বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি। ২৩ আগস্ট ২০২২

বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি

আমাদের বার্তা, ২৩ আগস্ট ২০২২

মো. রহমত উল্লাহ্


'দুই ভাগে হোক বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ' শিরোনামে গত বছরের ১৪ আগস্টে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আমি লিখেছিলাম, 'বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির দাবিটি তাদের প্রয়োজনের দিক থেকে খুবই মানবিক ও যৌক্তিক। দীর্ঘদিন ধরে এই দাবিতে সোচ্চার বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। এ কারণেই একাধিক এমপিও নীতিমালায় বদলির প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা তৈরির মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়ন করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু, কেন জানি- দীর্ঘ দিনেও তা সম্ভব হচ্ছে না বা করা হচ্ছে না! যতক্ষণ পর্যন্ত বদলির নীতিমালা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না - ততক্ষণ পর্যন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া উচিত। কেননা, তারা আগে নিয়োগ পেয়েছেন এবং অনেকদিন ধরে কষ্ট করে দূরে চাকরি করছেন। কোন ভাবেই নতুন নিয়োগ প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামানো উচিত নয় বদলিপ্রত্যাশী বিদ্যমান এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। 


বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বিভক্ত করতে হবে দুইভাগে। প্রতিবছর বা প্রতিবার পৃথক ভাবে সম্পন্ন করতে হবে দু'টি নিয়োগ প্রক্রিয়া। প্রথমে প্রদান করতে হবে শুধুমাত্র এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য বিশেষ বিজ্ঞপ্তি। এক্ষেত্রে কোন নতুন প্রার্থী আবেদন করতে পারবেন না। কেবলমাত্র বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধিত শিক্ষকরা আবেদন করতে পারবেন। এদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন সম্পন্ন করার পরবর্তীতে চিহ্নিত করতে হবে শূন্য পদ। সেই শূন্য পদে নতুনদের নিয়োগের জন্য প্রকাশ করতে হবে গণবিজ্ঞপ্তি। সেক্ষেত্রে কোন এমপিওভুক্ত শিক্ষক আবেদন করতে পারবেন না। শুধুমাত্র নিবন্ধিত প্রার্থীরা আবেদন করবেন। তাদের নিয়োগের মাধ্যমে বিদ্যমান শূন্যপদসমূহ পূর্ণ করা সম্ভব হবে। এভাবে প্রতিবছর বা প্রতিবার বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধিত শিক্ষকদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য একটি এবং শুধু নিবন্ধিত প্রার্থীদের নতুন নিয়োগের জন্য একটি অর্থাৎ মোট দু'টি নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলে অবশ্যই অনেকাংশে পূর্ণ হবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বদলিপ্রত্যাশী লাখ লাখ শিক্ষকের দাবি। সেই সাথে নিয়োগ পাবেন অধিক সংখ্যক নতুন প্রার্থী এবং পূর্ণ হবে অধিক শূন্য পদ।'


যেহেতু বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় বেসরকারি শিক্ষকদের সরাসরি বদলি করা সম্ভব নয় এবং যেহেতু বদলির জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্যে এখনো সরকারি কোন কমিটি গঠন করা হয়নি, সেহেতু তাদের সরাসরি বদলির সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা অনিশ্চিত। তাই মন্দের ভালো হিসেবে উল্লেখিত লেখায় উত্থাপিত প্রস্তাবের সমর্থনেই ঐক্যবদ্ধ বদলিপ্রত্যাশী বেসরকারি শিক্ষকরা। সরাসরি বদলির বিকল্প পন্থাসমূহের মধ্যে এটিকেই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেন তারা। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যান্য বিবেকবান মানুষও অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করেন এই প্রস্তাব। উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় দু'টি পৃথক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে প্রথমে এমপিওভুক্ত নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের এবং পরবর্তীতে শুধুমাত্র নিবন্ধনধারী প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি এনটিআরসিএ কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে 'ইনডেক্সধারীদের নিয়োগ আলাদা প্রক্রিয়ায়' শিরোনামে একটি সংবাদ গত ২২ আগস্ট ২০২২ তারিখের দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত হলে বদলি প্রত্যাশীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু গত ১২ অক্টোবর ২০২২ তারিখের দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত অপর একটি প্রতিবেদনে চরমভাবে আশাহত হয়েছেন বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকরা। যার শিরোনাম- 'প্রস্তাবেই আটকা ইনডেক্সধারী শিক্ষকদের আলাদা নিয়োগ'। জানা যায়, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সহজ ও প্রাপ্য সুযোগটিও পাচ্ছেন না বদলিপ্রত্যাশীরা। এদিকে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগের জন্য চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আয়োজন চলছে। তাতে প্রতীয়মান হচ্ছে, এই গণবিজ্ঞপ্তির পূর্বে শুধুমাত্র ইনডেক্সধারী নিবন্ধিত শিক্ষকদের জন্য পৃথকভাবে বিশেষ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সম্ভাবনা নেই। বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকগণের জন্য এটি অবশ্যই অত্যন্ত দুঃসংবাদ ও পরিতাপের বিষয়! আরো বৃদ্ধি পেল তাদের বুকে জমে থাকা দীর্ঘদিনের পাথরচাপা কষ্ট!


সর্বশেষ তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে যে, নতুন নিয়োগ প্রত্যাশী নিবন্ধনধারীদের সাথে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পুনঃনিয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়ার কারণে নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন নতুন প্রার্থীরা। অপরদিকে বিদ্যমান এমপিওভুক্ত নিবন্ধনধারী শিক্ষকদের সাথে নতুনদের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার কারণে তারা অনেকেই পুনঃনিয়োগ পাননি বিধায় যেতে পারেননি কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে। তারা বঞ্চিত হয়েছেন পরোক্ষ বদলির এই ন্যূনতম সুযোগ থেকে। ক্ষতির শিকার হয়েছেন উভয়পক্ষই। অপরদিকে বেশ কিছু ইনডেক্সধারী শিক্ষক এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার কারণে শূন্য পদের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। ফলে প্রায় ৮৯ লাখ আবেদন নিয়ে বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পরেও শূন্য পদ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার। যা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়! ক্ষতির শিকার হয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ সংঘটিত হয়েছে ত্রিমুখী ক্ষতি! এরূপ অযৌক্তিক প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বারবার তৈরি হবে এমন চিত্র! বারবার প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক শিক্ষক, বারবার নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হবেন অনেক নতুন প্রার্থী, বারবার শূন্য থেকে যাবে অনেক অনেক পদ, প্রতিবারই অসন্তোষ বাড়তে থাকবে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের উপর; যা কারও কাম্য নয়।


অপরদিকে এটিও মনে রাখতে হবে, আগামী ২০২৩ সাল থেকে আমরা যে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি শিক্ষকগণ সেই মননশীল কর্মযজ্ঞের অগ্রবর্তী সৈনিক। শিক্ষকদের মনে আনন্দ না থাকলে শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ মোটেও তৈরি করা সম্ভব হবে না। নিশ্চয়ই বিপুল অর্থ ব্যয় হবে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য। তার কতটা বেসরকারি শিক্ষকদের ভাগ্যে নতুন করে আসবে তা আমরা জানি না, যদিও তা অত্যাবশ্য। অথচ কোনরূপ সরকারি অর্থ ব্যয় ব্যতীত তাদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ তথা বদলির সুযোগ দিয়ে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কষ্ট থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়া এবং শিক্ষাক্ষেত্রে কিছুটা আনন্দঘন পরিবেশ যুক্ত করা সম্ভব। যারা এ বিষয়টিকে গুরুত্বহীন ভাবছেন তারা নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে তথা শিক্ষার মানোন্নয়নে কতটা আন্তরিক সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। 


লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক

আমাদের বার্তা, ২৩ আগস্ট ২০২২


বিনামূল্যের বই অবৈধ বিক্রি রোধ যেভাবে। আমাদের বার্তা, ২৮ নভেম্বর ২০২২

পত্রিকার লিংক

বিনামূল্যের বই অবৈধ বিক্রি রোধ যেভাবে

আমাদের বার্তা, ২৮ নভেম্বর ২০২২




মো. রহমত উল্লাহ্ 

গত ২৫ নভেম্বর ২০২২ তারিখে দৈনিক শিক্ষায় প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল "শিক্ষকদের পিকনিকের টাকা জোগাতে বিনামূল্যের বই বিক্রি"। জানা যায়, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রয়-বিক্রয় কমিটি পুরাতন খাতা বিক্রি করার সময় বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে দিয়েছে। সরকারি বই পুরাতন হলেও বিক্রি করার অনুমতি না থাকায় তা বিক্রি করা আইনত দণ্ডনীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি বই বিক্রি করার ছবিসহ পত্রিকায় রিপোর্ট হওয়ার কারণে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধরা পড়েছে, শুধুমাত্র সেই প্রতিষ্ঠানই কি সরকারি বই বিক্রি করেছে নাকি আরও কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি বই বিক্রি করেছে ও করছে? যিনি পুরাতন বই ক্রয় করে ট্রাক ভর্তি করেছেন তাকে অনুসরণ করা হলে হয়ত তার গোডাউনে গিয়ে আরো অনেক সরকারি বই পাওয়া যাবে। তার মতো অন্যান্য ব্যবসায়ীদের খোঁজখবরও পাওয়া যাবে। তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নিশ্চয়ই এমন আরো অনেক বই ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য পাওয়া যাবে। জানা যাবে, আর কোন কোন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে সে/তারা বই ক্রয় করেছে? কোনো শিক্ষা অফিস থেকে সরকারি পুরাতন বই ক্রয় করেছে কিনা? তখনই জানা যাবে, যারা সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে পত্রিকায় শিরোনাম হয়নি তাদের পরিচয় কী ও সংখ্যা কত!


বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে এবং আমার কাছে আসা একাধিক টেলিফোন থেকে জানা যায় যে, সরকারি পুরাতন বই বিক্রির সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম নয়। পুরাতন কাগজ ক্রয় করে এমন একাধিক ব্যক্তি আমাকে প্রতিবছরই বারবার ফোন করে পুরাতন বই বিক্রির জন্য প্রস্তাব দিয়ে থাকে। তারা কোথায় থেকে আমার ফোন নম্বর পায় এমন প্রশ্ন করলে এর উত্তরে জানায় যে, সকল স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার ফোন নম্বরই তাদের কাছে আছে এবং তারা সবাইকেই ফোন করে পুরাতন বই-খাতা ক্রয় করে থাকে। কয়েকদিন আগেও আমাকে একজন ফোন করে বলেছে, পুরাতন বই-খাতা থাকলে আমাদের দিয়ে দেন স্যার। আমরা রেট ভালো দিবো। এখন কাগজের রেট ভালো আছে। বর্তমানে প্রতি কেজি বই ৪৫ টাকা এবং প্রতি কেজি খাতা ৫৫ টাকা দরে নেওয়া যাবে। পরে হয়তো এই রেট নাও থাকতে পারে। আপনার কোন সমস্যা হবে না স্যার। আপনি যখন বলবেন তখনই আমরা এসে নিয়ে যাব। 


যদি পুরাতন কাগজ ব্যবসায়ীদের এসকল বক্তব্য শতভাগ সঠিক নাও হয়; তথাপি এটি পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে যে, সারাদেশে অবস্থিত অনেক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করে থাকে। শুধু যে পিকনিক করার জন্য বা আর্থিক অনটনের জন্য অথবা অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য এ সকল বই বিক্রি হয়ে থাকে তা নয়। আর্থিক অনটন বা অবৈধ অর্থ উপার্জন ছাড়াও এর সঙ্গে বেশ কিছু কারণ জড়িত। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, প্রতিবছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নিচের শ্রেণির শিক্ষার্থীর সংখ্যাকে ভিত্তিতে করে তার সাথে ফাঁকা আসনের বিপরীতে সম্ভাব্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা যোগ করে উপরের ক্লাসের বইয়ের আনুমানিক চাহিদা দিয়ে থাকে। যেমন, একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে যত জন শিক্ষার্থী থাকে তার সাথে আগামী বছর পঞ্চম শ্রেণিতে যতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবার সম্ভাবনা থাকে তা যোগ করে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক-প্রাথমিক ও/বা প্রথম শ্রেণিতে এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণিতে কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি হবে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাশার ভিত্তিতে অবাস্তব অনুমান করে বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়। অন্যান্য শ্রেণিতেও আসন ফাঁকা থাকা সাপেক্ষে প্রত্যাশার ভিত্তিতে বইয়ের চাহিদা কিছুটা বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ তারা কিছু বাড়তি বইয়ের চাহিদা দিয়ে থাকে যাতে শিক্ষার্থীরা উপরের ক্লাসে প্রমোশন পেয়ে বা নতুন ভর্তি হয়ে নতুন বই পেতে বিলম্ব/অসুবধা না হয় এবং শিক্ষার্থীদের মন খারাপ না হয়। কেননা, আগে থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে, কোন ক্লাসের কতজন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হবে, কতজন শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে, কতজন নতুন শিক্ষার্থী এসে ভর্তি হবে। পরবর্তীতে সকল শিক্ষার্থী প্রমোশন না পেলে, কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়লে ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি না হলে বিভিন্ন শ্রেণির কিছু কিছু বই অতিরিক্ত থেকে যায়। বিশেষ করে কোভিড ১৯ পরিস্থিতির কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালের অনেক বই অব্যবহৃত রয়ে গেছে। এই বাস্তব কারণে অতিরিক্ত থেকে যাওয়া কয়েক বৎসরের বই থানা/ উপজেলা শিক্ষা অফিস ফেরত না নিলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই স্থান সংকুলান সমস্যা হয় এবং অযত্নে বিনষ্ট হয়। আবার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেঁচে যাওয়া একাধিক বছরের বই একত্রে থানা/উপজেলা শিক্ষা অফিসে রাখার জায়গাও পর্যাপ্ত নেই। কেননা, প্রতি বৎসর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষা অফিসে নতুন বই রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার প্রয়োজন হয়। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে পুরাতন বই বিক্রি করে দিতে চায়। কিন্তু বৈধভাবে তা করতে পারে না!


এমতাবস্থায় অব্যবহৃত সরকারি পুরাতন বই বিক্রি করার জন্য প্রতি বৎসর বাজার দর যাচাই করে ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে একটি সরকারি আদেশ জারি করা আবশ্যক। সেই আদেশটি হতে পারে এমন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিজে এক বছরের অধিক পুরাতন বই বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা সরকারি কোষাগরের নির্দিষ্ট হিসাব নম্বরে জমা দিবে। সেই সাথে কোন কোন শ্রেণির কোন কোন বিষয়ের মোট কতটি বই কত কেজি হয়েছিল তার একটি ছকবদ্ধ হিসাব অনলাইনে ও হার্ডকপিতে জমা দিবে। যাতে তাদের প্রদত্ত বইয়ের চাহিদা, ব্যবহৃত বইয়ের সংখ্যা ও অব্যবহৃত বইয়ের সংখ্যা তুলনা করে সিস্টেম লস নির্ধারণ করে জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব হয়। অথবা এর চেয়ে উত্তম হতে পারে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এক বৎসরের অধিক অব্যবহৃত সকল পুরাতন বই নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে থানা/উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দিবে। শিক্ষা অফিস সে বই প্রতি বৎসর নিলামে বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিবে এবং সেইসাথে বিক্রিত বইয়ের ছকবদ্ধ হিসাব অনলাইনে ও হার্ডকপিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দিবে। এতে করে সরকারি পুরাতন বই অবৈধভাবে বিক্রির সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে এবং নতুন বই সযত্নে রাখার শূন্যস্থান বৃদ্ধি পাবে। 


তাছাড়া বইয়ের চাহিদা নেওয়ার সময়ও এমন আদেশ থাকতে হবে যেন, কোনভাবেই অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা কেউ দিতে না পারে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক ট্রাক অব্যবহৃত বই থাকা কোনভাবে স্বাভাবিক সিস্টেম লস নয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিভিত্তিক প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যাসহ প্রায় সকল তথ্যই শিক্ষাবিভাগে বিদ্যমান। কোন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, থানার/উপজেলার ও জেলার বিগত কয়েক বৎসরের প্রকৃত শিক্ষার্থী হ্রাস-বৃদ্ধির হার পর্যালোচনা করলেই সংশ্লিষ্টদের বইয়ের স্বাভাবিক চাহিদা নির্ধারণ করা সম্ভব; যাতে সামান্য সিস্টেম লস থাকতে পারে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা প্রদান করলে তাও আইডেন্টিফাই করা সম্ভব। নতুন শিক্ষাবর্ষে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের যাওয়া-আসা ঘটলেও একটি থানার/উপজেলার বা জেলার মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা খুব বেশি হেরফের ঘটে না। শহরের তুলনায় গ্রামে এই হেরফের আরও কম থাকে। তাই অস্বাভাবিক অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধান, থানা/উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা ও শাস্তি নিশ্চিত করা আবশ্যক। মনে রাখতে হবে, সাধারণ জনগণের টাকায় ছাপানো এ সকল বই অপচয় করা মানেই সরকারি সম্পদের অপচয় করা। এক্ষেত্রে কারো উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা ও দুর্ভিসন্ধি কোনভাবেই মেনে নেওয়া উচিত নয়। 


মো. রহমত উল্লাহ্ 

সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও কলাম লেখক


অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ।


https://www.dainikshiksha.com/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%82%E0%A6%B2%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%87-%E0%A6%85%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%A7-%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%A7-%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87/242799/

পত্রিকার লিংক


বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গ। দৈনিক ইত্তেফাক, ০৮ নভেম্বর ২০১৯


বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গ

মো. রহমত উল্লাহ্

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯

দৈনিক ইত্তেফাক

পত্রিকার লিংক

বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গ

নিয়োজিত কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই বদলি ব্যবস্থা বিদ্যমান। এই বিধানের আওতায় একই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এক স্থান বা অফিস থেকে অন্যস্থানে বা অফিসে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় বদলি হয়ে থাকেন। এই বদলি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের থাকে অনেক কাজ, কর্মীদের থাকে অনেক সন্তোষ-অসন্তোষ, থাকে অনেক তদ্বির এবং আরো অনেক অনেক না-বলা কথা। তথাপি বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান বদলি ব্যবস্থা। কেননা, নিজের সুবিধাজনক স্থানে বদলির সুযোগ পাওয়া কর্মীর অধিকার এবং প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে বা সুবিধার্থে কর্মীকে বদলি করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা। অথচ বেসরকারি শিক্ষকদের এমন বদলির কোনো সুযোগ নেই। তাই বদলির সুযোগ চেয়ে আন্দোলন করছেন বেশ কিছু এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক। ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীদের কষ্ট লাঘব ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষার মানোন্নয়ন—এ দুটি বিষয় বিবেচনায় রেখে যথাশিগিগর সম্ভব সুষ্ঠু বদলি বিধি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করা উচিত।  


বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন, আমাদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের বিদ্যমান অবস্থায় এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারী বদলির বিধানটি কেমন হলে ভালো হবে? যেখানে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ আলাদা, পরিচালনা কমিটি আলাদা, কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠান অংশের আর্থিক-অনার্থিক সুবিধাদি আলাদা, নিয়োগের শর্ত কম-বেশি আলাদা এবং নিয়োগকর্তাও আলাদা। সরকারি কিছু বিধিবিধান মেনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হলেও শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, পদাবনতি, শাস্তি, বরখাস্ত, অবসর ইত্যাদি কার্যকর করার ক্ষমতা কিন্তু সংশ্লিষ্ট পরিচালনা কমিটির হাতেই। অপরদিকে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগকর্তা সরকার। সব প্রতিষ্ঠানের বেতন, ভাতা, সিপিএফ ও অন্যান্য সুবিধা সমান। পদোন্নতি ব্যবস্থা কেন্দ্রীয়। তাই সেখানে এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বদলি কার্যকর করা সম্ভব। তবুও বাস্তবায়ন হচ্ছে না তিন বছর পরপর বদলির সেই বিধান।  


বেসরকারি একেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তহবিল ও সুযোগ সুবিধা একেক রকম বিধায় এখানে শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলির সুযোগ দেওয়া হলে কেউ কেউ যেমন নিজের এলাকায় অবস্থিত ভালো প্রতিষ্ঠানে যেতে চাইবেন তেমনি অধিকাংশই অধিক সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান ও শহরে/অনুকূলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তদ্বির করবেন। একটা পদের বিপরীতে আবেদন আসবে হাজারটা। কোন বিবেচনায় গ্রহণ করা হবে কার একটি আবেদন, আর বাদ দেওয়া হবে বাকি সব? তখন হয়তো সেখানে হবে হাজারো অনিয়ম। শুরু হবে ধাক্কাধাক্কি ও ক্ষমতার অপব্যবহার। আবার কাউকে ফোর্স ট্রান্সফার দেওয়া হলে সে দায়ের করবে রিট। বলবে, আমি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছি সেই প্রতিষ্ঠানেই থাকব। নিয়োগের সময় আমাকে বদলি করা হবে এমন কোনো শর্ত ছিল না।


এসব বাস্তব অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বদলির জন্য সর্বজন গৃহীত একটি সুষ্ঠু বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব। অবশ্য যখন সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন, ভাতা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকার প্রদান করবে এবং পরিচালনা কমিটির ক্ষমতা আরো হ্রাস করবে তখন বিষয়টি এত বেশি জটিল থাকবে না।


বর্তমানে বাধ্যতামূলক বদলির (ফোর্স ট্রান্সফারের) সুযোগ দেওয়া হলে অধিক সচ্ছল ও সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য অধিকাংশ শিক্ষকের মধ্যে শুরু হবে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ফলে বেড়ে যেতে পারে অসত্ শিক্ষা কর্মকর্তাদের অবৈধ আয়। শুরু হতে পারে ক্ষমতার অপব্যবহার। অধিক যোগ্য, দক্ষ ও নিরীহদের হটিয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে চলে আসতে পারে তুলনামূলক কম যোগ্যরা বা সরকার দলীয়রা। তখন হয়তো বার বার বদলি হওয়ার জন্য বা বদলি ঠেকাবার জন্য আমলা, মন্ত্রী, নেতাদের কাছে ছুটতে থাকবেন শিক্ষকগণ। আর সারা বছর যদি চলমান থাকে এইরূপ অশান্তি, তো নিশ্চয়ই অনুমান করা যায় কেমন হবে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান। এমতাবস্থায় এমপিওভুক্ত সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম মান, শিক্ষক-কর্মচারীদের শতভাগ বেতন, ভাতা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করে ফোর্স ট্রান্সফারের সুযোগ দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।      


তবে বর্তমান বা বিদ্যমান অবস্থায়ও নিম্নরূপ নীতিমালা প্রণয়ন করে অতি সহজেই বেসরকারি শিক্ষকদের দেওয়া যেতে পারে দুই ধরনের বদলির সুযোগ।

(ক) পারস্পরিক বদলি, (মিউচুয়াল ট্রান্সফার): সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত ইনডেক্সধারী শিক্ষকগণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এনটিআরসিএ-এর বরাবরে যে কোনো সময় আবেদন করে পারস্পরিক বদলি (মিউচুয়াল ট্রান্সফার) নিতে পারবে।


খ) স্বেচ্ছায় বদলি (উইলিং ট্রান্সফার): বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য আসনে নতুন নিয়োগের আগে স্বেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ প্রয়োজনমতো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সম-পদে ও একই বিষয়ে কর্মরত ইনডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকগণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে চয়েজ দিয়ে আবেদন করতে করবেন। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানে কারো চাকরি নিরবিচ্ছিন্ন ও সন্তোষজনকভাবে পাঁচ বছর পূর্ণ না হলে তিনি বদলির বা পুনঃবদলির আবেদন করতে পারবেন না। একই প্রতিষ্ঠানের একই বিষয়ে ও পদে একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সহশিক্ষা ইত্যাদি (জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের নীতি অনুসারে) বিবেচনা করে অধিক পয়েন্ট প্রাপ্ত শিক্ষক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলির সুযোগ পাবেন। এভাবে বদলি কার্যকর হওয়ার পর যেসব প্রতিষ্ঠানে শূন্য আসন সৃষ্টি হবে সেগুলোতে বিধিমোতাবেক নতুন নিয়োগ প্রদান করা হবে।


আগ্রহী ভুক্তভোগী শিক্ষকদের সুবিধার্থে এই দুই ধরনের বদলির সুযোগ দেওয়া হলে যেহেতু অনিয়ম ও অশান্তির সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকে এবং ভালো শিক্ষকগণের ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ বা সম্ভাবনা বেশি থাকে, সেহেতু এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষভাবে বিবেচনা করবেন আশাকরি। 


n লেখক: অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


শিক্ষক কীভাবে মর্যাদাবান হবেন? দৈনিক শিক্ষা, ৫ অক্টোবর ২০২২

পত্রিকার লিংক

শিক্ষক কীভাবে প্রকৃত মর্যাদাবান হবেন


মো. রহমত উল্লাহ্ | ০৫ অক্টোবর, ২০২২। দৈনিক শিক্ষা

শিক্ষকদের অবদানকে স্মরণ করার জন্য প্রতিবছর পালিত হয়ে থাকে 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস'। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ এই দিবস পালিত হয়ে থাকে। ইউনেস্কোস্বীকৃত 'বিশ্ব শিক্ষক দিবস' শিক্ষকগণের জন্য অবশ্যই একটি মর্যাদার দিন। শিক্ষায় ও উন্নয়নে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ একদিন নয়, কয়েকদিন নয়, প্রতিদিনই শিক্ষকগণ সর্বাধিক মর্যাদার দাবি রাখেন। অনেকেই বলে থাকেন, শিক্ষকগণের মর্যাদা এখন আগের তুলনায় অনেক কম! প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষকতা কী? শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা কী? কীভাবে শিক্ষক সত্যিকারের মর্যাদাবান হবেন? শিক্ষককে মর্যাদাবান করার দায়িত্ব কার? এ সকল বিষয় শুধু বিশ্ব শিক্ষক দিবসেই নয়, প্রতিদিনই গভীরভাবে ভেবে দেখা, আলোচনা করা ও পর্যালোচনা করা উচিত।


মানবসন্তানকে মানুষে পরিণত করার ঐকান্তিক তপস্যা হচ্ছে শিক্ষকতা। তাই পৃথিবীর সব দেশেই শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা তুলনামূলক সর্বাধিক। সামষ্টিক বিবেচনায় যে কোনো পেশার তুলনায় শিক্ষকতা অধিক সম্মানজনক। কারণ শিক্ষকতা মূলত একটি ব্রত। তাই প্রতিটি সমাজেই পেশাদার শিক্ষকের পাশাপাশি অগণিত অপেশাদার শিক্ষক বিদ্যমান। শুধু পেশা হিসেবে শিক্ষকতায় পূর্ণ সফলতা নেই, পরিপূর্ণ পরিতৃপ্তি নেই। শিক্ষাদান হচ্ছে অতি উত্তম পূণ্য কর্ম। মহান সৃষ্টিকর্তা নিজেই প্রধান শিক্ষক। বিভিন্ন ধর্মের প্রবর্তকগণ ছিলেন উৎকৃষ্ট শিক্ষক। অর্থাৎ উৎকৃষ্ট মানবেরাই উৎকৃষ্ট শিক্ষক। উৎকৃষ্ট মানব তথা উৎকৃষ্ট শিক্ষকের মর্যাদাও উৎকৃষ্ট। শিক্ষক ছাড়া কোনো সমাজ নেই। সব মানুষেরই শিক্ষক আছেন। যে সমাজের শিক্ষক যত বেশি উৎকৃষ্ট, সে সমাজের মানুষ তত বেশি উৎকৃষ্ট। 


বর্তমান বাস্তবতায় উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা অনেকটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার ওপর নির্ভরশীল। যে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানী বেশি, সে দেশে উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি। যে দেশে উৎকৃষ্ট শিক্ষকের সংখ্যা বেশি, সে দেশে উৎকৃষ্ট নাগরিকের সংখ্যাও বেশি। উৎকৃষ্ট নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে শিক্ষকের সম্মান ও সম্মানী সর্বাধিক নির্ধারণ করা কল্যাণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শিক্ষকের সার্বিক মর্যাদা তথা সম্মান ও সম্মানী সর্বাধিক হলেই সর্বাধিক যোগ্য লোক শিক্ষক হন। এটিই বর্তমান বাস্তবতায় স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের সর্বত্র ন্যায়-নীতিপরায়ণ যোগ্য লোক নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষক হিসেবে সর্বাধিক ন্যায়-নীতিপরায়ণ যোগ্য লোক নিশ্চিত করা। কোনো রাষ্ট্র যদি তা করতে ব্যর্থ হয় বা অনীহা দেখায় তো সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের সততা, সভ্যতা, যোগ্যতা ও দক্ষতা অনিশ্চিত। তাই শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হয়।


সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের মর্যাদা যতই ওপরে নির্ধারণ করা হোক না কেন, শিক্ষক নিজে উৎকৃষ্ট না হলে তা বজায় রাখা অসম্ভব। শিক্ষক নিজে নিকৃষ্ট হলে মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। মর্যাদা বা ঘৃণা মানুষের অন্তর্নিহিত বিষয়। সদা সর্বদা এটির বহিঃপ্রকাশ নাও ঘটতে পারে। শিক্ষক উৎকৃষ্ট হলেই মানুষের কাছে বৃদ্ধি পায় তাঁর প্রকৃত মর্যাদা। যে শিক্ষক যত বেশি উৎকৃষ্ট সে শিক্ষকের প্রকৃত মর্যাদা তত বেশি। 


দাপট প্রদর্শন ও শ্রদ্ধা অর্জন এক নয়। দাপটে প্রকৃত মর্যাদা নেই, শ্রদ্ধায় প্রকৃত মর্যাদা আছে। যে শিক্ষক তার শিক্ষার্থীকে যত বেশি সুশিক্ষা প্রদান করতে সক্ষম, সে শিক্ষক তত বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম। শিক্ষকের জ্ঞানের গভীরতায় ও দক্ষতার উচ্চতায় বিস্তৃত থাকে শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ। শিক্ষার্থীর মনে শিক্ষকের একটা চিত্র অঙ্কিত হয়। সেই চিত্রটি যত উত্তম হয় শিক্ষার্থী তত শ্রদ্ধাশীল হয়। 


শিক্ষকের চিন্তা-চেতনা, চলা-বলা ও কাজ-কর্মের প্রতিফলন ঘটে শিক্ষার্থীর মনে। শিক্ষক উত্তম চিন্তা ও কর্ম করতে ব্যর্থ হলে উত্তম মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হন। সমাজ ও রাষ্ট্রে উত্তম মানুষের অভাব হলেই শিক্ষকের মর্যাদার অভাব হয়। উত্তম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই উত্তম মানুষ তৈরির দায়িত্ব শিক্ষকের। যিনি শিক্ষক তিনি কোনোভাবেই অবহেলা করতে পারেন না এই দায়িত্বে। কেননা শিক্ষকতা একটি ব্রত। নিয়োগপত্র পেলেই শিক্ষক হওয়া যায় না, শিক্ষক হয়ে উঠতে হয়। 


উল্লিখিত আলোচনা গভীরভাবে উপলব্ধি করে, পর্যালোচনা করে, প্রত্যেকেই নিজেকে মূল্যায়ন করে দেখা উচিত শিক্ষকের মর্যাদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমার ভূমিকা কতটুকু? নিজে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি যদি আমার শিক্ষককে সদা সর্বদা যথাযথ শ্রদ্ধা করি, যে সকল শুভ কারণে আমি আমার প্রিয় শিক্ষককে অধিক শ্রদ্ধা করি, নিজে শিক্ষক হয়ে তেমন হবার জন্য যদি আন্তরিক চেষ্টা করি; সাধারণ নাগরিক হিসেবে সমাজের শিক্ষকগণের প্রতি যদি আমি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থাকি। সমাজের নেতা হয়ে, জনগণের প্রতিনিধি হয়ে, রাষ্ট্রের আমলা হয়ে, রাষ্ট্রপতি হয়ে, সরকারের মন্ত্রী হয়ে আমি যদি নিজের তুলনায় শিক্ষককে অধিক মর্যাদাবান ভাবি এবং শিক্ষকগণের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য যদি আন্তরিক থাকি; তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে শিক্ষকগণের প্রকৃত মর্যাদা, সফল হবে শিক্ষক দিবস উদযাপন। 


লেখক : মো. রহমত উল্লাহ্, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ -কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

১৫ হাজার শিক্ষক নেবে এনটিআরসিএ, আবেদন করুন ভেবেচিন্তে, প্রথম আলো ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২

 পত্রিকার লিংক

১৫ হাজার শিক্ষক নেবে এনটিআরসিএ, আবেদন করুন ভেবেচিন্তে


মো. রহমত উল্লাহ্


বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার ১৬৩ জন শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)। ১৫ হাজার ১৬৩ পদের মধ্যে ১২ হাজার ৮০৭টি এমপিওভুক্ত শূন্য পদ। নন-এমপিও পদ আছে ২ হাজার ৩৫৬টি। বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব শিক্ষক নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে আবেদনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবেদন করা যাবে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।


আবেদনকারীর বয়স ১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে সর্বোচ্চ ৩৫ বছর বা তার কম হতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে জারি করা সর্বশেষ জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। তবে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ইনডেক্সধারী প্রার্থীদের সমপদে আবেদনের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিলযোগ্য। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী ১২ জুন ২০১৮ তারিখের পূর্বে যাঁরা নিবন্ধিত হয়েছেন কিন্তু ইনডেক্সধারী নন, তাদের ক্ষেত্রেও এই বয়সসীমা শিথিলযোগ্য থাকবে। প্রতিটি আবেদনের জন্য ১০০ টাকা ফি দিয়ে পৃথক পৃথক আবেদন করতে হবে। একটি আবেদন করে পছন্দক্রম নির্ধারণ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। যথাযথ যোগ্যতা থাকলে একজন প্রার্থী একাধিক প্রতিষ্ঠানে একাধিক পদে আবেদন করতে পারবেন। এনটিআরসিএর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে আবেদন করা যাবে।


এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরাসরি বদলি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠান বদলের সহজ কোনো সুযোগ আদৌ তৈরি হবে কি না, হলেও কত দিনে হবে, তা অনিশ্চিত। যখনই হোক, যে নীতিমালা তৈরি করা হবে, সেই নীতিমালায় কে কতটুকু সুযোগ পাবে, তা–ও অজানা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও এনটিআরসিএ কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুসারে নতুন করে নিয়োগের জন্য আবেদন করে যোগ্যতা প্রমাণ করে নিয়োগ লাভ করে সেখানে গিয়ে নতুন করে যোগদান করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সমপদ হলে পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনাযোগ্য হবে।


শূন্য পদের বিপরীতে প্রার্থীসংখ্যা বেশি থাকায় যেকোনো প্রার্থী মনে করতে পারেন, একটি বা দুটি আবেদন করলে তার চাকরি না–ও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তিনি নিজের বাড়ির আশপাশে অবস্থিত একাধিক প্রতিষ্ঠানে এবং অনেক দূরের একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারেন। যে প্রতিষ্ঠানেই আবেদন করুন না কেন, একজন প্রার্থীর অবশ্যই নিচের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে আবেদন করা উচিত।


● নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর বেশি বা মেরিট পজিশন আগে না থাকলে ভালো প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সে ক্ষেত্রে অধিকসংখ্যক আবেদন করার প্রয়োজন হতে পারে।


● নিজের এলাকায় ও কম দূরের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পছন্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে যাঁদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা আছে এবং যাঁরা নারী প্রার্থী, তাঁদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।


● প্রতিষ্ঠানের অবস্থা, কর্মপরিবেশ, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, আর্থিক সচ্ছলতা ও শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি সন্তোষজনক কি না, তা জেনে নিতে হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা কম।

● আবেদনের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত পদটি এমপিওভুক্ত কি না বা এমপিওভুক্ত হবে কি না, হলে কত দিন লাগতে পারে, তা নিশ্চিত হতে হবে।


● কোনো কারণে নন-এমপিও পদে আবেদন করতে চাইলে, তা জেনে-বুঝেই করা উচিত। কারণ, সরকারি আদেশ থাকার পরেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান থেকে নন-এমপিও শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা কম দেওয়া হয়।


● দূরের কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে হলে, সেই প্রতিষ্ঠান ও এলাকা সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত। সেখানে যাতায়াত সুবিধা কেমন, থাকা-খাওয়ার সুবিধা আছে কি না, নিরাপত্তাব্যবস্থা কেমন, ছুটিতে বা প্রয়োজনে নিজের আপনজনের কাছে যাওয়া-আসা করা যাবে কি না, এসব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া উচিত।



● গ্রামে কিংবা শহরে যেখানে বসবাস করতে আপনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেখানকার প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শহরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শহরের প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতা কিছুটা বেশি থাকলেও জীবনযাপনের ব্যয় আরও অনেক বেশি।


● স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে চাকরি আপনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বা অস্বস্তি বোধ করবেন, তা ভেবে নেওয়া উচিত।


● যে পদে আবেদন করবেন সে পদের বেতন স্কেল, বর্তমান মূল বেতন, অন্যান্য ভাতার পরিমাণ, বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ, পদোন্নতির সুযোগ, অবসরকালীন সুবিধা—এসব বিষয় জেনে নেওয়া উচিত।


● একাধিক স্তরবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পদে যোগদান করলে কোন কোন স্তরে ক্লাস নিতে হবে, তা জেনে নেওয়া এবং সেই স্তরে ক্লাস নেওয়ার জন্য নিজের ইচ্ছা ও যোগ্যতা আছে কি না বা থাকবে কি না তা ভেবে নেওয়া উচিত।


● আধুনিক শিক্ষকতায় কাজের ধরন-পরিধি কেমন, লেখাপড়ায় লেগে থাকতে ভালো লাগে কি না, শিক্ষকের দায়িত্ব-কর্তব্য কতটুকু ও কর্মকালে ছুটি ভোগের বিধান কেমন, অন্যান্য পেশার তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কতটুকু, নিজের যোগ্যতা ও মন-মানসিকতার সঙ্গে এই পেশা খাপ খায় কি না, ইত্যাদি বুঝে নেওয়া দরকার।


● প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ও অবস্থান বর্তমান প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ও অবস্থানের তুলনায় অধিক ভালো কি না এবং সেখানে গেলে পরিবর্তনের উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে কি না, তা জেনে নেওয়া উচিত।

বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিক স্তরে সহকারী শিক্ষকের মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে প্রভাষকের প্রাথমিক মূল বেতন ২২ হাজার টাকা। এ ছাড়া সব স্তরের শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ, বাড়ি ভাড়া ভাতা ১ হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ, বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ দেওয়া হয়ে থাকে। মূল বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ তহবিলের জন্য ১০ শতাংশ টাকা জমা রাখা হয়। নিয়মিত ২৫ বা তার বেশি বছর চাকরি করে অবসরে গেলে কল্যাণ ও অবসর তহবিল থেকে সর্বশেষ মূল বেতনের প্রায় ১০০ গুণ টাকা পাওয়ার বিধান রয়েছে। এসব সরকারি সুবিধার বাইরে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের নিয়মের ওপর নির্ভর করে।


মো. রহমত উল্লাহ্


অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ


প্রথম আলো, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২২


https://www.facebook.com/163059227060505/posts/5588192671213773/


পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার ও ভোগদখল। বাংলা ট্রিবিউন, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার ও ভোগদখল। বাংলা ট্রিবিউন, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১

 

পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার ও ভোগদখল 

মো. রহমত উল্লাহ্মো. রহমত উল্লাহ্ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় বিধান থাকা সত্ত্বেও পৈতৃক সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে  অনর্জিতই থেকে যায় আমাদের দেশে। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে সচেতনতার অভাবই প্রধান। ইসলাম ধর্ম মতে পিতামাতার অবর্তমানে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার হিসাব করেই দেওয়া আছে। যদিও এটি ভাইয়ের প্রাপ্যাংশের তুলনায় অর্ধেক। অবশ্য পিতামাতা ইচ্ছে করলে তাঁদের সম্পত্তি ছেলেমেয়েকে সমান হারেও ভাগ করে দিতে পারেন। এতে ইসলাম ধর্মে কঠিন নিষেধ নেই। নতুন কোনও আইনেরও প্রয়োজন নেই। পরিমাণ যাই হোক মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই অধিকারটুকু আমাদের মুসলিম নারীরা অর্জন ও ভোগদখল করতে পারছেন কিনা? যদি কেউ পেরে থাকেন তো মোটের তুলনায় এটি খুবই নগণ্য।

আমাদের সমাজে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত যে, ‘বাপের বাড়ির সম্পত্তির অংশ মেয়েরা নিয়ে নিলে স্বামীর সংসারে অনটন নেমে আসে এবং ভাইদের সাথে বোনদের সম্পর্কের কোনও সেতুবন্ধন থাকে না। বোনেরা ভাইদের বাড়িতে এবং ছেলেমেয়েরা মামার বাড়িতে যাবার বা আপ্যায়ন পাবার যোগ্যতা হারায়।’

আসল কথা হচ্ছে, মেয়েদের স্থায়ীভাবে ঠকানোর এটি একটি চতুর কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। ভাইয়েরা পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি (বোনদের অংশসহ) করে ভোগ-দখল করলে যদি অভিশপ্ত না হয়, সম্পর্ক অবনতি না হয়, পরস্পরের বংশধরদের আপ্যায়ন পাওয়ার অধিকার থাকে, পরস্পরের সুখে-দুঃখে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা থাকে, তো বোনদের অপরাধ কোথায়? বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাই ভোগদখল করবে সারা জীবন, ফুফুর সম্পত্তি ভাইপো ভোগদখল করবে জোর করে; তাতে অপরাধ হবে না– অথচ পিতামাতার সম্পত্তির বৈধ প্রাপ্যাংশ কন্যা ভোগদখল করলেই ‘অভিশপ্ত’ হবে– এটা কোন নীতি-ধর্মের কথা?

ইসলাম ধর্মে ও আমাদের রাষ্ট্রীয় আইনে অন্যের প্রাপ্য সম্পত্তি ভোগদখল করার কোনও বৈধতা নেই। বরং কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা পাপ, অপরাধ। নারী তো ভাইয়ের সম্পত্তি পায় না, পিতামাতার সম্পত্তি পায়। এতে ভাইয়ের রাগ করার, ‘অভিশাপ’ দেওয়ার বৈধতা ও যৌক্তিকতা কোথায়? ভাইকে প্রাপ্যাংশ দিতে কষ্ট না থাকলে, বোনকে দিতে এত কষ্ট কেন?

অবাক ব্যাপার, যে বাবা মেয়েকে বেশি আদর দেখায়, পুত্র-পুত্রবধূ রেখেও মেয়ের সেবা-যত্ন প্রত্যাশা করে মৃত্যু শয্যায়; সে বাবাই তার সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অনেক সময় কূটকৌশলে ছেলের দখলে দিয়ে মরে যায়। এমন অনেকেই আছেন, ধর্মীয় সকল নিয়ম-কানুন মেনে চলেন কিন্তু নিজের মেয়ে সন্তানদের বঞ্চিত করে ভালো মানুষ সাজেন!

মেয়েদের বঞ্চিত করে ছেলেদের নামে মূল্যবান জমি-বাড়ি দলিল করে দখল দিয়ে যান এমন নীতি-আদর্শহীন বাবার সংখ্যাও আমাদের সমাজে কম নয়। যে ভাইয়ের জন্য সবার আগে নির্দ্বিধায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এমনকি প্রাণও দিতে পারে বোন; সেই ভাই-ই বোনের প্রাপ্যাংশ না দেওয়ার জন্য বা কম দেওয়ার জন্যে আঁটে নানান কূটকৌশল। কেউ কেউ বছরে দু-একটা দাওয়াত ও কাপড়চোপড় দিয়েই সারতে চায় বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি না দেওয়ার দায়। কোনও অধিকার সচেতন বোন তার প্রাপ্যাংশের দাবিতে সোচ্চার হলে, বিচারপ্রার্থী হলে, আদালতের আশ্রয় নিলে, ভাই ধর্মীয় পোশাক পরে ভালো মানুষ সেজে হাজির হয় বিচারকের সামনে। কোনও অসতর্ক, অসুস্থতা বা বিপদের সময় বাবার, মায়ের, বোনের স্বাক্ষর/টিপসই নিয়ে বোনকে অধিকার বঞ্চিত করে বা করার চেষ্টা করে, এমন ভাইয়ের সংখ্যাও অনেক। এমন ভাইকেও বলা হয় আপন ভাই!

সাধারণত ধনী পরিবারের কন্যার সঙ্গে ধনী পরিবারের পুত্রেরই বিয়ে। এটা আমাদের সমাজে বেশি হয়। সেসব বিয়েতে বিয়ের দেনমোহরও ধার্য হয় তুলনামূলক বেশি। অথচ ধনী পিতার সম্পত্তির প্রাপ্যাংশ যদি ওই মেয়ে ও তার সন্তানেরা না-ই পায়, তো তাকে অধিক মূল্যায়নের ভিত্তি কোথায়?

যুগ যুগ ধরে পুত্রসন্তানের ভোগদখলে দিয়ে রাখে সব সম্পত্তি। সেই মেয়ে কখনও সম্পত্তির অধিকার চাইতে গেলে বলা হয়, তোমাকে লালন-পালন করা হয়েছে, লেখাপড়া করানো হয়েছে, বিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার সম্পত্তি দেবো কেন!

কী অদ্ভুত কথা! যে ছেলেকে হয়তো মেয়ের চেয়ে ভালোভাবে লালন-পালন করা হয়েছে, অধিক লেখাপড়া করানো হয়েছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অধিক ব্যয় করে বিয়েশাদি করানো হয়েছে; সেই ছেলের ভোগদখলেই থাকবে সব সম্পত্তি!

বাস্তবে আমাদের অনেক মুসলিম নারী স্বামীর সম্পত্তিতে নিজের নাম লেখানোর ও ভোগ-দখল করার জন্য যতটুকু সংগ্রাম ও অশান্তি করে, পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের নাম জন্মসূত্রে লেখা থাকলেও সেটি ভোগদখল করার জন্য ততটুকু সংগ্রাম করে না। বিভিন্ন যৌক্তিক, অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণার কারণে পৈতৃক সম্পত্তি গ্রহণ ও ভোগদখল না করে উদারতা দেখালেও, নিঃশর্তে দলিল করে ভাইকে দিয়ে দেয় এমন নারীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ নারীরা তার রক্তের অধিকার পৈতৃক সম্পত্তির দাবি সত্যিকার অর্থে মন থেকে ত্যাগ করতে পারে না, করে না কোনোদিনই। দাবি অব্যাহত রেখেই মৃত্যুবরণ করে। এই দাবির দাবিদার হয় তার সন্তানেরা। দাবি আদায় করতে গেলেই হয় বিবাদ।

কোনও নারী যদি মনে করে তার পিতামাতার নিকট থেকে প্রাপ্যাংশ ভাইকে বা ভাইয়ের সন্তানদের দিয়ে দেবেন, তো এটি মনে রাখা উচিত যে তার এই প্রাপ্য সম্পত্তির ওপর নিজের সন্তানের অধিকার ও দাবিই অগ্রগণ্য। নিজের সন্তানকে বঞ্চিত করে ভাই, ভাইয়ের সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়া অনুচিত। ভাইয়ের অভাবের কারণে দিতে হলেও নিজের স্বামী-সন্তানের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হলে যাদের অবৈধ স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে, তাদের গা জ্বালা হওয়া স্বাভাবিক। এর বিপক্ষে তারা যতই যুক্তি খোঁজুক, ফন্দি আঁটুক, পৈতৃক সম্পত্তির (স্থাবর-অস্থাবর) ওপর নারীর এই জন্মগত অধিকার অর্জন ও ভোগ করার জন্য মনের জোর নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে নারীকেই। নিজের ও নিজের কন্যাসন্তানের ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে ও দিতে হবে যেকোনও মূল্যে।

লেখক: অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

Email- rahamot21@gmail.com