সব দিক জেনে-বুঝে হোন বেসরকারি শিক্ষক, দৈনিক বাংলা, ১০ জুলাই ২০২৫

 পত্রিকার লিংক



সব দিক জেনে-বুঝে হোন বেসরকারি শিক্ষক 

দৈনিক বাংলা, ১০ জুলাই ২০২৫

মো. রহমত উল্লাহ্

>বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল রাখার প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যারা এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হতে আগ্রহী তাদের উচিত বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য জেনে-বুঝে বাস্তবতার আলোকে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা। কেননা, অতি আবেগ তাড়িত হয়ে বা অন্য চাকরি না পেয়ে অথবা ভিন্ন কোন কারণে সব কিছু না জেনে না বুঝে বেসরকারি শিক্ষক হয়ে নিজের কর্মের উপর সন্তুষ্ট থাকতে না পারলে ব্যক্তিগত সফলতা অর্জন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন মোটেও সম্ভব নয়। সফল শিক্ষক ব্যতীত যোগ্য-দক্ষ নাগরিক-কর্মী তৈরি হয় না। একজন স্বেচ্ছা প্রণোদিত ও আত্ম নিবেদিত সুযোগ্য সফল শিক্ষক সারা জীবনে তৈরি করেন অগণিত সফল মানুষ। বিপরীত ক্রমে একজন অনাগ্রহী ও অসন্তুষ্ট শিক্ষক নিজের জান্তে বা অজান্তে সারা জীবনে তৈরি করেন অগণিত অযোগ্য নাগরিক। উত্তম শিক্ষকতার জন্য সন্তুষ্ট চিত্ত অত্যাবশ্যক। তাই বলছি, ভালোভাবে সবকিছু জেনেবুঝে ভেবেচিন্তে তবেই হওয়া উচিত শিক্ষক বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষক। এজন্যে প্রার্থীদের সুবিধার্থে সংক্ষিপ্তভাবে নিচে উপস্থাপন করছি কিছু বিবেচ্য বিষয়। 


মনে রাখতে হবে, ভিন্ন ভিন্ন ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি দ্বারা পরিচালিত প্রতিটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পৃথক, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদ সম্পূর্ণ পৃথক, চাকরির আবেদনের চয়েজ লিস্টের প্রতিটি চয়েজ পৃথক। পদ শূন্য থাকলে নিজের যোগ্যতা ও ইচ্ছা অনুসারে বাড়ির পাশে/ দূরে/ বহুদূরে/ শহরে/ গ্রামে অবস্থিত স্কুলে/ কলেজে/ মাদ্রাসায়/ কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবেদন করা যায়। এক্ষেত্রে একজন প্রার্থী তার পছন্দের ক্রমানুসারে অনেকগুলো (ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তি অনুসারে ৪০ টি) প্রতিষ্ঠানে অল্টারনেটিভ চয়েজ দিয়ে স্বেচ্ছায় আবেদন করতে পারেন। তার পছন্দ তালিকার যেকোনো একটিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে সে নিয়োগ পেতে পারেন। কর্তৃপক্ষ প্রার্থীর পছন্দ তালিকার বাইরের কোন প্রতিষ্ঠানে কাউকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করতে পারেন না। অর্থাৎ প্রার্থীর পছন্দ ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাকে সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। ফলে নিয়োগের পর কাউকে অন্যত্র বদলি করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য নয়; যদি না সহানুভূতিশীল হয়। তাই আবেদন করার ও নিয়োগ পাওয়ার আগেই প্রার্থীকে অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হবে। 


মনে রাখতে হবে, এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে সরাসরি বদলি হওয়ার বা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ এখনো অত্যন্ত সীমিত। কেন সীমিত তার ব্যাখ্যা অনেক বিস্তৃত, অনেক বিতর্কিত। তাই দ্রুত বদলি হবার মানসিকতা পরিহার করে যেখানে নিয়োগ পাবেন সেখানেই দীর্ঘদিন চাকরি করবেন এমন মানসিকতা নিয়ে আবেদন করা উচিত। কেউ কোনদিন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সুযোগ পেলেও সেটি তার পছন্দ মতো নাও হতে পারে। আবারো অনেকগুলো চয়েজ দিয়ে কোন একটিতে সুযোগ পেতে পারেন। তখনো তাকে অন্য একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যেতে হবে এবং সেটির ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির অধীনস্থ হয়েই চাকরি করতে হবে। 


মোট শূন্য পদের বিপরীতে মোট প্রার্থীসংখ্যা যাই থাকুক না কেন ভালো/ সচ্ছল/ সুবিধাজনক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। নিবন্ধন পরীক্ষায় বেশি নম্বর প্রাপ্ত হয়ে থাকলেও ভালো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে চাইলে একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার প্রয়োজন হবে। যাদের নিবন্ধন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর তুলনামূলক কম তাদের আরো বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার প্রয়োজন হবে। সে ক্ষেত্রে নিজের বাড়ির আশেপাশে অবস্থিত একাধিক প্রতিষ্ঠানে এবং অনেক দূর-দূরান্তে অবস্থিত একাধিক প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার তাগিদ অনুভব করতে পারেন।  


যে প্রতিষ্ঠানেই আবেদন করুন না কেন; ধরে নিতে হবে ওই প্রতিষ্ঠানেই আপনার চাকরি হবে এবং আপনি অবশ্যই সেখানে চাকরি করতে যাবেন। তাই একজন প্রার্থীর নিম্নে লিখিত বিষয়গুলো ভালোভাবে বিবেচনায় রেখে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চয়েজ করে সিলেকশন করা বা আবেদন করা উচিত।


অনেক বছর আগে থেকেই এদেশের শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা অত্যন্ত কম ছিল। তখনকার শিক্ষকগণের প্রায় সবাই স্বেচ্ছায় স্বপ্রণোদিত হয়ে, আত্মনিবেদিত হয়ে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তাঁদের কাছে শিক্ষকতা প্রায় শতভাগ ব্রত ছিল। তখনকার জীবনযাপনের প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্য মুখ্য ছিল না। তবে বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষকদের ন্যূনতম জীবন ধারণের প্রয়োজনেই শিক্ষকতার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি অনেকাংশে মুখ্য হয়ে উঠেছে। তথাপি আমাদের দেশের শিক্ষকদের বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় খুবই নগণ্য! বর্তমানে এমপিও এর মাধ্যমে সরকার মাধ্যমিক স্তরের একজন প্রশিক্ষণ বিহীন সহকারি শিক্ষককে মূল বেতন দিয়ে থাকে মাত্র ১২,৫০০ টাকা! উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের একজন প্রভাষককে প্রাথমিক মূল বেতন দেওয়া হয় ২২,০০০ টাকা। এছাড়া সকল স্তরের শিক্ষকদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট অনধিক ৫ শতাংশ, বাড়ি ভাড়া ভাতা ১,০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ, বাংলা নববর্ষ ভাতা ২০ শতাংশ দেওয়া হয়ে থাকে। অপরদিকে এই মূল বেতন থেকে অবসর + কল্যাণ তহবিলের জন্য ১০ শতাংশ টাকা জমা রাখা হয়। নিয়মিত ২৫ বা ততোধিক বৎসর চাকরি করে অবসরে গেলে কল্যাণ + অবসর তহবিল থেকে সর্বশেষ মূল বেতনের প্রায় ১০০ গুন টাকা পাওয়ার বিধান বিদ্যমান। তবে তা পেতে অনেক বৎসর অপেক্ষা করতে হয়! 


উল্লিখিত সরকারি সুবিধার অতিরিক্ত কোন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বচ্ছলতা ও বিধি-বিধানের উপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠান সচ্ছল হলে আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান অসচ্ছল হলে সরকারি টাকার বাইরে উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই পাওয়া যায় না! এই ডিজিটাল যুগে নিজেকে তৈরি করতে জানলে এর চেয়ে অধিক উপার্জনের বহুমুখী সুযোগ দেশে ও বিদেশে অবারিত। বেসরকারি শিক্ষকদের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা কতদিনে কতটুকু বৃদ্ধি পাবে তা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। কতবছরে কতটি প্রতিষ্ঠান সরকারি হবে তা আরো বেশি অনিশ্চিত। আমার দীর্ঘ অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে বারবার।


কেউ যদি ধারণা করেন, অন্যান্য চাকরির তুলনায় শিক্ষকতায় সময়, শ্রম ও মেধা কম দিতে হয় তো সেটি ভুল। শিক্ষকতায় কাজের পরিধি এখন অনেক বিস্তৃত। নিত্যনতুন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঠিক জ্ঞান দেওয়ার জন্য শিক্ষককে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয় প্রতিনিয়ত। আয়ত্ত করতে হয় অত্যাধুনিক পাঠদান ও মূল্যায়ন কৌশল। আত্মনিবেদিত থাকতে হয় সর্বক্ষণ। বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপনের জন্য ছুটির দিনেও আসতে হয় প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থীর কল্যাণার্থে চিন্তাচেতনার দিক থেকে প্রকৃত শিক্ষকের কোনো ছুটি নেই। এসবই করা চাই অত্যন্ত আগ্রহ ও আনন্দের সঙ্গে। শিক্ষকতা শিক্ষকের জন্য আনন্দদায়ক না হলে শিক্ষা লাভ শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দদায়ক হয় না, সফল হয় না। শিক্ষক হবার আগে অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে এসব। 


মোট কথা হচ্ছে, সব দিক না জেনে, না বুঝে, শিক্ষকতায় এসে কেউ যদি হতাশায় ভোগেন তো তিনি নিজে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন তেমনি শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সবকিছু জেনে বুঝে, মেনে নিয়ে, মনে নিয়ে, তবেই আসা উচিত শিক্ষকতায় বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষকতায়। আমি বলতে চাচ্ছি, সবার শিক্ষক হওয়া উচিত নয়। যারা সাধারণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত, ভোগের চেয়ে ত্যাগে আনন্দিত, শিক্ষা অর্জনে ঐকান্তিক, শিক্ষাদানে উজ্জীবিত, মননশীল ও সৃষ্টিশীল, মহৎ চিন্তায় ও কাজে নিবেদিত, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিরলস, শিক্ষার্থীদের মাঝে অমর হতে ইচ্ছুক তাদেরই হওয়া উচিত এদেশের শিক্ষক। তা না হলে এ মহৎ কাজে এসে সারাক্ষণ মন খারাপ করে, দাবিদাওয়া করে, আন্দোলন করে, দলাদলি করে, অন্যকে দোষারোপ করে, অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করে, বিক্ষুব্ধ বা হতাশাগ্রস্ত হয়ে নিজের পেশাকে মন্দ বলে বলে মন্দ সময় পার করে; না হওয়া যায় শিক্ষক, না পাওয়া যায় আনন্দ, না পাওয়া যায় শান্তি!<



লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 Email - rahamot21@gmail.com 


পত্রিকার লিংক: 

https://epaper.dainikbangla.com.bd/home/displaypage/news_2025-07-10_5_15_b 

শিক্ষায় যোগাযোগ দক্ষতা

পত্রিকার লিংক

শিক্ষায় যোগাযোগ দক্ষতা 

মো. রহমত উল্লাহ্

ইত্তেফাক > ০৪ মে ২০২৫

>যোগাযোগ ব্যতীত অনেক কিছুই অচল। শুধু প্রাণীকুলের মধ্যেই নয়, প্রাণীকুল ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যেও যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। তাই যোগাযোগ দক্ষতা সবার জন্যই আবশ্যক। বিভিন্ন ক্ষেত্রের সফলতা অনেকাংশেই যোগাযোগ দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। নেতা, কর্তা, কর্মী, শিল্পী, শিক্ষক, সাহিত্যিক সবার সফলতাই কমবেশি নির্ভর করে যোগাযোগ দক্ষতার উপর।


প্রত্যক্ষভাবে বা প্রযুক্তির মাধ্যমে তথ্য ও মনোভাবের সফল আদান-প্রদানের যোগ্যতাই যোগাযোগ দক্ষতা। সংক্ষেপে বলা যায়, বুঝতে পারা এবং বুঝাতে পারার যোগ্যতাই যোগাযোগ দক্ষতা। বলা, শোনা, লেখা, পড়া, আঁকা, ইঙ্গিত করা যোগাযোগের উল্লেখযোগ্য উপায়। যার জন্য ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং এর প্রয়োগ দক্ষতা অত্যাবশ্যক। স্থান, কাল, পাত্র, ক্ষেত্র, পরিবেশ, পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে যথাযথ ভাষা, যুক্তি, প্রযুক্তি প্রয়োগ করে তথ্য ও মনোভাব আদান-প্রদান সফল যোগাযোগের পূর্বশর্ত। উত্তম সম্ভাষণ উত্তম যোগাযোগের অলংকার। 


শ্রেণিনেতা হিসেবে শিক্ষকের যোগাযোগ দক্ষতা উত্তম শিক্ষক হবার ক্ষেত্রে সর্বাধিক ভূমিকা রাখে। শিক্ষনীয় বিষয়ে তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা শিক্ষকের অন্যতম প্রধান গুণ। আবশ্যকীয় এ গুণ আত্মস্থ করা, প্রয়োগ করা শিক্ষকের নৈতিক ও পেশাগত অপরিহার্য দায়িত্ব। যোগাযোগ দক্ষতায় সুদক্ষ শিক্ষকের নিকট থেকেই শিক্ষার্থীরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আয়ত্ত করে বিভিন্ন শিক্ষনীয় শিক্ষনীয় বিষয়।  


শিক্ষার্থীর কাঙ্খিত যোগাযোগ যোগ্যতা অর্জনের প্রধান অবলম্বন হচ্ছেন শিক্ষক। শিক্ষকের নিকট থেকেই শিক্ষার্থী আয়ত্ত করে যৌক্তিক প্রশ্ন করার এবং উত্তর দেওয়ার অধিকাংশ কৌশল, শিষ্টাচার, নমনীয়তা ও সহিষ্ণুতা। যা তার উত্তম জীবনের অফুরন্ত সম্পদ। নিজের মনে উঁকি দেওয়া প্রশ্নগুলো সঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারা শিক্ষার্থীর আবশ্যকীয় যোগাযোগ দক্ষতা। যে শিক্ষার্থীর প্রশ্ন করার আগ্রহ ও দক্ষতা বেশি সে শিক্ষার্থীর শিক্ষা লাভের সম্ভাবনা বেশি। উত্তরদাতার বোধগম্য করে প্রশ্ন করা এবং প্রশ্নকর্তার বোধগম্য করে উত্তর দেওয়ার দক্ষতা ঘরে-বাইরে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত। আবার সম্পর্ক বজায় রেখে ‘না’ বলতে পারাও যোগাযোগ দক্ষতার বিশেষ দিক। 


যোগাযোগ সফলতার মানদণ্ডেই নির্ধারিত হয় পারস্পরিক ও সামগ্রিক সম্পর্কের স্তর।

ছাত্র ও শিক্ষক উভয়ের উত্তম যোগাযোগ দক্ষতার উপর ভিত্তি করেই রচিত হয় উত্তম ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। যা সফল শিক্ষার অপরিহার্য মানবীয় উপাদান।< 


মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক



https://epaper.ittefaq.com.bd/m/433618/6816237b5e35a

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি

 পত্রিকার লিংক

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি:

ক্লাশ অফিস সহশিক্ষা কার্যক্রম খোলা-বন্ধের বিষয় স্পষ্ট করা উচিত

মো. রহমত উল্লাহ্

জাগোনিউজ২৪ডটকম, ১০ এপ্রিল ২০২৫

>আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরো গভীরভাবে ভাবা উচিত। সাধারণত দেখা যায় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় বিভিন্ন উপলক্ষে বছরে ছুটি থাকে কমবেশি ৭৫ দিন। এর বাইরে খুলার দিনগুলোতে সপ্তাহে দু’দিন করে থাকে সাপ্তাহিক ছুটি। এভাবে বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মোট ছুটি থাকে ১৫০ দিনেরও বেশি! এক্ষেত্রে মেনে চলা উচিত আন্তর্জাতিক মান ও সমতা। জানা উচিত কোন দেশে কী কারণে কতদিন ছুটি থাকে কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান? বাস্তবতার ভিত্তিতে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা উচিত আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে। যেমন, পূজায় মাদ্রাসা এবং রোজায় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা উচিত কিনা? প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের ছুটির তালিকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আরেক ধরনের ছুটির তালিকা এবং উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরেক ধরনের ছুটির তালিকা কতটা যৌক্তিক?


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবারের পরিবর্তে বৃহস্পতি ও শুক্রবার নির্ধারণ করা অধিক যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এতে করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পাবে; যা শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে কর্মজীবী অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদের শুক্রবারে নিজেদের মত সময় দিতে পারবেন এবং শনিবারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সন্তানদের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে শিক্ষকগণের পরামর্শ নিতে পারবেন ও প্রয়োজনীয় মতামত দিতে পারবেন। অর্থাৎ অভিভাবক-শিক্ষক সমিতি (পিটিএ) এর কার্যক্রম আরো জোরদার করা যাবে। পরিচালনা কমিটিতে (জিবি, এসএমসি, এমএমসি) অধিক শিক্ষিত কর্মজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করে শনিবারে সভা করে উপস্থিতি বৃদ্ধি করে অধিক সহযোগিতা নেওয়া যাবে। তাছাড়া শিক্ষক-কর্মচারীরা বৃহস্পতিবারে ছুটি না নিয়ে নিজেদের ব্যাংক একাউন্ট অপারেট করাসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদন করতে পারবেন। তদুপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন চাইলে বৃহস্পতিবারে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের অফিসিয়াল কাজও জরুরি ভিত্তিতে সম্পাদন করতে পারবেন। অপরদিকে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও পানি-বিদ্যুৎ বন্টনের ক্ষেত্রেও তা সামান্য সহায়ক হবে।


একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয় যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দিবস ছুটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যেমন: ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, বাংলা নববর্ষ, ১৬ই ডিসেম্বর। কিন্তু সেসকল দিবস উদযাপনের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। দিবস উদযাপনের জন্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন বিধায় কর্মচারীদেরও প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হয়। অর্থাৎ অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মত শিক্ষক-কর্মচারীরা ঐ সকল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসে বাস্তবে ছুটি ভোগ করতে পারেন না। এক্ষেত্রে অনেকের মনে অসন্তোষ বিরাজ করে। এসকল দিবস শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য ছুটির দিন নাকি খোলার দিন তা পরিষ্কার নয়! তাই প্রতিষ্ঠান প্রধানরাও শিক্ষকদের ম্যানেজ করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জটিল সমস্যার সম্মুখীন হন। প্রতিষ্ঠান প্রধানের সঙ্গে শিক্ষকদের মতপার্থক্য হয়, দূরত্ব বৃদ্ধি পায় ও শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হয়। তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছুটির দিনে এক বা একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী অনুপস্থিত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে তা পরিষ্কারভাবে বলা না থাকায় প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ চরম বেকায়দায় পড়েন। 


শিক্ষার্থীদের বিশেষ দিবসে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকা ও বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করাকে ধারাবাহিক মূল্যায়নের বা প্রতিযোগিতার অন্তর্ভুক্ত করে কিছুটা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা গেলেও শিক্ষকদের ক্ষেত্রে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা আরোপ করার তেমন কোন নির্ধারিত উপায় ঘোষণাকৃত নেই। কোন শিক্ষক-কর্মচারী জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ দিবসে স্বপ্রণোদিত হয়ে স্বেচ্ছায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না চাইলে অর্থাৎ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে অনুপস্থিত থাকতে চাইলে বা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রধান কী করবেন বা কী ধরনের ব্যবস্থা নিবেন তা পরিষ্কার করে উল্লেখ থাকা উচিত। একজনকে বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ঐদিন অনুপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হলে ১০ জন ১০ রকমের সমস্যা উত্থাপন করে অনুপস্থিত থাকার আবদার করেন! সবার আবদার রাখতে গেলে দিবস উদযাপন করা সম্ভব হয় না। আবার অনুপস্থিতির সংখ্যা হ্রাস করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান প্রধানের ক্ষমতা বলে ওই দিনের অনুপস্থিতির কারণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীর একদিনের নৈমিত্তিক ছুটি কমিয়ে দেওয়া হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন; যদিও ছুটিবিধি অনুসারে কর্মী বৎসরে পূর্ণ বিশ দিন নৈমিত্তিক ছুটি অধিকার হিসেবে প্রাপ্য নন এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান তা দিতে বাধ্য নন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, সরকারি আদেশ অনুসারে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবস উদযাপনের এবং তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের দায়িত্ব কেবল প্রতিষ্ঠান প্রধানের ও আগ্রহী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই দায়সারা ভাবে জাতীয় দিবস উদযাপিত হয়ে থাকে। এমতাবস্থায় বিশেষ জাতীয় দিবসগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি তালিকার বাইরে রাখা অথবা অন্য কোন কার্যকর নির্দেশনা থাকা আবশ্যক। 


অপরদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু ছুটি বিদ্যমান যে সকল ছুটির দিনে বা ভ্যাকেশনে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সরকারি অফিস খোলা থাকে। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি, সরকারি অফিস খোলা। তাই সংশ্লিষ্ট সরকারি অফিস থেকে বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশ এসে থাকে; যা জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করতে হয় বিধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলা রাখতে হয়। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বিভিন্ন অফিসিয়াল বা হিসাব সংক্রান্ত কাজেও ভ্যাকেশনের সময় অফিস খোলা রাখার প্রয়োজন পড়ে। শিক্ষার্থীদের ভর্তি, টিসি, রেজিস্ট্রেশন, ফরম ফিলাপ, সনদ প্রদান, প্রবেশপত্র প্রদান, বইয়ের চাহিদা প্রদান, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-বিল তৈরি ইত্যাদি কাজে প্রতিষ্ঠানের অফিস নিয়মিত খোলা না রেখে কোন উপায় থাকে না। তখন প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহপ্রধান ও কর্মচারীদের উপস্থিত থাকতে হয়। অর্থাৎ তারা ওই ভ্যাকেশন উপভোগ করতে পারেন না। আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মী হিসেবে ট্রিট করার কারণে বিশেষ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরতরা ছুটি অর্জন ও বিক্রির সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং তারা পিআরএল ভোগের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহপ্রধান ও কর্মচারী প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না চাইলে কী রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে তাও পরিষ্কার ভাবে ব্যাখ্যা থাকা উচিত। তবে যে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী অবকাশ বিভাগের সুবিধা ভোগ করতে পারেন না তাদেরকে অবকাশ বিভাগের কর্মী হিসেবে বিবেচনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত তাও ভাবতে হবে।

 

তাছাড়া বিশেষ দিবসে ও অন্যান্য ভ্যাকেশনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “ছুটি/বন্ধ থাকবে” এমন কমন কথা ছুটির তালিকায় বা সরকারি আদেশে মোটেও লেখা উচিত নয়। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন অফিসের গেট বা দরজা ছুটির দিনে বন্ধ থাকে। সে হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছুটির দিনে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকারই কথা এবং সেদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানে আসতে না চাওয়ারই কথা। তাই নির্ধারিত ছুটির/বন্ধের দিনে কেউ আসতে না চাইলে তাকে বাধ্য করা খুবই কঠিন। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটির তালিকায় এটি পরিষ্কার করে লেখা উচিত যে, কোন দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ছুটি থাকবে, কোন দিন শুধু শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, কোন দিন অফিস খোলা থাকবে, কোন দিন বিশেষ দিবস উদযাপনের জন্য কিংবা সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য সবাই প্রতিষ্ঠানে আসতে বাধ্য থাকবে। যখন অফিস বন্ধ রাখা হবে তখন কোন সরকারি কাজ করার আদেশ সাধারণত দেওয়া উচিত নয়। কেননা, বাড়তি সুবিধা দেওয়া না গেলে ছুটির দিনে কাজ করার আদেশ অমান্য হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।<


সর্বোপরি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অফিসের জন্য পৃথকভাবে যৌক্তিক বার্ষিক মোট কর্মদিবস তথা মোট কর্মঘন্টা নির্ধারণ করে ছুটির তালিকা প্রণয়ন করা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসসহ বিভিন্ন দিবসে ও অন্যান্য ভ্যাকেশনে প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রধান, সহপ্রধান, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য পুরস্কার-তিরস্কার নির্দিষ্ট করা আবশ্যক। সেইসাথে অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় রাখা উচিত শিক্ষক-কর্মচারীদের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও কাঙ্খিত জীবনমান।


লেখক: অধ্যক্ষ ও প্রাবন্ধিক