শিক্ষাই হোক মেগা প্রকল্প। প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০২৩

পত্রিকার লিংক 

শিক্ষাই হোক মেগা প্রকল্প

দৈনিক প্রথম আলো, ১৪ আগস্ট ২০২৩


মো. রহমত উল্লাহ্ 

'বাইচান্স শিক্ষক নয়, আমাদের দরকার মনে-প্রাণে শিক্ষক। তাদের মাধ্যমেই আমরা দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ গড়ে তুলেতে চাই। এজন্য শিক্ষাই প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষাই হবে মেগা প্রকল্প। তাই আমাদের শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সময়ের প্রয়োজনেই তাকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে রাখতে হবে।' মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি গত ৩০ জুলাই ২০২৩ তারিখে প্রথম 'বাংলাদেশ স্টার্টআপ' সম্মেলনে এমন আরো অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন। আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি তাহলে 'বাইচান্স শিক্ষক, মানে ঘটনাচক্রে শিক্ষক, দৈবক্রমে শিক্ষক, ভাগ্যক্রমে শিক্ষক, হঠাৎ করে শিক্ষক। অর্থাৎ যিনি শিক্ষক হতে চান না তিনি অন্য কিছু হতে ব্যর্থ হয়ে কোন না কোন উপায়ে শেষমেষ শিক্ষক। কথাটি বলতে ও শুনতে খুবই খারাপ লাগছে! যদিও সবার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। তবে যাদের জন্য প্রযোজ্য দায়টা কি তাদের? বাস্তব অবস্থাটি এমন হল কেন, হচ্ছে কেন, হবে কেন? 


অন্য আরেকটি কথা আমি যদি ভুল না বুঝে থাকি তাহলে 'মনে-প্রাণে শিক্ষক' মানে চিন্তায় চেতনায় ধ্যানে জ্ঞানে মননে শিক্ষক। ছোটবেলা থেকে শিক্ষক হবার ইচ্ছায় শিক্ষক। নিজের ও মা-বাবার স্বপ্ন পূরণে শিক্ষক। শিক্ষক হবার স্বপ্ন দেখতে দেখতে শিক্ষক। শিক্ষক হবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে শিক্ষক। শুধুমাত্র শিক্ষকতার জন্য শিক্ষক। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত এমন শিক্ষক আমরা পাচ্ছি না! বেসরকারি তো দূরের কথা সরকারি চাকরিতেও পছন্দক্রমের তলানিতে থাকে শিক্ষকতা! সরকারি শিক্ষক হয়েও অনেকেই চলে যেতে চান, চলে যান অন্য পেশায়, অন্য ক্যাডারে। বাস্তব অবস্থাটি এমন হল কেন, হচ্ছে কেন, হবে কেন? 


সত্যি করে বলছি- আমিও আমার সন্তানের জন্য 'ঘটনাচক্রে শিক্ষক' চাই না, 'বাইচান্স শিক্ষক' চাই না; 'মনে-প্রাণে শিক্ষক' চাই, সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক চাই। আমি নিজেকে অযোগ্য শিক্ষক মনে করি না। তথাপি আমি আমার চেয়ে অধিক যোগ্য শিক্ষক চাই। আমার এ চাওয়া আজকের নয়, দীর্ঘদিনের। যখন শিক্ষার মূল ভিত্তি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসএসসি পাস শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তখনও আমি আপত্তি করেছি, লিখেছি। যখন ব্যাপক হারে কোটা সংরক্ষণ করে তুলনামূলক বেশি যোগ্য ছেলেদের বাদ দিয়ে কম যোগ্য মেয়েদের শিক্ষকতায় প্রবেশ করানো হয়েছে তখনও আমি আপত্তি করেছি, লিখেছি। যখন বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে যোগ্যতা কমিয়ে একাধিক তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণিধারী প্রার্থীকে শিক্ষকতায় প্রবেশ করানো হয়েছে তখনও আমি আপত্তি করেছি, লিখেছি। এখনো বেসরকারি শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা না বাড়িয়ে যোগ্যতা কমিয়ে একটি তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণিধারীকে শিক্ষক হবার সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে আমি তীব্র আপত্তি করছি। সরকারি শিক্ষক হবার জন্য যদি তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণিধারীকে গ্রহণ করা না হয় তাহলে বেসরকারি শিক্ষক হবার ক্ষেত্রে কেন গ্রহণ করা হবে? বেসরকারি শিক্ষকগণ তো এ দেশের শতকরা ৯৫ ভাগের বেশি সন্তানদের লেখাপড়া করাচ্ছেন।  


আমার মত আরও অনেকেই 'বাইচান্স শিক্ষক' চায় না, 'মনে-প্রাণে শিক্ষক' চায়। অর্থাৎ সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক চায়। যারা সন্তানকে ভালোবেসে ভালো ভালো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসায় ভর্তি করাতে চায় তারা সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক চায়। যারা শিক্ষক হয়েও সন্তানকে নিজের প্রতিষ্ঠানে না পড়িয়ে আরো ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়াতে চায় তারাও অধিক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক চায়। যারা সন্তানকে ভালোভাবে নাচ, গান, অভিনয়, আবৃত্তি, তেলাওয়াত, খেলা, সাঁতার, শিকার, ড্রাইভিং, পাইলটিং ইত্যাদি শিখাতে চায় তারাও সে লাইনের সর্বাধিক যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক চায়। যারা সকল শিক্ষার্থীর অধিক কল্যাণ চায়, আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ চায়, প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিক যোগ্য কর্মী চায়, দেশ ও জাতির প্রকৃত উন্নয়ন চায়, তারা সবাই সর্বাধিক যোগ্য শিক্ষক চায়। অর্থাৎ সকল বিবেকবান মানুষ তার সন্তানকে দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সর্বাধিক দক্ষ, যোগ্য ও মানবিক শিক্ষক চায়। শিক্ষকের নিকট থেকে আরও বেশি জ্ঞান চায়, দক্ষতা চায়, ত্যাগ চায়। 


এমতাবস্থায় 'বাইচান্স শিক্ষক নয়, আমাদের দরকার মনে-প্রাণে শিক্ষক' এই বক্তব্য দ্বারা মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় যদি এমন বুঝিয়ে থাকেন যে, নতুন যারা শিক্ষকতায় আসবেন তারা যেন 'বাইচান্স শিক্ষক' না হয়ে 'মনে-প্রাণে শিক্ষক' হন, যোগ্যতা ভিত্তিক শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে সর্বাধিক সফল শিক্ষক হন। তাহলে নিশ্চয়ই শিক্ষক পদের জন্য এখনই নির্ধারণ করতে হবে সর্বোচ্চ যোগ্যতা ও সুযোগ-সুবিধা; যাতে সর্বোচ্চ মেধাবীদের পেশা পছন্দের তালিকায় প্রথমে থাকে শিক্ষকতা। সেই সাথে আমরা যারা বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত আছি; কিন্তু 'মনে-প্রাণে শিক্ষক' হতে পারছি না, 'বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে' থাকতে পারছি না, ডিজিটাল তথা স্মর্ট হয়ে উঠতে পারছি না, কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারছি না, তাদের জন্য থাকা উচিত হ্যান্ডসাম এমাউন্ট নিয়ে অগ্রিম অবসরে যাওয়ার ব্যবস্থা। যাতে দ্রুত উন্মোচিত হয় অধিক যোগ্যদের শিক্ষকতায় আগমনের অধিক দ্বার। 


শিক্ষক পদের জন্য সর্বাধিক যোগ্যতা ও সুযোগ-সুবিধা নির্ধারণে বিলম্ব করা মানেই দেশ ও জাতির দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি করা। কেননা, এখন যিনি শিক্ষক তথা মানুষ গড়ার কারিগর হবেন তিনি তুলনামূলক কম যোগ্য হলে কমপক্ষে ৩০ বছর তৈরি করবেন অগণিত অযোগ্য বা কম যোগ্য মানুষ। অর্থাৎ অযোগ্যতা ছড়িয়ে দিবেন সকল ক্ষেত্রে, সকল পেশায়! অপরদিকে এখন যিনি শিক্ষক তথা মানুষ গড়ার কারিগর হবেন তিনি সর্বাধিক যোগ্য হলে কমপক্ষে ৩০ বছর তৈরি করবেন অগণিত অধিক যোগ্য মানুষ। দ্রুত বাস্তবায়িত হবে প্রকৃত স্মার্ট বাংলাদেশ। মনে রাখতে হবে, তুলনামূলক কম যোগ্য শিক্ষক দিয়ে অধিক যোগ্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, আমলা, কর্মী তথা সকল পেশাজীবী ও জনপ্রতিনিধি তৈরির প্রত্যাশা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, অবাস্তব, অসম্ভব। আশা করি বিষয়টি এখনই অনুধাবন করবে বর্তমান সরকার, দ্রুত বাস্তবায়ন করবে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়ের সেই মূল্যবান বক্তব্য- 'শিক্ষাই হবে মেগা প্রকল্প। শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা ও আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।' 


মো. রহমত উল্লাহ্

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

rahamot21@gmail.co

০৭ আগস্ট ২০২৩





https://nagorik.prothomalo.com/ayojon/lev41c7pyp 

রাগান্বিত বিচারক, প্রতিবাদী ছাত্রী

রাগান্বিত বিচারক, প্রতিবাদী ছাত্রী



মো. রহমত উল্লাহ্ 

দৈনিক শিক্ষা, ০৪ এপ্রিল ২০২৩

সম্প্রতি বগুড়ার একজন বিচারক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের সঙ্গে যে রূপ আচরণ করেছেন তাতে সে বিষয়টি আবার ব্যাপক আলোচনায় চলে এসেছে যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী সাধারণ মানুষকে দেশের মালিক তো দূরের কথা মানুষই মনে করেন না! সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই চলে এসেছে সরকারীদের এই মনোভাব। তাইতো দেশ স্বাধীনের পরপর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন - 'মানুষকে সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। তারাই দেশের মালিক।' আশা ছিল, পরিবর্তন হবে সরকারিদের 'মালিক বনে যাওয়া' মনোভাব। কিন্তু অর্ধশত বর্ষ চলে গেলেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না খুব বেশি অনুকূল পরিবর্তন। তাইতো জাতির জনকের কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্য করে বলতে বাধ্য হচ্ছেন- 'মানুষকে অবহেলার চোখে দেখবেন না বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিবেন। রিক্সাওয়ালাকেও আপনি করে বলবেন। মনে রাখবেন, আমরা জনগণের শাসক নয়, সেবক।' সরকারপ্রধানের এমন বক্তব্যে আমরা আসলেই খুব সম্মানিত বোধ করি এবং সরকারিদের নিকট থেকে সদ্ব্যবহার প্রত্যাশা করি। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমনভাবে দেখিনা, পাইনা, ভোগ করি না। 


বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রুবাইয়া ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে তার মেয়ের সহপাঠীদের অভিভাবকদের হেনস্তা, অবৈধভাবে ক্ষমতা ব্যবহার, সাইবার আইনে শিক্ষার্থীদের মামলার হুমকি ও অভিভাবকদের পা ধরতে বাধ্য করার প্রতিবাদে গত ২১ মার্চ ২০২৩ তারিখে রাস্তায় নেমে আসে বগুড়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে সংহতি প্রকাশ করেন অভিভাবকগণ। ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াতে। এক পর্যায়ে গত ২৩ মার্চ ২০২৩ তারিখে রুবাইয়া ইয়াসমিনকে বিচার কার্যক্রম থেকে প্রত্যাহার করে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। জানা যায়, বগুড়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা পালা করে নিজেদের ক্লাসরুম নিজেরাই পরিষ্কার করে থাকে। কিন্তু কিছুদিন আগে ভর্তি হওয়া ওই বিচারকের মেয়ে স্কুলের এই নিয়ম মানতে চায় না। সহপাঠীদের সাথে ক্লাসরুম পরিষ্কার করতে অনীহা দেখায় এবং নিজেকে উত্তম ও অন্যদের অধম ভাব প্রকাশ করে। এটি নিয়ে গত ২০ মার্চ ২০২৩ তারিখে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরণে উঠে! বিচারকের মেয়ে বাসায় গিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের 'বস্তির মেয়ে' উল্লেখ করে ফেসবুকে কটুক্তি মূলক স্ট্যাটাস দেয়। সেই কটূক্তিমূলক স্ট্যাটাসে তার সহপাঠীরাও কটূক্তিমূলক মন্তব্য করে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পুলিশ নিয়ে গত ২১ মার্চ ২০২৩ তারিখ মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুনের কক্ষে উপস্থিত হন ওই বিচারক। প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে অপমান-অপদস্ত করে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে তার পা ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেন।


এসব ইস্যুতে ওই দিনই প্রতিবাদী হয়ে উঠে বগুড়া সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসা ভিডিওতে এ ঘটনায় সর্বাধিক প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার মাহিকে। ভিডিওটিতে দেখা গেছে, ডিসি সাহেবসহ অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে লাইভে এসে যেভাবে মাহি বক্তব্য দিয়েছে তাতে তার মধ্যে নেতৃত্বের অনেক গুণাবলী লক্ষণীয়। সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নেতা হয়ে তাদের মনের কথা সে উপস্থাপন করেছে। সবার বিবেক জাগ্রত করার মত ছিল মাত্র ৮ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এই প্রতিবাদী শিক্ষার্থীর ভাষা। অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত প্রতিবাদ ছিল তার বক্তব্যের সারাংশে। এক পর্যায়ে সে ডিসি সাহেবকে বলেছে, আপনি এখন অবশ্যই বিশেষ। কেননা, আপনি এখন ডিসি সাহেব ও সভাপতি সাহেব হিসেবে এখানে এসেছেন। কিন্তু যখন আপনি আপনার মেয়ের অভিভাবক হিসেবে এখানে আসবেন তখন আপনিও অন্যান্য অভিভাবকের সমান। অথচ জজ সাহেব নিজের মেয়ের অভিভাবক হিসেবে স্কুলে এসে বড় ম্যাডামের রুমে বসে আমাদের ও আমাদের অভিভাবকদের ডেকে এনে অনেক অপমান করেছেন। আমাকে তুই তুকারি করেছেন। বলেছেন, তুই বেশি বেশি করছিস। তোর বাবা তরমুজের না কিসের ব্যবসায়ী। তুই আমার পাওয়ার জানিস? তোর কী ক্ষমতা আছে এরকম করার? জানিস, তোদের নামে মামলা দিব! জানিস, শিশু কারাগার আছে? তুই আমার ক্ষমতা দেখতে চাস? আমি ইংল্যান্ড আমেরিকা থেকে পড়াশোনা করে আসছি। তুই জানিস আমার কতগুলা ডিগ্রি আছে? তখন বড় ম্যামও জজ সাহেবের সাপোর্টে ছিলেন। বলছিলেন, আমাকে টিসি দেওয়া হবে, জেলে দেওয়া হবে। এসব করে আমার মাকে একরকম ফোর্স করা হইছে পা ধরার জন্য। পরে মা পা ধরে ক্ষমা চাইছে, আমিও ক্ষমা চাইছি। 


পরে ক্লাসরুমে গিয়ে বড় ম্যাম বলেছেন, যা হইছে ভালোই হইছে। পা ধরলে কারো জাত যায় না। এখানে আমার কোশ্চেনটা হচ্ছে, পা ধরলে যখন কারো জাত যায় না তখন জজ সাহেব এসে আমার মায়ের পা ধরলে তার তো জাত যাবে না। যদিও আমার মা এরকম না যে তাকে পায়ে ধরতে দিবে। বড় ম্যাম মাঠে এসে বলেছেন, তোমরা তিনজন কিন্তু বিপদে পড়বা। আমরা বড় ম্যামের বদলি চাই। আর ওই মেয়েটা (জজ সাহেবের মেয়ে) যদি এখানে থাকে আমরা পড়বো না এখানে। 


লক্ষণীয় যে, জজ সাহেবের এমন ভাষা ও মানসিকতা ওনার মেয়ের মধ্যে সঞ্চারিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে এখানে অন্য যে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে, মাহির সেই প্রতিবাদের ভাষা অত্যন্ত জোরালো, ধারালো ও যুক্তিপূর্ণ। তার উপস্থাপনা সাবলীল, ভাষা সংযত, মনোবল অধিক, সৎ সাহস অত্যাধিক। তার মধ্যে একিভূত শিক্ষা বাস্তবায়নের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জাগ্রত। সেই সাথে সাধারণের সম্মান প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার বিদ্যমান। তার সঠিক নেতৃত্বের ফলেই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের নীতি, নৈতিকতা, ন্যায্যতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও সম্মানবোধের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছেন উচ্চশিক্ষার সনদধারী একজন বিচারক। আমার মনে হচ্ছে, প্রয়োজনীয় উৎসাহ, উদ্দীপনা, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা পেলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে সে। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, এই আন্দোলন থেমে গেলে, সবার দৃষ্টি সরে গেলে, মাহি একা হয়ে গেলে, তদন্ত ঘুরিয়ে দেওয়া হলে, এই প্রতিবাদের প্রতিশোধ নেওয়া হলে- বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে তার ও তার অভিভাবকের! সেই সাথে ফেঁসে যেতে পারে তার সহপাঠীরাও! বড় ম্যাম তো বলেই দিয়েছেন- তোমরা তিনজন কিন্তু বিপদে পড়বা! এ বিষয়ে এলাকার ছাত্রশিক্ষকসহ সকল বিবেকবান মানুষ সজাগ দৃষ্টি রাখবেন আশা করি এবং সেই সাথে এও আশা করি যে, ভয়-ভীতি, রাগ-বিরাগের ঊর্ধ্বে ওঠে বড় মনের পরিচয় দিবেন বড় ম্যাম তথা প্রধান শিক্ষক। 


মরিয়ম আক্তার মাহিসহ সকল প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বলবো, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সুশৃংখল হয়ে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যেতে হবে সামনে। আমাদের সমাজে খুব বেশি প্রয়োজন তোমাদের মত প্রতিবাদী মানুষের। আবেগে, উচ্ছ্বাসে, যৌবনে, পরিবেশে, প্রতিকূলতায় ছিটকে গেলে চলবে না তোমাদের। ডিজিটাল প্রযুক্তির অপব্যবহারে আসক্ত হয়ে বখে গেলে চলবে না তোমাদের। শুধু ডিগ্রি নিয়ে নয়, সুশিক্ষা নিয়ে এ প্লাস মানুষ হয়ে আরো বড় বড় ক্ষেত্রে গিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে করতে হবে অন্যায়ের প্রতিরোধ।


লেখক : মো. রহমত উল্লাহ্, শিক্ষাবিদ ও অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি সরকারিদের মনোভাব।

বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি সরকারিদের মনোভাব।

 


বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি সরকারিদের মনোভাব 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে প্রায়ই বলে থাকেন, ‘মানুষকে অবহেলার চোখে দেখবেন না বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না। মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিবেন। রিকশাওয়ালাকেও আপনি করে বলবেন। মনে রাখবেন, আমরা জনগণের শাসক নয়, সেবক।’ তার পিতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বলতেন, ‘মানুষকে সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। তারাই দেশের মালিক।’

সরকারপ্রধানের এমন বক্তব্যে আমরা আসলেই খুব সম্মানিত বোধ করি এবং সরকারিদের নিকট থেকে সদ্ব্যবহার প্রত্যাশা করি। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন তেমনভাবে দেখিনা, পাইনা, ভোগ করি না।

কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই এমন ভাব দেখান যেন তারাই দেশের মালিক। চরম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন সেবাগ্রহীতা জনসাধারণকে। বিনামূল্যে কিংবা সরকারের নির্ধারিত চার্জে তারা করতে চান না জনগণের কোনো কাজ। ভালো ব্যবহার তো আরো অনেক দূরের কথা। সরকারের খাজনা দিতে গেলেও করে থাকেন হয়রানি। সরকারি হাসপাতলে গিয়েও বিনামূল্যে পাওয়া যায় না সঠিক চিকিৎসা ও ভালো ব্যবহার। নিজের টাকা জমা রাখতে গেলেও সম্মান পাওয়া যায়না সরকারি ব্যাংকে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে শুধু সাধারণ মানুষদের অসম্মান করেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন, তা নয়; বেসরকারি বা প্রাইভেট চাকরিজীবীদের প্রতিও দেখান না তেমন সম্মান। আজকের এই আলোচনায় শুধুমাত্র বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতি সরকারিদের মনোভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছি। দু'একটি উদাহরণ দিই: বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থাপিত পাবলিক পরীক্ষার কেন্দ্রে যখন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে আসেন কোন সরকারি কর্মকর্তা, তখন কী যে ভয়াবহ থাকে তিনার হামবড়া ভাব! শ্রদ্ধেয় পিতৃতুল্য শিক্ষকগণের প্রতিও দেখান না ন্যূনতম সম্মান। মাননীয় অধ্যক্ষ বা প্রধান শিক্ষককে সম্বোধন করেন ‘সাহেব’ বলে। অথচ প্রত্যাশা করেন, সবাই তাঁকে স্যার বলুক, দাঁড়িয়ে সম্মান করুক, দৌড়ে গিয়ে এগিয়ে আনুক, সাথে সাথে হাঁটতে থাকুক, বিশেষভাবে আপ্যায়ন করুক, যাবার সময় এগিয়ে দিয়ে আসুক। কী অবাক ব্যাপার, তিনি নিজে কাউকে সম্মান করবেন না, অথচ সম্মান প্রত্যাশা করবেন সবার কাছ থেকে!

বেসরকারি শিক্ষকগণ যখন নিজের বেতন তুলতে যান সরকারি ব্যাংকে তখন কি যে অসহনীয় হয় ব্যাংকারদের আচরণ তা বলে বোঝানোর মত নয়! তাঁরা একজন সাধারণ গ্রাহকের চেয়েও অবমূল্যায়ন ও হয়রানি করেন বেসরকারি শিক্ষকদের। এমন ভাব করেন যেন তাঁদের পকেটের টাকা নিয়ে নিচ্ছেন শিক্ষক। কথা বলেন ধমকের সুরে। অধিক বয়স্ক শিক্ষকগণের প্রতিও দেখান না ন্যূনতম সম্মান! কেননা, তারা জানেন, বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন, ক্ষমতা ও ব্যাংক ব্যালেন্স সবার চেয়ে কম! বাধ্য না হলে কোনোদিনও সরকারি ব্যাংকে যেতেন না বেসরকারি শিক্ষকগণ।

একদিন তিনজন নবীন সরকারি কর্মকর্তা এসেছিলেন আমার দপ্তরে। একজন সরকারি কলেজের প্রভাষক, একজন সরকারি ব্যাংকের অফিসার, একজন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা। তারা আমাদের পার্শ্ববর্তী একটি কেজি স্কুলের পরিচালক। তাদের স্কুলের একটি অনুষ্ঠান আমাদের বেসরকারি স্কুল ও কলেজের মাঠে করার অনুমতি নিতে এসেছিলেন তারা। আমার সন্তানও তাদের মতই সরকারি কর্মকর্তা। সন্তানতুল্য নবীন অফিসারদের আগমনে আনন্দে ভরে উঠল আমার মন। দেখালাম সর্বোচ্চ সৌজন্যতা, করলাম সাধ্যমত আপ্যায়ন। অথচ, আলাপকালে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলাম, তারা তিনজনই আমাকে সম্বোধন করছে ‘প্রিন্সিপাল সাহেব’ বলে! আরো বেশি অবাক হলাম, তাদের তিনজনের একজন কলেজ শিক্ষক! সে তার সিনিয়র কলিগের ফোন পেয়ে স্যার স্যার বলতে বলতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। এই কি শিক্ষা দেয়া হয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বুনিয়াদি ও অন্যান্য প্রশিক্ষণে? ম্যানার্স এন্ড এটিকেটস কি শুধু সরকারিদের সাথে সরকারিদের?

— হ্যালো স্যার। আসসালামু আলাইকুম স্যার। এটি কি স্যার ... সরকারি কলেজের নম্বর স্যার?
— ওয়ালাইকুম সালাম। না, এটি ... সরকারি কলেজের নম্বর নয়। আমি ... কলেজের অধ্যক্ষ বলছি। কে বলছিলেন প্লিজ।
— ও আচ্ছা, আমি ডিজি অফিস থেকে বলছি। শোনেন, আমরা কিছু তথ্য চেয়ে সব কলেজে মেইল পাঠিয়েছি। মেইল চেক করেন। কালকের মধ্যেই জবাব দিতে হবে।
— ঠিক আছে, দেখছি। কে বলছিলেন প্লিজ?
— আমি ডিজি অফিস থেকে বলছি।
— তাতো বুঝলাম। ডিজি অফিস থেকে কে বলছেন?
— ... শাখা থেকে বলছি। (ফোন কেটে দিলেন)
টেলিফোনের এই কথোপকথন গুলো একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের সঙ্গে সরকারি দপ্তরের কর্মচারীর। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, সরকারি দপ্তরের কর্মচারী যখন সরকারি কলেজের অফিসে ফোন করেছেন তখন বারবার স্যার স্যার বলেছেন। কিন্তু যখন তিনি জানতে পেরেছেন যে, এটি আসলে সরকারি কলেজের ফোন নম্বর নয় এবং একজন বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়ের সাথে তাঁর কথা হচ্ছে, তখন আর আগের মত স্যার স্যার বলছেন না। আদেশের সুরে কথা বলছেন। এমনকি তার নিজের সঠিক পরিচয়টিও অধ্যক্ষ মহোদয়ের নিকট দিচ্ছেন না। ন্যূনতম সৌজন্যতা না দেখেই ফোন কেটে দিয়েছেন। শুধু যে টেলিফোনেই তাঁরা এমন খারাপ আচরণ করেন তা নয়, অফিসে গেলে এর চেয়েও বেশি খারাপ আচরণ করে থাকেন। এ সকল কর্মচারীরা তাদের বসদের কাছ থেকেই শিখেছেন এমন আচরণ। তারা প্রতিদিন দেখেন যে সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকগণ ডেপুটেশনে ডিজি/বোর্ড অফিসে এসে হঠাৎ বস হয়ে কেমন খারাপ আচরণ করেন বেসরকারি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রদানগণের সঙ্গে!

সরকারি স্কুল-কলেজে কর্মরত শিক্ষকগণও চরম অবমূল্যায়ন করে থাকেন বেসরকারি শিক্ষকদের। সরকারি স্কুলের একজন সাধারণ শিক্ষক বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ স্যারকেও স্যার বলতে অনীহা দেখান। আর যারা সরকারি স্কুল-কলেজের হেডস্যার, প্রিন্সিপাল স্যার, তারা তো আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে। কেউ যদি শিক্ষা কর্মকর্তা হতে পারেন তো তিনার ভাবসাবই হয়ে যায় অন্যরকম! যেন সাক্ষাৎ ব্রাহ্মণ বনে গেছেন তিনি! কী বলবেন, কী করবেন, নিজেই ঠিক করতে পারেন না! বেসরকারিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর জন্যই যেন তিনি নাযিল হয়েছেন।

কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। আমার নিজের দেখা অতি উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আছেন যিনি শিক্ষকদের অত্যন্ত সম্মান করেন। সকল শিক্ষককেই সমীহ করেন, সরকারি-বেসরকারি আলাদা করেন না। এমনকি তিনার সন্তানকে প্রাইভেট পড়াতে বাসায় আসা হাউস টিউটরকেও স্যার বলে সম্বোধন করেন। শুধু শিক্ষকগণকেই নয়, সবাইকেই সম্মান করেন তিনি। তিনাকেও সম্মান করেন সবাই। সেই সম্মান ভয়ে নয়, শ্রদ্ধায় পরিপূর্ণ। তিনি যেমন মন থেকে সম্মান করেন সবাইকে, সবাই তেমনি মন থেকেই শ্রদ্ধা করেন তিনাকে। এটি-ই প্রকৃত শ্রদ্ধা, প্রকৃত সম্মান। ভয়ে স্যার বলায়, সালাম দেয়ায়, কুর্নিশ করায় প্রকৃত শ্রদ্ধা নেই, আন্তরিকতা নেই, পূণ্য নেই। প্রকৃত সম্মানেই আনে প্রকৃত সম্মান। এমনই তো হওয়া উচিত সকলের। তিনি ব্যতিক্রম হবেন কেন?

যিনি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হয়েছেন বলে অহংকার করেন, দেমাগ দেখান, ভাব ধরেন তিনিইতো ব্যতিক্রম হবার কথা। যে সকল সরকারিরা নিজেকে উত্তম ভাবেন, অন্যকে অধম ভাবেন, অসম্মান করেন, হয়রানি করেন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন, খারাপ আচরণ করেন, তারাই তো নগণ্য হবার কথা। মানুষের সংজ্ঞায় প্রকৃতপক্ষে তারাই তো অধম! অবশ্যই প্রয়োজন তাদের এই মানসিকতার পরিবর্তন এবং সেইসাথে প্রয়োজন বেসরকারি শিক্ষকগণের জীবনমান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদার উন্নয়ন।

মো. রহমত উল্লাহ: কলাম লেখক, সাহিত্যিক এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


পত্রিকার লিংক

শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক

পত্রিকার লিংক

শিক্ষকতার প্রশিক্ষণ অত্যাবশ্যক

মো. রহমত উল্লাহ্ 

দৈনিক শিক্ষা ও আমাদের বার্তা

০৭ জানুয়ারি ২০২৩

>পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে শিক্ষক হওয়ার জন্য ব্যাচেলর/ডিপ্লোমা ইন টিচিং ডিগ্রি বাধ্যতামূলক। তিনি যে পর্যায়ের, যে বিষয়ের শিক্ষকই হতে চান না কেন তার নিজস্ব বিষয়ে ডিগ্রির পাশাপাশি ব্যাচেলর/ডিপ্লোমা ইন টিচিং ডিগ্রি থাকতেই হবে। অর্থাৎ পাঠদানের বৈজ্ঞানিক কৌশল না জেনে কেউ শিক্ষক হতে পারেন না। অথচ আমাদের দেশে যে কেউ যে কোনো সময় শিক্ষক হয়ে যাচ্ছেন! শিক্ষক হওয়ার জন্য শিক্ষকতা শিক্ষা করার অর্থাৎ শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও পাঠদানের আধুনিক কলাকৌশল আয়ত্ত করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই! এমনকি অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেউ তার কাঙ্ক্ষিত অন্যান্য পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে শিক্ষকতায় আসেন/এসেছেন। দীর্ঘদিন ধরে এদেশে শিক্ষকতায় আর্থিক সুবিধা অত্যন্ত কম থাকা এর অন্যতম কারণ। নিজেই নিজেকে ব্যর্থ মনে করে অনিচ্ছায় শিক্ষকতায় আসা ও থাকা একজন মানুষ মনেপ্রাণে শিক্ষক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। এর মধ্যে যিনি নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রয়োজনীয় জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা লাভ করে শিক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি বা তারা সংখ্যায় খুব বেশি নন।


যতই আধুনিক শিক্ষা উপকরণ যুক্ত করা হোক, নতুন শিক্ষাক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হোক, উন্নত সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হোক, শিক্ষকের মান বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলে শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। শিক্ষকের মান বৃদ্ধি করা খুবই কঠিন কাজ। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেখানে সর্বোচ্চ মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসেননি, আসছেন না যুগ যুগ ধরে। টাকা হলে রাতারাতি শিক্ষা উপকরণ বদল করা যায়, পুরনো ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ করা যায়, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা আমদানি বা প্রস্তুত করা যায়, কিন্তু শিক্ষকদের বদল বা মানবৃদ্ধি করা যায় না। শিক্ষকের মানবৃদ্ধি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। শিক্ষকের বেতন সর্বোচ্চ নির্ধারণ করে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সব শিক্ষকের মান সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে যাবে এমনটি ভাবা অবাস্তব।


কেননা, এই আমি যতদিন আছি ততদিন দিয়েই যাবো ফাঁকি, রেখেই যাবো কম দক্ষতার স্বাক্ষর। ছোটবেলা থেকে এমন বলেই তো আমি হতে পারেনি ভালো ছাত্র, যেতে পারিনি অন্য কোথাও। তথাপি বৃদ্ধি করতে হবে আমার তথা শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা। তা না হলে শিক্ষকতায় আসবেন না আমার চেয়ে অধিক যোগ্যরা। প্রশিক্ষিতদের দিতে হবে আরো বর্ধিত বেতন। শিক্ষকতায় আনতে হবে সর্বোচ্চ মনোযোগী, মেধাবী ও যোগ্যদের। আমাদের সর্বাধিক মেধাবী ও যোগ্য সন্তানেরা যেদিন সাগ্রহে এসে দখল করবেন আমাদের স্থান সেদিনই উন্নীত হবে আমাদের শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত মান। সেটি যতই সময়সাপেক্ষ হোক এখন হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না কোনো অজুহাতেই। ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিয়ে যথাসম্ভব বৃদ্ধি করার চেষ্টা করতে হবে আমার মতো বিদ্যমান শিক্ষকদের মান। যতটুকু সম্ভব প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠদানে। এর কোনো বিকল্প নেই বর্তমান বাস্তবতায়।


আমাদের দেশে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের সুযোগ ও সুবিধা দুটোই অত্যন্ত সীমিত। ফলে এমপিওভুক্ত প্রায় ৫ লাখসহ বিপুলসংখ্যক প্রাইভেট ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকই রয়েছেন প্রশিক্ষণের বাইরে। কেননা, নিয়মিত শিক্ষকতার পাশাপাশি বিএড/ এমএড কোর্স সম্পন্ন করার সুযোগ অবারিত নয়। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকায় শিক্ষাছুটি দিতে চাননা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে পাঠিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয় বিধায় কর্তৃপক্ষ অনীহা দেখিয়ে থাকেন। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস পাওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ছুটি না নিয়েও কর্মরত সরকারি-বেসরকারি-প্রাইভেট শিক্ষকদের ডিপিএড, বিএড ও এমএড কোর্স করার সুযোগ থাকা আবশ্যক। 


বর্তমানে শিক্ষকদের বিএড ও এমএড কোর্স করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোতে যে ব্যবস্থা বিদ্যমান, সেখানে ইভিনিং কোর্স করার কোনো অনুমোদিত সুযোগ নেই। তাই ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছেন না প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকরা। অথচ এমন সুযোগ থাকা খুব বেশি প্রয়োজন। যেমন, আইনজীবীদের জন্য রয়েছে অনুমোদিত নাইট কলেজ। কর্মরত শিক্ষকরা বিশেষ করে অধিকাংশ বেসরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য না পাচ্ছেন ছুটি, না পাচ্ছেন ইভিনিং কোর্স করার সুযোগ। ফলে তারা ভর্তি হলেও নিয়মিত উপস্থিত থাকতে পারছেন না প্রশিক্ষণ ক্লাসে, নিতে পারছেন না শিক্ষক হয়ে ওঠার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। এহেন পরিস্থিতিতে টিটি কলেজগুলো পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত প্রশিক্ষণার্থী। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রয়োজনে সংশোধন বা পরিবর্তন বা প্রবর্তন করা উচিত ইভিনিং কোর্স চালু সংক্রান্ত বিধি-বিধান।


প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য নেওয়া উচিত ব্যাপক পরিকল্পনা। শুধু বেসরকারি বা প্রাইভেট নয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও রয়েছেন বিপুলসংখ্যক কম যোগ্য, কম দক্ষ শিক্ষক! শিশুদের পাঠদান অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া। পিটিয়ে কাউকে উত্তম মানুষ করা যায় না। শিশু-মনোবিজ্ঞান সম্পর্কিত জ্ঞান ও আধুনিক পাঠদান কৌশল আয়ত্ত না করে শিশুদের পাঠদান প্রায় অসম্ভব। শুধু সরকারি সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষকের জন্য নয়, বিপুলসংখ্যক বেসরকারি/প্রাইভেট স্কুল এবং মাদরাসার শিক্ষকদের জন্যও থাকা উচিত প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ ও বাধ্যবাধকতা। কেননা, তারাও পাঠদান করেন আমাদের বিপুলসংখ্যক সন্তানদের। 


অপরদিকে আমরা ভুলেই বসে আছি, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদেরও জানতে হয় টিচিং মেথড। শুধু নিজের পঠিত বিষয়ে ভালো ফলাফল করলেই ভালো শিক্ষক হওয়া যায় না। জানা এবং জানানোর মধ্যে অনেক তফাৎ। উন্নত অনেক দেশে পাঠদান যোগ্যতার সনদ ব্যতীত পিএইচডি ডিগ্রি থাকলেও কোনো পর্যায়েরই শিক্ষক হওয়া যায় না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া তো আরো অনেক দূরের কথা। শিক্ষক হতে হলে বিষয়ভিত্তিক ডিগ্রির পাশাপাশি ব্যাচেলর ইন টিচিং বা অনুরূপ ডিগ্রি থাকতে হয়। আমাদেরও ভাবতে হবে তেমনভাবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে তাদের বিদ্যমান ও অনাগত শিক্ষকদের আধুনিক টিচিং মেথড তথা পাঠদান কলাকৌশল ভিত্তিক প্রশিক্ষণের বিষয়ে।


সব পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক বিদ্যমান ও অনাগত শিক্ষকের প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য ৫৪টি পিটিআই এবং ১৪টি সরকারি ও ৭১টি বেসরকরি টিটি কলেজ যথেষ্ট নয়। প্রতি উপজেলায় থাকা উচিত অত্যাধুনিক টিচিং কলেজ। বর্তমানে শুধু মাধ্যমিক স্তরেই শিক্ষকতার মূল প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকের সংখ্যা ২ লাখের বেশি! একজন শিক্ষক একবার প্রশিক্ষণ নিয়ে সারাজীবন শিক্ষকতা করবেন এমনটি হওয়া উচিত নয়। পুরনো প্রশিক্ষণ নবায়ন করার জন্য, অধিক উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান করার জন্য, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করার জন্য, উৎসাহিত- উজ্জীবিত করে কর্মোদ্যম বৃদ্ধি করার জন্য প্রতি পাঁচবছর পর পর দেওয়া উচিত আপডেট প্রশিক্ষণ। অনন্তকাল চলমান এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করতে হবে উল্লেখযোগ্য পাঠদান প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকতে হবে সর্বস্তরের শিক্ষক তৈরির জন্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদানের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা। শিক্ষকদের বারবার প্রশিক্ষণে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা যাতে প্রাপ্য ক্লাস থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য রাখতে হবে ইভিনিং কোর্স করার সুযোগ। 


অবশ্যই শিথিল করতে হবে টিচিং প্রশিক্ষণে ভর্তির নিয়মকানুন। বিশেষ করে বিদ্যমান শিক্ষকদের সবাইকেই দিতে হবে ভর্তিতে অগ্রাধিকার। মনে রাখতে হবে, বিদ্যমান শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুব বেশি প্রয়োজন। যা অবশ্যই হতে হবে বাধ্যতামূলক, দীর্ঘমেয়াদি ও পর্যাপ্ত। সেই প্রশিক্ষণ কিন্তু নতুন প্রবর্তিত বা পরিবর্তিত কোনো ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য হঠাৎ আয়োজিত ৫-৭ দিনের দায়সারা কোনো কার্যক্রম নয়। যে শিক্ষকের একাডেমিক রেজাল্ট ভালো নেই তার জন্য প্রশিক্ষণ আরো বেশি প্রয়োজন। সকল শিক্ষকের জন্য টিচিং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করে, বিদ্যমান শিক্ষকদের জন্য ভর্তির নিয়ম শিথিল করে, অনাগত শিক্ষকদের জন্য হাই কোয়ালিটি এনশিওর করে, প্রশিক্ষণ প্রতষ্ঠানগুলোতে ইভিনিং কোর্স চালু করে দিলেই প্রয়োজন হবে আরো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের। 


নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, নিজেকে শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। শিক্ষক হয়ে ওঠার জন্য অন্যান্য অনেক যোগ্যতা ও গুণাবলীর পাশাপাশি অত্যাধুনিক পাঠদান কলা-কৌশল শিক্ষা করা (ব্যাচেলর/ডিপ্লোমা ইন টিচিং ডিগ্রি) অত্যাবশ্যক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোর নাম হওয়া উচিত ‘টিচিং কলেজ’। [Teaching colleges provide classes to help prepare people to teach at various levels. These may include elementary, middle and secondary school levels, as well as higher education, special education, adult education, vocational education etc.] সব টিচিং কলেজে অবশ্যই থাকতে হবে অত্যন্ত উদ্যমী, যোগ্য, দক্ষ প্রশিক্ষক। যেনতেনভাবে প্রশিক্ষক দিয়ে কখনো সফল হয় না কোনো প্রশিক্ষণ। আদর্শ শিক্ষক হওয়ার জন্য যে সকল গুণাবলী অর্জন করার কথা বলা হয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণে তার চেয়ে অধিক গুণাবলী থাকা উচিত প্রত্যেক প্রশিক্ষকের। তাই অধিক বেতন-ভাতা দিয়ে আমাদের তৈরি করতে হবে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক।  


আগামীতে অন্যান্য উন্নত দেশের মতো আমাদেরও এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হতে হবে যে, যারা শিক্ষকতায় আসবেন তারা আগেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে আসবেন এবং কর্মকালে ক্রমশ আধুনিক প্রশিক্ষণ নিতে থাকবেন। প্রশিক্ষণবিহীন কেউ শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে আমাদের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের মান। কেননা, মানব সন্তানকে মানুষ করার কঠিনতম কর্মটি হচ্ছে শিক্ষকের। শিক্ষক যতো সুযোগ্য হবেন, আদর্শবান হবেন, শিক্ষার্থী তথা  আমাদের প্রজন্ম ততোই যোগ্যতম হবেন, আরও সর্বোত্তম  হবেন। 


লেখক : শিক্ষাবিদ ও অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।




প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ। ইত্তেফাক, ২৫ ডিসেম্বর ২০২২

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ


দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ ডিসেম্বর ২০২২

মো. রহমত উল্লাহ্

সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, তোমরা যারা ২০২২ সালের পঞ্চম বা সমমান শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার্থী তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শুভেচ্ছা। তোমরা নিশ্চয়ই জানো, আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখ সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত ২ ঘন্টা অনুষ্ঠিত হবে তোমাদের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা। বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান এই ৪টি বিষয়ে ২৫ নম্বর করে মোট ১০০ নম্বরের একটি পরীক্ষা হবে তোমাদের। 


পরীক্ষার হলে দেওয়া হবে না পৃথক উত্তরপত্র। সরবরাহ করা হবে প্রশ্ন সম্বলিত একটি বুকলেট; যার নির্ধারিত স্থানে টিক চিহ্ন দিয়ে বা লিখে প্রদান করতে হবে প্রশ্নের উত্তর। প্রতিটি বিষয়ে ১৫টি এমসিকিউ বা বহুনির্বাচনী প্রশ্নে থাকবে ১৫ নম্বর। প্রতি প্রশ্নের চারটি অপশনের মধ্যে সঠিক উত্তরটিতে টিক চিহ্ন দিতে হবে। একই প্রশ্নের একাধিক অপশনে টিক চিহ্ন দেওয়া হলে ওই প্রশ্নের নির্ধারিত ১ নম্বর পাওয়া যাবে না। 

*বাংলা বিষয়ে ২টি অনুচ্ছেদ দেওয়া থাকবে। এই ২টি অনুচ্ছেদ থেকে ৪টি করে ৮টি বহু নির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে এবং অপর ৭টি বহু নির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে পুরো বই থেকে। তাছাড়া ১টি রচনামূলক প্রশ্ন থাকবে, যার মান হবে ১০ নম্বর। 

*গণিত বিষয়ে পুরো বই থেকে ১৫টি বহু নির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে। তাছাড়া ২টি সমস্যা সমাধানমূলক প্রশ্ন থাকবে। প্রতিটির মান ৫ নম্বর করে মোট ১০ নম্বর হবে। 

*ইংরেজি বিষয়ে পুরো বই থেকে ১৫টি বহু নির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে। তাছাড়া ১টি অনুচ্ছেদ লিখতে হবে, যার মান হবে ১০ নম্বর। 

*বিজ্ঞান বিষয়ে পুরো বই থেকে ১৫টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন থাকবে। তাছাড়া ২টি রচনামূলক প্রশ্ন থাকবে, প্রতিটির মান ৫ নম্বর করে মোট ১০ নম্বর হবে।


নিশ্চয়ই তোমরা ভয় পাও না পরীক্ষাকে। কিছুদিন আগেও অংশ নিয়েছ বার্ষিক পরীক্ষায়। সামান্য ঝালাই করে নাও সেই প্রস্তুতিটুকু। তোমরাই তো তোমাদের শ্রেণির ভালো ছাত্র। এগিয়ে যাও আনন্দের সাথে। সময় খুব বেশি নেই। গুরুত্বহীন ভাবলে চলবে না কোন পরীক্ষাকেই। বার বার পড়তে হবে মূল বই। প্রতিটি বিষয় বুঝে মনে রাখতে হবে এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজনে নিতে হবে শিক্ষকগণের ও গুরুজনের সহযোগিতা। সহপাঠীদের সাথে করতে হবে গ্রুপ স্টাডি। কোন প্রস্তুতিই বৃথা যায় না। তোমাদের শিক্ষার ভিত মজবুত করবে এই প্রস্তুতি। ছোটবেলার শিক্ষা মজবুত হলে দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যাওয়া যায় সারা জীবন।  


মনে রেখো, তোমাকে হয়ে উঠতে হবে দায়িত্বশীল। সময় মত সংগ্রহ করে নিতে হবে তোমার প্রবেশপত্র। জেনে নিতে হবে কোন প্রতিষ্ঠানে তোমার পরীক্ষার কেন্দ্র। পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগেই আসন গ্রহণ করতে হবে নির্ধারিত কক্ষে। খুব খেয়াল করে প্রশ্ন পড়ে বুঝে গুছিয়ে লিখতে হবে উত্তর। যেন শিক্ষক বুঝতে পারেন এটি তুমি নিজের মেধা থেকেই লিখেছ। তাতে তোমার নম্বর বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। 


বৃদ্ধি করতে হবে ধৈর্য ও মনোবল। মনে মনে বলতে হবে আমিও পারি, আমিও পারবো। তাই নিজেকে রাখতে হবে সুস্থ ও সবল। নিয়মিত করতে হবে নাওয়া, খাওয়া, বিশ্রাম ও ব্যায়াম। ঠিক রাখতে হবে ঘুমসহ সকল কাজের রুটিন। নিশ্চিত করতে হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন। সেইসাথে থাকতে হবে আত্মবিশ্বাস, করতে হবে পরিশ্রম। তবেই সফলতার দিকে এগিয়ে যাবে তোমাদের জীবন। 


মো. রহমত উল্লাহ্ 

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি। ২৩ আগস্ট ২০২২

বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি

আমাদের বার্তা, ২৩ আগস্ট ২০২২

মো. রহমত উল্লাহ্


'দুই ভাগে হোক বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ' শিরোনামে গত বছরের ১৪ আগস্টে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আমি লিখেছিলাম, 'বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবিটি তাদের প্রয়োজনের দিক থেকে খুবই মানবিক ও যৌক্তিক। দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে সোচ্চার বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। এ কারণেই একাধিক এমপিও নীতিমালায় বদলির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়ন করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু, কেন জানি- দীর্ঘ দিনেও তা সম্ভব হচ্ছে না বা করা হচ্ছে না! যতক্ষণ পর্যন্ত বদলির নীতিমালা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না - ততক্ষণ পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কেননা, তারা আগে নিয়োগ পেয়েছেন এবং অনেকদিন ধরে কষ্ট করে দূরে চাকরি করছেন। কোন ভাবেই নতুন নিয়োগ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামানো উচিত নয় বদলিপ্রত্যাশী বিদ্যমান এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। 


বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিভক্ত করতে হবে দুইভাগে। প্রতিবছর বা প্রতিবার পৃথক ভাবে সম্পন্ন করতে হবে দু'টি নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রথমে প্রদান করতে হবে শুধুমাত্র এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য বিশেষ বিজ্ঞপ্তি। এক্ষেত্রে কোন নতুন প্রার্থী আবেদন করতে পারবেন না। কেবলমাত্র বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধিত শিক্ষকরা আবেদন করতে পারবেন। এদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন সম্পন্ন করার পরবর্তীতে চিহ্নিত করতে হবে শূন্য পদ। সেই শূন্য পদে নতুনদের নিয়োগের জন্য প্রকাশ করতে হবে গণবিজ্ঞপ্তি। সেক্ষেত্রে কোন এমপিওভুক্ত শিক্ষক আবেদন করতে পারবেন না। শুধুমাত্র নিবন্ধিত প্রার্থীরা আবেদন করবেন। তাদের নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান শূন্যপদসমূহ পূর্ণ করা সম্ভব হবে। এভাবে প্রতিবছর বা প্রতিবার বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধিত শিক্ষকদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য একটি এবং শুধু নিবন্ধিত প্রার্থীদের নতুন নিয়োগের জন্য একটি অর্থাৎ মোট দু'টি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে অবশ্যই অনেকাংশে পূর্ণ হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বদলিপ্রত্যাশী লাখ লাখ শিক্ষকের দাবি। সেই সাথে নিয়োগ পাবেন অধিক সংখ্যক নতুন প্রার্থী এবং পূর্ণ হবে অধিক শূন্য পদ।'


যেহেতু বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় বেসরকারি শিক্ষকদের সরাসরি বদলি করা সম্ভব নয় এবং যেহেতু বদলির জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে এখনো সরকারি কোন কমিটি গঠন করা হয়নি, সেহেতু তাদের সরাসরি বদলির সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা অনিশ্চিত। তাই মন্দের ভালো হিসেবে উল্লেখিত লেখায় উত্থাপিত প্রস্তাবের সমর্থনেই ঐক্যবদ্ধ বদলিপ্রত্যাশী বেসরকারি শিক্ষকরা। সরাসরি বদলির বিকল্প পন্থাসমূহের মধ্যে এটিকেই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেন তারা। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য বিবেকবান মানুষও অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করেন এই প্রস্তাব। উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় দু'টি পৃথক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে প্রথমে এমপিওভুক্ত নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের এবং পরবর্তীতে শুধুমাত্র নিবন্ধনধারী প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে 'ইনডেক্সধারীদের নিয়োগ আলাদা প্রক্রিয়ায়' শিরোনামে একটি সংবাদ গত ২২ আগস্ট ২০২২ তারিখের দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত হলে বদলি প্রত্যাশীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু গত ১২ অক্টোবর ২০২২ তারিখের দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত অপর একটি প্রতিবেদনে চরমভাবে আশাহত হয়েছেন বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। যার শিরোনাম- 'প্রস্তাবেই আটকা ইনডেক্সধারী শিক্ষকদের আলাদা নিয়োগ'। জানা যায়, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সহজ ও প্রাপ্য সুযোগটিও পাচ্ছেন না বদলিপ্রত্যাশীরা। এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আয়োজন চলছে। তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে, এই গণবিজ্ঞপ্তির পূর্বে শুধুমাত্র ইনডেক্সধারী নিবন্ধিত শিক্ষকদের জন্য পৃথকভাবে বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সম্ভাবনা নেই। বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকগণের জন্য এটি অবশ্যই অত্যন্ত দুঃসংবাদ ও পরিতাপের বিষয়! আরো বৃদ্ধি পেল তাদের বুকে জমে থাকা দীর্ঘদিনের পাথরচাপা কষ্ট!


সর্বশেষ তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে যে, নতুন নিয়োগ প্রত্যাশী নিবন্ধনধারীদের সাথে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার কারণে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নতুন প্রার্থীরা। অপরদিকে বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের সাথে নতুনদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার কারণে তারা অনেকেই পুনঃনিয়োগ পাননি বিধায় যেতে পারেননি কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে। তারা বঞ্চিত হয়েছেন পরোক্ষ বদলির এই ন্যূনতম সুযোগ থেকে। ক্ষতির শিকার হয়েছেন উভয়পক্ষই। অপরদিকে বেশ কিছু ইনডেক্সধারী শিক্ষক এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার কারণে শূন্য পদের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। ফলে প্রায় ৮৯ লাখ আবেদন নিয়ে বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরেও শূন্য পদ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার। যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়! ক্ষতির শিকার হয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সংঘটিত হয়েছে ত্রিমুখী ক্ষতি! এরূপ অযৌক্তিক প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বারবার তৈরি হবে এমন চিত্র! বারবার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক শিক্ষক, বারবার নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক নতুন প্রার্থী, বারবার শূন্য থেকে যাবে অনেক অনেক পদ, প্রতিবারই অসন্তোষ বাড়তে থাকবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের উপর; যা কারও কাম্য নয়।


অপরদিকে এটিও মনে রাখতে হবে, আগামী ২০২৩ সাল থেকে আমরা যে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি শিক্ষকগণ সেই মননশীল কর্মযজ্ঞের অগ্রবর্তী সৈনিক। শিক্ষকদের মনে আনন্দ না থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ মোটেও তৈরি করা সম্ভব হবে না। নিশ্চয়ই বিপুল অর্থ ব্যয় হবে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য। তার কতটা বেসরকারি শিক্ষকদের ভাগ্যে নতুন করে আসবে তা আমরা জানি না, যদিও তা অত্যাবশ্য। অথচ কোনরূপ সরকারি অর্থ ব্যয় ব্যতীত তাদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ তথা বদলির সুযোগ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কষ্ট থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়া এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা আনন্দঘন পরিবেশ যুক্ত করা সম্ভব। যারা এ বিষয়টিকে গুরুত্বহীন ভাবছেন তারা নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে তথা শিক্ষার মানোন্নয়নে কতটা আন্তরিক সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। 


লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

আমাদের বার্তা, ২৩ আগস্ট ২০২২


বিনামূল্যের বই অবৈধ বিক্রি রোধ যেভাবে। আমাদের বার্তা, ২৮ নভেম্বর ২০২২

পত্রিকার লিংক

বিনামূল্যের বই অবৈধ বিক্রি রোধ যেভাবে

আমাদের বার্তা, ২৮ নভেম্বর ২০২২




মো. রহমত উল্লাহ্ 

গত ২৫ নভেম্বর ২০২২ তারিখে দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল "শিক্ষকদের পিকনিকের টাকা জোগাতে বিনামূল্যের বই বিক্রি"। জানা যায়, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয় কমিটি পুরাতন খাতা বিক্রি করার সময় বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে দিয়েছে। সরকারি বই পুরাতন হলেও বিক্রি করার অনুমতি না থাকায় তা বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি বই বিক্রি করার ছবিসহ পত্রিকায় রিপোর্ট হওয়ার কারণে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধরা পড়েছে, শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানই কি সরকারি বই বিক্রি করেছে নাকি আরও কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি বই বিক্রি করেছে ও করছে? যিনি পুরাতন বই ক্রয় করে ট্রাক ভর্তি করেছেন তাকে অনুসরণ করা হলে হয়ত তার গোডাউনে গিয়ে আরো অনেক সরকারি বই পাওয়া যাবে। তার মতো অন্যান্য ব্যবসায়ীদের খোঁজখবরও পাওয়া যাবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নিশ্চয়ই এমন আরো অনেক বই ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য পাওয়া যাবে। জানা যাবে, আর কোন কোন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে সে/তারা বই ক্রয় করেছে? কোনো শিক্ষা অফিস থেকে সরকারি পুরাতন বই ক্রয় করেছে কিনা? তখনই জানা যাবে, যারা সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে পত্রিকায় শিরোনাম হয়নি তাদের পরিচয় কী ও সংখ্যা কত!


বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে এবং আমার কাছে আসা একাধিক টেলিফোন থেকে জানা যায় যে, সরকারি পুরাতন বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়। পুরাতন কাগজ ক্রয় করে এমন একাধিক ব্যক্তি আমাকে প্রতিবছরই বারবার ফোন করে পুরাতন বই বিক্রির জন্য প্রস্তাব দিয়ে থাকে। তারা কোথায় থেকে আমার ফোন নম্বর পায় এমন প্রশ্ন করলে এর উত্তরে জানায় যে, সকল স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার ফোন নম্বরই তাদের কাছে আছে এবং তারা সবাইকেই ফোন করে পুরাতন বই-খাতা ক্রয় করে থাকে। কয়েকদিন আগেও আমাকে একজন ফোন করে বলেছে, পুরাতন বই-খাতা থাকলে আমাদের দিয়ে দেন স্যার। আমরা রেট ভালো দিবো। এখন কাগজের রেট ভালো আছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বই ৪৫ টাকা এবং প্রতি কেজি খাতা ৫৫ টাকা দরে নেওয়া যাবে। পরে হয়তো এই রেট নাও থাকতে পারে। আপনার কোন সমস্যা হবে না স্যার। আপনি যখন বলবেন তখনই আমরা এসে নিয়ে যাব। 


যদি পুরাতন কাগজ ব্যবসায়ীদের এসকল বক্তব্য শতভাগ সঠিক নাও হয়; তথাপি এটি পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, সারাদেশে অবস্থিত অনেক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে থাকে। শুধু যে পিকনিক করার জন্য বা আর্থিক অনটনের জন্য অথবা অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য এ সকল বই বিক্রি হয়ে থাকে তা নয়। আর্থিক অনটন বা অবৈধ অর্থ উপার্জন ছাড়াও এর সঙ্গে বেশ কিছু কারণ জড়িত। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, প্রতিবছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিচের শ্রেণির শিক্ষার্থীর সংখ্যাকে ভিত্তিতে করে তার সাথে ফাঁকা আসনের বিপরীতে সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা যোগ করে উপরের ক্লাসের বইয়ের আনুমানিক চাহিদা দিয়ে থাকে। যেমন, একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে যত জন শিক্ষার্থী থাকে তার সাথে আগামী বছর পঞ্চম শ্রেণিতে যতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবার সম্ভাবনা থাকে তা যোগ করে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক ও/বা প্রথম শ্রেণিতে এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাশার ভিত্তিতে অবাস্তব অনুমান করে বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়। অন্যান্য শ্রেণিতেও আসন ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে প্রত্যাশার ভিত্তিতে বইয়ের চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ তারা কিছু বাড়তি বইয়ের চাহিদা দিয়ে থাকে যাতে শিক্ষার্থীরা উপরের ক্লাসে প্রমোশন পেয়ে বা নতুন ভর্তি হয়ে নতুন বই পেতে বিলম্ব/অসুবধা না হয় এবং শিক্ষার্থীদের মন খারাপ না হয়। কেননা, আগে থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, কোন ক্লাসের কতজন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হবে, কতজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে, কতজন নতুন শিক্ষার্থী এসে ভর্তি হবে। পরবর্তীতে সকল শিক্ষার্থী প্রমোশন না পেলে, কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়লে ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি না হলে বিভিন্ন শ্রেণির কিছু কিছু বই অতিরিক্ত থেকে যায়। বিশেষ করে কোভিড ১৯ পরিস্থিতির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালের অনেক বই অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এই বাস্তব কারণে অতিরিক্ত থেকে যাওয়া কয়েক বৎসরের বই থানা/ উপজেলা শিক্ষা অফিস ফেরত না নিলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই স্থান সংকুলান সমস্যা হয় এবং অযত্নে বিনষ্ট হয়। আবার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেঁচে যাওয়া একাধিক বছরের বই একত্রে থানা/উপজেলা শিক্ষা অফিসে রাখার জায়গাও পর্যাপ্ত নেই। কেননা, প্রতি বৎসর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষা অফিসে নতুন বই রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুরাতন বই বিক্রি করে দিতে চায়। কিন্তু বৈধভাবে তা করতে পারে না!


এমতাবস্থায় অব্যবহৃত সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করার জন্য প্রতি বৎসর বাজার দর যাচাই করে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে একটি সরকারি আদেশ জারি করা আবশ্যক। সেই আদেশটি হতে পারে এমন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজে এক বছরের অধিক পুরাতন বই বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা সরকারি কোষাগরের নির্দিষ্ট হিসাব নম্বরে জমা দিবে। সেই সাথে কোন কোন শ্রেণির কোন কোন বিষয়ের মোট কতটি বই কত কেজি হয়েছিল তার একটি ছকবদ্ধ হিসাব অনলাইনে ও হার্ডকপিতে জমা দিবে। যাতে তাদের প্রদত্ত বইয়ের চাহিদা, ব্যবহৃত বইয়ের সংখ্যা ও অব্যবহৃত বইয়ের সংখ্যা তুলনা করে সিস্টেম লস নির্ধারণ করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয়। অথবা এর চেয়ে উত্তম হতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক বৎসরের অধিক অব্যবহৃত সকল পুরাতন বই নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে থানা/উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দিবে। শিক্ষা অফিস সে বই প্রতি বৎসর নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিবে এবং সেইসাথে বিক্রিত বইয়ের ছকবদ্ধ হিসাব অনলাইনে ও হার্ডকপিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিবে। এতে করে সরকারি পুরাতন বই অবৈধভাবে বিক্রির সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে এবং নতুন বই সযত্নে রাখার শূন্যস্থান বৃদ্ধি পাবে। 


তাছাড়া বইয়ের চাহিদা নেওয়ার সময়ও এমন আদেশ থাকতে হবে যেন, কোনভাবেই অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা কেউ দিতে না পারে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক ট্রাক অব্যবহৃত বই থাকা কোনভাবে স্বাভাবিক সিস্টেম লস নয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিভিত্তিক প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ প্রায় সকল তথ্যই শিক্ষাবিভাগে বিদ্যমান। কোন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, থানার/উপজেলার ও জেলার বিগত কয়েক বৎসরের প্রকৃত শিক্ষার্থী হ্রাস-বৃদ্ধির হার পর্যালোচনা করলেই সংশ্লিষ্টদের বইয়ের স্বাভাবিক চাহিদা নির্ধারণ করা সম্ভব; যাতে সামান্য সিস্টেম লস থাকতে পারে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা প্রদান করলে তাও আইডেন্টিফাই করা সম্ভব। নতুন শিক্ষাবর্ষে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যাওয়া-আসা ঘটলেও একটি থানার/উপজেলার বা জেলার মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব বেশি হেরফের ঘটে না। শহরের তুলনায় গ্রামে এই হেরফের আরও কম থাকে। তাই অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, থানা/উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তি নিশ্চিত করা আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, সাধারণ জনগণের টাকায় ছাপানো এ সকল বই অপচয় করা মানেই সরকারি সম্পদের অপচয় করা। এক্ষেত্রে কারো উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও দুর্ভিসন্ধি কোনভাবেই মেনে নেওয়া উচিত নয়। 


মো. রহমত উল্লাহ্ 

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক


অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ।


https://www.dainikshiksha.com/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%87-%E0%A6%85%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%A7-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7-%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87/242799/

পত্রিকার লিংক