শাস্তি দেওয়া সহজ, শিক্ষা দেওয়া কঠিন

 


পত্রিকার লিংক


শাস্তি দেওয়া সহজ, শিক্ষা দেওয়া কঠিন

দৈনিক বাংলা, ১০ জানুয়ারি ২০২৪

মো. রহমত উল্লাহ্

আমাদের দেশের অনেক স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কতিপয় শিক্ষক এখনো শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়াকেই শিক্ষা দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় বলে মনে করেন। কেননা, তারা সহজে শাস্তি দিয়ে শিক্ষা নিশ্চিত করতে চান। বাস্তবে শাস্তি দেওয়া যত সহজ শিক্ষা দেওয়া তত সহজ নয়! শাস্তি দেওয়ার জন্য তেমন সময়, শ্রম, মেধা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু সঠিক শিক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয় পরিচর্যার জন্য অনেক সময়, শ্রম, মেধা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োগ করতে হয়। অর্থাৎ প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক অনেক যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। যিনি শিক্ষার্থীদের শাস্তি না দিয়ে সঠিক শিক্ষা প্রদানে তথা আচরণের অনুকূল স্থায়ী পরিবর্তন সাধনে সক্ষম তিনি অবশ্যই উত্তম শিক্ষক। শিক্ষার্থীদের শাস্তি দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে নয়; বরং অনুকরণীয় অনুসরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্ব দিয়ে, সত্যিকারের আদর দিয়ে, উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়ে, বিবেক জাগ্রত করে, মানব ও দেশ প্রেমে উদ্ভূদ্ধ করে, বাস্তবতাপূর্ণ উচ্চাশা দিয়ে, সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনতে দিয়ে, আর সবার মত সেও পারে এমন সৎসাহস দিয়ে, ভয়ভীতি হীন আনন্দঘন পরিবেশ দিয়েই সুনিশ্চিত করা যায় মেধানুযায়ী সুশিক্ষা। 


পরীক্ষায় এ+ গ্রেড এবং কর্ম জীবনে অধিক আর্থিক সুবিধা হাত করা মানেই যে এ+ মানুষ হওয়া নয়; তা আমরা অনেকেই বুঝিনা, বুঝতে চাইনা বলেই নিষ্ঠুরভাবে চালাই ‘মানব সন্তান’দের পিটিয়ে মানুষ করার প্রতিযোগিতা। ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানবিক গুণাবলি জাগ্রত করার পরিবর্তে আমরা প্রতিনিয়ত শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন করে করে চিরতরে হটিয়ে দিই অনেকের ভিতরের অধিকাংশ জন্মগত মানবিক গুণাবলী। সাধিত হয় না তাদের আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন। অর্জিত হয় না কাঙ্খিত সফট স্কিল। ফলে লেখাপড়া শিখেও তারা হয়ে উঠে আরো বেশি লোভি, নিষ্ঠুর ও আত্মকেন্দ্রিক। স্বপ্রনোদিত হয়ে এগিয়ে আসে না অপরের কল্যাণে। পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে বৃদ্ধি পায় অনাচার এবং অস্থিতিশীলতা। 


মনে রাখতে হবে, বর্তমান শিক্ষার্থীরা আগের মত নয়। এখন তারা অনেক তথ্য সমৃদ্ধ, আবেগপ্রবণ, অধিকার সচেতন ও আত্মমর্যাদা বোধ সম্পন্ন। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বময় বিস্তৃত তাদের দৃষ্টি। বিশ্বজুড়ে তাদের পাঠশালা। অনেক রকম তাদের শিক্ষার ক্ষেত্র। অনেক রকম তাদের শিক্ষক। অনেক বেশি তাদের ইনফরমাল এডুকেশন। অনেক বেশি এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা। আগের দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতো না সবাই। হাতেগোনা যারা ভর্তি হতো তারাও টিকে থাকতো না লেখাপড়ায়। শিক্ষকদের মার খেয়ে প্রত্যক্ষ প্রতিবাদ না করলেও অধিকাংশরাই নিরব প্রতিবাদ করে, নিজেকে অযোগ্য মনে করে, পালিয়ে যেতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে। তাদের আর কোনদিন ফিরে আসা হতো না শিক্ষায়! চিহ্নিত হতোনা তাদের মেধার ক্ষেত্র। অর্জিত হতো না সঠিক যোগ্যতা ও দক্ষতা। শেষমেষ লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত থেকে যেতো বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে। যারা টিকে থাকতো তারা জন্মগতভাবে অত্যন্ত মেধাবী ও ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে নম্র-ভদ্র এবং শিক্ষা লাভে বদ্ধপরিকর হাতেগোনা কয়েকজন। তখনকার প্রায় শতভাগ অভিভাবক ও শিক্ষক মনে করতেন যে, কঠিন শাস্তি দিয়েই শিক্ষা দিতে হয়। অভিভাবক শিক্ষককে বলেই দিতেন, তার সন্তানকে বকাবকি ও মারধর করে মানুষ করার জন্য। যিনি শিক্ষার্থীদের বেশি পেটাতেন তাকেই ভালো শিক্ষক মনে করা হতো! তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের সংখ্যাই ছিল কম। সেভাবে ভাবলে আর চলবে না এখন। পাল্টাতে হবে নিয়ন্ত্রণ কৌশল। শক্তি খাটিয়ে নয়, বুদ্ধি খাটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বর্তমান ছেলেমেয়েদের। শতভাগে উন্নীত করতে হবে শিক্ষার হার। সবাইকেই ধরে রাখতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ। যেনো তারা হয়ে উঠতে পারে বিশ্বমানের নাগরিক। সেই অসাধ্য সাধন করার জন্য শিক্ষকদের হতে হবে সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ। তাই বদলাতে হবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনমান।  

লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক


পত্রিকার লিংক:

https://epaper.dainikbangla.com.bd/home/displaypage/news_2024-01-10_5_14_b

প্রসঙ্গ: ভালো কলেজ, মন্দ কলেজ

 পত্রিকার লিংক


প্রসঙ্গ: ভালো কলেজ, মন্দ কলেজ

দৈনিক বাংলা, ০১ জানুয়ারি ২০২৪

মো. রহমত উল্লাহ্

>বাছাই করা ভালো শিক্ষার্থীদের কৃতিত্বে ‘ভালো কলেজ’ নামে খ্যাত শহরকেন্দ্রিক কিছু কলেজে রয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থী। এখানে শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা আদর্শ অনুপাতের চেয়ে অনেক অনেক বেশি। তদুপরি তারাই অনুমতি পায় একাধিক শিফট ও শাখা খুলে আরো বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করার। অপরদিকে, সারাদেশে বিদ্যমান হাজার হাজার কলেজ-মাদ্রাসায় রয়েছে কাম্য শিক্ষার্থীর তীব্র সংকট। প্রতি বৎসর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ফাঁকা থাকছে কমবেশি ১০ লাখ আসন। তদুপরি স্থাপিত হচ্ছে আরো নতুন নতুন কলেজ ও মাদ্রাসা। কাম্য শিক্ষার্থী পাচ্ছে না অনেক এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। 


৫০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বছরের পর বছর চলে আসছে এমন দু-চারটি করে কলেজ-মাদ্রাসা পাওয়া যাবে প্রায় প্রতিটি থানা/ উপজেলাতেই। শিক্ষকের তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা আদর্শ অনুপাতের চেয়ে অনেক কম হলেও সেসব কলেজের শিক্ষক, প্রশাসক, ভবন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনায় আনা হলে সবই যে মন্দ, তা কিন্তু নয়। তথাপি সেসবকে বলা হচ্ছে ‘মন্দ কলেজ’। অর্থাৎ সেসব কলেজে পাশের হার কম তাই সেগুলো ভালো কলেজ নয়। ২০২৩ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় অনেক সরকারি/ বেসরকারি কলেজের তুলনায় প্রাইভেট, মিশনারি ও বিশেষায়িত কলেজগুলো এগিয়ে। অতীতেও এমনটি লক্ষ্য করা গেছে। অথচ সরকারি কলেজে বিসিএস ক্যাডার শিক্ষক ছাড়াও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি। লক্ষণীয় যে, অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে এখন শুধু ভালো শিক্ষক ও ভালো সুযোগ-সুবিধা নয়, বাছাই করা ভালো শিক্ষার্থী ভালো ফলাফলের তথাকথিত ‘ভালো কলেজে’র প্রধান উপাদান বা নিয়ামক। তাছাড়া কমিটির ও রাজনীতির অশুভ প্রভাব মুক্ত থাকাও একটি বিশেষ বিষয়। 


আলোচিত ভালো কলেজগুলোর আশেপাশে অবস্থিত কোচিং সেন্টার ও শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানোর দিকে সামান্য নজর দিলে সহজেই বোঝা যায় সেসব কলেজে কেমন লেখাপড়া হয়। যাদের ছেলেমেয়ে সেসব কলেজে পড়ে, তারা কলেজের বেতন-ফি ও কোচিং-প্রাইভেট পড়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পান ‘ভালো কলেজ’ কাকে বলে! আসলে ভালো কলেজ তো হবার কথা সেসব কলেজ যেখানে এসএসসিতে জিপিএ ২, ৩, ৪ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে শুধুমাত্র ক্লাসে পড়িয়ে এইচএসসিতে জিপিএ ৩, ৪, ৫ প্রাপ্ত নরম যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষার্থী বের করা হয় এবং তারা বেরিয়ে গিয়ে দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে। যে সকল কলেজ শতকরা ১০০ ভাগ জিপিএ ৫ প্রাপ্ত (এসএসসিতে) শিক্ষার্থী ভর্তি করে শতকরা ৬০-৮০ ভাগ জিপিএ ৫ প্রাপ্ত (এইচএসসিতে) শিক্ষার্থী বের করে তারা কীভাবে ভালো কলেজ হয়? সব ভালো শিক্ষার্থী নিয়েও তো তারা সবার ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা যদি এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে এ, বি, সি, ডি প্রাপ্ত সব গ্রেডের শিক্ষার্থী ভর্তি করতো তাহলেই দেখা যেতো ভালো সুতা দিয়ে ভালো কাপড় বোনা সেসব কারিগরদের দক্ষতা কতটুকু! সেক্ষেত্রে অসুস্থ প্রতিযোগিতার ফলে মন্দ কলেজ নামে চিহ্নিত হয়ে যাওয়া কলেজেও ভর্তি হতো কিছু ভালো শিক্ষার্থী। সেসব কলেজ থেকেও পাওয়া যেত আরও ভালো ফলাফল। কিছুটা হলেও কমে আসতো ভালো-মন্দের ব্যবধান। শহরমুখী হতো না সবাই। হ্রাস পেতো ‘ভালো কলেজ’ নামে পরিচিত কলেজে ভর্তির অসুস্থ প্রতিযোগিতা। হ্রাস পেতো অনেকের শিক্ষা বাণিজ্যের অবাধ সুযোগ। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মনে এতোটা আঘাত হানতো না তথাকথিত ভালো কলেজে ভর্তি হতে না পারার অযৌক্তিক কষ্ট। সবদিক বিবেচনা করে সকল অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এলাকাভিত্তিক কাম্যসংখ্যক কলেজ মানসম্পন্ন করে তোলা কি সরকারের দায়িত্ব নয়? বাড়ির পাশে একটি ভালো কলেজ পাওয়া কি শিক্ষার্থীর অধিকার নয়?  


মো. রহমত উল্লাহ্ 

শিক্ষক ও শিক্ষা বিশ্লেষক


https://epaper.dainikbangla.com.bd/home/displaypage/news_2024-01-01_5_14_b

শিক্ষার্থীদের সহমর্মিতা অর্জন অত্যাবশ্যক



 পত্রিকার লিংক

 

 

শিক্ষার্থীদের সহমর্মিতা অর্জন অত্যাবশ্যক

মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক

 দৈনিক ইত্তেফাক, ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩

মূল্যবোধের উল্লেখযোগ্য উপাদান হচ্ছে সহমর্মিতা। এটি জীবন দক্ষতা সমূহের অন্যতম দক্ষতা। জীবনের সর্বক্ষেত্রে সহমর্মিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহমর্মিতা মনের গভীরে অবস্থিত একটি নিঃস্বার্থ মহামূল্যবান অনুভূতি। সহমর্মিতার দ্বারাই ব্যক্তিক, পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়। আন্তঃ ব্যক্তিক সম্পর্ক মজবুত হয়। অন্যের দুঃখ-ব্যথায় সমব্যথী হওয়া, সমানুভূতি অনুভব করা ও প্রকাশ করাই সহমর্মিতা। লক্ষণীয়, বিষয়টি সহানুভূতি নয়, সমানুভূতি বা সমান অনুভূতি। সহমর্মিতা সহানুভূতির চেয়ে গভীরে অবস্থিত। অর্থাত্ সহানুভূতি (Szmpathy) আর সহমর্মিতা (Empathু) এক নয়। কোন কোন সহানুভূতিতে করুনা বা স্বার্থ মিশ্রিত থাকতে পারে। কিন্তু সহমর্মিতা সর্বদাই ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত। মনের মনিকোঠায় প্রজ্জ্বলিত সহমর্মিতা এক অনিঃশেষ ত্যাগী প্রদীপ। এই প্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত হলেই স্বার্থহীন সহানুভূতি প্রকাশ করা যায়, প্রতিদানহীন সহায়তার বা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা যায়। মুখে মুখে সমবেদনা প্রকাশ করা সহমর্মিতা নয়; সহমর্মিতা হচ্ছে অন্তর দিয়ে সমবেদনা অনুভব করা এবং সে মত আচরণ করা। সহমর্মিতার দ্বারাই সহপাঠীদের সাথে সংগঠিত হয় উত্তম আচরণ ও গভীর বন্ধুত্ব। সহমর্মিতার গভীরতাই ভালোবাসার গভীরতা।

সহকর্মীদের সহমর্মিতার ফলেই তৈরি হয় আন্তরিকতাপূর্ণ কর্মপরিবেশ। সহমর্মিতার মাত্রা অনুসারেই নির্ধারিত হয় অসুস্থ, বঞ্চিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বয?োবৃদ্ধদের সঙ্গে অন্যদের আচরণ। পারিবারিক সহমর্মিতার অভাবেই শিশুরা হয়ে ওঠে অবাধ্য, বড়রা হয়ে ওঠে অসহিষ্ণু, বয়োবৃত্তদের ঠিকানা হয় বৃদ্ধাশ্রম।

সহমর্মিতাপূর্ণ সমাজ হচ্ছে নিঃস্বার্থ সহযোগিতাপূর্ণ সমাজ। সহমর্মী নাগরিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। সহমর্মী সদস্য পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের শান্তি এবং অগ্রগতির অন্যতম নিয়ামক। ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের বৃহত্তর কল্যাণার্থে শিক্ষার্থীদের সহমর্মী করে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রায় সমান্তরাল। আমাদের দেশে সার্বিকভাবে পারিবারিক তথা অভিভাবকদের শিক্ষা তুলনামূলক কম থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথা শিক্ষকগণের ভূমিকাই সর্বাধিক কাম্য। যার জন্য সর্বাগ্রে শিক্ষকদের হতে হবে সহমর্মী। অন্যান্য যোগ্যতার পাশাপাশি অবশ্যই সকল ধরনের ও স্তরের শিক্ষকের থাকতে হবে সহমর্মী আচরণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের সহমর্মী করে গড়ে তোলার যোগ্যতা এবং আন্তরিকতা। তদুপরি সহমর্মিতাপূর্ণ হতে হবে শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে শিক্ষায়।

সহমর্মিতা শিক্ষার ও চর্চার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠবে ভোগবাদীর পরিবর্তে অন্যের কল্যাণে নিবেদিত ত্যাগবাদী নাগরিক।

 


ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের বাস্তবতা, দৈনিক বাংলা, ১৭ নভেম্বর ২০২৩

 পত্রিকার লিংক


ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বাস্তবতা 

মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক বাংলা, ১৭ নভেম্বর ২০২৩

ওস্তাদজী ওযু করছেন। পায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছে বাদশা আলমগীরের পুত্র তথা ওস্তাদজীর ছাত্র। এই দৃশ্য দেখে বাদশা আলমগীর ভীষণ মন ক্ষুন্ন হয়ে ওস্তাদজীকে ডেকে পাঠালেন। সবাই ভাবল, বাদশা ওই ওস্তাদজীকে কঠিন শাস্তি দিবেন! অবশেষে বাদশা আলমগীর জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কেমন শিক্ষা দিয়েছেন যে, ছাত্র শুধু পানি ঢেলে দেয়, নিজের হাতে আপনার পা ধুয়ে দেয় না? আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ওস্তাদের কদর শিরোনামে এই সত্য বিষয়টি পড়েছিলাম। বর্তমান বইয়ে এটি নেই। তাই নতুনদের উদ্দেশ্যে সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করলাম। এমন দৃশ্য এখন প্রায় অবাস্তব। ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কও এখন অন্যরকম। তাই অনেকেই আফসোস করে বলে থাকেন, আগের শিক্ষক ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় মাননীয় পূজনীয়। ছাত্র ছিল বিশ্বস্ত আদুরে স্নেহশীল। সর্বোৎকৃষ্ট সম্পর্ক ছিল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষকের আদেশ-নির্দেশ উপদেশ পাওয়ার প্রত্যাশায় সর্বদা ব্যাকুল থাকত শিক্ষার্থী। শিক্ষকের দেয়া কঠিন শাস্তিকেও মনে করত আশীর্বাদ। শুধু পুস্তকবদ্ধ জ্ঞান নয়, শিক্ষকের আচার-আচরণ জীবনযাপন নীতি-নৈতিকতা দেশপ্রেম জাতীয়তা বোধ সবকিছুই আত্মস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টায় মগ্ন থাকতো ছাত্ররা। ‘আব্দুস সালাম পন্ডিত কিংবা মোহাম্মদ আলী মাস্টারের প্রিয় ছাত্র’- এই স্বীকৃতিটুকুই যথেষ্ট ছিল সবুজ পাহাড় এলাকার একজন যুবকের লজিং পাওয়া, কাজ পাওয়া, এমনকি পুলিশের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। ছাত্রকে সর্বময় ভালো শিক্ষায় শিক্ষিত করার অদম্য প্রচেষ্টায় মগ্ন থাকতেন শিক্ষক। খুব ভোরে ও গভীর রাতে দু’এক মাইল হেঁটে বাড়ি যেয়ে দেখে আসতেন অধ্যয়ন করছে কিনা ছাত্র! এক দু’দিন পাঠশালায় অনুপস্থিত থাকলেই উদ্বিগ্ন চিত্তে ছুটে যেতেন পরস্পরের ভালো-মন্দ জানার জন্য। সামান্য অসুস্থ হলেই সেবার হাত বাড়িয়ে দিনরাত বসে থাকতেন শিয়রে। সবচেয়ে ভালো কথা ও কর্ম শত কষ্টে শিক্ষক আয়ত্ত করে রাখতেন ছাত্রের জন্য। সুশিক্ষা গ্রহণ ও দানই ছিল শিক্ষকের ধর্ম। ছাত্রের গাছের প্রথম সুস্বাদু ফল, নতুন ধানের মুড়ি খই পিঠা গাভীর দুধ এমন অনেক কিছুই শিক্ষকের জন্য আনন্দচিত্তে বরাদ্দ করতেন অভিভাবকগণ। 


গভীর মনোযোগে অধ্যয়ন করত ছাত্ররা। ‘ছাত্রনং অধ্যয়নং তপ’ শিক্ষকের এই উক্তি মনে প্রানে বিশ্বাস করত, কার্যকর করত।  জবাবদিহিতার প্রশ্নই ছিল না শিক্ষকের। তথাপি মানুষের ভিতরের মানুষটিকে আসল মানুষ করার গুরু দায়িত্ব পালনে কোন ছাত্রের অক্ষমতার কারণে সামান্য ব্যর্থ হলেও নিজের ব্যর্থতা মনে করে শিক্ষক ছটফট করতেন অনুতাপ যন্ত্রণায়! ছাত্রের মধ্যে এমনি প্রথিত হতো শিক্ষকের গুণ যেন শিক্ষক উপস্থিত থাকতেন জীবনের সর্বক্ষেত্রে। মনে কষ্ট পেতে পারেন শিক্ষক এমন কথা ও কাজ শুধু ছাত্র নয় ছাত্রের অভিভাবকগণও বলতেন না, করতেন না। ছাত্র-শিক্ষকের সেই সম্পর্কটি ছিল সহমর্মিতায় পরিপূর্ণ আদর্শগত সম্পর্ক। শুধুই কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্য ছিল উভয়ের। অর্থ মূল্যে বা ভোগে নয়, মনের টানে ও ত্যাগে মূল্যায়িত হত সেই সম্পর্ক। পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গুরু-শিষ্য সম্পর্কটি ইদানিং খুবই কম দেখা যায়। ‘ছাত্ররা এখন শিক্ষককে মান্য করে না, এমনকি শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না’, এর প্রকৃত কারণ ও সত্যতা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে সম্পর্কের আরো উন্নয়ন অত্যাবশ্য।


আসলে আগের মত কিছুই নেই। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে শিক্ষার পরিবেশ। বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে ছাত্র-শিক্ষক সংখ্যা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অনিবার্য প্রবর্তনের ফলে সামান্য হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে ছাত্র-শিক্ষকের অবস্থানগত দূরত্ব। পাল্টে গেছে শিক্ষা দানের আদি ধারণা। শিক্ষাদানকে বলা হচ্ছে পাঠদান, দক্ষতা দান, অভিজ্ঞতা দান। এক সময় ধর্ম, দর্শন, ভাষা ও গণিত শিক্ষাকেই মনে করা হতো শিক্ষা। অথচ এখন শিক্ষার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে সর্বদিকে। কৃষি থেকে মহাশূন্য পর্যন্ত এখন শিক্ষা বিস্তৃত। মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের চেয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও অর্থ উপার্জন ক্ষমতা অর্জনকে বিবেচনা করা হচ্ছে শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য। ফলে শিক্ষা এখন অনেকটা পণ্য এবং শিক্ষা উপার্জন ব্যয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। আগে শিক্ষককে মনে করা হতো বিদ্যাদাতা। আর এখন শিক্ষক অনেকটা বেতনভোগী সহযোগীর মতো। আমাদের শিক্ষার স্তরও উন্নীত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে। যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর বয়সের ব্যবধান আগের তুলনায় অনেক কম। তারা এখানে ভাই-বন্ধুর মত। প্রেম, প্রজনন, পরিবার পরিকল্পনা, যৌন রোগের বিস্তার ইত্যাদি গোপনীয় বিষয়েও ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আলোচনা করতে হয় খোলামেলাভাবে। যিনি জুতা তৈরীর বা পশুপাখি পালনের কৌশল শেখাচ্ছেন তিনিও শিক্ষক। যে গাড়ি, মেশিন, বিমান বা কম্পিউটার চালনা শিখছে সেও শিক্ষার্থী। যার বয়স তার শিক্ষকের চেয়ে বেশিও হতে পারে। অন্যান্য যোগ্যতার কারণে এই ছাত্র হতে পারেন শ্রদ্ধার পাত্র। যেমনটি অতীতে ছিল না বললেই চলে। শুধু শিক্ষক বা প্রকৃতি নয়; পত্র-পত্রিকা, বেতার-টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ইত্যাদি বর্তমানে পালন করছে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের ভূমিকা। যেখানে শিক্ষকের অবদান পরোক্ষ। অর্থাৎ অতীতের মতো ছাত্র-শিক্ষক ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ এখন নেই। এক্ষেত্রে কোন শিক্ষকের নিকট থেকে কোন বিষয় শিখবার আগ্রহ মানেই ঐ শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা। ছাত্র-শিক্ষকের এই সম্পর্কটি সফল। অর্থাৎ সুসম্পর্ক। এখানে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালবার সুযোগ ও পরিবেশ কোথায়? তাছাড়া শিক্ষক যথাযোগ্য না হলে, আন্তরিক ও নিবেদিত না হলে, সৎ ও নিরপেক্ষ না হলে ছাত্রদের শ্রদ্ধা পাওয়ার আশা করাও অনুচিত। 


ছাত্র শিক্ষক সু-সম্পর্কের বড় একটি পূর্ব শর্ত হচ্ছে অসংখ্য শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে সুনির্দিষ্ট শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ নির্ধারণ। অর্থাৎ কী শিখতে সে সর্বাধিক আগ্রহী এবং তার পক্ষে কী শিক্ষা করা সম্ভব তা স্থির করা। অতীতে শিক্ষার এতগুলো ক্ষেত্র চিহ্নিত ছিল না বলেই শিক্ষার্থীর আগ্রহ নির্ধারণের সুযোগও কম ছিল, শিক্ষার্থীও কম ছিল। যে কৃষি শিক্ষায় আগ্রহী তাকে পারিবারিক সিদ্ধান্তে ডাক্তারি বিদ্যা শিক্ষা দিতে গেলে অমনোযোগী থাকবেই। ওই শিক্ষার প্রতি আগ্রহের কারণেই শিক্ষকের প্রতিও থাকবে অনাগ্রহী। যে কম্পিউটার বিজ্ঞানে আগ্রহী তাকে কম্পিউটার বিজ্ঞান শিখতে দিলে ওই বিদ্যার প্রতি আগ্রহের কারণেই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রতিও সে আগ্রহী হবে, শ্রদ্ধাশীল হবে। এ বিষয়ে শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতায় ডুব দেওয়ার জন্যই শিক্ষার্থী তার সান্নিধ্য চাইবে, সন্তুষ্টি চাইবে। শিক্ষক সুযোগ্য হলে অবশ্যই তৈরি হবে সুসম্পর্ক। যে গান শিখতে আগ্রহী সে শুধু তার শিক্ষকের প্রতিই নয় ভালো শিল্পীর প্রতিও শ্রদ্ধাশীল, যদিও ওই শিল্পীর সঙ্গে তার পরিচয় নেই। এ সম্পর্কের বন্ধন আত্মিক। সুযোগ্য শিক্ষক ও যথাযথ পরিবেশ পেলে ওই সম্পর্কের সেতু বেয়ে আগ্রহী ছাত্রের কাছে প্রবাহিত হবে শিক্ষকের সকল সুশিক্ষা ও গুণাবলী। 


শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও মেধা অনুযায়ী শিক্ষার সুযোগ দিতে পারছিনা বলেও আমাদের ছাত্ররা যা শিখতে বাধ্য হচ্ছে ওই বিষয়ের প্রতি ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের প্রতি তুলনামূলক কম আন্তরিক, কম শ্রদ্ধাশীল। অন্ধভক্তি সুসম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ নয়। যে ছাত্র বাহ্যিকভাবে শিক্ষককে শ্রদ্ধা দেখায় কিন্তু যে বিষয়/কর্মদক্ষতা শেখার জন্য শিক্ষকের নিকট যায় তা সঠিকভাবে আয়ত্ত করে না সে ছাত্রের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হিসেবে কতটা সফল তা প্রশ্নবিদ্ধ! বরং যে শিক্ষার্থী নির্ধারিত শিক্ষা লাভে আগ্রহী, সচেষ্ট ও সফল তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সম্পর্ক ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হিসেবে অধিক সফল। শুধুমাত্র সালাম/ নমস্কারের পরিমাণ নয়, সুশিক্ষা লাভের পরিমাণই এই সম্পর্কের মানদন্ড। শ্রমবিভাজনের ফলে বর্তমানে একজন শিক্ষার্থীর অনেক শিক্ষক। বাংলা ইংরেজি অংক বিজ্ঞান ধর্ম সংগীত চিত্রকলা ক্রীড়া কম্পিউটার ইত্যাদি প্রতি বিষয়ের এক বা একাধিক শিক্ষক থাকেন প্রাথমিক স্তরেই। একেকজনের বৈশিষ্ট্য একেক রকম। তাদের নির্ধারিত পাঠ আয়ত্ত করতেই হিমশিম খাচ্ছে শিক্ষার্থী, ঘনিষ্ঠ হবার যোগ্যতা, ক্ষমতা ও সুযোগ আছে কি? বিভিন্ন মিডিয়াসহ নানা বিষয়ের শিক্ষকদের প্রতি ছাত্রদের যে শ্রদ্ধা তার সমষ্টি অতীতের চেয়ে কম নয়।


একসঙ্গে ছাত্র-শিক্ষকের উঠা-বসার সময় তুলনামূলক কমে যাওয়ায় পারস্পরিক স্নেহ-শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সুযোগও এখন কম। বিভিন্ন কারণে যে শিক্ষার প্রতি অমনোযোগী, অশ্রদ্ধাশীল ও অনাগ্রহী সে শিক্ষকের প্রতিও অশ্রদ্ধাশীল। পন্ডিত মশাই এর টিকিট কেটে পকেটে দিয়ে দেওয়ার মত দুষ্টু আগেও ছিল পাঠশালায়। কতিপয় ছাত্র-শিক্ষকের অশুভ আচরণের ভিত্তিতে পুরো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের মান নির্ধারণ অযৌক্তিক, অনুচিত। তথাপি এদের সংখ্যা হ্রাস করা জরুরি। প্রকৃত ছত্রের পক্ষে তার শিক্ষকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করা কোনদিনই সম্ভব নয়। অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে আদর্শ ছাত্রদের সঙ্গে আদর্শ শিক্ষকদের সুসম্পর্ক আগের তুলনায় মোটেই কমেনি। বিভিন্ন পরিবর্তনের প্রভাবে এই সম্পর্কের ধরন পরিবর্তিত হয়েছে মাত্র। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ঝর্ণাধারার মতো প্রবাহমান ছিল, আছে, থাকবে। আসলে যার শিখবার আগ্রহ আছে, শেখাবার আগ্রহ আছে, সেই ছাত্র, সেই শিক্ষক। এতো দুই নয়, একই সত্তা। সম্পর্ক অবনতির সুযোগ কই? 


মো. রহমত উল্লাহ্

শিশুসাহিত্যিক, শিক্ষাগবেষক এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

১৪ নভেম্বর ২০২৩



সর্বাধিক যোগ্য প্রশিক্ষক চাই, দৈনিক শিক্ষা ও আমাদের বার্তা

পত্রিকার লিংক

নতুন শিক্ষাক্রম: সর্বাধিক যোগ্য প্রশিক্ষক চাই

মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক শিক্ষা ও আমাদের বার্তা

২১ ও ২২ অক্টোবর ২০২৩

>নতুন শিক্ষাক্রম বিস্তরণে শিক্ষকদের পুনঃ পুনঃ প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক। বিশেষকরে বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যতীত নতুন পদ্ধতিতে পাঠদান ও মূল্যায়ন কোন শিক্ষকের পক্ষেই সঠিকভাবে সম্ভব নয়। জানাগেছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রশিক্ষক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষক বাছাই প্রক্রিয়ার শুরুতেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। সরকারি স্কুলের শিক্ষকগণ বলছেন, একাডেমিক সুপারভাইজারদের নিকট থেকে তারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন না। কেননা, একাডেমিক সুপারভাইজারগণ শিক্ষক নন। তারা প্রকল্প থেকে এসেছেন। তাই সরকারি স্কুলের শিক্ষকগণ শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের অধ্যাপকদের নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিতে চান। আবার একাডেমিক সুপারভাইজারগণ বলছেন, তারা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ মাস্টার ট্রেইনার। অভিজ্ঞ মাস্টার ট্রেইনারগণ প্রশিক্ষক হবেন এটাই স্বাভাবিক। এই বিতর্ক চলমান থাকা কালেই চলমান জেলা পর্যায়ের প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণ। প্রথম ব্যাচে গত ০৯ অক্টোবর থেকে গত ১৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখ পর্যন্ত ৩৩০ জন একাডেমিক সুপারভাইজার ও ১৫৪ জন শিক্ষা কর্মকর্তা নতুন শিক্ষাক্রমের প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।


প্রশ্ন হচ্ছে, যারা একাডেমিক সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষক তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছেন তারা কারা? আর যারা একাডেমিক সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষক তালিকা থেকে বাদ দিতে বলছেন তারা কারা? আমাদের জানামতে শিক্ষা প্রশাসনে অধিকাংশ সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকগণই নিয়োজিত আছেন। সেখানে তো কোন বেসরকারি শিক্ষক নিয়োজিত নেই! সরকারি শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত শিক্ষা প্রশাসনের গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন সরকারি শিক্ষকগণ! এমতাবস্থায় একাডেমিক সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষক তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তবে কোন্ ক্রাইটেরিয়াতে এই প্রশিক্ষকদের বাছাই করা হলো তা কিন্তু আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। সারাদেশের শিক্ষকদের পুনঃ পুনঃ প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য প্রশিক্ষক তৈরির কোন লিখিত ও অনুমোদিত নীতিমালা আছে কিনা তা আমার জানা নেই। লিখিত ও প্রকাশিত নীতিমালা থেকে থাকলে এবং সে নীতিমালা অনুসারে একাডেমিক সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষক তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকলে নিশ্চয়ই সরকারি স্কুলের শিক্ষকগণ তা বাতিল বা সংশোধনের জন্য দাবি উত্থাপন করতেন। তেমন দাবি তাদের আবেদনপত্রে ও পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়নি। সুষ্ঠু নীতিমালা প্রকাশিত থাকলে নিশ্চয়ই বিতর্ক সৃষ্টির সুযোগ থাকতো না এবং থাকবে না।  


মোট শিক্ষকের প্রায় ৯৫ শতাংশ বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্য থেকে কতজন, মোট সরকারি শিক্ষকদের মধ্য থেকে কতজন, মোট একাডেমিক সুপারভাইজারদের মধ্য থেকে কতজন ও মোট শিক্ষা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে কতজন এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সে অনুপাত বিশ্লেষণ করতে গেলে চলে আসবে আরো অনেক কথা, অনেক বিতর্ক। তাছাড়া শিক্ষকদের প্রশিক্ষক হবার জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের সকল অধ্যাপক সর্বাধিক যোগ্য, সরকারি স্কুল-কলেজের সকল শিক্ষক অধিক যোগ্য, সকল একাডেমিক সুপারভাইজার/ শিক্ষা কর্মকর্তা বেশি যোগ্য, আর সকল বেসরকারি শিক্ষক অযোগ্য এমন বলা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও পক্ষপাত দুষ্ট। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কম বা বেশি যোগ্য ও দক্ষ লোক বিদ্যমান। বিভিন্ন এনজিওতেও অনেক যোগ্য-দক্ষ প্রশিক্ষক আছেন। আসল কথা হচ্ছে, সবদিক বিবেচনা করে সর্বাধিক যোগ্য-দক্ষ প্রশিক্ষক বাছাইয়ের জন্য অবশ্যই সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন ও নিরপেক্ষভাবে তা অনুসরণ করা অত্যাবশ্যক। সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ প্রশিক্ষক ব্যতীত উত্তম প্রশিক্ষণ অসম্ভব। শিক্ষকদের উত্তম প্রশিক্ষণ ব্যতীত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। 


বিভিন্ন কারণে যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণের ও প্রদানের বেশি সুযোগ পেয়েছেন তারা সবাই বেশি যোগ্য-দক্ষ হয়েছেন এমনটি বলা যায় না সবার ক্ষেত্রে। 

একজন উত্তম প্রশিক্ষকের থাকা চাই কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞান, পাঠদান পদ্ধতি ও কৌশল প্রয়োগে উচ্চ দক্ষতা, স্পষ্ট উচ্চারণ ও জোরালো কণ্ঠস্বর, মুদ্রাদোষমুক্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, শুদ্ধভাবে বলায় ও লেখায় অভ্যস্ততা,  আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ দক্ষতা, সহজ বিশ্লেষণ ও সুন্দর উপস্থাপন ক্ষমতা, শারীরিক ও মানসিক ফিটনেস/সক্ষমতা, সুষ্ঠু শ্রেণি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা, ডিজিটাল প্রযুক্তিসহ আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারে পটুতা, সহশিক্ষায় আগ্রহ ও পারদর্শীতা এবং সেই সাথে তাকে হতে হবে দেশপ্রেম ও জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ আধুনিক তথ্যসমৃদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্ক, নিরপেক্ষ, ধৈর্যশীল, মিষ্টভাষী, উদ্যমী, উৎসাহী, নিরলস… ইত্যাদি আরও অনেক গুণের অধিকারী। সিমুলেশন ক্লাসের মাধ্যমে উল্লিখিত যোগ্যতা ও দক্ষতা মূল্যায়ন করা সম্ভব। সিমুলেশন ক্লাস রেকর্ড করে প্রয়োজনে যাচাই করে বাছাইকারীদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সম্ভব।


সকল যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করে সিমুলেশন ক্লাসের মাধ্যমে দক্ষতা বিবেচনা করে উত্তম প্রশিক্ষক বাছাইয়ের পরেও বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষনার্থী শিক্ষকদের দ্বারা প্রশিক্ষকদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা আবশ্যক। অর্থাৎ প্রশিক্ষকগণ কেমন প্রশিক্ষণ প্রদান করেন তা প্রতিনিয়ত গঠনকালীন মূল্যায়নের আধুনিক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে যেহেতু প্রশিক্ষনার্থীরা শিক্ষক সেহেতু তারা দক্ষতা ও নিরপেক্ষতা প্রয়োগ করে প্রশিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারবেন এবং করবেন বলে আশা করা যায়। এতে করে প্রশিক্ষকগণ ক্রমাগত নিজের মান বৃদ্ধি করা ও সর্বোচ্চটা প্রদান করার ব্যাপারে সদা সক্রিয় থাকবেন এবং কোন প্রশিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতা যে কোন পর্যায়ে কাঙ্খিত মাত্রায় না থাকলে বা তুলনামূলকভাবে কম থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তাঁর স্থলে অধিক যোগ্য-দক্ষ লোক নিয়োজিত করা যাবে। 


যাদের সর্বাধিক যোগ্যতা, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও সৎসাহস আছে তাঁরা নিশ্চয়ই আমার এই প্রস্তাব চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে সুষ্ঠু নীতিমালা অনুসরণ করে প্রশিক্ষক হতে চাইবেন। এ প্রক্রিয়ায় যদি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের শিক্ষক, সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষা কর্মকর্তা, একাডেমিক সুপারভাইজার নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষদের প্রশিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করা হয় এবং নিয়োজিত রাখা হয় তো প্রশিক্ষণের মান তথা শিক্ষার মান বিতর্কহীনভাবে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। <


মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষাগবেষক এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।









https://www.dainikshiksha.com/%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AE-%E0%A6%B8%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A7%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%95-%E0%A6%9A%E0%A6%BE%E0%A6%87/262011/

শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন আবশ্যক, দৈনিক বাংলা

পত্রিকার লিংক

শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন আবশ্যক

মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক বাংলা, ২৪ অক্টোবর ২০২৩

>কোন কিছু অন্যের বোধগম্য করে সহজ ও সুন্দরভাবে প্রকাশ করার যোগ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বলা এবং লেখা মনের ভাব প্রকাশের ও তথ্য আদান-প্রদানের তথা যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। জীবন দক্ষতার সর্বাধিক ব্যবহৃত অন্যতম দক্ষতা হচ্ছে যোগাযোগ দক্ষতা। এই যোগাযোগ দক্ষতা মানুষের ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, কর্মজীবনে, সামাজিক জীবনে তথা সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অন্যান্য কাম্য যোগ্যতার পাশাপাশি দেখে/শুনে/পড়ে বুঝে মনের ভাব বা নিজের কথা বিভিন্নভাবে লিখে/বলে প্রকাশ করার দক্ষতার উপর নির্ভর করেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেকাংশে সফল হয়ে ওঠেন অধিকাংশ মানুষ। যোগাযোগ দক্ষতার প্রধান দুটি ধাপ হচ্ছে, বুঝতে পারা ও প্রকাশ করতে পারা। এ দুটি ধাপ অতিক্রম করার জন্য ভাষার ব্যবহার অপরিহার্য। অর্থাৎ ভাষা আয়ত্ত করা ও প্রয়োগ করার দক্ষতাই যোগাযোগ দক্ষতা। লিখে, বলে, এঁকে, ইঙ্গিতে বা অন্য কোন ভাবে যার প্রকাশ ক্ষমতা যতো সুন্দর ও সফল তার অনুসারী তত বেশি। নেতা, কর্মী, শিল্পী, সাহিত্যিক, উৎপাদক, ব্যবস্থাপক, শিক্ষক, ধর্মযাজক ইত্যাদি সবার ক্ষেত্রেই তা কম/বেশি প্রযোজ্য। আজকের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে যাই হবে যোগাযোগ দক্ষতার আরো বেশি প্রয়োজন হবে। অবাধ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির যুগে যোগাযোগ দক্ষতা ব্যতীত কোন ক্ষেত্রেই কারো কাঙ্খিত সফলতা লাভের সম্ভাবনা নেই। তাই শিক্ষার্থীদের কোন কিছু করার দক্ষতা অর্জন করার পাশাপাশি দেখে/শুনে/পড়ে বুঝে বিভিন্নভাবে বলার ও লেখার যোগ্যতা-দক্ষতা অর্জন করা অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকাই সর্বাধিক। 


নতুন শিক্ষাক্রমে আগের মত লিখিত পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনেক কিছু চিন্তা করে বা মনে করে লেখার প্রয়োজনীয়তা তেমন ভাবে অনুভব করছে না বিধায় দ্রুত চিন্তা করার, মনে করার ও লেখার অনুশীলনও হয়তো করছে না আগের মতো। এমতাবস্থায় শিক্ষার্থীদের লেখার যোগ্যতা-দক্ষতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জিত হবার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে। বর্তমান দক্ষতা-অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রমের প্রত্যাশা অনুসারে শিক্ষার্থীদের কোন কিছু করার দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্নভাবে বলার ও লেখার যোগ্যতা-দক্ষতা কাঙ্খিত মাত্রায় সকলের অর্জিত হচ্ছে কিনা অর্থাৎ সবাই সঠিক ভাবে বলতে পারছে কিনা এবং সবাই সঠিকভাবে লিখতে পারছে কিনা তা প্রতিনিয়ত গুরুত্ব সহকারে যাচাই করা উচিত। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখার যোগ্যতা-দক্ষতা সঠিকভাবে অর্জিত হচ্ছে কিনা তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিখন কালেই দেখতে হবে নির্ধারিত ভাষার প্রমিত শব্দ আত্মস্থ করায় ও প্রয়োগ করায় এবং সুন্দর বাক্য গঠনে ও সঠিক ভাব প্রকাশে শিক্ষার্থীরা শ্রেণি উপযোগী পটু হয়ে উঠছে কিনা। কোন পরিস্থিতিতে কোন কথাটি কীভাবে বলতে হবে অথবা বলতে হবে না তা বুঝতে পারছে কিনা। আন্তঃ ব্যক্তিক সম্পর্ক স্থাপন ও রক্ষা করতে পারছে কিনা। এক্ষেত্রে যদি কারো ঘাটতি থাকে তো তা পূর্ণ করার জন্য ওই শ্রেণিতেই নেওয়া উচিত যথাযথ ব্যবস্থা। কেননা এসব দুর্বলতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা এক বা একাধিক শ্রেণি অতিক্রম করে গেলে সবাই আর পূর্ণ করতে পারে না সেই ঘাটতি! প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের বলার এবং লেখার কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা-দক্ষতা অর্জিত না হলে পরবর্তীতে কর্মে বা উচ্চশিক্ষায় গিয়ে তাদের ব্যর্থ হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এ বিষয়টিকে হালকা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। 


বর্তমানে নতুন কারিকুলামের আওতায় যে সকল একক কাজ, জোড়ায় কাজ, দলীয় কাজ, পরিদর্শন, ভ্রমণ, অনুষ্ঠান ইত্যাদি করানো হয় সেগুলো সম্পর্কে ও অন্যান্য উপযোগী বিষয় সম্পর্কে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে স্বতন্ত্রভাবে বলানো এবং লেখানো আবশ্যক। অর্থাৎ ব্যবস্থাটি এমন হওয়া উচিত যে, প্রতিটি কাজ বা ইভেন্ট প্রত্যেক শিক্ষার্থী নিজে করবে এবং সে কাজের অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বলবে ও লিখবে। তদুপরি শ্রেণি উপযোগী অন্যান্য পারিপার্শ্বিক ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কেও লিখবে-বলবে। অর্থাৎ শুধু করতে পারার মূল্যায়ন নয়, বলতে পারা এবং লিখতে পারার মূল্যায়নও ধারাবাহিকভাবে করা উচত। যাতে পাঠ্যক্রম অনুসারে কোন কিছু করতে পারার আগ্রহের মতো বলতে পারা এবং লিখতে পারার প্রতিও শিক্ষার্থীরা তাগিদ অনুভব করে, আগ্রহী থাকে। তাতে শিক্ষার্থীদের কাজ করার দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেখে/শুনে/পড়ে বুঝার, বলার ও লেখার যোগ্যতা অর্জিত হবে, দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।<  


মো. রহমত উল্লাহ্ 

সাহিত্যিক, শিক্ষাগবেষক এবং অধ্যক্ষ- কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

২১ অক্টোবর ২০২৩



https://epaper.dainikbangla.com.bd/home/displaypage/news_2023-10-24_5_15_b

সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক চাই

 পত্রিকার লিংক

*সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক চাই*

দৈনিক বাংলা, ১২ অক্টোবর ২৩

মো. রহমত উল্লাহ্

>স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন আমরা রচনা করেছি সেটি বাস্তবায়ন করার জন্য স্মার্ট নাগরিক অত্যাবশ্যক। দেশের মাটি নয়; মানুষ স্মার্ট হলেই স্মার্ট হবে দেশ।

পোশাকে নয়; চিন্তায়, চেতনায় ও কর্মে স্মার্ট হলেই স্মার্ট হবে মানুষ। কর্মে স্মার্ট হবার জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে হতে হবে পটু। অন্যভাবে বলা যায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষের সাথে সাথে দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি ও কর্মক্ষেত্রের জন্য যে যত বেশি যোগ্য হবে তাকেই তত বেশি স্মার্ট ধরা হবে। স্মার্ট মানুষের অবশ্যই থাকতে হবে অভিযোজন যোগ্যতা। তেমন অধিকযোগ্য মানুষ তৈরির জন্যই প্রয়োজন সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক। তা না হলে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রভাবে দ্রুত পরিবর্তনশীল নতুন নতুন কর্মক্ষেত্রে এসে আমাদের শিক্ষার্থী তথা নাগরিকরা প্রত্যাশিত স্মার্টনেস বা যোগ্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হবে এবং প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়বে। 


শিক্ষকতা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল কর্ম। সকল পেশার মানুষ তৈরি করেন শিক্ষক। এজন্যই তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয়। শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপরই নির্ভর করে অন্যান্য পেশার মানুষ কতটা যোগ্য ও দক্ষ হবেন। যে দেশের শিক্ষক যত বেশি যোগ্য ও দক্ষ সে দেশের সকল পেশার মানুষ তত বেশি যোগ্য ও দক্ষ। একজন কম যোগ্য শিক্ষক সারা জীবনে তৈরি করেন অগণিত অযোগ্য নাগরিক। বিপরীত ক্রমে একজন অধিক যোগ্য শিক্ষক সারা জীবনে তৈরি করেন অগণিত সুযোগ্য মানুষ।


সর্বাধিক মেধাবীদেরই সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক হবার সম্ভাবনা সর্বাধিক। কম মেধাবীদের প্রশিক্ষণ দিয়েও কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করা সম্ভব হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। উত্তম শিক্ষক হবার জন্য উত্তম মেধাবী হওয়ার পাশাপাশি আইসিটিতে ও সহশিক্ষায় পারদর্শী হওয়াসহ আরো অনেক উত্তম গুণের অধিকারী হতে হয়। থাকতে হয় যোগ্যতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার, দীক্ষা দিয়ে শিষ্যে পরিণত করার, গুণের পরশে গুণান্বিত করার, প্রেষণা দিয়ে উজ্জীবিত করার, সুশিক্ষা দিয়ে সুযোগ্য করার ও আদর দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মতো দক্ষতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি।


অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে আমরা অনেকেই তা অনুধাবন করতে পারছি না। আমরা কম যোগ্য শিক্ষক দিয়ে সকল কাজের জন্য অধিক যোগ্য মানুষ গড়তে চাইছি। বাস্তবে তা কখনোই সম্ভব নয়। তাই সর্বাধিক মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করা অত্যাবশ্যক। অথচ সর্বাধিক মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য আমাদের বাস্তব পদক্ষেপ মোটেও সন্তোষজনক নয়। সেই আদিকালের গুরুদের মতই কিছু না নিয়ে শুধু নিজেকে উজাড় করে দিবেন একজন শিক্ষক এমন মানসিকতা পোষণ করে বসে আছি এখনো। আমরা ভাবি না যে, অন্যান্য পেশাজীবীদের মতই শিক্ষকদেরও আছে পরিবার-পরিজন। তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্যও প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, সামাজিকতা, আনন্দ-উৎসব ইত্যাদির।


দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা অন্যান্য পেশাজীবীর তুলনায় অত্যন্ত কম থাকায় শিক্ষকতায় আসছেন না ও থাকছেন না অধিক মেধাবীরা। যারা সরকারি চাকরির জন্য বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তাদের পছন্দক্রমের তলানিতে থাকে শিক্ষকতা। আর যারা বেসরকারি শিক্ষক হতে আসেন তাদের প্রায় সবারই সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হয় এটি। যতক্ষণ বয়স থাকে ততক্ষণ তারা চেষ্টায় থাকে অন্য পেশায় যাওয়ার। অর্থাৎ অধিকাংশরাই অনিচ্ছায় বা কমিচ্ছায় শিক্ষক। তাইতো আমাদের দেশে আজ মনে-প্রাণে শিক্ষকের বড়ই অভাব। মনে-প্রাণে শিক্ষক হচ্ছে, চিন্তায় চেতনায় ধ্যানে জ্ঞানে মননে শিক্ষক। ছোটবেলা থেকে শিক্ষক হবার ইচ্ছায় শিক্ষক। নিজের ও মা-বাবার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষক। শিক্ষক হবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষক। শুধুমাত্র শিক্ষকতার জন্য শিক্ষক। তেমন শিক্ষক ব্যতীত সফল শিক্ষা সম্ভব নয়। 


বর্তমান যুগের চৌকশ শিক্ষার্থীদের সফল পাঠদানের মাধ্যমে বিশ্বমানের সুযোগ্য মানুষে পরিণত করার জন্য আধুনিক শিক্ষা সামগ্রী, বহুতল ভবন ও নতুন শিক্ষাক্রম যেমন প্রয়োজন এর চেয়েও অধিক প্রয়োজন সার্বিক বিবেচনায় সর্বাধিকযোগ্য শিক্ষক। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে যেকোনো মূল্যে সর্বাধিক যোগ্যদের আকৃষ্ট করতে হবে শিক্ষকতায়।<


মো. রহমত উল্লাহ্

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ - কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

rahamot21@gmail.com