGJCG0

চারু ও কারুকলা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যোগ্য শিক্ষক চাই > দৈনিক শিক্ষা, ০৩ অক্টোবর ২০২১

পত্রিকার লিংক

চারু-কারুকলা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যোগ্য শিক্ষক চাই

দৈনিক শিক্ষা > ০৩ অক্টোবর ২০২১



মো. রহমত উল্লাহ্

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ প্রকাশের পর থেকেই  বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও ব্যানার-পোস্টারে খুব বেশি চোখে পড়ছে নিম্নরূপ ভর্তির বিজ্ঞপ্তি। 

"… টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে এক বছর মেয়াদী এ্যাডভান্স সার্টিফিকেট ইন ফাইন আর্টস (চারু-কারুকলা) এবং কম্পিউটার টেকনোলজি (ICT) কোর্সে ভর্তি চলছে। এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চারু ও কারুকলা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি প্রত্যাশী, যে কোন বিষয়ে স্নাতক-ফাজিল-অনার্স বা সমমান পাস শিক্ষার্থী বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এক বছর মেয়াদী এ দুই কোর্সে জানুয়ারি-ডিসেম্বর, ২০২১ এবং জুলাই-জুন ২০২১-২০২২ সেশনে ভর্তি হতে পারবেন।" 


গত ০৮ সেপ্টেম্বর তারিখে দৈনিক শিক্ষা ডটকমে প্রকাশিত উল্লিখিত বিজ্ঞপ্তিটিতে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, প্রায় নয় মাস আগে থেকে শুরু হওয়া এবং প্রায় তিন মাস আগে থেকে শুরু হওয়া দুটি কোর্সে নিয়মিত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। এক বছর মেয়াদী কোর্স এর প্রায় নয় মাস চলে যাওয়ার পর নিয়মিত শিক্ষার্থী ভর্তি করা কীভাবে সম্ভব তা বোধগম্য নয়! এখন কোন শিক্ষার্থী ভর্তি হলে পরবর্তী তিন মাসে তাকে কীভাবে এক বছরের কোর্স করানো সম্ভব তাও বোধগম্য নয়। অবশ্য নয় মাস বিলম্বে ভর্তি করে যদি নয় মাস পরে কোর্স সমাপ্ত করা হয় তো সেটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে।  চারু ও কারুকলা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় দুটি সম্পূর্ণই ব্যবহারিক। এসকল বিষয়ে ক্লাস না করে বা অনলাইনে ক্লাস করে সঠিকভাবে কোর্স সম্পন্ন করা মোটেও সম্ভব নয়। 


অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যথাযথ লেখাপড়া ও হাতে কলমে শিক্ষা ব্যতীতই সনদ প্রদানের একটি প্রক্রিয়া চলমান! তাই এর বাস্তবিক সত্যতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কেননা, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে শিক্ষক হবার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে এই সনদ। তাই চাকরি প্রত্যাশীরা যে করেই হোক এই সনদ সংগ্রহে এখন ব্যতিব্যস্ত। এ দুটি কোর্সে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি সম্বলিত বিপুল সংখ্যক ব্যানার-পোস্টার, বিজ্ঞাপন ও ফোনে আসা এসএমএস দেখে মনে হচ্ছে দ্রুত গজিয়ে উঠছে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যমান অনেক প্রতিষ্ঠানে তড়িঘড়ি খোলা হচ্ছে এ দুটি কোর্স। এ দুটি কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তি করা, পাঠদান করা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করার জন্য নিশ্চয়ই কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন হচ্ছে। তাই কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের দেখা উচিত প্রায় নয় মাস ও প্রায় তিন মাস চলে যাওয়ার পর কোর্স দু'টিতে কীভাবে নিয়মিত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়! ভর্তির পর বাস্তবে কত মাস শিক্ষা দিয়ে এই শিক্ষার্থীদের এক বছর মেয়াদি কোর্স সমাপ্ত করা হয়। 


আলোচিত এ সকল প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা কেমন তাও যাচাই করা প্রয়োজন। উল্লিখিত কোর্স দু'টি পড়ানোর মতো পর্যাপ্ত যোগ্য শিক্ষক তাদের আছে কিনা, পাঠদানের উপযোগী অবকাঠামো আছে কিনা, ব্যবহারিক ক্লাস করার উপযোগী যন্ত্রপাতি ও ল্যাব আছে কিনা, যত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে তত সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করার অনুমতি আছে কিনা, যে পরিমাণ কোর্স ফি নেওয়া হচ্ছে তা যথাযথ হচ্ছে কিনা, নিয়মিত থিউরিটিক্যাল ও প্রেকটিকেল ক্লাস হচ্ছে কিনা, শিক্ষার্থীরা সে সকল ক্লাসে যথাযথভাবে অংশগ্রহণ করে কাঙ্খিত যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জন করছে কিনা ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত হয়ে যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে সনদ প্রদান করা উচিত। 


একবছর মেয়াদী এডভান্স সার্টিফিকেট কোর্স  (থিউরিটিক্যাল ও প্রাকটিক্যাল) যদি তিন মাসে সম্পন্ন করে সনদ দেওয়া হয় তো তারা কেমন শিক্ষিত হবেন? এরপর এইরূপ সনদধারীরা যদি সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পান তো তারা কেমন যোগ্য  শিক্ষক হবেন? শিক্ষকতায় যদি আসতে পারেন তো তারা কেমন শিক্ষার্থী তৈরি করবেন? একজন শিক্ষক অযোগ্য হলে তো তিনি সারাজীবনে তৈরি করেন অসংখ্য অযোগ্য নাগরিক-কর্মী! বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২১ অনুসারে চারু ও কারুকলা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয় দুটিতে সারাদেশে নিয়োগ হবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। সম্ভাব্য এই শিক্ষকগণ যোগ্য না হলে ব্যাহত হবে সরকারের উদ্দেশ্য। সঠিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। 


যথাযথ যোগ্যতা না দিয়ে সনদ দেওয়া হলে, প্রায় শতভাগ আবেদনকারী অযোগ্য হলে এবং তাদের মধ্য থেকেই বিপুল সংখ্যক লোক নিয়োগ দিতে হলে যতই বাছাই করা হোক কাঙ্ক্ষিত যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যাবে কীভাবে? শিক্ষক যোগ্য না হলে কাঙ্খিত শিক্ষা নিশ্চিত হবে কীভাবে? তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সজাগ দৃষ্টি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছি।  


মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষক ও কলাম লেখক

আসলেই আমি ঘটনাচক্রে শিক্ষক > দৈনিক শিক্ষা, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

আসলেই আমি ঘটনাচক্রে শিক্ষক

দৈনিক শিক্ষা > ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১



মো. রহমত উল্লাহ্

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের কিছু উক্তি নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে শিক্ষক সমাজে। নতুন শিক্ষাক্রম বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একটা বড় অংশ, ঘটনাচক্রে শিক্ষক। অন্য কোনো পেশায় অনেকেই যেতে পারেননি, শিক্ষকতা কোনোদিন তারা চাননি। আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন’। তিনি আরো বলেন, ‘যিনি শিক্ষকতা পেশায় আসবেন তিনি তার জীবনের লক্ষ্যই হবে শিক্ষকতা পেশা।  তিনি সেই লক্ষ্য নির্ধারণ করে আসবেন।’ [দৈনিক শিক্ষা, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১]


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশিত শিক্ষকদের বিভিন্ন মন্তব্য দেখে মনে হচ্ছে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের এসব কথায় খুবই কষ্ট পেয়েছেন তারা। তিনি অবশ্য সবাইকে 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' বলেন নি; শিক্ষকদের বড় একটা অংশকে 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' বলেছেন। সকল শিক্ষক ভাই ভাই। সুতরাং শিক্ষকদের বড় একটা অংশকে এমন কথা বললে সবাই কষ্ট পাবেন এটাই স্বাভাবিক। আমিও কষ্ট পেয়েছি। তবে সে কষ্টের কারণ সবার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। 


অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন- আমি খুব ভাল ছাত্র ছিলাম, আমি অনেক কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষক হয়েছি, আমি অনেক ভাবেই অনেক যোগ্য। সুতরাং আমি 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' হয়নি। তাই শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের এই কথায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি! হ্যাঁ, একজন যোগ্য মানুষ যদি মনে করেন তাকে অযোগ্য বলা হয়েছে তো তিনি কষ্ট পাবেন এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। আমি তত যোগ্য মানুষ নই। তাই তেমন চিন্তা আমি করতে পারিনি। তেমন ভেবে আমি কষ্ট পাইনি। কেননা, আমি আসলেই 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' হয়েছি। যিনি সুযোগ পেয়েও অধিক বেতনের চাকরিতে না গিয়ে কিংবা অন্য পেশায় না গিয়ে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা করবেন বলে স্বেচ্ছায় এদেশের বেসরকারি শিক্ষক হয়েছেন তিনি অবশ্যই আমার চেয়ে উত্তম। যদিও আমি জানি না, আসলে এমন আছেন ক'জন! 


বিভিন্ন বাস্তব ঘটনার কারণে এর চেয়ে অধিক উপার্জনক্ষম কোন পেশা অর্জন করতে পারিনি বলেই ঘটনাচক্রে আমি বেসরকারি শিক্ষকতায় এসেছি। যতই যুক্তিযুক্ত হোক সেসব কারণ, অন্য পেশা অর্জনে আমি ব্যর্থ হয়েছি এটিই শেষ কথা। তবে শিক্ষকতায় এসে আমি আর অনিহা দেখাইনি, দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা করিনি, কোন কাজে ফাঁকি দেইনি, শিক্ষার্থীদের ঠকাইনি। লেখাপড়া করেছি, প্রশিক্ষণ নিয়েছি, শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করেছি। মনেপ্রাণে শিক্ষক হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি ও করছি। বেতন-ভাতা কম পাই বলে কখনো কাজ কম করার চিন্তা করিনি। হয়েছি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান। এতোকিছুর পরেও এটাই সত্য যে, আমি শিক্ষক হতে চাইনি, অন্য কোন পেশায় যেতে পারিনি, তাই ঘটনাচক্রে বেসরকারি শিক্ষক হয়েছি। আমার মত আরো অনেকেই আছেন। শুধু বেসরকারি নয়, যারা সরকারি শিক্ষক হয়েছেন তাদের অনেকেরই এটি ফার্স্ট চয়েজ ছিল না। অন্যান্য ক্যাডারে এবং পেশাতেও এমন উদাহরণ আছে। এটাই বাস্তব সত্য। এই সত্যটা স্বীকার করার সৎসাহস নেই আমাদের অনেকেরই। আমরা স্বীকার করি বা না করি, এই সত্যটাই স্বীকার করেছেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী। তিনি পরিস্কার করেই বলেছেন, '‘আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একটা বড় অংশ, ঘটনাচক্রে শিক্ষক। অন্য কোনো পেশায় অনেকেই যেতে পারেননি, শিক্ষকতা কোনোদিন তারা চাননি। আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন'। আমাদের দেশের বাস্তবতাটি উপলব্ধি করার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়কে ধন্যবাদ। 


কিন্তু যুগ যুগ ধরে অধিক যোগ্যরা শিক্ষকতায় না আসার দায় কার? আমরা কেন যুগ যুগ ধরে ঘটনাচক্রে শিক্ষক হলাম? আমরা কেন স্বেচ্ছায় শিক্ষক হতে চাইনি? আমরা কেন শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় থাকতে চাই না? আমাদের চেয়ে অধিক যোগ্যরা কেন স্বেচ্ছায় শিক্ষক হলো না? আমাদের অধিক যোগ্য সন্তানটি কেন সেচ্ছায় শিক্ষকতায় আসতে চায় না? অধিক যোগ্যদের লক্ষ্য কেন শিক্ষকতা নয়? আমরা কেন শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশায় মনোযোগ দিতে বাধ্য হচ্ছি? কেন শিক্ষকতায় পূর্ণ শ্রম, সময়, মেধা ও মনোযোগ দিতে পারছি না? অনেকেই কেন এখনও যথাযথ প্রশিক্ষণবিহীন রয়ে গেছি? 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' দিয়ে কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব আসন্ন আধুনিক শিক্ষাক্রম? কতটুকু সম্ভব বিশ্বমানের নাগরিক-কর্মী তৈরি? আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও সেচ্ছায় না হয়ে কেন 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' হচ্ছেন প্রায় শতভাগ শিক্ষক? এখানেই তো আমার কষ্ট! অতীত ও বর্তমান কোন সরকার কি এড়াতে পারে এই দায়?


মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষক, সাহিত্যিক ও কলাম লেখক 

পত্রিকার লিংক

যোগাযোগ: অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১

শিক্ষকের মর্যাদা > ইত্তেফাক, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১


শিক্ষকের মর্যাদা 

দৈনিক ইত্তেফাক > ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

মো. রহমত উল্লাহ্

মানবসন্তানকে মানুষে পরিণত করার ঐকান্তিক তপস্যা হচ্ছে শিক্ষকতা। তাই পৃথিবীর সকল দেশেই শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা সর্বাধিক। সামষ্টিক বিবেচনায় যে কোন পেশার তুলনায় শিক্ষকতা অধিক সম্মানজনক। কেননা শিক্ষকতা মূলত একটি ব্রত। তাই প্রতিটি সমাজেই অগণিত অপেশাদার শিক্ষক বিদ্যমান। শুধু পেশা হিসেবে শিক্ষকতায় সফলতা নেই, পরিতৃপ্তি নেই। শিক্ষাদান হচ্ছে অতি উত্তম পূণ্য কর্ম। মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই প্রধান শিক্ষক। বিভিন্ন ধর্মের প্রবর্তকগণ ছিলেন উৎকৃষ্ট শিক্ষক। অর্থাৎ উৎকৃষ্ট মানবেরাই উৎকৃষ্ট শিক্ষক। উৎকৃষ্ট মানব তথা উৎকৃষ্ট শিক্ষকের মর্যাদাও উৎকৃষ্ট। শিক্ষক ব্যতীত কোন সমাজ নেই। সকল মানুষেরই শিক্ষক আছেন। যে সমাজের শিক্ষক যত বেশি উৎকৃষ্ট সে সমাজের মানুষ তত বেশি উৎকৃষ্ট। 


বর্তমান বাস্তবতায় উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা অনেকটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উপর নির্ভরশীল। যে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানি বেশি সে দেশে উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। যে দেশে উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি সে দেশে উৎকৃষ্ট নাগরিকের সংখ্যা বেশি। উৎকৃষ্ট নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানি সর্বাধিক নির্ধারণ করা কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকের সার্বিক মর্যাদা তথা সম্মান ও সম্মানি সর্বাধিক হলেই সর্বাধিক যোগ্য লোক শিক্ষক হন। রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায়-নীতি পরায়ন যোগ্য লোক নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষক হিসেবে সর্বাধিক ন্যায়-নীতি পরায়ন যোগ্য লোক নিশ্চিত করা। কোন রাষ্ট্র যদি তা করতে ব্যর্থ হয় বা অনীহা দেখায় তো সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের সততা, সভ্যতা, যোগ্যতা ও দক্ষতা অনিশ্চিত। তাই শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়। 


সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের মর্যাদা যতই উপরে নির্ধারণ করা হোক না কেন শিক্ষক নিজে উৎকৃষ্ট না হলে তা বজায় রাখা অসম্ভব। শিক্ষক নিজে নিকৃষ্ট হলে মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। মর্যাদা বা ঘৃণা মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয়। সর্বদা এটির বহিঃপ্রকাশ নাও ঘটতে পারে। শিক্ষক উৎকৃষ্ট হলেই মানুষের কাছে বৃদ্ধি পায় তার প্রকৃত মর্যাদা। যে শিক্ষক যত বেশি উৎকৃষ্ট সে শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা তত বেশি। দাপট প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা অর্জন এক নয়। দাপটে প্রকৃত মর্যাদা নেই, শ্রদ্ধায় প্রকৃত মর্যাদা আছে। যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে যত বেশি সুশিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম সে শিক্ষক তত বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম। শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতায় ও দক্ষতার উচ্চতায় বিস্তৃত থাকে শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ। শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষকের একটা চিত্র অঙ্কিত হয়। সেই চিত্রটি যত উত্তম হয় শিক্ষার্থী তত শ্রদ্ধাশীল হয়। শিক্ষকের চিন্তা-চেতনা, চলা-বলা  ও কাজ-কর্মের প্রতিফলন ঘটে শিক্ষার্থীর মনে। শিক্ষক উত্তম চিন্তা ও কর্ম করতে ব্যর্থ হলে উত্তম মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হন। সমাজ ও রাষ্ট্রে উত্তম মানুষের অভাব হলেই শিক্ষকের মর্যাদার অভাব হয়। উত্তম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই উত্তম মানুষ তৈরির দায়িত্ব শিক্ষকের। যিনি শিক্ষক তিনি কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারেন না এই দায়িত্বে। কেননা শিক্ষকতা একটি ব্রত। নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। 


মো. রহমত উল্লাহ্

সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ 

 rahamot21@gmail.com  

অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। 

১৭ জুলাই ২০২১ 

পত্রিকার লিংক


https://www.ittefaq.com.bd/print-edition/practice/276337/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE

কভিডকালীন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ > ইত্তেফাক, ৩১ আগস্ট ২০২১

 কভিডকালীন মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ

দৈনিক ইত্তেফাক > ৩১ আগস্ট ২০২১

মো. রহমত উল্লাহ্



সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, তোমরা যারা ২০২১ সালের এসএসসি বা সমমান পরীক্ষা দেওয়ার অপেক্ষায় আছ তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা। তোমাদের পরীক্ষা নিয়ে শুধু তোমরা নয় আমরা সবাই অনিশ্চয়তায় ছিলাম দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তোমাদের পরীক্ষার বিষয়ে। তিনি বলেছেন, (ক) কভিড-১৯ পরিস্থিতি অনুকূল হলে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে আগামী নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সরাসরি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সেক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের আলোকে গ্রুপ ভিত্তিক তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ের পরীক্ষা হবে। সেই পরীক্ষায় সময় ও নম্বর হ্রাস করা হবে। প্রতি বিষয়ে ৫০ নম্বর করে পরীক্ষা হবে। সেই ৫০ নম্বরকে আবার ১০০ নম্বরে কনভার্ট করা হবে। 


আবশ্যিক বিষয়সমূহের উপর কোন পরীক্ষা হবে না। তোমাদের জেএসসি বা সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আবশ্যিক বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হবে। অর্থাৎ আবশ্যিক বিষয় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আইসিটি ও ধর্ম এর জন্য জেএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনা করা হবে।


অত:পর, ৩টি নৈর্বাচনিক বিষয়ে অনুষ্ঠেয় পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর এবং ৫টি আবশ্যিক বিষয়ের জন্য জেএসসি বা সমমান পরীক্ষার ফলাফল থেকে অর্জিত নম্বর একসঙ্গে সমন্বয় করে মোট/চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা হবে। 


(খ) অতিমারি কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে সরাসরি পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব না হলে তোমাদের জেএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে আবশ্যিক ৫টি বিষয় মূল্যায়ন করা হবে এবং সেইসাথে গ্রুপ ভিত্তিক নৈর্বাচনিক  ৩টি বিষয়ের   এসাইনমেন্ট কার্যক্রমের মূল্যায়ন সমন্বয় করে মোট/চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা হবে। 


(গ) কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পরীক্ষা গ্রহণ করা ও এসাইনমেন্টের মূল্যায়ন বিবেচনা করা সম্ভব না হলে শুধুমাত্র জেএসসি বা সমমান পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে আবশ্যিক ৫টি বিষয় মূল্যায়ন করে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা হবে। 


লক্ষণীয় যে, আবশ্যিক ৫টি বিষয়ের কোন পরীক্ষা বা এসাইনমেন্ট কার্যক্রম হবে না। চতুর্থ বিষয় হিসেবে কোন বিষয় থাকবে না। তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয় পরীক্ষার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে বা এসাইনমেন্টের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে অথবা মূল্যায়নের বাইরে রাখা হবে। 


মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় আরো বলেছেন যে, তোমরা যারা এসাইনমেন্ট কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পাদন করবে তারা চূড়ান্ত পরীক্ষায় অবশ্যই ভালো ফলাফল করবে। আশা করি ৩টিমাত্র নৈর্বাচনিক  বিষয়ের ২৪টি এসাইনমেন্ট তোমরা ভালোভাবে সম্পাদন করতে পারবে। এসাইনমেন্টের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর গুলো খুব ভালভাবে স্টাডি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যদি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় তো এই ২৪টি এসাইনমেন্ট থেকেই পরীক্ষায় প্রশ্ন থাকবে। অর্থাৎ ভালোভাবে এসাইনমেন্ট করা মানেই চূড়ান্ত পরীক্ষার ভালো প্রস্তুতি নেওয়া। চূড়ান্ত পরীক্ষায় অন্যান্য বারের মতোই বেশি সংখ্যক প্রশ্ন থাকবে কিন্তু এবার খুবই কম সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সুতরাং এসাইনমেন্ট গুলো ভালোভাবে করা থাকলে কোন প্রশ্ন আনকমন হবার সম্ভাবনা থাকবে না। নির্ধারিত এসাইনমেন্ট গুলো বারবার স্টাডি করে ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। বার বার পড়তে হবে মূল বই। মনে রাখতে হবে বিভিন্ন নাম, তারিখ, স্থান, সুত্র, সংজ্ঞা, কোটেশন, বিক্রিয়া, সমীকরণ, বৈজ্ঞানিক নামসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনলাইনে নিয়ে নিতে হবে শিক্ষকগণের সহযোগিতা। প্রয়োজনে অনলাইনেই সহপাঠীদের সঙ্গে করতে হবে গ্রুপ স্টাডি। ফাঁকি দেওয়া চলবে না কোনোভাবেই।  মনে রেখো, লেখাপড়ায় ফাঁকি দেওয়া মানে কিন্তু নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া!  


অতিমারি কোভিড-১৯ এর কারণে যদি আসন্ন পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব না হয় তো তোমাদের এসাইনমেন্ট পেপার গুলোই হয়ে যাবে চূড়ান্ত পরীক্ষার উত্তরপত্র। অর্থাৎ তিনটি নৈর্বাচনিক বিষয়ের এসাইনমেন্ট পেপারের উপর প্রাপ্ত নম্বর যুক্ত হবে তোমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফলাফলে। সুতরাং এসাইনমেন্ট পেপার গুলো তৈরি করতে হবে অত্যন্ত যত্নসহকারে। মূল বই পড়ে এমনভাবে  উত্তর লিখতে হবে যেন শিক্ষক বুঝতে পারেন এটি তুমি নিজের মেধা থেকেই লিখেছ। তাতে তোমার নম্বর বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। মনে রেখো, কোথাও থেকে কারো এসাইনমেন্ট পেপার কপি করা উচিত নয়। এটি নীতি-নৈতিকতা বিরোধী অন্যায় ও পাপ কাজ। 


এখন কিন্তু আর সময় বিনষ্ট করার সুযোগ নেই। পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগাতে হবে এসাইনমেন্টের জন্য নির্ধারিত ১২ সপ্তাহ সময়। ভালোর জন্য চেষ্টা করা আর মন্দের জন্য প্রস্তুত থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবিলা করার জন্য থাকতে হবে প্রস্তুত। তাই নিজেকে রাখতে হবে সুস্থ ও সবল। কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। অনুশীলন করতে হবে ধর্মীয় বিধিবিধান। নিয়মিত করতে হবে নাওয়া, খাওয়া, বিশ্রাম ও ব্যায়াম। ঠিক রাখতে হবে ঘুমসহ সকল কাজের রুটিন। নিশ্চিত করতে হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন। তবেই সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে তোমাদের জীবন।




মো. রহমত উল্লাহ্ 

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। 

----------------



বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, Jagonews24.com, 18 August 2021

পত্রিকার লিংক

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন

Jagonews24.com, 18 August 2021

মো. রহমত উল্লাহ্

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকগণ বদলির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। বিশেষ করে এনটিআরসি'র সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে দূর-দূরান্তে নিয়োগ নিয়ে কর্মরত শিক্ষকগণের বদলির দাবি সর্বাধিক উচ্চারিত। বাস্তবে নিবন্ধন এবং অনিবন্ধিত উভয় প্রকার ইনডেক্সধারী  শিক্ষকের ক্ষেত্রেই বদলি অত্যাবশ্যক।  এই দাবিটি তাদের প্রয়োজনের দিক থেকে খুবই মানবিক ও যৌক্তিক। চাকরিতে বদলির সুযোগ একদিকে কর্মীর অধিকার, অপরদিকে কর্তৃপক্ষের হাতিয়ার। সুযোগ থাকলে যেমন কর্মী উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে তার পছন্দমতো স্থানে বা দপ্তরে যেতে পারেন, তেমনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বা শাস্তিসরূপ কর্মীকে অন্যত্র বদলি করতে পারে। এই ব্যবস্থাটি বিশ্বস্বীকৃত। যা একই প্রতিষ্ঠানে/ সংস্থায়/ ব্যাংকে/ এনজিওতে কর্মরত বিভিন্ন দপ্তর ও শাখার কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।


অপরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিনে গড়ে উঠা ও বেড়ে চলা আমাদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এখনই তেমন সার্বজনীন বদলির সুযোগ দেওয়া খুবই কঠিন। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, বেতনভাতা, পদোন্নতি, শাস্তি ইত্যাদি প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ আলাদা। এমনকি সরকারি বেতনভাতাও আলাদা কমিটির মাধ্যমেই প্রদান করা হয়ে থাকে।  


এমতাবস্থায় নতুন আইন ও নীতিমালা প্রবর্তন ব্যতীত বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। সম্ভবত এ কারণেই বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এমপিও নীতিমালায় এমনকি উচ্চ আদালতেও 'বদলি' শব্দটির স্থলে 'প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন' কথাগুলো ব্যবহার করা হয়। আমাদের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তারা নীতিমালা প্রণয়ন করে বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ব্যবস্থা করার কথা বলে থাকেন। সরাসরি বদলির আদেশ দেন না বা দিতে পারেন না। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, দীর্ঘ দিনেও হচ্ছে না সেই নীতিমালা প্রণয়ন, হচ্ছে না আমাদের বদলির ব্যবস্থা। এই আন্দোলনে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি বারবার! আমার জানা মতে বদলি প্রত্যাশীরাও  সর্বজন গৃহীত একটি সুষ্ঠু নীতিমালা উপস্থাপন করতে পারেননি আজ অবধি।  আমাদের সেই কাঙ্খিত নীতিমালা কতদিনে হবে, কী রকম হবে, কোন শিক্ষক কিভাবে বদলির সুযোগ পাবেন তা সম্পূর্ণই অনিশ্চিত! 


বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই বারবার উত্থাপন করতে হবে বদলির দাবি এবং সেইসাথে নিতে হবে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের বিদ্যমান সুযোগ। এমপিও নীতিমালা ২০২১ অনুসারে নিবন্ধনধারী এমপিওভুক্ত বা এমপিও বহির্ভূত  শিক্ষকগণ অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রকাশিত ৩য় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ২০২১ এও সেই সুযোগ রাখা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের খুব বেশি সুযোগ পাননি বিদ্যমান শিক্ষকগণ। কেননা, নতুন শিক্ষক পদপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে বিদ্যমান অভিজ্ঞ শিক্ষকদের পূর্বের নিবন্ধন পরীক্ষার নম্বরপত্র দিয়ে। এক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কোন নম্বর পাননি বিদ্যমান শিক্ষকগণ! মোটেও যুক্তিযুক্ত নয় এ সকল বিষয়।



এদিকে জানা গেছে, তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে সুপারিশপ্রাপ্তদের চূড়ান্ত নিয়োগ শেষে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শূন্যপদের চাহিদা সংগ্রহ করা হবে এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক নিয়োগের জন্য চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এমপিও নীতিমালা অনুসারে আসন্ন চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতেও নিশ্চয়ই নিবন্ধনধারী এমপিওভুক্ত ও এমপিও বহির্ভূত শিক্ষকদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হবে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ লাভের জন্য। 


একজন বিদ্যমান শিক্ষককে যদি বদলির লক্ষ্যে অন্য প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নেওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়; নিয়োগ পেলে এমপিও ট্রানস্ফার/বদলি করার সুযোগ দেওয়া হয়; এমপিও ট্রানস্ফার/বদলি হলে পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনা করা হয়; তাহলে তিনি কেন চাকরিপ্রার্থী তথা সম্ভাব্য শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন? তিনি তো নতুন করে চাকরি চাচ্ছেন না, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে চাচ্ছেন। তিনি তো শিক্ষক হয়েই আছেন। তিনি চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে আবেদন করবেন কেন? যদি আবেদন করতেই হয় তো প্রতিযোগিতায় তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনা ও মূল্যায়ন করা হবে না কেন? যেহেতু সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে বদলি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না সেহেতু বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অধিক যুক্তিযুক্ত ও ন্যায় সঙ্গত নয় কি? 


সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য প্রতিবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের একটা সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের এই সুযোগ পাওয়া বিদ্যমান শিক্ষকগণের অধিকার। বিদ্যমান শিক্ষকগণ প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে গিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন এটি মোটেও সম্মানজনক নয়, উচিত নয়।  একজন বিদ্যমান শিক্ষক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে গিয়ে সম্ভাব্য শিক্ষকদের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে গেলে প্রতিষ্ঠানে তার সম্মানহানি ঘটে। সে মর্মাহত হয় ও বিষণ্ণতায় ভোগে! 



এমতাবস্থায় বিদ্যমান নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত উভয় প্রকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য আসনে নতুন নিয়োগের পূর্বে সেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ প্রয়োজনমত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সমঅভিজ্ঞ ইন্ডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে চয়েজ দিয়ে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একই প্রতিষ্ঠানের একই বিষয়ে ও পদে একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে  শিক্ষাগত যোগ্যতা, আইসিটি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা,  প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রকাশনা, চারিত্রিক গুণাবলি, সহশিক্ষা ইত্যাদি (জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের নীতি অনুসারে) এরসাথে দূরত্ব বা জেলা ও উপজেলা কোটা বিবেচনা করে অধিক পয়েন্ট প্রাপ্ত শিক্ষককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলির বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। 



এভাবে বদলি কার্যকর হবার পর যেসকল প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদ সৃষ্টি হবে সেগুলোতে বিধিমোতাবেক নতুন নিয়োগ প্রদান করা হলে হ্রাস পাবে শূন্য পদ নির্ধারণের জটিলতা। কিছুটা হলেও লাঘব হবে বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকগণের কষ্ট ও অসন্তোষ! বেসরকারি শিক্ষকদের যে পরিমাণ বেতন-ভাতা দেওয়া হয় তাতে নিজ বাড়ি থেকে দূর-দূরান্তে অবস্থান করে জীবনধারণ করা মোটেও সম্ভব নয়!  বদলি বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক শিক্ষকের জীবনে যদি সামান্যতম স্বস্তি বৃদ্ধি করা যায় তো অবশ্যই কিছুটা বৃদ্ধি পাবে সার্বিক শিক্ষার মান। এনটিআরসিএ সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলো বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন আশা করি।



মো. রহমত উল্লাহ্

সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। Email -  rahamot21@gmail.com  


অধ্যক্ষ - কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।



দুই ভাগে হোক বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ, প্রথম আলো > ১৪ আগস্ট ২০২১

পত্রিকার লিংক 

পরামর্শ

দুই ভাগে হোক বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রথম আলো > ১৪ আগস্ট ২০২১


বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের তৃতীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে প্রত্যাশা ছিল অনেক। দীর্ঘদিন পর চাকরি পাবেন অনেক বেকার, পূর্ণ হবে প্রতিষ্ঠানের অনেক শূন্য পদ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে সেই প্রত্যাশা। অর্ধলাখ শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আশায় বুক বেঁধেছিলেন অনেক নিবন্ধনধারী প্রার্থী। কিন্তু অর্ধেকও পূর্ণ হয়নি তাঁদের সেই আশা। তাঁদের অভিযোগ হচ্ছে, বিদ্যমান এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার কারণে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নতুন প্রার্থীরা। অপর দিকে বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধনধারী শিক্ষকগণের অভিযোগ হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে নতুন প্রার্থীদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার কারণে তাঁরা অনেকেই পুনর্নিয়োগ পাননি বিধায় যেতে পারেননি কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে। তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন পরোক্ষ বদলির এই সুযোগ থেকে। ক্ষতির শিকার হয়েছেন উভয় পক্ষই। অপর দিকে শূন্য পদ পূর্ণ না হওয়ায় ক্ষতির শিকার হয়েছে প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সংঘটিত হয়েছে ত্রিমুখী ক্ষতি!


এনটিআরসিএর তৃতীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ৮৯ লাখ আবেদন জমা পড়েছিল। নিয়োগ সুপারিশ পাওয়ার কথা ছিল ৫১ হাজার ৭৬১ জনের। কিন্তু নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৬ জনকে। নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা যায়নি ১৫ হাজার ৩২৫ জনকে। এনটিআরসিএ জানায়, নারী কোটায় প্রার্থী না পাওয়ায় ৬ হাজার ৭৭৭ জনকে সুপারিশ করা যায়নি এবং আবেদন না পাওয়ায় ৮ হাজার ৪৪৮ জনকে সুপারিশ করা যায়নি। প্রার্থীদের অভিযোগ, সুপারিশপ্রাপ্ত ৩৮ হাজারের প্রায় অর্ধেক পদ ইনডেক্সধারীদের দখলে চলে গেছে। অর্থাৎ তাঁরা আগে থেকেই বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং এমপিওভুক্ত আছেন। তাঁরা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করেছেনমাত্র। এক প্রতিষ্ঠানের পদ শূন্য করে অন্য প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন। মোট শূন্য পদ পূরণে কোনো ভূমিকা রাখেননি। ফলে এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরও শূন্য রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার পদ, যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়! প্রতিটি আবেদনের জন্য পৃথকভাবে ফি জমা দিয়ে একেকজন প্রার্থী ১০-২০টি আবেদন করেও নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আগামীতে হয়তো আবেদন করার বয়সই থাকবে না এদের অনেকের।


মূলত সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে একদিকে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য রয়েছে, অপর দিকে বিপুলসংখ্যক নতুন প্রার্থী নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এরূপ অযৌক্তিক প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বারবার তৈরি হবে এমন চিত্র! বারবার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক শিক্ষক, বারবার নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক নতুন প্রার্থী, বারবার শূন্য থেকে যাবে অনেক অনেক পদ, প্রতিবারই অসন্তোষ বাড়তে থাকবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর; যা কারও কাম্য হওয়া উচিত নয়। অথচ সামান্য সদিচ্ছা থাকলে এবং পরিকল্পনা করে এগুলে খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াকে দুই ভাগে বিভক্ত করতে হবে। প্রতিবছর পৃথকভাবে সম্পাদন করতে হবে দুটি নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রথমে প্রদান করতে হবে শুধু এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। এ ক্ষেত্রে কোনো নতুন প্রার্থী আবেদন করতে পারবে না। কেবল বিদ্যমান এমপিওভুক্ত ও নিবন্ধিত শিক্ষকগণই আবেদন করতে পারবেন। এদের পুনর্নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন সম্পন্ন করার পরবর্তী শূন্য পদ চিহ্নিত করতে হবে। সেই শূন্য পদে নতুন প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক আবেদন করতে পারবেন না। কেবল নিবন্ধিত ও ননএমপিও প্রার্থীগণ আবেদন করবেন। তাঁদের নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান শূন্য পদগুলো পূর্ণ করা সম্ভব হবে। এভাবে প্রতিবছর বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধিত শিক্ষকদের পুনর্নিয়োগের জন্য একটি এবং ননএমপিও নিবন্ধিত শিক্ষকদের নতুন নিয়োগের জন্য একটি করে মোট দুটি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে অবশ্যই অনেকাংশে সমাধান হবে এই সমস্যার।


মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবিটি তাঁদের প্রয়োজনের দিক থেকে খুবই মানবিক ও যৌক্তিক। এ কারণেই একাধিক এমপিও নীতিমালায় বদলির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে বদলি বাস্তবায়ন করার জন্য বলা হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বদলি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া উচিত। কেননা, তাঁরা আগে নিয়োগ পেয়েছেন এবং অনেক দিন ধরে কষ্ট করে দূরে চাকরি করছেন। কোনোভাবেই নতুন নিয়োগ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামানো উচিত নয় বদলিপ্রত্যাশী বিদ্যমান এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের।


*মো. রহমত উল্লাহ্, শিক্ষক ও কলাম লেখক



কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষ করে শিক্ষক। ইত্তেফাক, ১০ জুন ২০২০

কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষ করে শিক্ষক। ইত্তেফাক, ১০ জুন ২০২০

 পত্রিকার লিংক

কোনভাবেই গুজব ছড়াতে পারেন না কেউ বিশেষকরে শিক্ষক  

-মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক ইত্তেফাক >আলোকপাত, ১০ জুন, ২০২০

>গুজব ছড়ানো রাষ্ট্রীয় এবং ধর্মীয় কোনো দিক থেকেই সমর্থনযোগ্য নয়। কোনো সাধারণ বিবেকবান মানুষ এটি করতে পারেন না। যারা প্রকৃত ধর্মপ্রাণ, দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক তারাতো কখনোই এটি করবেন না। গুজব ছড়ানো বা অপপ্রচার করা মানেই মিথ্যা বলা। ইসলাম ধর্মে বলা আছে, তোমরা নিশ্চিত না হয়ে কিছুই বলবে না এবং কোনো কিছুকে এক রত্তিও কমিয়ে বা বাড়িয়ে বলবে না। অন্য সব ধর্মই সমর্থন করে এই বক্তব্য। কেননা সব ধর্মমতেই মিথ্যা বলা মহাপাপ।


অথচ অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে প্রতিনিয়ত ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন অনলাইন বা সোসাল মিডিয়াতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চালাচ্ছে অনেক অপপ্রচার, ছড়াচ্ছে নানান গুজব। তারা অসত্ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ের ভুল বা বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে ছড়াচ্ছে বিভ্রান্তি, দিচ্ছে উসকানি, তৈরি করছে অশান্তি! এসব আবার ভাইরাল করে অতি চালাকরা উপার্জন করছে অর্থ। সেগুলোকে দ্রুত লাইক ও শেয়ার দিচ্ছে তাদের গ্রুপভুক্ত সমমনারা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষক পদবিধারীরাও করছে হেন কাজ! এসব দেখে হুজুগে পড়ে, তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত না হয়ে, গভীরভাবে চিন্তাভাবনা না করে, ভালোমন্দ বিবেচনা না করে, সেগুলোকে লাইক ও শেয়ার করে মিথ্যা তথ্য বা গুজব ছড়াচ্ছেন অনেক সাধারণ শিক্ষক।


এক্ষেত্রে অত্যন্ত সজাগ ও সতর্ক থাকা উচিত সব শিক্ষকের। ফেসবুক-মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন অনলাইন বা সোসাল মিডিয়াতে যা পাওয়া যায় তার সবই অন্ধের মতো বিশ্বাস করা, লাইক করা, শেয়ার করা কোনো বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষের তথা শিক্ষকের কর্ম হতে পারে না কোনোভাবেই। একটি সঠিক সংবাদ/সার্কুলার বিকৃতভাবে বা ভিন্ন কৌশলে উপস্থাপন করে অন্যকে উসকে দেওয়া অথবা বিভ্রান্ত করাও অপরাধ। শিক্ষকের সদাই মনে রাখতে হবে, তিনি একজন শিক্ষক। তার আছে অগণিত শিক্ষার্থী। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তার দায়িত্ব ও কর্তব্য সবচেয়ে বেশি। শুধু আইনের কাছে নয়, নিজের বিবেকের কাছেও তার জবাবদিহিতা অপরিসীম। তাই এমন কোনো কিছুকেই তিনি পোস্ট, লাইক ও শেয়ার দিতে পারেন না; যার দ্বারা সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এবং যা আইনসিদ্ধ নয়।


যিনি মনেপ্রাণে শিক্ষক তিনি কোনোভাবেই কোনো অবস্থাতেই ছড়াতে পারেন না কোনো রকম অপপ্রচার বা গুজব। অন্যভাবে বলা যায়, যিনি গুজব ছড়ান তিনি প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকই নন। নিয়োগপত্র পেলেই, ছাত্রছাত্রী পড়ালেই, বেতন-ভাতা পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। শিক্ষকতা চাকরি নয়, মহান ব্রত। অনেক কিছু পাওয়ার মধ্যে নয়, ভালো কিছু দেওয়ার মধ্যেই শিক্ষকতার আনন্দ ও সফলতা। শিক্ষকের থাকতে হয় সর্বোচ্চ সম্মানবোধ, ন্যায়নীতিবোধ ও সতাদর্শ।


লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা


https://www.ittefaq.com.bd/print-edition/opinion/157044/%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%A8%E0%A7%8B%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%87-%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%9C%E0%A6%AC-%E0%A6%9B%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%A8%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%89