উপ-সম্পাদকীয়- 'পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার' -নরসিংদীর কথা- ০৪ মার্চ ২০০৩

উপ-সম্পাদকীয়- 'পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার' -নরসিংদীর কথা- ০৪ মার্চ ২০০৩
IMG_20180425_133340_1

নরসিংদীর কথা- ০৪ মার্চ ২০০৩

পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার
মো. রহমত উল্লাহ্
>পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনর্জিতই থেকে যায় আমাদের দেশে। এর নানাবিধ কারণের মধ্যে সচেতনতার অভাবই প্রধান। নারীর এই অধিকার সরাসরি অস্বীকার করা হয়নি কোন ধর্মেই। বিশেষ করে ইসলাম ধর্মেতো পিতা-মাতার অবর্তমানে তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তিতে মেয়ের অধিকার হিসাব করেই দেয়া আছে; যদিও এটি ভাইয়ের প্রাপ্যাংশের তুলনায় অর্ধেক। অবশ্য পিতা/ মাতা ইচ্ছে করলে তাঁদের সম্পত্তি ছেলে মেয়েকে সমান হারেও ভাগ করে দিতে পারেন। এতে ইসলাম ধর্মে কোন নিষেধ নেই। কোন আইনেরও প্রয়োজন নেই। পরিমাণ যাই হোক মূল প্রশ্ন হচ্ছে, এই অধিকারটুকু আমাদের নারীরা অর্জন ও ভোগ করতে পারছে কিনা? যদি কেউ পেরে থাকে তো মোটের তুলনায় এটি খুবই নগণ্য। আমাদের সমাজে এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত যে, বাপের বাড়ির সম্পত্তির অংশ মেয়েরা নিয়ে নিলে স্বমীর সংসারে অনটন নেমে আসে এবং ভাইদের সাথে বোনদের সম্পর্কের কোন সেতু বন্ধন থাকে না। বোনরা ভাইদের বাড়িতে এবং ছেলেমেয়েরা মামার বাড়িতে যাবার বা আপ্যায়ন পাবার যোগ্যতা হারায়। উচিত কথা হচ্ছে, মেয়েদেরকে স্থায়ীভাবে ঠকানোর এটি একটি চতুর কৌশল ছাড়া আর কিছুই না। ভাইয়েরা পৈত্রিক সম্পত্তি ভাগাভাগি (বোনদের অংশসহ) করে ভোগ-দখল করলে যদি অভিশপ্ত না হয়, সম্পর্ক অবনতি না হয়, পরষ্পরের বংশধরদের আপ্যায়ন পাবার অধিকার থাকে, পরষ্পরের সুখে-দুঃখে এগিয়ে যাবার মানসিকতা থাকে, তো বোনদের অপরাধ কোথায়? বোনের প্রাপ্য সম্পত্তি ভাই ভোগ-দখল করবে সারাজীবন, ফুফুর সম্পত্তি ভাইপোরা ভোগ করবে জোর করে; তাতে অপরাধ হবে না, অভিশপ্ত হবে না, অথচ পিতা-মাতার সম্পত্তির বৈধ প্রাপ্যাংশ কণ্যা ভোগ-দখল করলেই অভিশপ্ত হবে, ধবংস হয়ে যাবে এ কেমন কথা, কোন ধর্মের কথা? নারীতো ভাইয়ের সম্পত্তি পায় না, পিতা-মাতার সম্পত্তি পায়। এতে ভাইয়ের রাগ করার, অভিশাপ দেয়ার বৈধতা ও যুক্তিকতা কোথায়? ভাইকে প্রাপ্যাংশ দিতে কষ্ট না থাকলে, বোনকে দিতে এত কষ্ট কেন? এ কষ্টে কি পাপ নেই?
অবাক ব্যাপার, যে বাবা মেয়েকে বেশি আদর দেখায়, পুত্র-পুত্রবধূ রেখেও মেয়ের সেবাযতœ প্রত্যাশ্যা করে মৃত্যু শয্যায়; সে বাবাই তার সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কূট-কৌশলে ছেলের দখলে দিয়ে মরে যায় বেহেশতে যাবার দোয়া করতে করতে! হজ্জও করেন কেউ কেউ! বিশেষ করে শহরের বাড়ির অংশতো কোনভাবেই দিতে চায় না মেয়েদেরকে। মেয়েদেরকে বঞ্চিত করে ছেলেদের নামে মূল্যবান বাড়ি দলিল করে দিয়ে যান, এমন নীতি-আদর্শহীন বাবার সংখ্যাও আমাদের সমাজে কম নয়। যে ভাইয়ের জন্য সবার আগে নির্দ্বিধায় প্রাণ দিতে পারে বোন; সেই ভাই-ই বোনের প্রাপ্যাংশ না দেয়ার জন্যে আঁটে নানা অবৈধ কৌশল। কোনো অধিকার সচেতন বোন তার প্রাপ্যাংশের দাবিতে আদালতের আশ্রয় নিলে, ভাই ধর্মীয় পোশাক পরে ভালো মানুষ সেজে হাজির হয় বিচারকের সামনে। কোন অসতর্ক, অসুস্থতা বা বিপদের সময় বাবার/ মার/ বোনের টিপসহি নিয়ে বোনকে অধিকার বঞ্চিত করে বা করার চেষ্টা করে এমন ভাইয়ের সংখ্যাও কম নয়।
সাধারণত ধনীর মেয়ের রূপ-গুণ-যোগ্যতা যতই কম থাকুক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনীর সঙ্গেই তার বিয়ের হয় আমাদের সমাজে। বিয়ের দেনমহরানা ধার্য হয় তুলনামূলক বেশি। অথচ ধনী পিতার সম্পত্তির প্রাপ্যাংশ যদি ঐ মেয়ে ও তার সন্তানেরা না পায়, তো তাকে অধিক মূল্যায়নের ভিত্তি কোথায়? শিক্ষিত অশিক্ষিত বেকার চাকুরে যা-ই হোক, যে মেয়ের নামে সম্পত্তি থাকে তার বিয়েতে যৌতুকের প্রশ্ন উঠে না।
বা¯—বে আমাদের নারীরা বিভিন্ন যৌক্তিক, অযৌক্তিক ও ভ্রাš— ধারণার কারণে পৈতিক সম্পত্তি গ্রহণ ও ভোগদখল না করে উদারতা দেখালেও, নিঃশর্তে দলিল করে ভাইকে দিয়ে দেয় এমন নারীর সংখ্যা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ নারীরা তার পৈতিক সম্পত্তির দাবি সত্যিকারার্থে মন থেকে ত্যাগ করে না কোন দিন। দাবি অব্যাহত রেখেই মৃত্যুবরণ করে। এই দাবির দাবিদার হয় তার সন্তানেরা। দাবি আদায় করতে গেলেই হয় বিবাদ। নারীর এই জন্মগত বৈধ দাবি না চাইতেই পূরণের দায়িত্ব ছিল যে বাবার/ ভাইয়ের অথচ পূরণ করেনি, সেই বাবা/ ভাই ইহ ও পরকালে শান্তি পাবে কোন যুক্তিতে?
কোনো নারী যদি মনে করে তার পিতা-মাতার নিকট থেকে প্রাপ্যাংশ ভাই কে বা ভাইয়ের সন্তানদেরকে দিয়ে দিবেন, তো এটি মনে রাখা উচিৎ যে, তার এই প্রাপ্য সম্পত্তির উপর নিজের সন্তানের অধিকার ও দাবিই অগ্রগণ্য। নিজের সন্তানকে বঞ্চিত করে ভাই/ ভাইয়ের সন্তানদেরকে সম্পত্তি দেয়া অনুচিৎ। ভাইয়ের অভাবের কারণে দিতে হলেও নিজের স্বামী-সন্তানের মতামত নেয়া প্রয়োজন।

বোনের প্রাপ্যাংশ বুঝিয়ে দেয়ার পরও যে ভাই বোনকে, বোনের স্বামী-সন্তানকে সাধ্যমত আদর-আপ্যায়ন করার আন্তরিক চেষ্টা করে সে ভাই-ই প্রকৃত অর্থে ভাই। সম্পত্তির দেনা-পাওনার নিস্পত্তির পর যে সম্পর্ক ও আন্তরিকতা থাকে তা-ই আসল। আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি- নরসিংদী জেলার সবুজ পাহাড় এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তি আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী মাষ্টার নিজেই তাঁর ফুফু, বোন ও কন্যাদের প্রাপ্য সম্পত্তি দলিল করে দখল বুঝিয়ে দিয়েছেন। অথচ তাদের সাথে তাঁর ও তাঁর ছেলেদের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক অবনতি হয়নি। বরং অন্যদের তুলনায় তাঁদের সম্পর্ক পরষ্পরের সুখে-দুখে-আনন্দ অনুষ্ঠানে আদর-আপ্যায়নে সক্রিয়তার কোন ঘাটতি নেই। নারী বলে পৈত্রিক সম্পত্তি ভোগদখল করে গরিব হয়ে যায় নি তারা কেউ। অবশ্য এক্ষেত্রে সম্পর্ক ভাল রাখার দায়িত্ব অনেকাংশে ভাই ও ভাইপোদের উপর নির্ভর করে।
পৈত্রিক সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হলে যাদের অবৈধ স্বার্থ পুরন হবে, তাদের গা জ্বালা হওয়া স্বাভাবিক। এর বিপরীতে তারা যতই যুক্তি খোঁজুক, ফন্দি আঁটুক, পৈতিক সম্পত্তির (স্থাবর-অস্থাবর) উপর নারীর এই জন্মগত অধিকার অর্জন ও ভোগ করার জন্য মনের জোর নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে নারীকেই। নিজের ও নিজের কন্যা সন্তানদের বৈধ পাওনা বুঝে নিতে ও দিতে হবে যে কোন মূল্যে। //

উপ-সম্পাদকীয়- 'টাকার পাগল চিকিতসকদের চিকিতসা করা জরুরি' -যায়যায়দিন- ১৪ নভেম্বর ২০১৪

উপ-সম্পাদকীয়- 'টাকার পাগল চিকিতসকদের চিকিতসা করা জরুরি' -যায়যায়দিন- ১৪
নভেম্বর ২০১৪
IMG_20180425_152425_1

যায়যায়দিন- ১৪ নভেম্বর ২০১৫

টাকার পাগল চিকিৎসকদের চিকিৎসা করা জরুরি

মো. রহমত উল্লাহ্‌
অসুস্থ হলে প্রায় সবাই কম বেশি অসহায় বোধ করেন। প্রত্যাশা করেন ভালো চিকিৎসকের চিকিৎসা ও নিকটজনের সেবা। বিশেষ ভাবে নির্ভর করেন চিকিৎসকের উপর। আনেকেই মনে করেন চিকিৎসক হচ্ছেন রোগ মুক্তির দ্বিতীয় দেবতা। একজন উত্তম চিকিৎকের নিকট অসুস্থ এবং সুস্থ মানুষের কমপক্ষে পাঁচটি প্রত্যাশা থাকে। ধৈর্য্য, সহানুভূতি, ভালো ব্যবহার, অবানিজ্যিক মানসিকতা ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে কাঙ্ক্ষিত ধৈর্য্য, সহানুভূতি, ভালো ব্যবহার ও অবানিজ্যিক মানসিকতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা দেবার মতো চিকিৎসকের সংখ্যা আমাদের বাংলাদেশে একেবারেই কম। হাতেগুনা দু’একজন আছেন। তাই একেবারে নেই বলা চলে না।

আমার জানা ও দেখা উত্তম চিকিৎসকগণের মধ্য থেকে একজনের কথা বলছি, তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্কোলজির সিনিয়র প্রফেসর। মেডিসিনেরও বিশেষজ্ঞ। পরিচিত রোগীদের নিয়ে গত ২০ বৎসরে অনেবার গিয়েছি তাঁর কাছে। মুগ্ধ হয়েছি বার বার। এমন অনেক দিন দেখেছি খুবই ধর্য্য ধরে শুনেছেন রোগীর প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক সব কথা। তার পর লিখে দিয়েছেন অন্য একজন ডাক্তারের নাম ঠিকানা। ফিস দিতে গেলে বলেছেন: আমিতো চিকিৎসা দিইনি, যিনি চিকিৎসা দিবেন তিনি ফিস নিবেন। আমি অবশ্য ঔষধ লিখে দিতে পারতাম, কিন্তু এটি আমার বিষয় নয়। তাই ঔষধ লেখা আমার অনুচিত। এমনটি যুক্তিযুক্ত হলেও আমাদের দেশে খুব একটা দেখা যায় না।

হরহামেসা যা দেখা যায় তা হলো: কোন রোগী একবার হাতে পেলে হাতছাড়া করতে চায় না আর। তা সে এই চিকিৎসা জানুক আর নাই জানুক (এখন তো ভোগাস ডাক্তারের সংখ্যাও কম নয়), লিখতে থাকেন হাজারো ঔষধ আর পরিক্ষা-নিরীক্ষা।

শধু রোগীই নয়, রোগীর রিপোর্ট দেখেও বার বার আদায় করেন মোটা অংকের ফিস। আপরদিকে রিপোর্ট বাবদ রোগীর পরিশোধিত টাকার ভাগ আদায় করেন সংশ্লিষ্ট ডায়গস্টিক সেন্টার থেকে। তাদের মনের কথা যেনো একটাই; রোগী সুস্থ হোক না হোক, টাকা চাই, আরো টাকা।

দু’টি উদাহরণ দিই। দু’জনই মানসিক রোগের বিশেষজ্ঞ। দু’জনই রাজধানির সাইন্স ল্যাব এর কাছাকাছি চেম্বারে বসেন। একজন পুরুষ আর একজন মহিলা। একজন সরকারি ডাক্তার, দৈনিক রোগী দেখেন এ, বি, সি এই তিন সিরিয়েলে প্রায় ১৫০ জন। মাথাপিছু ফিস আদায় করেন ৮০০ টাকা। এমন সব ঔষধ লিখেন যার অধিকাংশই পাওয়া যায় না অন্য কোথাও। চড়া দামে কিনতে হয় তাঁর নিজস্ব দোকান থেকে। বিদেশ থেকে একমাত্র তিনিই নাকি আমদানি করেন সেইসব চড়া দামি ঔষধ। কখন জানি তিনি আবার পত্রিকা এবং বইও বেড় করেন। ঔষধের দোকানেই পাওয়া যায় তাঁর বই ও পত্রিকা। শুনলাম একটা প্রাইভেট হাসপাতাল করে সেখানেও রোগী দেখেন তিনি। একসময় জাতীয় মানসিক সাস্থ্য ইন্সটিটিউটের পরিচালকও ছিলেন তিনি। বিভিন্ন কৌশলে টাকা হাত করায় সুদক্ষ এই লোকটির কোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আছে বলে আমার জানা নেই।

আর একজন মহিলা সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। দৈনিক রোগী দেখেন ২০/২৫ জন। একেক জনের নিকট থেকে ফিস আদায় করেন একেক রকম। মাথাপিছু ১ হাজার টাকা থেকে ২/৩ হাজার টাকাও আদায় করে থাকেন তিনি। একজন রোগী দেখতে যত সময় লাগবে তত টাকা হবে তার ফিস। আমার এক রোগী দেখার সময় একদিন তিনি দুঃখ করে বলছিলেন, তদ্বির/দলাদলি করতে পারেন না বলে, এতদিনে মাত্র সহকারি অধ্যাপক হয়েছেন। এই কাহিনী বলতে বলতে পাস করলেন ১০/১৫ মিনিট আর বাড়িয়ে দিলেন রোগীর ফিস। আরেকদিন এক রোগীর হাতে ডায়বেটিক হাসপাতালের বই দেখে মানসিক ঔষধের প্রেসক্রিপসনে লিখে দিলেন এক বিশাল খাদ্য তালিকা! এই অতিরিক্ত সময়ের জন্য আদায় করলেন অতিরিক্ত ফিস!

শুধু যে টাকা আদায় করেন তাই নয়। অধিকাংশ বড়(?) ডাক্তারেরা এমন আচরন করেন রোগীদেরসাথে; যেনো সব রোগীরা সিঁদেল চোর আর ডাক্তার সাহেব বড় দারোগা। কথা বলতে গেলে এমন খেপে উঠেন, যেনো রোগীরা বিনা টিকেটের রেল যাত্রী আর ডাক্তার সাহেব মোবাইল কোর্টের বিচারক। কোর্টের পেসকারের মতো তার আবার এসিসটেন্ট ডাক্তার থাকেন। তিনি রোগির কথা শুনেন ও লেখেন। কয়েকজন রোগি একত্রে বসিয়ে তিনি ফাইল করেন কেস। যেখানে গোপন কথা বলার কোন সুযোগই থাকে না রোগিদের। তারপর কেস ফাইল নিয়ে আসামির মতো হাজির হতে হয় সেই বড়(?) ডাক্তারের সামনে। রোগির কোন কথা না শুনে, তিনি একই সাথে লিখেন অনেক গুলো পরিক্ষা ও ঔষধ। পরিক্ষা দিলেন কী রোগ ধরার জন্য, আর ঔষধ দিলেন কী রোগ ধরে, তা জানার অধিকার নেই রোগির বা রোগির সংগীর। টাকা দিয়ে প্রাইভেট চেম্বারে গেলেই এই অবস্থা। আর সরকারি হাসপাতালে তাদের সামনে রোগি যাবে কোন সাহসে?

এমনও ডাক্তার আছেন যারা রোগী দেখেন বিকাল থেকে রাত বারোটা / একটা পর্যন্ত। কখন তারা ঘুমান, কখন নাওয়া খাওয়া করেন, কখন সকালে উঠেন, কখন সরকারি হাসপাতালে যান, কতক্ষণ থাকেন সেখানে, ক’টা রোগির চিকিৎসা দেন ঠিকমত, কীভাবে আবার চেম্বারে আসেন সঠিক সময়ে? শুনেছি অনেক দেশেই বিচারকদের হিসাব দিতে হয়, তিনি কতটা মামলার শুনানি করেছেন, কতটা মামলার রায় দিয়েছেন, কতটা রায় আপিলে গিয়ে টিকেছে বা বাতিল হয়েছে ইত্যাদি। গুয়েন্দা কর্মীদেরঅকেও হিসাব দিতে হয়, কতটা কেস ফাইল করছেন, কতটা কেস তদন্ত করেছেন, কতটা সময় ও অর্থ ব্যয় করেছেন, কতটাতে সফল আর কতটাতে ব্যার্থ হয়েছেন ইত্যাদি। আবার ডাক্তারদেরও নাকি হিসাব দিতে হয়, কতটা রোগী দেখেছেন, কতটার সফল চিকিৎসা দিয়েছেন, রোগির সাথে কী রকম আচরন করেছেন, কোন ভুল চিকিৎসা দিয়েছেন কি না ইত্যাদি। এইসব বিষয়ের উপর নির্ভর করে তাদের প্রমোশন। আমাদের ডাক্তারদের প্রমোশনের বেলায় কি এমন কোন মানদন্ড আদৌ আছে? যদি থাকতো তাহলে তো সেই মহিলা ডাক্তারের এমন অভিযোগ থাকতো না যে, তিনি দালালি ও দলাদলি করতে পারেন না বলে প্রমোশন পাচ্ছেন না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও নার্সদের কাজের পরিধি পরিমাপের ব্যবস্থা করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে বর্তমান বাজেট ও কাঠামোতেই চিকিৎসা পেতে পারে আরো তিনগুণ বেশি রোগি। অবশ্যই কমবে ডাক্তারদের প্রাভেট চেম্বারের ভিড়। বর্তমান ডিজিটাল ব্যবস্থায় (প্রতিটি রোগির পৃথক ও স্থায়ী আডি নম্বর দিয়ে) দু’একটি সফটওয়ার তৈরি ও প্রয়োগ করে সহজেই হিসাব রাখা সম্ভব প্রতিদিন কতটা রোগির টিকেট বিক্রি হচ্ছে, কোন কোন ডাক্তার কতজন নতুন ও কতজন পুরাতন রোগি দেখেছেন, একজন রোগি একই রোগের চিকিৎসা নিতে কতবার এসেছেন ইত্যাদি। তেমন ব্যবস্থা করা গেলে আর ঢাকায় এসে চেম্বারে বসে থাকতে পারবে না মফস্বল হাসপাতালে যাদের পোস্টিং।

বর্তমান সরকার শিক্ষকদের প্রাইভেট কোচিং বন্ধের ব্যাপারে যতটা সোচ্চার ও সক্রিয় ডাক্তারদের প্রাইভেট প্রেক্টিস কমানোর বা বন্ধের ব্যাপারে এক আনাও সক্রিয় আছে বলে মনে হয় না। যারা টাকার জন্য পাগল হয়ে গেছে, তারা তো আর সুস্থ স্বাভাবিক নয়; জাতীয় স্বার্থেই তাদের সামান্য চিকিৎসা করা জরুরি।//

প্রবন্ধ- 'ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে সুস্থ দেহে সুস্থ মন' -ইত্তেফাক- ২৫ জুন ২০১৪

প্রবন্ধ- 'ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে সুস্থ দেহে সুস্থ মন' -ইত্তেফাক- ২৫ জুন ২০১৪
IMG_20180425_152311_1

দৈনিক ইত্তেফাক
ঢাকা, বুধবার ২৫ জুন ২০১৪, ১১ আষাঢ় ১৪২১, ২৬ শাবান ১৪৩৫
ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে, সুস্থ দেহে সুস্থ মন
মো. রহমত উল্লাহ্
অধ্যক্ষ
কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা

ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হচ্ছে, সুস্থ দেহে সুস্থ মন। সুশিক্ষার জন্য প্রয়োজন শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। এজন্যেই খেলাধুলাকে এখন শুধু সহপাঠই নয় কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত ও করা হয়েছে অর্থাত্ খেলাধুলা শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ। খেলাধুলা ব্যতীত শিক্ষার পরিপূর্ণতা অসম্ভব। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থকার জন্য প্রতিটি মানুষের বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের প্রয়োজন নিয়মিত খেলাধুলা।

খেলাধুলার এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শারীরিক শিক্ষা নামে একটি পাঠ্যবিষয় কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে শহর কেন্দ্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে তেমন কোন আঙিনা বা খেলার মাঠ না থাকায় বাস্তবে এই ব্যবহারিক বিষয়টির চর্চা করার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত হয়ে যাচ্ছে আবার কোথাও কোথাও উধাও হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের শহর কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে খেলাধুলা তথা শারীরিক শিক্ষার অধিকার থেকে।

খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত অনেকেই দিনদিন ঝুঁকে পড়ছে নানান রকম অপকর্মে। কেউ কেউ টেলিভিশন ও কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে হয়ে উঠছে চরম অসামাজিক। নিয়মিত করছে না লেখাপড়া, নাওয়া-খাওয়া। ঘুমাতে যাচ্ছে না সঠিক সময়ে। জেগে উঠছে না সকাল বেলা। শারীরিক ও মানসিক ভাবে হচ্ছে না সুস্থ-সবল। ধারণ করছে না প্রয়োজনীয় ধৈর্য্য। মান্য করছে না বড়দের। আদর করছে না ছোটদের। লালন করছে না দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ।

এইরূপ একটি বা দু'টি সন্তান নিয়ে ঘরে ঘরে উদ্ভিগ্ন থাকছেন মা-বাবা,

শুধু বই-খাতা আর ঘরোয়া খেলা দিয়ে সম্ভব নয় তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ। অবশ্যই খোলা জায়গায় সৃষ্টি করতে হবে তাদের খেলাধুলার সুযোগ। সচেতন মানুষ মাত্রই স্বীকার করবেন এই বাস্তবতা। অথচ আমরা প্রতিনিয়তই দখল বা জবর দখল করে নিচ্ছি আমাদের সন্তান ও শিক্ষার্থীদের প্রাপ্য আলো-বাতাসে খেলাধুলা করার প্রতিটি স্থান। এমনকি সরকারি সহায়তায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভবন নির্মানের পরিকল্পনাতেও বিবেচনা করা হচ্ছেনা শিক্ষার্থীদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় আলো-বাতাস ও খেলাধুলার স্থান সুরক্ষার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে গিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ক্রমাগত বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে আরো দমবন্ধ পরিবেশ। আমাদের সন্তানদের বৃহত্তর স্বার্থে কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না এই অবস্থা। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা সুদৃষ্টি দিবেন আশা করি। তদুপরি আসুন আমরা সবাই মিলে সুরক্ষার চেষ্টা করি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় আলো-বাতাস ও খেলাধুলার ন্যূনতম স্থান এবং সেইসাথে তাদেরকে উত্সাহিত করি খেলাধুলায়।
http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDZfMjVfMTRfMV8yOF8xXzE0MDU5Ng==

প্রবন্ধ- 'নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুফল' -সাক্ষরতা বুলেটিন- ফেব্রুয়ারি ২০১৮

প্রবন্ধ- 'নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সুফল' -সাক্ষরতা বুলেটিন- ফেব্রুয়ারি
২০১৮
IMG_20180428_121422_1

সাক্ষরতা বুলেটিন- ফেব্রুয়ারি ২০১৮

নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাঙ্ক্ষিত সুফল
লেখক: মো. রহমতউল্লাহ্  | আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তনই শিক্ষা। অর্থাত্ শিক্ষার মাধ্যমে আচরণের পরিবর্তন সাধিত হতে হবে, পরিবর্তনটি অনুকূল হতে হবে এবং স্থায়ীও হতে হবে। এ কারণেই শিক্ষাদান অত্যন্ত জটিল একটি প্রক্রিয়া। যুগের পরিবর্তনের সাথে-সাথে পাঠদান পদ্ধতিতেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। বাধ্যতামূলকভাবেই এসেছে মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার। কেননা শিক্ষার্থীরা কোন বিষয় সম্পর্কে কেবল শুনে যতটুকু শিখে তারচেয়ে অনেক বেশি শিখে দেখে এবং তার  চেয়েও অনেক বেশি শিখে নিজে করে। কেবল শুনে যা শিখে, তা যতটা স্থায়ী হয়; তারচেয়ে বেশি স্থায়ী হয় শুনে ও দেখে যা শিখে তা এবং তারচেয়েও বেশি স্থায়ী হয় শুনে, দেখে ও নিজে করে যা শিখে তা। শুনে, দেখে ও নিজে করেই সম্ভব আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন সাধন। আনন্দঘন শিক্ষাই ফলপ্রসূ শিক্ষা। আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে তাই মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শিক্ষাদান অত্যন্ত কার্যকর একটি পদ্ধতি। অডিওর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কানে সহজেই পুনঃ পুনঃ পৌঁছে দেয়া যায় প্রতিটি বাংলা, ইংরেজি ও আরবি শব্দের সঠিক উচ্চারণ। তাতে শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা যায় সঠিক উচ্চারণ শিক্ষা। ভিডিও চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রায় বাস্তব করে তোলা যায় শিক্ষণীয় বিষয়। যেমন- একটি গাছে ৫টি পাখি আছে। দু’টি উড়ে গেলে ক’টি থাকবে। এই অংকটি বলে বোঝানোর চেয়ে অনেক সহজ ভিডিও চিত্র দেখিয়ে।
চিত্রে শিক্ষার্থীদের একটি কামরাঙা গাছ দেখানো হলো। গাছে ৫টি টিয়ে পাখি বসে কিচকিচ করছে দেখানো ও শোনানো হলো। ২টি পাখি উড়ে চলে যেতে দেখানো হলো। ৩টি পাখি গাছে বসে আছে দেখানো হলো। এখন সকল শিক্ষার্থীই বলতে পারবে ৫টি থেকে ২টি বাদ দিলে কয়টি থাকে। এতে শিক্ষার্থীরা অংক শিখলো এবং কামরাঙা গাছ চিনলো, টিয়ে পাখি চিনলো, টিয়ে পাখির ডাক শুনলো। শিক্ষা এবং আনন্দ দুটোই অনেক বেশি হলো। একটি মোবাইল ডিভাইজে ডিকশনারি, বিভিন্ন দেশের নাম, রাজধানীর নাম, মুদ্রার নামসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং কিছু শিক্ষণীয় বিষয়যুক্ত গেম লোড করে শিক্ষার্থীর হাতে বুঝিয়ে দিলে সহজেই সে পেতে পারে আনন্দঘন শিক্ষা। হতে পারে এসকল বিষয়ে তার আচরণের স্থায়ী অনুকূল পরিবর্তন। তাই বর্তমান সরকার ইতোমধ্যেই ২০ হাজার ৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টি-মিডিয়া ক্লাসরুম প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা নিয়েছে। আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় তা মোটেও যথেষ্ট নয়। সরকারের সাথে সাথে স্থানীয় জনগণ ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা এগিয়ে এলে দেশের সকল প্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন মোটেও কঠিন ব্যাপার নয়। মাল্টিমিডিয়াসহ বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তিসমৃদ্ধ শিক্ষা উপকরণ সংগ্রহ করা যতটা কঠিন তারচেয়ে অনেক বেশি কঠিন সেসব উপকরণ সঠিকভাবে ব্যবহার করে সঠিক শিক্ষাদান সুনিশ্চিত করা। শিক্ষক হচ্ছেন এই প্রক্রিয়া কার্যকর করার প্রধান নিয়ামক। এই পদ্ধতিতে শিক্ষাদানের জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহী ও সক্ষম শিক্ষকমন্ডলী। শিক্ষকরা যে সকল বিষয়ে জ্ঞান নিয়ে শিক্ষকতায় এসেছেন; তার যথাযথ প্রয়োগ করার জন্য প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। প্রশিক্ষণ ব্যতীত কোন কাজই পরিপূর্ণভাবে সম্পাদন করা যায় না। আমাদের শিক্ষানীতির প্রধান উদ্দেশ্য অনুসারে দেশের নাগরিকদেরকে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন আধুনিক যুগোপযোগী বিজ্ঞানমনস্ক কর্মমুখী শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য চাই অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সুশিক্ষিত শিক্ষক। আমাদের দেশে তেমন যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। অথচ অত্যাধুনিক প্রশিক্ষিত শিক্ষক ব্যতীত আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাদান অসম্ভব। বিশেষ করে কীভাবে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদেরকে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাদান সম্ভব তা জানানোর জন্য, বোঝানোর জন্য, শিখানোর জন্য শিক্ষকদেরকে দিতে হবে মাল্টি-মিডিয়া প্রশিক্ষণ। নায়েমসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত রয়েছে এই প্রশিক্ষণ প্রদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। যিনি নিজের চেষ্টাতেই ভালো শিক্ষক তিনি প্রশিক্ষিত হলে আরো কম সময় ও কম পরিশ্রমেই আরো অনেক বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে সুশিক্ষিত করতে পারেন। যা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য আরো অধিক কল্যাণকর। এজন্যই শিক্ষক প্রশিক্ষণের, বিশেষ করে মাল্টিমিডিয়া প্রশিক্ষণের গুরুত্বটি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মধ্যে এমনভাবে তুলে ধরা জরুরি যেনো তারা মনেপ্রাণে অনুভব করেন যে, তাদের সন্তাদেরকে শিক্ষাদানের জন্য চাই আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও মাল্টিমিডিয়া ব্যবহারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকমন্ডলী। অপরদিকে শিক্ষকদেরকে এব্যাপারে আরো আগ্রহী ও সক্রিয় করে তোলার জন্য বাধ্যতামূলক করতে হবে প্রশিক্ষণ এবং সেইসাথে বৃদ্ধি করতে হবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের বেতন-ভাতা।
লেখক :অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা
Email: md.rahamotullah52¦gmail.com