ভাল বই-ই হওয়া উচিত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পুরস্কার। দৈনিক শিক্ষা, ৩১ জানুয়ারি ২০১৯


মূল পত্রিকার লিংক

মো. রহমত উল্লাহ্‌ | দৈনিক শিক্ষা,  ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯


Md. Rahamot Ullah

বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ দেয়া হয়। এই আদেশ পালনের ক্ষেত্র দেশব্যাপী ভিন্ন ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। যেমন:

১। বেশির  ভাগ  আদেশ বিলম্বে পাওয়ায় অধিকাংশ  প্রতিষ্ঠানই তা দায়সারা ভাবে পালন করে। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতার আয়োজনই করে না।



২। প্রতিযোগিতায় পুরস্কার প্রদান করা হবে কি না; কিংবা কী ধরনের পুরস্কার প্রদান করা হবে, তার কোন সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আদেশে থাকে না। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, অনেক শিক্ষা প্র্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাদিবস/ স্বাধীনতাদিবস/ শিশুদিবস/ শোকদিবস/ বিজয় দিবসে ক্রোকারিজ পুরস্কার দিচ্ছে। স্কুল, কলেজ, মাদরাসায় বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী ও বিভিন্ন ইসলামিক বই পুরস্কার দিচ্ছে। এ সকল বইয়ের মাধ্যমে জঙ্গিবাদের প্রচার হচ্ছে কিনা তা তদারকিও হচ্ছে বলে মনে হয়  না।

যথেচ্ছ ও যেনতেনভাবে অনুষ্ঠান করে বা না করে জাতীয় দিবস  উদযাপনের ফলে ভাব-গাম্ভীর্য বজায় থাকছে না এবং এর মর্মার্থ  শিক্ষার্থীদের অনুধাবন করানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, শিক্ষার্থীদের এ সম্পর্কিত শিক্ষা পূর্ণতা পাচ্ছে না। অর্থাৎ যে উদ্দেশ্য সাধারণ  শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা হচ্ছে, সে উদ্দেশ্য বাস্তবে ততটা সফল হচ্ছে না।

এমতাবস্থায় জাতীয় দিবস উদযাপন বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে প্রতিযোগিতার আয়োজন ও পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা থাকা আবশ্যক। যেমন: মাতৃভাষা দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে ভাষা আন্দোলন ও তৎসংশ্লিষ্ট বই, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ইতিহাস ও তৎসংশ্লিষ্ট বই, শিশু দিবস ও শোক দিবস উদযাপন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবনী ও তৎসংশ্লিষ্ট বই উপহার দেয়ার জন্য  আদেশ দেওয়া উচিত।

তদুপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিযোগিতা এবং অন্যান্য সকল প্রতিযোগিতাই পুরস্কার হিসেবে বই প্রদানের জন্য  সরকারি ও বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেওয়া উচিৎ বিশেষ উৎসাহ। একমাত্র ভাল বই-ই হওয়া উচিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পুরস্কার ও উপহার । এতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বেশি বেশি বই পাবে, বেশি বেশি বই পড়বে এবং  বিক্রি হবে বেশি বেশি বই। সচ্ছল হবে লেখক ও প্রকাশক। জ্ঞানে-গুনে সমৃদ্ধ হবে জাতি ।

লেখক : অধ্যক্ষ , কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা


প্রাইভেট কোচিং বন্ধের উপায় কী? দৈনিক শিক্ষা, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯

        মূল পত্রিকার লিংক

প্রাইভেট কোচিং বন্ধের উপায় কী?
মো. রহমত উল্লাহ্ |
দৈনিক শিক্ষা, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯

আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের অপরিহার্যতা সবাই স্বীকার করলেও অতীতে এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার তা নিয়েছে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনুকূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এই যে সারা দেশে অনলাইনে সব ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, একই দিনে বই বিতরণ, একই দিনে ক্লাস শুরু, একই রুটিনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ, অতি স্বল্পতম সময়ে কাগজবিহীন ফলাফল প্রকাশ, এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানা ও উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ন, মোটের ওপর একটা উদ্যম-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে-  এ সবকিছুই  বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছেন শিক্ষক সমাজ।







শিক্ষকরা তাদের অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে কাজ করেছেন ও করছেন সরকারের গৃহীত অনুকূল পদক্ষেপ বাস্তবায়নে। অন্যথায় এই সফলতাটুকু অর্জন সম্ভব ছিল না মোটেও। আর এই শিক্ষকদের ৯৭ ভাগ হচ্ছেন বেসরকারি। তাদের প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় সংসার চলে না- এটি এখন সবাই জানেন ও বোঝেন। শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানোর জন্য।



তাই তাদের যোগ্যতানুসারে বেছে নিয়েছেন ওভারটাইম আয়ের রাস্তা। কেউ প্রাইভেট পড়াচ্ছেন, কেউ নোট-গাইড লিখছেন, কেউ ঠিকাদারি, কেউ জমির ব্যবসা, কেউ রাজনীতি ব্যবসা, কেউ আবার দোকানদারি করছেন, কেউ বাবার/স্বামীর ধন খাচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব খাতের আয়ের ওপর যেহেতু তাদের জীবনধারণ করতে হচ্ছে সেহেতু তারা এডিশনাল কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে কাজেই বেশি সময়, শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকতায় তাদের মনোযোগ না থাকা বা কম থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াই বাস্তব। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট বা কোচিং না করে শিক্ষার্থীরা পারবে কীভাবে? তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চেয়ে যারা প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তারা তো ব্যক্তিগতভাবে হলেও শিক্ষকতাই করছেন। নিজের পাঠদানের বিষয়টি নিয়মিত চর্চা করছেন কমবেশি। অন্যরা তো তা-ও করছেন না।

এই প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেনি বলেই হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত নমনীয় নীতি নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের কথা বলে বলে শেষমেশ যে নীতিমালা জারি করেছেন তাকে পরোক্ষ অনুমোদনই বলছেন কেউ কেউ। [যেমন : শিক্ষকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের ১০ জনের বেশি পড়াতে পারবেন না। নিজের শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিষয় শহরে ৩০০, উপশহরে ২০০, গ্রামে ১৫০ টাকা হারে; তবে সর্বমোট অনধিক ১২০০ টাকায় সব বিষয় পড়াতে পারবেন অভিভাবকদের সম্মতিসাপেক্ষে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শাস্তি পাবেন। একটি বিশেষ কমিটি তা মনিটরিং করবে।

এসব পদক্ষেপের ফলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে, আগে তো কেবল কঠিন বিষয়ে কোচিং হতো এখন হবে সব বিষয়ে। কারণ দুয়েক জন শিক্ষক কোচিং ফি পাবেন আর অন্যরা পাবেন না তা তো হবে না। তাই পরীক্ষায় ফেল করিয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করাতে পারেন অতি সহজ বিষয়ের জটিল স্যাররাও।

অপরদিকে নিজের বাসায় বসে বা শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে কোন শিক্ষক কখন কতজন কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তা মনিটর করা আমাদের জন্য দুরূহ কাজ। আমরা তো এখনও আমাদের নিত্যদিনের ওপেন ও প্যাকেট খাবারগুলোই ভেজাল এবং ফরমালিনমুক্ত করতে পারছি না। প্রকাশ্যে সদর রাস্তায় চলা মিটারবিহীন অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব বন্ধ করতে পারছি না। সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে চেষ্টাও করছি না।

অথচ কোথায় কোন গ্রামেগঞ্জে, শহরে কোন ঘরে বসে বা অন্যের ঘরে গিয়ে কবে কখন সকাল-বিকেল রাতে কোন প্রতিষ্ঠানের কতজন শিক্ষার্থীকে কোন প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তা খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন আর প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ হবে এমনটি অবাস্তব নয় কী? আসলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সঠিকভাবে পড়াচ্ছেন কি না, তদারকি করা প্রয়োজন সেটি। তা না করে কমিটি বাসাবাড়িতে যেয়ে তদারক করবে শিক্ষকরা সরকারি নিয়ম মেনে প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন কি না। এ যেন ‘চোখের অপারেশন পায়ে’।

একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে অনেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য হয়তো বাসায়ই নিয়োগ দেওয়া আছে একাধিক টিচার। বিশেষ করে নামকরা টিচার ও কোচিং-সেন্টারের আশেপাশের রাস্তায় যেসব দামি দামি গাড়ির ভিড় লেগে থাকে সেগুলোর অধিকাংশই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিদের ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিদের। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যাদের দিয়ে এই প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য বন্ধের তদারকি করানো হবে তাদের কারও সন্তানও যে প্রাইভেট পড়েনি, পড়ছে না এবং পড়বে না, তা নিশ্চিত করবে কে? বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা প্রাইভেট-কোচিং করানো বন্ধ করতে বাধ্য হলেও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিং না করে পারবে না। কারণ শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত। ফলে অশিক্ষকের কাছ থেকে প্রাইভেট-কোচিং নিতে বাধ্য হবে শিক্ষার্থীরা। অশিক্ষকদের তো আর শাস্তি নেই। সে হবে আরও বেশি ক্ষতির কারণ।

আবারও বলছি, দীর্ঘ অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের প্রয়োজনেই চলছে এই প্রাইভেট-কোচিং। কিন্তু এভাবে তো আর চলতে পারে না। শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকায় ভর্তি হবে, বেতন-ফি পরিশোধ করবে, আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোচিং ক্লাস করে রিকভার করতে বাধ্য হবে নির্ধারিত ক্লাসের ঘাটতি পড়া! সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ পাঠদান করাই তো শিক্ষকদের চাকরি। কিন্তু শিক্ষকরা এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করছেন কি না তা তদারক করার জন্য কমিটি না করে, করা হল প্রাইভেট-কোচিং তদারকি কমিটি।

একজন শিক্ষক দৈনিক কত ঘণ্টা প্রতিষ্ঠানে থাকবেন, কত ঘণ্টা থাকছেন তার কি কোনো হিসাব নেওয়া হয়? আমার জানা মতে, এমনও শিক্ষক আছেন যারা ঢাকা শহরে বাসাবাড়িতে থেকে চাকরি করছেন অন্য জেলার সরকারি-বেসরকারি কলেজে। সপ্তাহে যাচ্ছেন ৩-৪ দিন। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস নিচ্ছেন দিনে দুয়েকটি মাত্র। তাদের মাসিক কর্মঘণ্টা  ৮/১০/১৬/২০ ঘণ্টার। শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণি আছে এমন কলেজের একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন চল্লিশ মিনিটের দুটি করে ক্লাস সপ্তাহে ছয় দিনই নেন তবুও তার মাসিক কর্মঘণ্টা হবে সর্বোচ্চ ৩২ ঘণ্টা। এর বাইরে হয়তো কিছু পরীক্ষা নেওয়া আর খাতা দেখা। দৌড়ে এসে ক্লাস আবার ক্লাস শেষ হলেই দৌড়। এক কাজ থেকে এসে আবার ছুটছেন অন্য কাজে। পত্রপত্রিকা পড়ার সময় এবং ধৈর্য্যও নেই অনেকেরই। গবেষণা তো দূরের কথা। শিক্ষকরা এমন হলে শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? কমবেশি একাদশ শ্রেণির ১২০ এবং দ্বাদশ শ্রেণির ১২০ জনসহ মোট ২৪০ শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র  একজন করে  বাংলা  ও  ইংরেজি শিক্ষক যথেষ্ট কি না তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থা থেকে বের হতে হলে অবশ্যই বাড়াতে হবে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা এবং সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে কর্মঘণ্টা। শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেন আর না থাকে ক্লাসের বাইরে ক্লাসের বিষয় পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা। তা না হলে বন্ধ করা সম্ভব হবে না এই প্রাইভেট-কোচিং।

লেখক : শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ,  কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ,  ঢাকা।


ক... করে ওঠে কাক

ক... করে ওঠে কাক


মো. রহমত উল্লাহ্‌


আলো ঝলমল বিকাল বেলা। গ্রামের পথে হাঁটছে তিনজন। রাকিব, সাকিব ও লুহাম। খেলতে যাবে সবুজ পাহাড় মাঠে। গুড়ুম করে আওয়াজ হয় বিদ্যুতের তারে। চোখে লাগে আগুনের ঝিলিক। ঝপ করে নিচে পড়ে একটি কাক। কা কা, কা কা! ডেকে উঠে কয়েকটি কাক। কা কা করে আসতে থাকে আরও। ডাকতে থাকে কর্কষ গলায়। বাড়তে থাকে কা কা, কা কা! আসতে থাকে আরো কাক। কা, কা, কা! বাড়তে থাকে ডাকাডাকি। বাড়তে থাকে ছুটাছুটি। যেনো কাকদের প্রতিবাদী মিছিল। ভয়ে দৌড়ে পালায় রাকিব ও সাকিব। তবে পালায় না লুহাম। সে ছুটে যায় সেই কাকের কাছে। দেখে, মাটিতে পড়ে আছে কাক। অপলক তাকিয়ে থাকে কাকের দিকে। ভাবে, কী করা যায়?


কাকের কাছে বসে লুহাম। হাতে তুলে নেয় কাকটিকে। কঠিন হয়ে আছে কাকের শরীর। নড়াচড়া করে না মোটেও। কালো চোখ যেন পাথর। কুঁকড়ে আছে পায়ের আঙুল। বাঁকা হয়ে আছে ছাই রং ঘাঁড়। হা হয়ে আছে দুটি ঠোঁট। লাল দেখা যায় মুখের ভিতর। পাখা ও লেজ হয়ে আছে এলোমেলো । যেনো, ছেঁড়া ছাতার কালো কাপড়। মনেহয়, আর বেঁচে নেই কাক! কারণ বুঝতে পারে লুহাম। বিদ্যুৎ শকেই এমন হয়েছে কাকের। ভাবে, কী করা যায়? কী করা যায় এখন?


একটা দৃশ্য মনে পড়ে লুহামের। একদিন সে খেলা দেখছিল টিভিতে। চলছিল তার প্রিয় ফুটবল খেলা। আহত হয়েছিল এক খেলোয়াড়। মাঠে পড়েছিল এই কাকের মতই। একজন এসে চাপল তাঁর বুক। বাঁকা ও সোজা করল হাত-পা। বার বার করল এপাশ ওপাশ। শেষে বেঁচে গেল সেই খেলোয়াড়। মনে মনে কথা বলে লুহাম। হ্যাঁ, এখন তাই করব আমি।


কাকের বুকে হালকা চাপ দেয় লুহাম। চাপ দেয় সারা শরীরে । বাঁকা, সোজা করে পা। টানে ঠোঁট ও পাখা। হালকা চাপড় দেয় কাকের পীঠে। এসব করতে থাকে বার বার। একসময় ক… করে ওঠে কাক। নড়ে ওঠে কাকের চোখ। কিছুটা টান করে পা। সামান্য নাড়ায় পাখা। খুশিতে মন ভরে ওঠে লুহামের।  মুখে ফুটে ওঠে হাঁসির রেখা। বুকে জাগে আশার আলো।


এবার অন্যদিক খেয়াল করে লুহাম। দেখে, সাথে নেই রাকিব ও সাকিব। উড়াউড়ি করছে কাকের দল। কর্কষ গলায় করছে কা কা। ছুটছে মাথার সামান্য উপর দিয়ে। উড়ছে গায়ের খুব কাছ দিয়ে। যেনো এখনই ঠোঁকর দিবে মাথায়! খামছি দিবে গায়ে! তবুও ভয় পায় না লুহাম। রাগ করে না কাকদের উপর। ভাবে, কাকেরা অনেক ভাল। একের বিপদে এগিয়ে এসেছে সবাই।<


[শিশুদের উপযোগী এই গল্পটিতে ৪ বর্ণের অধিক কোন শব্দ নেই, ৬ শব্দের অধিক কোন বাক্য নেই, কোন শব্দে যুক্ত বর্ণ নেই।]


মো. রহমত উল্লাহ্

অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকাবিদ্যালয়ওকলেজ

তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা


+8801711147570

[১৪ জানুয়ারি ২০১৯, মোহাম্মদপুর, ঢাকা]

বই উৎসবের বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়- ভোরের কাগজ- ১৫ জানুয়ারি ২০১৯

বই উৎসবের বাস্তবতা ও আমাদের করণীয়

মো. রহমত উল্লাহ্

দেশের প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই তুলে দেয়া শেখ হাসিনা সরকারের এক বিরাট সাফল্য। অনেক সফলতার অন্যতম এটি। সরকারি, বেসরকারি, প্রাইভেট, সাধারণ স্কুল, কেজি স্কুল, এনজিও স্কুল, মাদ্রাসা, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, গ্রাম, শহর, উপশহর, ধনী, দরিদ্র, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই বিনামূল্যে পাচ্ছে সরকারি বই। এটিই কল্যাণ রাষ্ট্রে ধারণা। সমালোচকরা যাই বলুক, সারা বিশ্বে এটি একটি গণকল্যাণমুখী অনন্য উদাহরণ। যা গত দশ বছর ধরে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে চলমান।

বিনামূল্যের বই বিতরণের জন্য প্রতি শিক্ষাবর্ষের শুরুতে জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে সারাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করা হয় বই উৎসব। সত্যিই এটি খুব আনন্দের বিষয়। কেননা এই বই উৎসব আমাদের পহেলা বৈশাখের চেয়েও অধিক সর্বজনীন উৎসব। কিন্তু এর বাস্তবতায়ও রয়েছে দুয়েকটি কষ্টের বিষয়। পর্যাপ্ত বই থাকার পরও জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে সবার হাতে হাতে বই তুলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এর কয়েকটি কারণ বিদ্যমান।

প্রথমত, যেসব শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষায় পাস করে না, সঙ্গত কারণেই তাদের উপরের ক্লাসের বই দেয়া হয় না এবং তারা পরবর্তী সময় বিশেষ বিবেচনায় বা তদবিরে প্রমোশন পাবে এই আশায় নিচের ক্লাসের বই নিজেরাই নেয় না। প্রথম দিন বই পায় না বিধায় তারা বই উৎসবের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। এ কষ্ট নিয়ে তারা প্রতিষ্ঠানেই আসে না প্রথম দিন। কেউ এলেও প্রমোশন না পাওয়ায় তাকে উপরের ক্লাসের বই দেয়া সম্ভব হয় না। এদের সংখ্যা কিন্তু কম নয়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থীর শতকরা প্রায় ১০ ভাগ শিক্ষার্থী বার্ষিক পরীক্ষায় ফেল করে থাকে। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সোয়া চার কোটি। কম করে হলেও এই চার কোটি শিক্ষার্থীর ১০ ভাগ ৪০ লাখ। এই ৪০ লাখ শিক্ষার্থী প্রথম দিনে বই না পেলেও নতুন বই প্রাপ্তির আনন্দ থেকে শেষমেশ তারা বঞ্চিত হয় না। কিছুদিন পরই তারা তাদের নির্ধারিত শ্রেণির বই পেয়ে যায়।

তবে পয়লা দিনে তাদের মনে থেকে যায় নতুন ক্লাসে প্রমোশন না পাওয়ার ও নতুন বই হাতে না পাওয়ার দুটি কষ্ট। সেদিন এই বিজিতদের হাতে হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে উৎসবের আনন্দে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার কোনো উপায় এখনো বিদ্যমান নেই।

দ্বিতীয়ত, নতুন বছরের সেশন চার্জ দিয়ে ভর্তি নিশ্চিত না করলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বই দিতে চায় না। কেননা বার্ষিক পরীক্ষায় যারা অতি উত্তম রেজাল্ট করে এবং যারা ফেল করে তারা উভয়েই অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং অনেকেই যায়। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই বাস্তবতা বিদ্যমান। বই নিয়ে শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে গেলে এবং সেই প্রতিষ্ঠান থেকে আরেক সেট বই নিলে সে বইয়ের হিসাব মিলাতে বেকায়দায় পড়তে হয় প্রতিষ্ঠান প্রধানদের।

কেননা কিছুদিন পর যখন শ্রেণিভিত্তিক ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের নামের তালিকাসহ বইয়ের হিসাব চায় সরকার তখন আর উপায় থাকে না। এ ছাড়া যে শিক্ষার্থী পিইসি বা জেএসসি পাস করে সরকারি সনদ লাভ করে, সে সেই সনদ দিয়ে যে কোনো যথাযোগ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভর্তি হতে পারে।

এমতাবস্থায় প্রতি বছর প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পিইসি ও জেএসসি পাস করে আসা লাখ লাখ শিক্ষার্থী যদি মাধ্যমিক স্তরের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের আগে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি না হয় এবং যারা পাস করে না তারাও যদি জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৫ম শ্রেণিতে পুনরায় ভর্তি না হয়; তো ১ তারিখের বই উৎসবে তাদের হাতে হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার উপায় কী? ২০১৮ সালে যাদের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫৫ জন।

অনুরূপভাবে যে লাখ লাখ শিক্ষার্থী প্রতি বছর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা পাস করে শিক্ষা বোর্ডের সনদ লাভ করে এসএসসি পাসের মতোই স্বাধীন হয়ে যায় তারা যদি জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি না হয় এবং যারা পাস করে না তারাও যদি জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের ৮ম শ্রেণিতে পুনরায় ভর্তি না হয়; তো তারা ১ তারিখের বই উৎসবে বই পাবে কীভাবে? ২০১৮ সালে যাদের সংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ২৯ হাজার ২৪১ জন।

তৃতীয়ত, অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যারা আর্থিক অনটনের কারণে শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন-ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করতে পারে না। তারা সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন যে, জানুয়ারি মাসে ভর্তি ও সেশন ফি বাবদ কিছু টাকা আয় হলে সামান্য বেতন-ভাতা পাবেন। তাই তারা নির্ধারিত সেশন ফি জানুয়ারি মাসের আগেই দিয়ে দিতে বলেন এবং নতুনদের ভর্তি হতে বলেন।

কিন্তু অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক তা করেন না বিধায় শিক্ষকরা জানুয়ারির ১ তারিখে সবাইকে বই না দিয়ে ভর্তি/সেশন ফি আদায় করে দুয়েকদিন পর বই দিতে চান। কেননা শিক্ষার্থীরা নতুন বই হাতে পেয়ে গেলে দেনা পরিশোধে অভিভাবকরা চরম অনীহা দেখান। সব অভিভাবক যে অভাবের কারণে এমনটি করে থাকেন তা নয়।

একেকজন একেক রকম ক্ষমতা খাটিয়েও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের টাকা না দেয়ার সুযোগ নিয়ে থাকেন এবং একাধিক সেট বইও নিয়ে থাকেন কেউ কেউ। ফলে প্রাপ্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হন শিক্ষক-কর্মচারী। বইয়ের সঠিক হিসাব দিতে পারেন না শিক্ষকরা। হাতেগোনা কিছু নামিদামি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থাই এমন।

সরকারি বই আটকে রাখার কোনো অধিকার শিক্ষকদের নেই এবং শেষমেশ তারা তা আটকে রাখেন না। উল্লিখিত তিনটি বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের বই উৎসবে কম-বেশি ৯০ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দিতে পারেন না শিক্ষকরা। ফলে তারা বঞ্চিত হয় বই উৎসবের আনন্দ থেকে। তবে কয়েকদিন পরই ভর্তিকৃত সবাইকে দিয়ে দেন তাদের প্রাপ্য বই। এতে যথাযথ হয় সরকারি বইয়ের বণ্টন ও রোধ হয় সরকারি সম্পত্তির অপচয়।

তা না হলে বিনামূল্যে সরকারি বই নিয়ে সের দরে বিক্রি করবে লাখ লাখ ঝরে পড়া শিক্ষার্থী। যার হার প্রাথমিক স্তরে প্রায় ২০% এবং মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৪০%। আর এ কারণেই নির্ধারিত শ্রেণিতে ভর্তি নিশ্চিত না করে কাউকেই বই দেয়া উচিত নয়। ‘জানুয়ারি মাসের ১ তারিখের বই উৎসবেই সবাই বই পাবে। তা না হলে শিক্ষকদের শাস্তি হবে।’ এমন অবাস্তব বক্তব্য দেয়া ও কঠোর অবস্থান নেয়ার আগে উল্লিখিত বাস্তবতাগুলো অনুধাবন করা সবারই দায়িত্ব।

শিক্ষকরাও এই সমাজেরই মানুষ। সবদিক বিবেচনায় জানুয়ারি মাসের ৫ তারিখে করা যেতে পারে এই বই উৎসব। অথবা ১ জানুয়ারি উদ্বোধন করে ১ সপ্তাহ হতে পারে শিক্ষার্থীদের বই বিতরণ উৎসব। তা না হলে নেয়া যেতে পারে আরো অধিক যুক্তিযুক্ত কোনো পদক্ষেপ। এককথায় সরকারি বই বতরণের ক্ষেত্রে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে আলোচিত সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে একটা সুষ্ঠু নীতিমালা থাকা এবং তা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবার জানা থাকা একান্ত আবশ্যক।

মো. রহমত উল্লাহ্ : লেখক এবং অধ্যক্ষ কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।



উপ-সম্পাদকীয়- মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক -সাক্ষরতা বুলেটিন- নভেম্বর ২০১৭

উপ-সম্পাদকীয়- মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক -সাক্ষরতা বুলেটিন- নভেম্বর ২০১৭

মানসম্মত শিক্ষার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক

মো. রহমত উল্লাহ্

>সুশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সবার আগে চাই সুযোগ্য শিক্ষক। কেননা অন্যান্য উপাদান ও উপকরণ সঠিক থাকলেও ভালো শিক্ষক না থাকলে ভালো শিক্ষা অসম্ভব। একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় বই, খাতা, কলম, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়াসহ অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ, সুসজ্জিত শ্রেণিকক্ষ, অনলাইন পাঠাগার, ডিজিটাল বিজ্ঞানাগার, ইত্যাদি অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেও শুধু ভালো শিক্ষক দেয়া না হলে তার পক্ষে সঠিক শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব নয়। একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও মেধার সঠিক সমন্বয় ঘটিয়ে সুপ্ত প্রতিভাকে সযত্নে জাগিয়ে লালন-পালনের মাধ্যমে তাকে অধিক কর্মক্ষম করে তোলা শিক্ষকের প্রধান কাজ। এ কাজ অত্যন্ত জটিল। শিক্ষার্থীভেদে বিচিত্র মনমানসিকতা অনুধাবন করে একেকজনকে একেক কৌশলে আয়ত্ত করাতে হয় শিক্ষার বিষয়। শিক্ষা হচ্ছে 'শিক্ষার্থীর আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন'। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর মনোযোগ আকর্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকের বিভিন্নমুখী যোগ্যতা ও দক্ষতা যত বেশি হবে শিক্ষার্থীরা তার প্রতি তত বেশি শ্রদ্ধাশীল হবে, আকৃষ্ট হবে, মনোযোগী হবে। সফল হবে শিক্ষণ-শিখন প্রক্রিয়া। অধিক লাভবান হবে শিক্ষার্থী।

অথচ আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকের আর্থিক-অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা কম ও নিয়োগে দুর্নীতির কারণে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সত্যিকার মানসম্পন্ন শিক্ষকের খুবই অভাব। ফলে পরীক্ষার ফল ভালো হলেও শিক্ষার মান তুলনামূলক কম। প্রকৃত শিক্ষক হওয়ার মতো ভালো রেজাল্ট, জ্ঞান, মেধা, পাঠাভ্যাস, সততা, ধৈর্য্য, নীতি-আদর্শ, দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা, আচার-আচরণ, চলন-বলন নেই এমন অনেকেই আজ আমাদের শিক্ষক। তারা শিক্ষক হয়েও স্বভাবে বা অভাবে যুক্ত শিক্ষাবহির্ভূত কর্মে। ক্লাস ফাঁকি দিতে, অধিক নাম্বার দিতে, প্রশ্ন ফাঁস করে দিতে, বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা নিতে, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে শিক্ষার্থীদের অপব্যবহার করতে তাদের অনেকেরই বিবেকে বাধে না। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এদের সংখ্যা তুলনামূলক অনেক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে বাঙালি জাতির মূল চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুসারে দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার মতো সৎ, যোগ্য, দক্ষ, ন্যায়নীতিপরায়ণ সুনাগরিক তৈরির উপযোগী সর্বজনীন কোনো শিক্ষানীতি না থাকা এবং বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত বিভিন্ন রকম সরকারি পরিপত্র এর জন্য বহুলাংশে দায়ী। যেমন ১৯৯৫ সালের আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হওয়ার জন্য নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী কল্যাণকর কোনো সুষ্ঠু নীতিমালই ছিল না। ২৪ অক্টোবর, ১৯৯৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত (নাম্বার-শি.ম./শা. ১১/বিবিধ-৫/৯৪/অংশ-৬/৩৯৪) পরিপত্রে শিক্ষক হওয়ার নূ্যনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল_ 'সকল পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণি'। কিন্তু ১৬ জানুয়ারি, ১৯৯৬ সালে অন্য একটি পরিপত্রের দ্বারা (নাম্বার-শি.ম./শা. ১১/বিবিধ-৫/৯৪/১২) সিদ্ধান্তটির স্থগিতাদেশ জারি করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শুভবুদ্ধির পুনরুদয় হলে ৩১ আগস্ট, ২০০০ সালে (নাম্বার-শি.ম./শা.১১/৫/৯৪/৭৩১/১৯ নাম্বার পরিপত্রের দ্বারা) ওই স্থগিতাদেশটি প্রত্যাহার করে নেয়। ২০০৩ সালের ২ এপ্রিল আবার শিক্ষা মন্ত্রণালয় (নাম্বার-শি.ম./শ.১১/৬/২০০২/৩৪৭/১৩ নাম্বার পরিপত্রের মাধ্যমে) ঘোষণা করে যে, 'বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে একজন প্রার্থীর সমগ্র শিক্ষাজীবনে অনধিক একটি তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণি গ্রহণযোগ্য হবে'। অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সালে জারিকৃত (নাম্বার-শি.ম./শা.১৩/এম.পি.ও.-১২/২০০৯/৭৫ নাম্বার) পরিপত্রেও তা বহাল রাখা হয়েছে। ফলে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, শুধু ২৪ অক্টোবর, ১৯৯৫ থেকে ১৫ জানুয়ারি, ১৯৯৬ এবং ৩১ আগস্ট, ২০০০ থেকে ১ এপ্রিল, ২০০৩ এ কদিন কমিটি/গভর্নিং বডি ইচ্ছা করলেও থার্ড-ক্লাস শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেনি। তা ছাড়া সর্বদাই সুযোগ ছিল এবং এখনো সুযোগ রয়েছে তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্ত 'আদু ভাই'দের শিক্ষক হওয়ার। অথচ অন্যান্য কম গুরুত্বপূর্ণ এমনকি ছোট-বড় প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রেও এখন আর এ সুযোগ নেই। তৃতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্ত 'আদু ভাই'দের শিক্ষক হওয়ার সুযোগ সরকার না দিলে নিয়োগের দুর্নীতিটাও থার্ড-ক্লাস পর্যায়ে নামতে পারত না।
একজন অযোগ্য শিক্ষক সারা জীবন তৈরি করে অসংখ্য অযোগ্য নাগরিক, যা দেশ ও জাতির জন্য সীমাহীন অকল্যাণ। আমাদের দেশে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করে বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায়। যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির প্রয়োজনেই বিশেষ নজর দেয়া উচিত সেখানে। বিশেষ করে গ্রামে অবস্থিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে। শহরের তুলনায় গ্রামে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থার্ড-ক্লাস ও অযোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। সুশিক্ষার অধিকার থেকে অধিক বঞ্চিত গ্রামবাংলার শিক্ষার্থীরা।
দেশ-জাতির অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার যুক্তিতেই বিভিন্ন চাকরি ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে কোটা। শিক্ষক নিয়োগে এর হার সর্বাধিক। এমনকি এ কোটা পূরণের জন্য শিথিল করা হচ্ছে মেয়েদের শিক্ষাগত যোগ্যতা! অথচ গভীরভাবে ভেবে দেখা হচ্ছে না এর ফল। অন্যান্য চাকরি ক্ষেত্রে যা-ই হোক, জাতি গঠনের কারিগর 'শিক্ষক' নিয়োগের ক্ষেত্রে গভীরভাবে ভেবে নেয়া দরকার এ কোটা সংরক্ষণের সুফল-কুফল। সরকার একদিকে বলছে নতুন শিক্ষানীতি অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষার স্তর হবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, অন্যদিকে সেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য নিয়োগ দিচ্ছে মাত্র এসএসসি পাস শিক্ষক! কোনো পর্যায়েই এখন আর যোগ্যতার প্রশ্নে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে।
এ ছাড়াও সুদূরপ্রসারী কোনোরূপ সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও অধিক কল্যাণকর নীতিমালা ছাড়াই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাময়িক স্বার্থে রেজিস্ট্রিকৃত প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করার কারণে এবং যত্রতত্র যেনতেনভাবে গড়ে ওঠা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা এমপিওভুক্ত করার কারণে এবং এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান সরকারি করার কারণে দেশের জনগণের টাকায় সরকারি সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষকসমাজের মূল স্রোতে যুক্ত হয়ে পড়েছে অনেক অযোগ্য শিক্ষক। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, একটি উন্নত শিক্ষানীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরুর পরেও থেমে নেই এসব অশুভ/অকল্যাণকর পদক্ষেপ। ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রি করা, এমপিওভুক্ত করা, সরকারি করা হোক তা আমিও চাই। কিন্তু তার আগে দেখে নেয়া হোক সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির অবস্থা ও অবস্থান। সেখানে বিদ্যমান জমির পরিমাণ কতটুকু। তাতে নিশ্চিত করা যাবে কিনা খেলার মাঠ, সবুজ বনায়ন, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস এবং নির্মাণ করা যাবে কিনা আধুনিক শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজনীয় ভবন। আছে কিনা সহজ যাতায়াতের প্রয়োজনীয় রাস্তা ও প্রয়োজনে নতুন করে অধিগ্রহণ করার মতো সংলগ্ন খালি জায়গা। বজায় থাকছে কিনা নিকটবর্তী সমজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে এর প্রমাণ দূরত্ব। বিদ্যমান সব শিক্ষকের আদৌ আছে কিনা বিশ্বমানের নাগরিক-কর্মী তৈরির উপযোগী হয়ে ওঠার সব যোগ্যতা। তা না হলে, দেশ ও জাতির অধিকতর স্বার্থে সন্তোষজনক গোল্ডেন হ্যান্ডশেক ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে অগ্রিম অবসরে পাঠিয়ে দিতে হবে অযোগ্যদের। কেননা, সরকার কর্তৃক রেজিস্ট্রিকৃত, সরকারি এমপিওভুক্ত বা সম্পূর্ণ সরকারিকৃত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লোকবল ও শিক্ষার পরিবেশ তো আর যেনতেন হলে চলে না, চলবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকটা ভিন্ন রকমের। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, ক্লাব-সমিতি ইত্যাদি পণ্য বা সেবা উৎপাদনকরী প্রতিষ্ঠানের মতো স্বল্প মেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সফলতা বা ব্যর্থতা মূল্যায়ন করা চলে না। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো পণ্যের একক উৎপাদন করে না। বরং মানসম্পন্ন পণ্য বা সেবা উৎপাদনের জন্য মানসম্পন্ন মানবসম্পদ উৎপাদনের গুরুদায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথা প্রতিষ্ঠান-প্রধান ও শিক্ষকের ওপর ন্যস্ত। শিক্ষকরা মানুষ গড়ার কারিগর। অন্যান্য কারিগরের চেয়ে তারা ভিন্ন। শিক্ষার মূল লক্ষ্য 'আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন' একটি দীর্ঘমেয়াদি মননশীল কর্ম বা ব্রত; যা শিক্ষকের মনের গভীরে লালিত। শুভচিন্তা, জাতীয় চেতনা, সুশিক্ষা, ইত্যাদি সদ্গুণ স্বেচ্ছায় সুকৌশলে শিক্ষার্থীর মনে রোপণ ও লালন-পালন করতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত এ প্রক্রিয়া। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধান একাধারে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, অভিভাবকসহ আরো অনেকেরই শিক্ষক। তাই তার হওয়া চাই সবচেয়ে বড় শিক্ষক। শিক্ষাদানের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান ব্যাপক আর্থিক ও অনার্থিক বিষয়। শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা অন্য যে কোনো প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা থেকে পৃথক ও জটিল। প্রতিষ্ঠান-প্রধানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় পুরো শিক্ষা কার্যক্রম এবং আর্থিক-অনার্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন। প্রতিষ্ঠানের ভিন্নতা বা বিশেষত্বের কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানের দায়িত্ব ও কর্তব্যের পরিধি এত বেশি যার সব কটি চিহ্নিত/উল্লেখ/দৃশ্যমান করা প্রায় অসম্ভব। এ বিশাল গুরুদায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রধানের থাকা চাই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান অনেক ধরনের যোগতা ও দক্ষতা। শুধু বয়সের মাপকাঠিতে যার মূল্যায়ন সঠিক হয় না।
যোগ্য নাগরিক-কর্মী তৈরির কারখানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষকরা এ কারখানর কারিগর। তাই যোগ্য মন্ত্রী, আমলা, নেতা, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, বিচারক, আইনবিদ, সাংবাদিক, লেখক, শ্রমিক-কর্মচারী সবই তৈরির পূর্বশর্ত সুযোগ্য শিক্ষক।
শুধু বেসরকারি নয়, সব শিক্ষক, প্রশিক্ষক ও হুজুরেরই যথাযথ শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অত্যন্ত ভালোভাবে জানা থাকতে হবে শিক্ষার সংজ্ঞা, শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিশু-কিশোর মনোবিজ্ঞান ও শিক্ষা প্রদানের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। অবশ্যই থাকতে হবে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ এবং প্রতিনিয়ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান আহরণ ও বিতরণের ঐকান্তিক ইচ্ছা। তদুপরি একজন শিক্ষককে প্রকৃত শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য তার থাকা চাই অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব।
যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের বাদ দেয়া কঠিন। কিন্তু নতুন করে কেন আবার নিয়োগ দিতে হবে থার্ড-ক্লাস শিক্ষক? এখন তো আর প্রথম/দ্বিতীয় বিভাগ/শ্রেণিপ্রাপ্ত প্রার্থীর অভাব নেই। শিক্ষকদের আর্থিক ও অনার্থিক সুযোগ-সুবিধা আরো বৃদ্ধি করে সর্বাধিক ভালো ছাত্রদের শিক্ষকতায় আকৃষ্ট করতে পারলে তারা অবশ্যই ভালো শিক্ষক হবেন। তাই দেশ ও জাতির সুদূরপ্রসারী কল্যাণার্থে এখন আমাদের সস্নোগান হোক_ 'আর নয় থার্ড-ক্লাস শিক্ষক'। দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, জঙ্গিবাদমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উপযোগী ফার্স্ট-ক্লাস মানুষ তৈরির জন্য চাই ফার্স্ট-ক্লাস শিক্ষক। যার জন্য এখনই প্রয়োজন সঠিক সরকারি সিদ্ধান্ত ও কার্যকর পদক্ষেপ।

উপ-সম্পাদকীয়- প্রাইভেট কোচিং বন্ধের উপায় কী? -সকালের খবর- ০৬ আগস্ট ২০১২


সকালের খবর
সোমবার, ৬ আগস্ট ২০১২, ২২ শ্রাবণ ১৪১৯, ১৭ রমজান ১৪৩৩
প্রাইভেট কোচিং বন্ধের উপায় কী?
রহমত উল্লাহ
আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের অপরিহার্যতা সবাই স্বীকার করলেও অতীতে এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার তা নিয়েছে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনুকূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিক ইচ্ছার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে। এই যে সারা দেশে অনলাইনে সব ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, একই দিনে বই বিতরণ, একই দিনে ক্লাস শুরু, একই রুটিনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার সফল বাস্তবায়ন, অতি স্বল্পতম সময়ে কাগজবিহীন ফলাফল প্রকাশ, এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানা ও উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ন, মোটের ওপর একটা উদ্যম-উদ্দীপনা সৃষ্টি-এ সবকিছু বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। সরকারের শুরু থেকেই শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন কথায় তারা অনুভব করতে পেরেছিলেন, তিনি শিক্ষক সমাজের প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। শিক্ষকরা তাদের অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে কাজ করেছেন ও করছেন সরকারের গৃহীত অনুকূল পদক্ষেপ বাস্তবায়নে। অন্যথায় এই সফলতাটুকু অর্জন সম্ভব ছিল না মোটেও। আর এই শিক্ষকদের ৯৭ ভাগ হচ্ছেন বেসরকারি। তাদের প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় সংসার চলে না-এটি এখন সবাই জানেন ও বোঝেন। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও তা অনুভব করেন বলে সবার বিশ্বাস। শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানোর জন্য। তাই তাদের যোগ্যতানুসারে বেছে নিয়েছেন ওভারটাইম আয়ের রাস্তা। কেউ প্রাইভেট পড়াচ্ছেন, কেউ নোট-গাইড লিখছেন, কেউ ঠিকাদারি, কেউ জমির ব্যবসা, কেউ রাজনীতি ব্যবসা, কেউ আবার দোকানদারি করছেন, কেউ বাবার/স্বামীর ধন খাচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব খাতের আয়ের ওপর যেহেতু তাদের জীবনধারণ করতে হচ্ছে সেহেতু তারা এডিশনাল কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে কাজেই বেশি সময়, শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকতায় তাদের মনোযোগ না থাকা বা কম থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াই বাস্তব। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট বা কোচিং না করে শিক্ষার্থীরা পারবে কীভাবে? তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চেয়ে যারা প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তারা তো ব্যক্তিগতভাবে হলেও শিক্ষকতাই করছেন। নিজের পাঠদানের বিষয়টি নিয়মিত চর্চা করছেন কমবেশি। অন্যরা তো তা-ও করছেন না।  এই প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেনি বলেই হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত নমনীয় নীতি নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের কথা বলে বলে শেষমেশ যে নীতিমালা জারি করেছেন তাকে পরোক্ষ অনুমোদনই বলছেন কেউ কেউ। [যেমন : শিক্ষকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের ১০ জনের বেশি পড়াতে পারবেন না। নিজের শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিষয় শহরে ৩০০, উপশহরে ২০০, গ্রামে ১৫০ টাকা হারে; তবে সর্বমোট অনধিক ১২০০ টাকায় সব বিষয় পড়াতে পারবেন অভিভাবকদের সম্মতিসাপেক্ষে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শাস্তি পাবেন। একটি বিশেষ কমিটি তা মনিটরিং করবে।
এসব পদক্ষেপের ফলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে, আগে তো কেবল কঠিন বিষয়ে কোচিং হতো এখন হবে সব বিষয়ে। কারণ দুয়েক জন শিক্ষক কোচিং ফি পাবেন আর অন্যরা পাবেন না তা তো হবে না। তাই পরীক্ষায় ফেল করিয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করাতে পারেন অতি সহজ বিষয়ের জটিল স্যাররাও। অপরদিকে নিজের বাসায় বসে বা শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে কোন শিক্ষক কখন কতজন কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তা মনিটর করা আমাদের জন্য দুরূহ কাজ। আমরা তো এখনও আমাদের নিত্যদিনের ওপেন ও প্যাকেট খাবারগুলোই ভেজাল এবং ফরমালিনমুক্ত করতে পারছি না। প্রকাশ্যে সদর রাস্তায় চলা মিটারবিহীন অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব বন্ধ করতে পারছি না। সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে চেষ্টাও করছি না। অথচ কোথায় কোন গ্রামেগঞ্জে, শহরে কোন ঘরে বসে বা অন্যের ঘরে গিয়ে কবে কখন সকাল-বিকেল রাতে কোন প্রতিষ্ঠানের কতজন শিক্ষার্থীকে কোন প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তা খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন আর প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ হবে এমনটি অবাস্তব নয় কী? আসলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সঠিকভাবে পড়াচ্ছেন কি না, তদারকি করা প্রয়োজন সেটি। তা না করে কমিটি বাসাবাড়িতে যেয়ে তদারক করবে শিক্ষকরা সরকারি নিয়ম মেনে প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন কি না। এ যেন ‘চোখের অপারেশন পায়ে’। একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে অনেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য হয়তো বাসায়ই নিয়োগ দেওয়া আছে একাধিক টিচার। বিশেষ করে নামকরা টিচার ও কোচিং-সেন্টারের আশেপাশের রাস্তায় যেসব দামি দামি গাড়ির ভিড় লেগে থাকে সেগুলোর অধিকাংশই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিদের ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিদের। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যাদের দিয়ে এই প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য বন্ধের তদারকি করানো হবে তাদের কারও সন্তানও যে প্রাইভেট পড়েনি, পড়ছে না এবং পড়বে না, তা নিশ্চিত করবে কে? বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা প্রাইভেট-কোচিং করানো বন্ধ করতে বাধ্য হলেও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিং না করে পারবে না। কারণ শ্রেণীকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত। ফলে অশিক্ষকের কাছ থেকে প্রাইভেট-কোচিং নিতে বাধ্য হবে শিক্ষার্থীরা। অশিক্ষকদের তো আর শাস্তি নেই। সে হবে আরও বেশি ক্ষতির কারণ। আবারও বলছি, দীর্ঘ অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের প্রয়োজনেই চলছে এই প্রাইভেট-কোচিং। এই প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ করার জন্য গৃহীত এসব পদক্ষেপের ফলাফল সরকারের বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রীর জনপ্রিয়তা হ্রাস ছাড়া আর কিছুই হবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে তো আর চলতে পারে না। শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকায় ভর্তি হবে, বেতন-ফি পরিশোধ করবে, আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোচিং ক্লাস করে রিকভার করতে বাধ্য হবে নির্ধারিত ক্লাসের ঘাটতি পড়া! সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ পাঠদান করাই তো শিক্ষকদের চাকরি। কিন্তু শিক্ষকরা এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করছেন কি না তা তদারক করার জন্য কমিটি না করে, করা হল প্রাইভেট-কোচিং তদারকি কমিটি। একজন শিক্ষক দৈনিক কত ঘণ্টা প্রতিষ্ঠানে থাকবেন, কত ঘণ্টা থাকছেন তার কি কোনো হিসাব নেওয়া হয়? আমার জানা মতে, এমনও শিক্ষক আছেন যারা ঢাকা শহরে বাসাবাড়িতে থেকে চাকরি করছেন অন্য জেলার সরকারি-বেসরকারি কলেজে। সপ্তাহে যাচ্ছেন ৩-৪ দিন। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস নিচ্ছেন দিনে দুয়েকটি মাত্র। তাদের মাসিক কর্মঘণ্টা  ৮/১০/১৬/২০ ঘণ্টার। শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী আছে এমন কলেজের একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন চল্লিশ মিনিটের দুটি করে ক্লাস সপ্তাহে ছয় দিনই নেন তবুও তার মাসিক কর্মঘণ্টা হবে সর্বোচ্চ ৩২ ঘণ্টা। এর বাইরে হয়তো কিছু পরীক্ষা নেওয়া আর খাতা দেখা। দৌড়ে এসে ক্লাস আবার ক্লাস শেষ হলেই দৌড়। এক কাজ থেকে এসে আবার ছুটছেন অন্য কাজে। পত্রপত্রিকা পড়ার সময় এবং ধৈর্যও নেই অনেকেরই। গবেষণা তো দূরের কথা। শিক্ষকরা এমন হলে শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? কমবেশি একাদশ শ্রেণীর ১২০ এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ১২০ জনসহ মোট ২৪০ শিক্ষার্থীর জন্য একজনমাত্র ইংরেজি শিক্ষক যথেষ্ট কি না তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থা থেকে বের হতে হলে অবশ্যই বাড়াতে হবে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা এবং সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে কর্মঘণ্টা। শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেন আর না থাকে ক্লাসের বাইরে ক্লাসের বিষয় পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা। তা না হলে বন্ধ করা সম্ভব হবে না এই প্রাইভেট-কোচিং।

লেখক : শিক্ষক
http://www.shokalerkhabor.com/2012/08/06/92496.html

উপ-সম্পাদকীয়- বেতন-ভাতা ও কর্মঘন্টা বৃদ্ধি ব্যতীত বন্ধ করা যাবে না প্রাইভেটকোচিং-সাক্ষরতা বুলেটিন- অক্টোবর ২০১৭

উপ-সম্পাদকীয়- বেতন-ভাতা ও কর্মঘন্টা বৃদ্ধি ব্যতীত বন্ধ করা যাবে না প্রাইভেটকোচিং-সাক্ষরতা বুলেটিন- অক্টোবর ২০১৭
P_20180528_110948_1বেতন-ভাতা ও কর্মঘন্টা বৃদ্ধি ব্যতীত বন্ধ করা যাবে না প্রাইভেট-কোচিং

মো. রহমত উল্লাহ্‌
আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের অপরিহার্যতা সবাই স্বীকার করলেও অতীতে এর জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকার তা নিয়েছে এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনুকূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। এটা পরিষ্কার যে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ঐকান্তিক ইচ্ছার কারণেই তা সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে। এই যে সারা দেশে অনলাইনে সব ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম পূরণ, একই দিনে বই বিতরণ, একই দিনে ক্লাস শুরু, একই রুটিনে অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা গ্রহণ, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার সফল বাস্তবায়ন, অতি স্বল্পতম সময়ে কাগজবিহীন ফলাফল প্রকাশ, এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানা ও উত্তরপত্র পুনঃমূল্যায়ন, মোটের ওপর একটা উদ্যম-উদ্দীপনা সৃষ্টি-এ সবকিছু বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকায় রয়েছে শিক্ষক সমাজ ও শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। সরকারের শুরু থেকেই শিক্ষামন্ত্রীর বিভিন্ন কথায় তারা অনুভব করতে পেরেছিলেন, তিনি শিক্ষক সমাজের প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। শিক্ষকরা তাদের অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে কাজ করেছেন ও করছেন সরকারের গৃহীত অনুকূল পদক্ষেপ বাস্তবায়নে। অন্যথায় এই সফলতাটুকু অর্জন সম্ভব ছিল না মোটেও। আর এই শিক্ষকদের ৯৭ ভাগ হচ্ছেন বেসরকারি। তাদের প্রাপ্ত বেতন-ভাতায় সংসার চলে না-এটি এখন সবাই জানেন ও বোঝেন। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও তা অনুভব করেন বলে সবার বিশ্বাস। শিক্ষকদের বাধ্য হয়েই বিকল্প উপার্জনের রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মেটানোর জন্য। তাই তাদের যোগ্যতানুসারে বেছে নিয়েছেন ওভারটাইম আয়ের রাস্তা। কেউ প্রাইভেট পড়াচ্ছেন, কেউ নোট-গাইড লিখছেন, কেউ ঠিকাদারি, কেউ জমির ব্যবসা, কেউ রাজনীতি ব্যবসা, কেউ আবার দোকানদারি করছেন, কেউ বাবার/স্বামীর ধন খাচ্ছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। সেসব খাতের আয়ের ওপর যেহেতু তাদের জীবনধারণ করতে হচ্ছে সেহেতু তারা এডিশনাল কাজকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সে কাজেই বেশি সময়, শ্রম ও মেধা খাটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষকতায় তাদের মনোযোগ না থাকা বা কম থাকাই স্বাভাবিক। শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়াই বাস্তব। এই বাস্তবতায় প্রাইভেট বা কোচিং না করে শিক্ষার্থীরা পারবে কীভাবে? তবে এ কথা স্বীকার করতে হবে, যারা শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছেন বা করতে বাধ্য হচ্ছেন; তাদের চেয়ে যারা প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তারা তো ব্যক্তিগতভাবে হলেও শিক্ষকতাই করছেন। নিজের পাঠদানের বিষয়টি নিয়মিত চর্চা করছেন কমবেশি। অন্যরা তো তা-ও করছেন না।  এই প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারেনি বলেই হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত নমনীয় নীতি নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। প্রাইভেট-কোচিং বন্ধের কথা বলে বলে শেষমেশ যে নীতিমালা জারি করেছেন তাকে পরোক্ষ অনুমোদনই বলছেন কেউ কেউ। [যেমন : শিক্ষকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের ১০ জনের বেশি পড়াতে পারবেন না। নিজের শিক্ষার্থীদেরকে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় প্রতি বিষয় শহরে ৩০০, উপশহরে ২০০, গ্রামে ১৫০ টাকা হারে; তবে সর্বমোট অনধিক ১২০০ টাকায় সব বিষয় পড়াতে পারবেন অভিভাবকদের সম্মতিসাপেক্ষে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক শাস্তি পাবেন। একটি বিশেষ কমিটি তা মনিটরিং করবে।
এসব পদক্ষেপের ফলে যা দাঁড়াল তা হচ্ছে, আগে তো কেবল কঠিন বিষয়ে কোচিং হতো এখন হবে সব বিষয়ে। কারণ দুয়েক জন শিক্ষক কোচিং ফি পাবেন আর অন্যরা পাবেন না তা তো হবে না। তাই পরীক্ষায় ফেল করিয়ে কোচিংয়ে বাধ্য করাতে পারেন অতি সহজ বিষয়ের জটিল স্যাররাও। অপরদিকে নিজের বাসায় বসে বা শিক্ষার্থীর বাসায় গিয়ে কোন শিক্ষক কখন কতজন কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তা মনিটর করা আমাদের জন্য দুরূহ কাজ। আমরা তো এখনও আমাদের নিত্যদিনের ওপেন ও প্যাকেট খাবারগুলোই ভেজাল এবং ফরমালিনমুক্ত করতে পারছি না। প্রকাশ্যে সদর রাস্তায় চলা মিটারবিহীন অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব বন্ধ করতে পারছি না। সরকারি ডাক্তারদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করতে চেষ্টাও করছি না। অথচ কোথায় কোন গ্রামেগঞ্জে, শহরে কোন ঘরে বসে বা অন্যের ঘরে গিয়ে কবে কখন সকাল-বিকেল রাতে কোন প্রতিষ্ঠানের কতজন শিক্ষার্থীকে কোন প্রতিষ্ঠানের কোন শিক্ষক প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন তা খুঁজে বের করে শাস্তি দেবেন আর প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ হবে এমনটি অবাস্তব নয় কী? আসলে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা সঠিকভাবে পড়াচ্ছেন কি না, তদারকি করা প্রয়োজন সেটি। তা না করে কমিটি বাসাবাড়িতে যেয়ে তদারক করবে শিক্ষকরা সরকারি নিয়ম মেনে প্রাইভেট-কোচিং দিচ্ছেন কি না। এ যেন ‘চোখের অপারেশন পায়ে’। একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যাবে অনেক মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতির ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিকে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য হয়তো বাসায়ই নিয়োগ দেওয়া আছে একাধিক টিচার। বিশেষ করে নামকরা টিচার ও কোচিং-সেন্টারের আশেপাশের রাস্তায় যেসব দামি দামি গাড়ির ভিড় লেগে থাকে সেগুলোর অধিকাংশই সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশেষ ব্যক্তিদের ছেলেমেয়ে বা নাতি-নাতনিদের। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যাদের দিয়ে এই প্রাইভেট-কোচিং বাণিজ্য বন্ধের তদারকি করানো হবে তাদের কারও সন্তানও যে প্রাইভেট পড়েনি, পড়ছে না এবং পড়বে না, তা নিশ্চিত করবে কে? বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা প্রাইভেট-কোচিং করানো বন্ধ করতে বাধ্য হলেও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট-কোচিং না করে পারবে না। কারণ শ্রেণীকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত। ফলে অশিক্ষকের কাছ থেকে প্রাইভেট-কোচিং নিতে বাধ্য হবে শিক্ষার্থীরা। অশিক্ষকদের তো আর শাস্তি নেই। সে হবে আরও বেশি ক্ষতির কারণ। আবারও বলছি, দীর্ঘ অতীত ও বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের প্রয়োজনেই চলছে এই প্রাইভেট-কোচিং। এই প্রাইভেট-কোচিং বন্ধ করার জন্য গৃহীত এসব পদক্ষেপের ফলাফল সরকারের বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রীর জনপ্রিয়তা হ্রাস ছাড়া আর কিছুই হবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে তো আর চলতে পারে না। শিক্ষার্থীরা নিজের প্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকায় ভর্তি হবে, বেতন-ফি পরিশোধ করবে, আবার নিজের প্রতিষ্ঠানেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কোচিং ক্লাস করে রিকভার করতে বাধ্য হবে নির্ধারিত ক্লাসের ঘাটতি পড়া! সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয়ে পরিপূর্ণ পাঠদান করাই তো শিক্ষকদের চাকরি। কিন্তু শিক্ষকরা এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করছেন কি না তা তদারক করার জন্য কমিটি না করে, করা হল প্রাইভেট-কোচিং তদারকি কমিটি। একজন শিক্ষক দৈনিক কত ঘণ্টা প্রতিষ্ঠানে থাকবেন, কত ঘণ্টা থাকছেন তার কি কোনো হিসাব নেওয়া হয়? আমার জানা মতে, এমনও শিক্ষক আছেন যারা ঢাকা শহরে বাসাবাড়িতে থেকে চাকরি করছেন অন্য জেলার সরকারি-বেসরকারি কলেজে। সপ্তাহে যাচ্ছেন ৩-৪ দিন। চল্লিশ মিনিটের ক্লাস নিচ্ছেন দিনে দুয়েকটি মাত্র। তাদের মাসিক কর্মঘণ্টা  ৮/১০/১৬/২০ ঘণ্টার। শুধু উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণী আছে এমন কলেজের একজন শিক্ষক যদি প্রতিদিন চল্লিশ মিনিটের দুটি করে ক্লাস সপ্তাহে ছয় দিনই নেন তবুও তার মাসিক কর্মঘণ্টা হবে সর্বোচ্চ ৩২ ঘণ্টা। এর বাইরে হয়তো কিছু পরীক্ষা নেওয়া আর খাতা দেখা। দৌড়ে এসে ক্লাস আবার ক্লাস শেষ হলেই দৌড়। এক কাজ থেকে এসে আবার ছুটছেন অন্য কাজে। পত্রপত্রিকা পড়ার সময় এবং ধৈর্যও নেই অনেকেরই। গবেষণা তো দূরের কথা। শিক্ষকরা এমন হলে শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়? কমবেশি একাদশ শ্রেণীর ১২০ এবং দ্বাদশ শ্রেণীর ১২০ জনসহ মোট ২৪০ শিক্ষার্থীর জন্য একজনমাত্র ইংরেজি শিক্ষক যথেষ্ট কি না তা-ও ভেবে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের এই দুরবস্থা থেকে বের হতে হলে অবশ্যই বাড়াতে হবে শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা এবং সেই সঙ্গে বাড়াতে হবে কর্মঘণ্টা। শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা। যেন আর না থাকে ক্লাসের বাইরে ক্লাসের বিষয় পড়ার কোনো প্রয়োজনীয়তা। তা না হলে বন্ধ করা সম্ভব হবে না এই প্রাইভেট-কোচিং।

লেখক : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।