উপ-সম্পাদকীয়- 'ধনির দায় গরিবের হক জাকাত' -কালের কন্ঠ- ১০ আগস্ট ২০১২

উপ-সম্পাদকীয়- 'ধনির দায় গরিবের হক জাকাত' -কালের কন্ঠ- ১০ আগস্ট ২০১২
ধনীর দায় গরিবের হক জাকাতকালের কন্ঠ, ১০ আগস্ট ২০১২

ধনীর দায় গরিবের হক জাকাত

মো. রহমত উল্লাহ্‌

আল্লাহ তায়ালা যাকে সম্পদ দিয়েছেন, তার ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি মালদার হওয়া সত্ত্বেও জাকাত পরিশোধ করে না, পরকালে তাকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। হাদিস অনুযায়ী- যার কাছে রুপা বা স্বর্ণ আছে, অথচ সে জাকাত দেয়নি, কিয়ামতের দিন ওই রুপা বা স্বর্ণকে তামার পাতে পরিণত করে দোজখের আগুনে দগ্ধ করে বুকে-পিঠে, পাঁজরে-কপালে ছ্যাঁকা দেওয়া হবে। অন্য হাদিসে আছে- যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ধনসম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে জাকাত দেয়নি, কিয়ামতের দিন ওই ধনসম্পদ বিষাক্ত সাপ হয়ে তাকে গলায় পেঁচিয়ে ধরবে এবং দুই গালে দংশন করবে। ইসলাম ধর্মের এই বিধানটি সমাজের দরিদ্র শ্রেণীকে ধনীর সম্পদের অংশীদার করেছে। ধনী ও দরিদ্রের আর্থিক ব্যবধান কমাতে সহায়তা করে এই জাকাত ব্যবস্থা। আমরা অনেকেই জাকাতের মাসয়ালা সঠিকভাবে জানি না কিংবা জানতে চাই না। জাকাত না দেওয়ার বা কম দেওয়ার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতে গেলেই বিষয়টি জটিল। নিয়ত সহিহ থাকলে বুঝতে এবং মানতে কোনো জটিলতা নেই। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, মাসয়ালা-মাসায়েলের ফাঁকফোকর খুঁজে-বেছে জাকাত পরিশোধ করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র কম পরিশোধিত হলে অসীম পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাই সহজ-সরল হিসাবে কিছু বেশি অর্থ পরিশোধ করাই সর্বোত্তম। এতে শতভাগ জাকাত প্রদান নিশ্চিত হবে এবং অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের জন্য আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত নেকি দান করবেন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তর বোঝেন।
ইসলাম ধর্মের অনুসারী ধনী ব্যক্তির জন্য শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত প্রদানের বিধান করা হয়েছে। অর্থাৎ মালদারের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে আড়াই টাকা গরিবের। এটি ধনীর দায় এবং গরিবের হক। প্রশ্ন হচ্ছে, কী পরিমাণ ধনসম্পদের অধিকারী হলে জাকাত ফরজ হবে? যে ব্যক্তি সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের কিংবা তৎমূল্যের টাকা বা ধনসম্পদের মালিক হয় এবং তার কাছে ওই পরিমাণ টাকা বা ধনসম্পদ পূর্ণ এক বছরকাল স্থায়ী থাকে, সেই ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হয়। এর চেয়ে কম হলে জাকাত ফরজ হয় না। তবে বেশি হলে অবশ্যই ফরজ হবে। জাকাতযোগ্য এই ধনসম্পদের পরিমাণকে নিসাব বলা হয় এবং যে ব্যক্তি (প্রাপ্তবয়স্ক-অপ্রাপ্ত বয়স্ক, নারী-পুরুষ) জাকাতযোগ্য ধনসম্পদের মালিক হয়, তাকে মালিকে নিসাব বা সাহেবে নিসাব বলা হয়। আমাদের সমাজের অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আমার কাছে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ নেই, সেহেতু (অন্য ধনসম্পদ যতই থাকুক) আমাকে জাকাত দিতে হবে না। আসলে এটা সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে রুপা বা স্বর্ণ থাকা বা না থাকা কোনো বিষয় নয়। রুপা বা স্বর্ণের পরিবর্তে জাকাতযোগ্য অন্য ধনসম্পদ থাকলেও জাকাত প্রদান ফরজ হবে। রুপা বা স্বর্ণ হচ্ছে নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের একটি মাধ্যম মাত্র। এক বিন্দু রুপা বা স্বর্ণ না থাকলেও ওই ব্যক্তির জন্য জাকাত প্রদান ফরজ হবে, যার মালিকানায় নিসাব পরিমাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ জাকাতবর্ষ-এর শুরুতে ও শেষে থাকে। এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মালিকে নিসাব এবং জাকাত প্রদেয় সময় চিহ্নিত করার জন্য তিনটি প্রধান বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য। প্রথমত, নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরা হবে, নাকি স্বর্ণের মূল্য ধরা হবে? দ্বিতীয়ত, নিসাবের পরিমাণ হিসাব করার সময় কোন কোন সম্পত্তি যোগ-বিয়োগ করতে হবে? তৃতীয়ত, কিভাবে জাকাতবর্ষ গণনা করা হবে?
১. নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বর্তমান মূল্য সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের চেয়ে অনেক বেশি। তাই মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরা হলে জাকাত প্রদানকারীর সংখ্যা ও জাকাতের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায় এবং গরিব মানুষ অধিক লাভবান হয়। ফলে আল্লাহ পাক যে উদ্দেশ্যে জাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন, তা অধিক কার্যকর হয়। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ওপর অধিক খুশি হন। লক্ষণীয়, এই হাদিসে বারবারই আগে রুপা শব্দটি এবং পরে স্বর্ণ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। তথাপি কেউ যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের মূল্যকেই নিসাবের পরিমাপ নির্ধারণের মানদণ্ড ধরে জাকাত দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে জোর আপত্তির সুযোগ নেই। যেকোনো একটিকে মানদণ্ড ধরে জাকাত প্রদান করা যাবে।
২. নিসাব পরিমাণ সম্পত্তি (জাকাতযোগ্য সম্পত্তি) হিসাব করার সময় যা কিছুর মূল্য যোগ এবং বিয়োগ হবে, তা হচ্ছে-
(ক) যোগ করতে হবে : নিজের মালিকানায় থাকা সব নগদ টাকা-পয়সা, লগি্নকৃত/বিনিয়োগকৃত টাকা-পয়সা এবং এর ওপর প্রাপ্ত লাভ, রুপা ও স্বর্ণের (ব্যবহৃত/অব্যবহৃত) বাজারমূল্য, ব্যবসায়িক পণ্য (অর্থাৎ বিক্রি করে লাভ করার নিয়তে ক্রয়কৃত সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি), ভাড়ায় খাটানো স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার টাকা, আদায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন পাওনাদি ইত্যাদি।
(খ) যোগ করতে হবে না : নিজেদের ব্যবহৃত বা ব্যবহারের নিয়তে ক্রয়কৃত সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি (রুপা ও সোনা ব্যতীত), ভাড়ায় খাটানো সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, বাবা-মা ও স্বামী-সন্তানের মালিকানায় থাকা সম্পত্তি (কারণ প্রত্যেকের হিসাব পৃথক হবে), আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন পাওনাদি ইত্যাদি।
(গ) বিয়োগ করতে হবে : সব ধরনের দায়দেনা।
৩. জাকাতবর্ষ হিসাব করার সময় বছরের শুরু এবং শেষ দেখতে হবে। ধরা যাক, কাদির মোল্লার মালিকানায় জানুয়ারি মাসের প্রথম দিন নিসাব পরিমাণ ধনসম্পদ ছিল এবং তিনি ওই ধনসম্পদের জাকাত দিয়েছিলেন। তারপর যেকোনো কারণেই হোক, কয়েক মাস তার ধনসম্পদ নিসাব পরিমাণের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে আবার নিসাব পরিমাণ ধনসম্পদ তাঁর মালিকানায় এসেছে। এমতাবস্থায় ওই মালের ওপর শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত পরিশোধ করতে হবে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর- এই ১২ মাসই হবে তাঁর জাকাতবর্ষ। জাকাত শুধু গরিব ব্যক্তির হক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন, আমরা যেন যথাযথভাবে জাকাত পরিশোধ করতে পারি, আমাদের নিয়ত যেন সহিহ্ থাকে, হৃদয় যেন গরিবদের পক্ষে থাকে।
মো. রহমত উল্লাহ
লেখক: অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ

জাকাত: ধনির দায়, গরিবের হক

জাকাত: ধনির দায়, গরিবের হক
জাকাত: ধনীর দায়, গরিবের হক
মো. রহমত উল্লাহ
আল্লাহ তায়ালা যাকে সম্পদ দিয়েছেন, তার ওপর জাকাত ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি মালদার হওয়া সত্ত্বেও জাকাত পরিশোধ করে না, পরকালে তাকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। হাদিস অনুযায়ী- যার কাছে রুপা বা স্বর্ণ আছে, অথচ সে জাকাত দেয়নি, কিয়ামতের দিন ওই রুপা বা স্বর্ণকে তামার পাতে পরিণত করে দোজখের আগুনে দগ্ধ করে বুকে-পিঠে, পাঁজরে-কপালে ছ্যাঁকা দেওয়া হবে। অন্য হাদিসে আছে- যে ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা ধনসম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে জাকাত দেয়নি, কিয়ামতের দিন ওই ধনসম্পদ বিষাক্ত সাপ হয়ে তাকে গলায় পেঁচিয়ে ধরবে এবং দুই গালে দংশন করবে।

ইসলাম ধর্মের এই বিধানটি সমাজের দরিদ্র শ্রেণীকে ধনীর সম্পদের অংশীদার করেছে। ধনী ও দরিদ্রের আর্থিক ব্যবধান কমাতে সহায়তা করে এই জাকাত ব্যবস্থা। আমরা অনেকেই জাকাতের মাসয়ালা সঠিকভাবে জানি না কিংবা জানতে চাই না। জাকাত না দেওয়ার বা কম দেওয়ার জন্য ফাঁকফোকর খুঁজতে গেলেই বিষয়টি জটিল। নিয়ত সহিহ থাকলে বুঝতে এবং মানতে কোনো জটিলতা নেই। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, মাসয়ালা-মাসায়েলের ফাঁকফোকর খুঁজে-বেছে জাকাত পরিশোধ করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র কম পরিশোধিত হলে অসীম পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাই সহজ-সরল ভাবে হিসাব করে (নিজের প্রদেয় জাকাতের পরিমান সঠিক ভাবে হিসাব করা ওয়াজিব) কিছু বেশি অর্থ পরিশোধ করাই সর্বোত্তম। এতে শতভাগ জাকাত প্রদান নিশ্চিত হবে এবং অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের জন্য আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত নেকি দান করবেন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তর বোঝেন।
ইসলাম ধর্মের অনুসারী ধনী ব্যক্তির জন্য শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত প্রদানের বিধান করা হয়েছে। অর্থাৎ মালদারের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে আড়াই টাকা গরিবের। এটি ধনীর দায় এবং গরিবের হক।

প্রশ্ন হচ্ছে, কী পরিমাণ ধনসম্পদের অধিকারী হলে জাকাত ফরজ হবে? যে ব্যক্তি সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের কিংবা তৎমূল্যের টাকা বা ধনসম্পদের মালিক হয় এবং তার কাছে ওই পরিমাণ টাকা বা ধনসম্পদ পূর্ণ এক বছরকাল স্থায়ী থাকে, সেই ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হয়। এর চেয়ে কম হলে জাকাত ফরজ হয় না। তবে বেশি হলে অবশ্যই ফরজ হবে। জাকাতযোগ্য এই ধনসম্পদের পরিমাণকে নিসাব বলা হয় এবং যে ব্যক্তি (প্রাপ্তবয়স্ক-অপ্রাপ্ত বয়স্ক, নারী-পুরুষ) জাকাতযোগ্য ধনসম্পদের মালিক হয়, তাকে মালিকে নিসাব বা সাহেবে নিসাব বলা হয়।

আমাদের সমাজের অনেকেই মনে করেন, যেহেতু আমার কাছে সাড়ে ৫২ তোলা রুপা বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ নেই, সেহেতু (অন্য ধনসম্পদ যতই থাকুক) আমাকে জাকাত দিতে হবে না। আসলে এটা সঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে রুপা বা স্বর্ণ থাকা বা না থাকা কোনো বিষয় নয়। রুপা বা স্বর্ণের পরিবর্তে জাকাতযোগ্য অন্য ধনসম্পদ থাকলেও জাকাত প্রদান ফরজ হবে। রুপা বা স্বর্ণ হচ্ছে নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের একটি মাধ্যম/একক মাত্র। এক বিন্দু রুপা বা স্বর্ণ না থাকলেও ওই ব্যক্তির জন্য জাকাত প্রদান ফরজ হবে, যার মালিকানায় নিসাব পরিমাণ কিংবা তার চেয়ে বেশি পরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ জাকাতবর্ষ-এর শুরু থেকে শেষে পর্যন্ত থাকে। এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মালিকে নিসাব এবং জাকাত প্রদেয় সময় চিহ্নিত করার জন্য তিনটি প্রধান বিষয় বিশেষভাবে বিবেচ্য।

প্রথমত, নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরা হবে, নাকি স্বর্ণের মূল্য ধরা হবে?

দ্বিতীয়ত, নিসাবের পরিমাণ হিসাব করার সময় কোন কোন সম্পত্তি যোগ-বিয়োগ করতে হবে?

তৃতীয়ত, কিভাবে জাকাতবর্ষ গণনা করা হবে?
১. নিসাবের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরাই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বর্তমান মূল্য সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের চেয়ে অনেক কম। তাই মাধ্যম হিসেবে রুপার মূল্য ধরা হলে জাকাত প্রদানকারীর সংখ্যা ও জাকাতের পরিমাণ অনেক বৃদ্ধি পায় এবং গরিব মানুষ অধিক লাভবান হয়। ফলে আল্লাহ পাক যে উদ্দেশ্যে জাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন, তা অধিক কার্যকর হয়। আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের ওপর অধিক খুশি হন। লক্ষণীয়, এই হাদিসে বারবারই আগে রুপা শব্দটি এবং পরে স্বর্ণ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। তথাপি কেউ যদি সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের মূল্যকেই নিসাবের পরিমাপ নির্ধারণের মানদণ্ড ধরে জাকাত দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে জোর আপত্তির সুযোগ নেই। যেকোনো একটিকে মানদণ্ড ধরে নিসাব পরিমান নির্ধারণ করা যাবে।
২. নিসাব পরিমাণ সম্পত্তি (জাকাতযোগ্য সম্পত্তি) হিসাব করার সময় যা কিছুর মূল্য যোগ এবং বিয়োগ হবে, তা হচ্ছে-
(ক) যোগ করতে হবে : নিজের মালিকানায় থাকা সব নগদ টাকা-পয়সা, লগ্নিকৃত/বিনিয়োগকৃত টাকা-পয়সা এবং এর ওপর প্রাপ্ত লাভ, রুপা ও স্বর্ণের (ব্যবহৃত/অব্যবহৃত) বাজারমূল্য, ব্যবসায়িক পণ্য (অর্থাৎ বিক্রি করে লাভ করার নিয়তে ক্রয়কৃত সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি), ভাড়ায় খাটানো স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার টাকা, আদায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন পাওনাদি ইত্যাদি।
(খ) যোগ করতে হবে না : নিজেদের ব্যবহৃত বা ব্যবহারের নিয়তে ক্রয়কৃত সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি (রুপা ও সোনা ব্যতীত), ভাড়ায় খাটানো সব ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, বাবা-মা ও স্বামী-সন্তানের মালিকানায় থাকা সম্পত্তি (কারণ প্রত্যেকের হিসাব পৃথক হবে), আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন পাওনাদি ইত্যাদি।
(গ) বিয়োগ করতে হবে : সব ধরনের দায়দেনা।
৩. জাকাতবর্ষ হিসাব করার দুইটি ক্ষেত্র আছে:

(ক) প্রথম জাকাত দাতার জাকাত বর্ষ গণনা: যিনি আগের বছরগুলোতে ধারাবাহিক ভাবে জাকাত যোগ্য সম্পদের মালিক ছিলেন না বিধায় জাকাত আদায় করেননি তাঁর ক্ষেত্রে জাকাত বর্ষের গণনাটি হবে নিম্নরূপ-

ধরা যাক, জনাব কাদির মোল্লা ০১ জানুয়ারি তারিখে প্রথম নিসাব পরিমাণ ধনসম্পদের মালিক হলেন। এই ০১ জানুয়ারি তারিখ থেকেই তার জাকাত বর্ষের শুরু হবার নিয়ম। কিন্তু যদি কয়েক দিন/মাস পরেই তার এই ধনসম্পদের মূল্য/পরিমান নিসাব স্তরের নিচে নেমে যায় তো তার জাকার বর্ষ ০১ জানুয়ারি তারিখ থেকে শুরু হবে না। বরং আবার যে মাসের যে তারিখে তিনি নিসাব পরিমান ধনসম্পদের মালিক হবেন সে মাসের সেই তারিখ থেকেই তাঁর জাকাত বর্ষ গণনা শুরু হবে যদি পরবর্তি ১২ মাস তার নিসার পরিমান ধনসম্পদের মালিকানা বজায় থাকে। যদি ১২ মাস পূর্ণ হবার আগেই আবারো তার ধনসম্পদের মূল্য/পরিমান নিসাব স্তরের নিচে নেমে যায় তো তার জাকাত বর্ষ গণনা আবারো বাতিল হবে। পরে আবার যে মাসের যে তারিখে তিনি নিসাব পরিমান ধনসম্পদের মালিক হবেন সে মাসের সে তারিখ থেকে তাঁর জাকাত বর্ষ গণনা শুরু হবে যদি তিনি টানা ১২ মাস নিসাব পরিমান বা এর অধিক পরিমান ধনসম্পদের মালিক থাকেন। এবং যেদিন এই ১২ মাস পূর্ণ হবে সেদিনই তিনি জাকাত দাতা হবেন। সেদিনের সম্পদের মূল্য/পরিমানের ভিত্তিতেই তাঁর জাকাতের পরিমান নির্ধারিত হবে।

তিনি ওই ধনসম্পদের জাকাত দিয়েছিলেন। এই নিসাব পরিমান বজায় থেকে তারপর যেকোনো কারণেই হোক, কয়েক মাস তার ধনসম্পদ নিসাব পরিমাণের চেয়ে কমে গিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনে আবার নিসাব পরিমাণ ধনসম্পদ তাঁর মালিকানায় এসেছে। এমতাবস্থায় ওই মালের ওপর শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত পরিশোধ করতে হবে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর- এই ১২ মাসই হবে তাঁর জাকাতবর্ষ। জাকাত শুধু গরিব ব্যক্তির হক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দিন, আমরা যেন যথাযথভাবে জাকাত পরিশোধ করতে পারি, আমাদের নিয়ত যেন সহিহ্ থাকে, হৃদয় যেন গরিবদের পক্ষে থাকে।

মো. রহমত উল্লাহ লেখক: অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ

প্রবন্ধ- শিক্ষাক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে অব্যাহত অগ্রগতি- ইত্তেফাক- ০২ জানুয়ারি ২০১২


শিক্ষা ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে অব্যহত অগ্রগতি

প্রবন্ধ: শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালায় আনতে হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন -ইত্তেফাক- ২১ এপ্রিল ২০১২


শিশুতোষ গল্প- শোভনের স্বপ্ন -দৈনিক ইনকিলাব-১৮ জুলাই ২০০৮



শোভনের স্বপ্ন
মো. রহমত উল্লাহ্‌

কাগজ কুড়াতে কুড়াতে ক্লান্তি আসে শোভনের। কতক্ষণ হাঁটা যায় নুয়ে নুয়ে। সেই দুপুর থেকে কাগজ কুড়ানো শুরু। মাত্র অর্ধেক হয়েছে পিঠের বস্তা। আগের মত পাওয়া যায় না কাগজ। পলিথিনে বাজার করে সবাই। ছেঁড়া কাগজের দামও কম। কোত্থেকে যে আসে এত টোকাই! কুড়িয়ে নিয়ে যায় সব। কখন ভরবে এই বস্তা। না হলে জুটবে না রাতের খাবার। দ্রুত হাত- পা চালায় শোভন। পিপাসায় শুকিয়ে যায় বুক। কাঁপতে থাকে লিকলিকে হাঁটু। বাসি গোলাপের মতো হয়ে যায় গায়ের রং। কোসা নৌকার মত বেঁকে যায় শরীর। ঘুম লাগে ভাসাভাসা চোখে। শুয়ে পড়ে পার্কের পাকা বেঞ্চিতে। সামান্য ব্যথা পায় পিঠের হাড়ে। শুয়ে থাকে কষ্ট করে। ধীরে ধীরে সোজা হয় শিরদাঁড়া। কিছুটা আরাম লাগে পিঠে। টান পড়ে পেটে। যেন ছিঁড়ে যাবে চামড়া। বেড়ে যায় ক্ষুধার আগুন! হাত-পা ছেড়ে শুয়ে থাকে চোখ বন্ধ করে। ভাবে, এর চেয়ে ভালো ছিল গ্রামে। এতো কষ্ট ছিল না মতি কাকার বাড়িতে। ভাত দিত তিন বেলা। কাজ বলতে ছিল কয়েকটি গরু চরানো। সুযোগ পাওয়া যেত খেলার। গলা ছেড়ে গাওয়া যেত গান। আঁকাবাঁকা পথে চালানো যেত বেতের চাকা। জিরানো যেতো আমের ছায়ায়। কেন যে এই বস্তিতে চলে এলেন মা। আজো বুঝেনি শোভন। মনে আছে মায়ের সেই কথা- ‘চল বাবা, এখানে আর থাকা যাবে না। এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।’
মুখে পানির ছিটা লাগে। ছন্দ পতন হয় শোভনের ভাবনায়। চোখ খুলে। দেখে একগাল হাসি। দাঁড়িয়ে আছে কনক। পালিয়ে যায় সব কষ্ট। চট্করে বসেপড়ে শোভন। কনকের হাত থেকে টেনে নেয় পানির জগ। গড়গড় গিলে দুই/ তিন স পানি। পাউরুটি বাড়িয়ে দেয় কনক। ‘নেও এক জনে দিছে।’ শোভনের ছোট বোন কনক। পানি বিক্রি করে পার্কে। অর্ধেক পাউরুটি ভাগ করে খায় ভাই-বোনে। ‘এই টুক্ কাগজ টোকাইছ মাত্র! মজা বুঝবানে রাতে!’ শোভনকে মায়ের বকুনির ভয় দেখায় কনক। চিপ দিয়ে উঠে শোভনের বুকের ভিতর! বলে- ‘কনক, কিছু কাগজ টোকাইয়া দে না আমার লগে।’ না, বলে ঘাড় বাঁকা করে কনক। ছুটতে থাকে ‘এই পানি, এই ঠান্ডা পানি ’ বলতে বলতে।

আবার কাগজ কুড়াতে শুরু করে শোভন। লজ্জা লাগে কাগজ টোকানি। এর চেয়ে ভালো হতো টেম্পুর ভাড়া কাটা। প্রতিদিনই পাওয়া যায় নগদ টাকা। চালকও হওয়া যায় এক সময়। কিন্তু পরিচিত লোক ছাড়া পাওয়া যায় না সে কাজ। দ্রুত কুড়াতে থাকে কাগজ। পেয়ে যায় বেশ ক’টি খালি বোতল। পুরা হয়ে যায় বস্তা। আনন্দে ভরে উঠে বুক ! ফিরে যায় বস্তির দিকে।
বিশাল আবাসিক এলাকা। স্কুলের সমনে পাকা রাস্তা। মাঠ নেই। রাস্তাটুকুই হাঁটা-চলা ও খেলাধুলার জায়গা। সাইকেল চালায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা। এখানে এলে শোভনের খুব ভাল লাগে। সময় পেলেই সে আসে এখানে। বসে থাকে একাএকা। বস্তিতে থাকে বলে অংশ নিতে পারে না খেলাধুলায়। অন্য দিনের চেয়ে বেশি ভালো লাগে আজ। অনেক সুন্দর মনে হয় সাইকেলগুলো! একেকটা একেক রকম! একটার চাকা পিচঢালা রাস্তার মত কালো। জিহ্বার মত লাল অন্যটির টায়ার। নারিকেল পাতার মত সবুজ কোনটার প্যাডেল। সিটের রং যেন কুটুমপাখির হলুদ। ক্রিং ক্রিং, টুং টাং শব্দ করে ছুটছে সাইকেল। প্রতিযোগিতায় নেমেছে তিনজন। অপলক তাকিয়ে আছে শোভন। দেখতে দেখতে মনে হয় সে নিজেও চালাচ্ছে একটি। নেমেছে প্রতিযোগিতায় । কার আগে যেতে পারে কে। প্যাডেল চালায় দ্রুত। শোভন নিজেকে কল্পনা করে সবার আগে। ক্রিং ক্রিং, ক্রিং ক্রিং। হঠাৎ মনে হয় সাইকেল চড়ে স্কুলে যাচ্ছে সে! পরনে আকাশি শার্ট ও নেভি ব্লু প্যান্ট। পিঠের উপর বই-খাতা ভর্তি ব্যাগ। টিফিন বক্রে ডিম, পরটা, মিষ্টি, কলা...। নিজেকে কল্পনা করে ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চের ছাত্র। সবার আগে বলতে পারে পড়া। করতে পারে অংক। অনেক আদর করেন স্যারেরা। খেলায় ডেকে নেয় বন্ধুরা।

মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আযান। সাইকেল নিয়ে সবাই চলে যায় নিজ নিজ বাসায়। বন্ধ হয়ে যায় বাসা-বাড়ির লোহার গেট। সে গেটের বাইরে ঠেকে থাকে শোভনের অপলক দৃষ্টি ! /