অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা। দৈনিক আমাদের সময়, 31 ডিসেম্বর 2020

অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা। দৈনিক আমাদের সময়, 31 ডিসেম্বর 2020
অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা
মো. রহমত উল্লাহ্  

দৈনিক আমাদের সময়, ৩১ ডিসেম্বর ২০২০

পৃথিবীর বর্তমান বাস্তবতায় অনলাইন শিখন-শেখানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ব্যস্ততা, অবস্থা, অবস্থান, আর্থিক সুবিধা-অসুবিধা, সময়ের স্বল্পতা ইত্যাদি কারণে উন্নত বিশ্বে অনলাইন শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই চলমান ও জনপ্রিয়। বিশেষ করে বর্তমান কোভিড পরিস্থিতিতে মানুষ যখন প্রায় ঘরবন্দি, তখন শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার জন্য পৃথিবীর সব দেশেই এখন একমাত্র ভরসা হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম। এই কোভিড পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা খাত। এর বিরূপ প্রভাব হবে অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিসীম। এই ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায় হিসেবে এখন দেখা হচ্ছে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমকে।

‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র’- এ বক্তব্য, ধারণা, চিন্তা ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব রূপ দিয়েছে বর্তমান অনলাইন শিখন-শেখানো কার্যক্রম। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির বদৌলতে পৃথিবীর অনেক কিছুই বর্তমানে হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর বাইরেও চলছে মানুষের অভিযান। সেখান থেকেও নেওয়া হচ্ছে শিক্ষার নানা উপাদান। তথ্য ও তত্ত্ব জ্ঞানলাভের প্রায় সবকিছুই পাওয়া যাচ্ছে ছোট্ট একটি মোবাইল ফোনে। বলা যায়, আমার মোবাইল ফোনেই আমার বিশ্বজোড়া পাঠশালা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষক। আবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একজন শিক্ষকের শিক্ষার্থী। ইন্টারনেট সুবিধার কারণে শিক্ষকরা তাদের শ্রেষ্ঠ ক্লাসগুলো আপলোড করে রাখতে পারেন অনলাইনে।

প্রাতিষ্ঠানিক বা ফরমাল শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমানে অনলাইন শিখন-শেখানোর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। আমাদের শিক্ষার্থীদের স্লোগান হচ্ছে ‘আমার ঘরে আমার স্কুল’। আজ ঘরে বসেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা অর্জন করছে শিক্ষা ও শিক্ষাসনদ। বর্তমান মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের নিরাপদে রেখে অনলাইন শিখন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে তাদের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারছে- এটি অবশ্যই একটি ভালো দিক। শিক্ষকরাও নিরাপদে থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন অনলাইন শেখানো কার্যক্রম। শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ই আয়ত্ত করছেন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার। উত্তম শিক্ষকরা উদ্ভাবন করেছেন পরিবর্তিত পরিস্থিতির আলোকে নতুন নতুন পাঠদান কৌশল। প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে আপলোড করছেন তার সিলেবাসভুক্ত নির্ধারিত চ্যাপ্টারের বিশেষ বিশেষ ক্লাস। প্রয়োজনে সেসব ক্লাস আপডেট করতে পারছেন যখন-তখন, করতে পারছেন নতুন নতুন ক্লাস আপলোড। ওই ক্লাসগুলো আর বারবার নিতে হচ্ছে না শিক্ষকের এবং বারবার অনুসরণ করতে পারছে অগণিত শিক্ষার্থী। ভালো শিক্ষকের পাঠদান কৌশল অনুসরণ করছেন অনেক আগ্রহী সাধারণ শিক্ষক। উভয়েই চালিয়ে যাচ্ছেন উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা। এতে লাভবান হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা মূল্যায়নেও যুক্ত হয়েছে নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি।

এতকিছুর পরও এ কথা বলার উপায় নেই, আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে এতটুকু কমে গেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তথা অফলাইন ক্লাসের প্রয়োজনীয়তা। বিশেষ করে শিশু-কিশোর, যুবা-যুবক শিক্ষার্থীদের জন্য ফরমাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়া খুব বেশি জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না যাওয়ার কারণে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং উদ্যমহীন ও বিষণœ হয়ে পড়ছে। দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা, হাসি-তামাশা না থাকায় তারা ধরে রাখতে পারছে না শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। কেউ কেউ নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছে অবাধ ইন্টারনেটের অন্ধকার আসক্তিতে। প্রত্যক্ষ যোগাযোগের অভাবে তারা হয়ে উঠছে অসামাজিক। শিখছে না প্রকৃত বন্ধুত্ব, মানুষের জন্য ত্যাগ, সামাজিক দায়িত্ব-কর্তব্য। অর্জন করছে না সুন্দর করে কোনো কিছু মুখ খুলে বলার যোগ্যতা। সরাসরি শিক্ষকদের সঙ্গে ওঠাবসা না থাকায় তারা আয়ত্ত করতে পারছে না আদর্শ চলন-বলন, পোশাক-আশাক। উত্তম শিক্ষকের ন্যায়-নীতিবোধ প্রোথিত হচ্ছে না শিক্ষার্থীর মনে। প্রাতিষ্ঠানিক ওঠা-বসা না থাকায় তারা শিখছে না সময়ানুবর্তিতা ও নিয়ম-শৃঙ্খলা। রপ্ত করছে না ম্যানার্স অ্যান্ড এটিকেটস। সবকিছুই খুব সহজে ইন্টারনেট থেকে পেয়ে যাওয়ার কারণে শানিত করছে না নিজের সৃজনশীলতা। হারিয়ে ফেলছে দেশ ও জাতির কল্যাণে এক পা এগিয়ে আসার উদ্দীপনা ও মানসিকতা। শারীরিকভাবেও হয়ে যাচ্ছে শক্তিহীন ও অলস।

অন্যদিকে সব শিক্ষার্থী সমানভাবে পাচ্ছে না অনলাইন শিখন সুবিধা। বিশেষ করে আমাদের দেশের মতো দরিদ্র দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী অবস্থান করছে ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে। আবার অনেকেরই সাধ্য নেই ডিভাইস ক্রয় ও ইন্টারনেট বিল পরিশোধের। তাই আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। তারা পিছিয়ে থাকবে পরবর্তী শিক্ষা ও কর্মে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে শিক্ষা, যোগ্যতা ও দক্ষতায় তৈরি হবে বিশাল অসমতা। এটি খুবই ভাবনার বিষয়!

এদিকে অনলাইন শিখন-শেখানোয় বিদ্যমান নেই ব্যবহারিক শিক্ষার কোনো সুযোগ। এমন কিছু চ্যাপ্টার বা বিষয় আছে- যেগুলোর সফল পাঠদান সম্ভব হয় না অনলাইন ক্লাসে। মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো অনেক বিষয় আছে- যেগুলোর দুই-একটি চ্যাপ্টার অনলাইনে পড়ানো সম্ভব হলেও সম্পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করা মোটেও সম্ভব নয়। নাচ, গান, হামদ, নাত, চিত্রাঙ্কন, বক্তৃতা, বিতর্ক, আবৃত্তি, খেলাধুলা ইত্যাদি সহশিক্ষার সঠিক অনুশীলন অনলাইন ক্লাসে অসম্ভব। প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক তৈরি করতে পারেন না মানসম্পন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহ ও দক্ষতা নেই সব শিক্ষকের। এমনও শিক্ষক আছেন- যারা ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে ক্যামেরার সামনে এসে বলতে চান না কথা, নিতে চান না অনলাইন ক্লাস। ফলে তৈরি হয় না শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর ইন্টারেকশন বা মিথস্ক্রিয়া। নিজের দুর্বলতা প্রকাশের ভয়ও আছে অনেক শিক্ষকের। অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষার মাধ্যমে সম্ভব হয় না পরিপূর্ণ শিক্ষার মূল্যায়ন। কিছু অ্যাপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর স্মরণশক্তি ও আইকিউ যাচাই করা সম্ভব হলেও সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনী শক্তি মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না সঠিকভাবে।

আলোচিত সুবিধা ও অসুবিধার আলোকে নিশ্চিত করেই বলা চলে, আনুষ্ঠানিক শ্রেণিপাঠের জন্য কোনোভাবেই অফলাইন বা সাধারণ ক্লাসের বিকল্প হতে পারে না অনলাইন ক্লাস। প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে সরাসরি পাঠদানের মাধ্যমেই সর্বাধিক অর্জন করা সম্ভব শিখন-শেখানোর সফলতা তথা ‘সুস্থ দেহে সুস্থ মন গঠন’। বিশেষ করে শিশু-কিশোর, যুবা-যুবক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক ও বয়স্কদের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অনলাইন শিখন-শেখানোর প্রয়োজনীয়তা এই ডিজিটাল যুগে অনস্বীকার্য। মোট কথা, একটি অন্যটির পরিপূর্ণ বিকল্প নয়। বর্তমান ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতির অবসান হলেও চলমান থাকবে অনলাইন শিখন-শেখানো কার্যক্রম। স্বাভাবিক শ্রেণি কার্যক্রমের পাশাপাশি চলবে অনলাইন ক্লাস। এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই শিক্ষকদের হয়ে উঠতে হবে উভয় পদ্ধতিতে অধিক যোগ্য ও দক্ষ।

মো. রহমত উল্লাহ্ : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যা করণীয়। jagonews24.com, 29 ডিসেম্বর 2020

শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যা করণীয়। jagonews24.com, 29 ডিসেম্বর 2020

 শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যা করণীয়

সম্পাদকীয় ডেস্ক প্রকাশিত: ০৯:৫৬ এএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০

মো. রহমত উল্লাহ্

আমাদের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কেননা, এই সময়ে তারা টিনএজে অবস্থান করে বিধায় তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন চলমান থাকে। দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে শারীরিক ও মানসিক গঠন। অতিক্রম করতে থাকে বয়ঃসন্ধিকাল। তাই তাদের চিন্তা-চেতনায়ও এ সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। একেকজন করে থাকে একেক রকম আচরণ।

অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায় অবাধ্য হবার প্রবণতা। শুনতে চায় না উপদেশ, মানতে চায় না আদেশ-নির্দেশ। শুরু করে বেপরোয়া দুরন্তপনা, দেখায় ভয়াবহ দুঃসাহস। নিজে যা ভাল মনে করে তাই সঠিক বলে ধরে নেয় এবং তাই করার চেষ্টা করে। বাঁধভাঙ্গা গতিতে ধাবিত হতে থাকে নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি। সামান্য প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির ব্যবধানে হয়ে যায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ, প্রকাশ করে অস্বাভাবিক রাগ-অভিমান। অল্পতেই বোধ করে অপমান, হুটহাট করে ফেলে আত্মহত্যা। লেখাপড়ায় হয়ে উঠে অমনোযোগী। পাল্টে যায় চলন-বলন ও সাজ-পোশাকের ধরন। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি হয়ে ওঠে অতিরিক্ত আগ্রহী, আকৃষ্ট। কেউ হয়ে ওঠে বাহির মুখী, কেউবা লুকিয়ে যায় নিজের ভিতর। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ সকল বিষয়ের প্রতি যত্নশীল না হলে তারা হয়ে যেতে পারে বিষন্ন, জড়িয়ে যেতে পারে অপকর্মে, চলে যেতে পারে বিপথে, হারাতে পারে মনোযোগ, ছিটকে যেতে পারে লেখাপড়া থেকে। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে শিক্ষক ও অভিভাবকের হতে হয় অত্যন্ত যত্নশীল। তবেই তৈরি করা সম্ভব হয় দেশ ও জাতির কল্যাণে অধিক যোগ্য নাগরিক-কর্মী।

শিক্ষার্থীর শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আমরা সবাই গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। আসলে সুস্থতা বলতে শারীরিক ও মানসিক উভয় সুস্থতা কেই বোঝায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- 'শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য'। অর্থাৎ দেহ ও মন ভালো থাকা মানেই স্বাস্থ্য ভালো থাকা। দেহ ও মন পরস্পরের পরিপূরক। শরীর যতই সুস্থ থাকুক, ভালো কিছু করার জন্য মানসিক সুস্থতা আবশ্যক। মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে, মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভূতির সুষ্ঠু সমন্বয়। এই মানসিক বিষয়গুলোর সঠিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই মানুষ তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে সম্পাদন করে এবং পরস্পরের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উত্তম মানুষে পরিণত করার জন্যই মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন অপরিহার্য। সুস্থ শরীরের যেমন যত্ন নিতে হয় তেমনি সুস্থ মনেরও নিয়মিত যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এর মতে, 'পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে না পারা শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হাত থেকে বাঁচাতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। দেশের সকল স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট (মনোবিদ) নিয়োগ দিতে হবে। মানসিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সুরক্ষায় আমাদের এখন থেকেই কাজ করতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে এ সমস্যা আরও বেড়ে যাবে।'

তাঁর কথার আলোকে আমাদের দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে গ্রহণ করতে হবে স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ। সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এর প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট বিশেষ করে এডুকেশনাল কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। কেননা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জটিল মানসিক রোগীর চিকিৎসা করার চেয়ে মানসিক রোগ প্রতিরোধে কাজ করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত যোগ্য লোক তৈরি না থাকায় আমাদের দেশের লক্ষাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এডুকেশনাল কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করা অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ব্যাপার। যে কোন স্তরেই হোক, শিক্ষকতায় যথাযোগ্য লোক আসার অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে বেকার লোকের কর্মসংস্থান করার চিন্তা করা মানেই দেশ ও জাতির চিরস্থায়ী ক্ষতি সাধন করা। যারা যোগ্যতার অভাবে কোথাও চাকরি পায় না তারা যেনতেন ডিপ্লোমা সনদ সংগ্রহ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে এডুকেশনাল কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট হয়ে গেলে এবং ৩০ থেকে ৪০ বছর এই কর্মে নিয়োজিত থাকলে কী মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হবে আমাদের তা কল্পনা করাও কঠিন। এমন লোক নিয়োগ হলে কিছুদিন পর হয়তো দেখা যাবে, তারা ক্লাস নিচ্ছেন বা প্রাইভেট পড়াচ্ছেন অন্য কোন বিষয়ে। তাই অধিক যোগ্য লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রাখার পাশাপাশি নিয়মিত কাজ হিসেবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকদেরই অর্জন করতে হবে ন্যূনতম যোগ্যতা, পালন করতে হবে সর্বাধিক দায়িত্ব।

একটি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য একজন কাউন্সিলর কখনোই যথেষ্ট হবে না। কেননা, প্রতিটি শিক্ষার্থীকে পৃথকভাবে খুব কাছে থেকে বছরের পর বছর নিয়মিত নিবিড় পর্যবেক্ষণ করা কখনোই একজনের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি হয়তো শিক্ষকদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে এই কাজ করানোর ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। শিক্ষকগণ যেখানে যেখানে ব্যর্থ হবেন তিনি সেখানে সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন। আমাদের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন করে এডুকেশনাল কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দিয়ে সে পর্যায়ে পৌঁছাতে গেলেও অনেক সময়ের প্রয়োজন।

বর্তমান বাস্তবতায় 'মানসিক শিক্ষা'কে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা (আসন্ন একমুখী শিক্ষায় প্রস্তাবিত 'ভালো থাকা' বিষয়টিতে তা যুক্ত করা যেতে পারে) এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ চলমান রাখার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে তাদের কিছু করণীয় নির্ধারণ করে দেওয়া আবশ্যক।

যেমন-
*শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অনুকূল রাখতে হবে সকল স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার পরিবেশ। সবাই খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনোভাবেই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং বুলিংয়ের শিকার না হয় শিক্ষার্থীরা। 
*প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই বজায় রাখতে হবে একটা জয়জয়কার (উইন উইন) পরিবেশ। 
*শিক্ষক কোনভাবেই ভয়ের পাত্র হবে না শিক্ষার্থীদের। এমনকি সিনিয়র শিক্ষার্থীরাও ভয়ের পাত্র হবেন না কোন জুনিয়র শিক্ষার্থীর। পরস্পরের মধ্যে বিরাজ করতে হবে শ্রদ্ধা ও স্নেহের সম্পর্ক।
*শিক্ষার্থীদের সাথে তুইতোকারি করে কথা বলা যাবে না। সম্মানজনক সম্বোধন করে কথা বলতে হবে। কোনভাবেই করা যাবে না তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ডাকা যাবে না বিকৃত নামে।
*শিক্ষকগণ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে শুনবেন শিক্ষার্থীদের কথা, যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থী মনে করে তার শিক্ষক অনেক গুরুত্ব দিচ্ছেন, আদর করছেন তাকে। শিক্ষক কোনভাবেই প্রকাশ করবেন না বিরক্তিভাব। কোন কিছু 'না' করতে হলেও ব্যবহার করবেন অনুকূল শব্দ বা বাক্য। 
*শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ও পরীক্ষায় ভালো করার জন্য শিক্ষকগণ প্রতিনিয়ত প্রদান করবেন উৎসাহ ও উদ্দীপনা। কোনভাবেই করবেন না বকাঝকা বা তিরস্কার, দেখাবেন না কোনকিছুর ভয়।
*শিক্ষকগণ সর্বদা ইতিবাচক কথা বলবেন শিক্ষার্থীদের সাথে। কোন শিক্ষার্থীকে তার চেয়ে অধিক যোগ্য কারোর সঙ্গে তুলনা করে অপমান করবেন না। যা পারেনি তা বলবেন না, যা পেরেছে তা যত ছোটই হোক বার বার উল্লেখ করে ধন্যবাদ দিবেন।
*শিক্ষার্থীদের মনে স্বপ্ন জাগাবেন, সাহস যোগাবেন শিক্ষক। যেন তারা এমন মনোভাব নিয়ে বেড়ে ওঠে যে, 'আমি অবশ্যই পারব, কখনোই হারব না'। 
*শিক্ষকগণ খুব কাছে থেকে পর্যবেক্ষণ করবেন শিক্ষার্থীদের। চিহ্নিত করবেন তার শারীরিক ও মানসিক সমস্যা, বাতলে দিবেন সমাধানের উপায়। চাঙ্গা করে দিবেন মনোবল। সেই সাথে প্রদান করবেন পুষ্টি ও পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান।
*ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীকেই সমান গুরুত্ব দিবেন শিক্ষক। খেয়াল রাখবেন কোন শিক্ষার্থী যেন নিজেকে অবহেলিত ভাবতে না পারে। 
*শিক্ষকগণ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সকল শিক্ষার্থীকেই আগ্রহ অনুসারে অংশগ্রহণ করাবেন কোনো না কোনো সহশিক্ষা কার্যক্রমে। 
*প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অন্তরে শিক্ষক জাগিয়ে দিবেন দেশপ্রেম, জাতীয় চেতনা ও নৈতিক মূল্যবোধ। বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের জন্য করবেন অনুপ্রাণিত।
*শিক্ষকগণ অবশ্যই শিক্ষার্থীদের প্রদান করবেন খেলাধুলা ও শারীরিক ব্যায়ামের উৎসাহ, উদ্দীপনা। নিয়মিত আয়োজন করবেন বিভিন্ন প্যারেড-পিটি ও খেলাধুলার। ক্লাসের আগে, টিফিনের ফাঁকে, ক্লাসের শেষে অবশ্যই শিক্ষার্থীদের দিবেন কিছুটা দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি, হাসিতামাশা করার সময় ও সুযোগ। প্রদান করবেন পরিবারের বিভিন্ন কাজকর্ম করার ও বাগান করার উপদেশ।
*প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পারিবারিক অবস্থা অনুসারে শিক্ষক তৈরি করে দিবেন একটি কর্মপরিকল্পনা। যাতে নির্ধারিত থাকবে তার লেখাপড়া, নাওয়া, খাওয়া, ঘুম, ব্যায়াম, কাজকর্ম, খেলাধুলা ইত্যাদি করার প্রমাণ সময়।
*কোনো শিক্ষার্থীর আচরণ অস্বাভাবিক মনে হলে, শিক্ষক একান্তে ডেকে কথা বলবেন তার সাথে। আগ্রহ দেখিয়ে শুনবেন তার বিস্তারিত সমস্যা, প্রদান করবেন সমাধানের পরামর্শ। বিষয়টি গোপনীয় হলে অবশ্যই রক্ষা করবেন গোপনীয়তা। প্রয়োজনে কথা বলবেন তার অন্য শিক্ষক ও তার অভিভাবকের সাথে।
*শিক্ষক নিজে হয়ে উঠবেন বিশ্বস্ত, শিক্ষার্থীদের উপরও রাখবেন বিশ্বাস। যেন সবকিছু মন খুলে বলতে পারে শিক্ষার্থী। বন্ধুত্ব করবেন, দূরত্ব রাখবেন, বজায় রাখবেন উত্তম ব্যক্তিত্ব। থাকবেন ধীর-স্থির, প্রকাশ করবেন না অস্থিরতা।
*এছাড়াও উদ্ভূত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে যখন যা প্রয়োজন তা করবেন শিক্ষকগণ।

শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও চিহ্নিত করে দেওয়া উচিত কিছু করণীয়। যেমন: 
*শিক্ষার্থী যখন ঘরে থাকে তখন তার প্রতি অভিভাবককে থাকতে হবে খুবই যত্নশীল। দিতে হবে সুন্দর সময়, মাতিয়ে রাখতে হবে গল্পে-আড্ডায়।
*কোনভাবেই অভিভাবক বা অন্য কেউ শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করবেন না শিক্ষার্থী তথা সন্তানদের। করবেন না অস্বাভাবিক রাগারাগি, দেখাবেন না কোন ভয়।
*ক্লাসের নির্ধারিত লেখাপড়ার পাশাপাশি সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে হবে ভালো বই পড়ায়, ঘরোয়া খেলাধুলায় ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমে এবং বিভিন্ন সুন্দর সুন্দর সখের কাজে।
*অংশগ্রহণ করাতে হবে ছোটখাটো পারিবারিক কাজকর্মে। বয়স ও সক্ষমতা অনুযায়ী দিতে হবে কিছু দায়-দায়িত্ব। জাগিয়ে তুলতে হবে দায়িত্ব-কর্তব্য বোধ। সামাজিক কাজেও করে তুলতে হবে সক্রিয়।
*যথাসম্ভব দুঃসংবাদ থেকে দূরে রাখতে হবে সন্তানদের। এমনকি মারামারি বা হিংস্রতা সম্পর্কিত গেম থেকেও রাখতে হবে বিরত। মুক্ত রাখতে হবে ইন্টারনেট আসক্তি থেকে।
*সন্তানদের নাওয়া-খাওয়া ও ঘুমের সময়সূচি ঠিক রাখার ব্যাপারে দিতে হবে উৎসাহ, করতে হবে সহযোগিতা।
*সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে তাদের প্রতি, আগ্রহসহকারে শুনতে হবে সকল কথা। তাদের শারীরিক ও মানসিক যেকোন সমস্যাকেই বিবেচনা করতে হবে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে এবং তা সমাধান করতে হবে দ্রুততার সাথে।
*অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি সন্তানের গতিবিধি। জানতে হবে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে, কার সঙ্গে ওঠাবসা করে। নিশ্চিত করতে হবে সৎসঙ্গ।
*ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলায়। বয়স ও যোগ্যতা অনুসারে গুরুত্ব দিতে হবে বিভিন্ন কথায় ও কাজে। মতামত রাখার সুযোগ দিতে হবে সিদ্ধান্তে।
*শিক্ষক বা অন্য কারো কোনরূপ সমালোচনা করা যাবে না সন্তানের সামনে। সন্তানের সমালোচনাও করা উচিত নয় শিক্ষক বা অন্য কারোর কাছে। 
*ভাইবোন বা অন্য কারো সঙ্গে তুলনা করে খাটো করা যাবে না কোন সন্তানকে। যা পারেনি তা না বলে, যতটুকু পেরেছে ততটুকু বারবার বলে, ধন্যবাদ দিতে হবে, উৎসাহ দিতে হবে, আস্থা বাড়িয়ে দিতে হবে।
*প্রতিনিয়ত দিতে হবে উৎসাহ-উদ্দীপনা যেন কোনোভাবেই বিষন্নতায় গ্রাস করতে না পারে তাদের। 
*কথায়, কাজে, চলায়, বলায় হয়ে উঠতে হবে সন্তানের বন্ধু। সর্বক্ষেত্রে ধরে রাখতে হবে এই বন্ধুত্ব। যেন তারা যেকোন সমস্যা সহজেই শেয়ার করতে পারে মা-বাবার সাথে। 
*এছাড়াও প্রয়োজন অনুসারে সন্তানের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে নিতে হবে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা।

শিক্ষক ও অভিভাবকদের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালক বা শিক্ষা প্রশাসনের জন্যও কিছু করণীয় নির্ধারিত থাকা আবশ্যক। 
যেমন-
*শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ, খেলাধুলা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
*'মানসিক শিক্ষা'সহ প্রতিটি বিষয়ে অধিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। 
*শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ে শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ইন হাউস ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।
*শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আচরণ মনিটরিং করতে হবে।
*শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলার জন্য শিক্ষকদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
*শিক্ষার্থীদের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভয় দেখানোর জন্যও বেত-লাঠি রাখতে দেওয়া যাবে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
*অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। 
*এছাড়াও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও উন্নয়নে যখন যা প্রয়োজন তখন তা নিশ্চিত করতে হবে।

এরিস্টটলের মতে- 'সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই শিক্ষা'। সুস্থ মন গঠন একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া! ছোটবেলা থেকে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রেখেই গঠন করতে হয় শিক্ষার্থীর সুস্থ মন। যিনি এই কাজে যত বেশি সফল তিনিই তত বেশি উত্তম শিক্ষক, অভিভাবক। বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান বা মোকাবিলা করে সঠিক পথে এগিয়ে চলার জন্য শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক শক্তি লাভের জ্ঞান-দক্ষতা প্রদান করা শিক্ষক এবং অভিভাবকের গুরু দায়িত্ব। শিক্ষার্থীর মনকে এমনভাবে গঠন করতে হয় যেনো সে কোনদিন ভেঙ্গে না পড়ে ব্যর্থতায়, নিমজ্জিত না হয় বিষন্নতায়। স্বপ্রেষিত হয়ে সে যেনো নিজেই আজীবন ধরে রাখতে পারে নিজের কর্মোদ্যম ও মানসিক সুস্থতা।

লেখক : কলাম লেখক, সাহিত্যিক এবং অধ্যক্ষ- কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। 
rahamot21@gmail.com


পত্রিকার লিংক

শিক্ষার্থীর সুস্থ মন গঠনে শিক্ষক। দৈনিক ইত্তেফাক 10 ডিসেম্বর 2020

শিক্ষার্থীর সুস্থ মন গঠনে শিক্ষক



মো. রহমত উল্লাহ্

দৈনিক ইত্তেফাক। ১০ ডিসেম্বর ২০২০ 


>বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে- 'শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য'। অর্থাৎ দেহ ও মন ভালো থাকা মানেই স্বাস্থ্য ভালো থাকা। দেহ ও মন পরস্পরের পরিপূরক। শরীর যতই সুস্থ থাকুক, ভালো কিছু করার জন্য মানসিক সুস্থতা আবশ্যক। মানসিক স্বাস্থ্য হচ্ছে, মানুষের চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভূতির সুষ্ঠু সমন্বয়। এই মানসিক বিষয়গুলোর সঠিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই মানুষ তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে সম্পাদন করে এবং পরস্পরের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে। এসব যোগ্যতা ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মানব শিশুকে উত্তম মানুষে পরিণত করার জন্য শিক্ষকের ভূমিকা অপরিহার্য।


মনমানসিকতা উত্তম না হলে উত্তম কর্মের উপযোগী হয় না মানুষ। এরিস্টটলের মতে- 'সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই শিক্ষা'। সুস্থ মন গঠন একটি জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া! ছোটবেলা থেকে নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রেখেই গঠন করতে হয় শিক্ষার্থীর সুস্থ মন। যিনি এই কাজে যত বেশি সফল তিনিই তত বেশি উত্তম শিক্ষক। বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক ও অন্যান্য সমস্যার সমাধান বা মোকাবিলা করে সঠিক পথে এগিয়ে চলার জন্য শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিক শক্তি লাভের জ্ঞান-দক্ষতা প্রদান করা শিক্ষকের গুরু দায়িত্ব। শিক্ষার্থীর মনকে এমনভাবে গঠন করতে হয় যেনো সে কোনদিন ভেঙ্গে না পড়ে ব্যর্থতায়, নিমজ্জিত না হয় বিষন্নতায়। স্বপ্রেষিত হয়ে সে যেনো নিজেই আজীবন ধরে রাখতে পারে নিজের কর্মোদ্যম ও মানসিক সুস্থতা।


প্রেষণা হচ্ছে মানসিক সুস্থতার প্রধান উপাদান। এই উপাদানটি শিক্ষার্থীর মনে চিরদিনের মতো প্রোথিত করে দেওয়াই উত্তম শিক্ষকের কাজ। যিনি এই কাজে সফল তিনিই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। শিক্ষা প্রদানের চেয়ে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী করে তোলাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রেষণার অফুরন্ত শক্তিতেই সম্ভব দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষা অর্জন ও প্রয়োগ। মূলত প্রেষণার শক্তিতেই সাধিত হয় কর্ম, অর্জিত হয় অগ্রগতি। যে শিক্ষার্থী নিজের মধ্যে প্রতিনিয়ত শুভ কাজের অনুপ্রেরণা উৎপাদন করতে পারে সেই মানসিকভাবে সুস্থ ও সবল। অনুপ্রাণিত মানুষই অবিষন্ন, উদ্যমী। শিক্ষার্থীর মধ্যে এই প্রেরণা উৎপাদনের ক্ষমতা জাগ্রত করাই শিক্ষকের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।


ফেডরিক হার্বার্ট এর মতে- "শিক্ষা হচ্ছে নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন"। একান্ত আপনজন হয়ে খুব কাছে থেকে শিক্ষার্থীকে পর্যবেক্ষণ করে তার বয়স অনুসারে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝে বারবার দিতে হয় প্রয়োজনীয় পরামর্শ। তার পরিবারের সদস্যদের সাথেও করতে হয় মত বিনিময়। সুস্থ দেহ গঠনের জন্য যেমন গড়ে দিতে হয় সঠিকভাবে নাওয়া, খাওয়া, ঘুম, ব্যায়াম, বেড়ানো ও খেলাধুলার অভ্যাস; তেমনি নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধনের মাধ্যমে সুস্থ মন গঠনের জন্য দিতে হয় মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ এবং ভালো কাজ করার উৎসাহ, উদ্দীপনা ও মনোবল। সেইসাথে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মধ্যে জাগ্রত করতে হয় সঠিক ধর্মীয় মূল্যবোধ তথা মানব প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, দেশ প্রেম, জাতীয়তা বোধ, ন্যায়-নীতি বোধ, সৃজনশীলতা, পরমত সহিষ্ণুতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা, দায়িত্ব-কর্তব্যপরায়নতা ইত্যাদি মহামূল্যবান গুণাবলি। তবেই মানব শিশু হয়ে উঠে প্রত্যাশিত সুস্থ মনের অধিকারী তথা সুশিক্ষিত মানুষ। তবেই সে সঠিকভাবে পালন করতে পারে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্ব-কর্তব্য এবং করতে পারে পরস্পরের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। এ+ ফলাফলের পাশাপাশি এ+ মানুষ গড়ার এই মহান ব্রতে মা-বাবার পরেই শিক্ষকের স্থান। তাই শিক্ষককে হতে হয় অত্যন্ত মেধাবী, আগ্রহী, উদ্যমী, ধৈর্যশীল, নিবেদিত, অনুপ্রাণিত, প্রশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত মানুষ। শিক্ষার্থীর সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরির মাধ্যমেই শিক্ষক হয়ে উঠেন পরম শ্রদ্ধার পাত্র এবং দেশ ও জাতি হয়ে উঠে চির উন্নত।


লেখক: অধ্যক্ষ- কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, Email- rahamot21@gmail.com


পত্রিকার লিংক

https://www.ittefaq.com.bd/anushilon/205493/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A5-%E0%A6%AE%E0%A6%A8-%E0%A6%97%E0%A6%A0%E0%A6%A8%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%95

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। ভোরের কাগজ, 9 ডিসেম্বর 2020

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা। ভোরের কাগজ, 9 ডিসেম্বর 2020

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি

সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৮, ২০২০ , ১০:১০ অপরাহ্ণ আপডেট: ডিসেম্বর ৮, ২০২০ , ১০:১০ অপরাহ্ণ, ভোরের কাগজ

দলের সক্রিয় নেতাকর্মীকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য করতে হবে তারও কোনো যুক্তি নেই। এলাকার আদর্শবান বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য করাই অধিক মঙ্গলজনক। তারা হতে পারেন নিরপেক্ষ বা দলের সমর্থক। তবে অবশ্যই হতে হবে ন্যূনতম ডিগ্রি পাস এবং চল্লিশোর্ধ্ব বয়স।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ওপর শিক্ষকদের অসন্তোষের অন্ত নেই। অধিকাংশ কমিটির সদস্যদের দৌরাত্ম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, অযাচিত হস্তক্ষেপ ইত্যাদি এর প্রধান কারণ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সভাপতির অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে অতিষ্ঠ সবাই। প্রতিটি বিষয়ে সভাপতি এত বেশি হস্তক্ষেপ করেন যেন তিনিই প্রতিষ্ঠান প্রধান। অধ্যক্ষ, সুপার বা প্রধান শিক্ষক যেন তার আদেশের গোলাম। অনেকেই জানেন না, মানেন না কোনো নিয়মকানুন। যা ইচ্ছা তাই করতে বলেন। এসব করলেও বিপদ, না করলেও বিপদ! চাকরি যায় অধ্যক্ষ, সুপার বা প্রধান শিক্ষকের। মান তো যায়ই, জানও যেতে পারে কোনো কোনো সময়। যারা দুর্নীতিবাজ তাদের কথা আলাদা। এমন অনেক সভাপতি ও সদস্য আছেন যারা নিজেদের মনে করেন প্রতিষ্ঠানের মালিক এবং শিক্ষকরা তাদের কেনা কাজের লোক। মন চাইলে বেতন দেবেন, মন না চাইলে দেবেন না। যা খুশি বলবেন, করবেন। ইচ্ছা হলে রাখবেন, ইচ্ছা না হলে রাখবেন না। শুধু তারা নয়, তাদের অধিকাংশ ভাইবোন, বিবি-বাচ্চা, সাঙ্গোপাঙ্গরাও দেখান ক্ষমতা, করেন খারাপ আচরণ। এমনকি তাদের যে সন্তান এখনো স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় পড়ে সেও ভাব দেখায় শিক্ষকদের সঙ্গে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অমান্য করে শিক্ষকদের আদেশ-নির্দেশ।
এমন অনেক উদাহরণ হয়তো আছে সারাদেশে, পরীক্ষায় ফেল করা সাবেক ছাত্র এখন কমিটির সদস্য বা সভাপতি। সেই ছাত্ররাই এখন পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠান, শাসন করে শিক্ষকদের। অনেক ফেল করা, বেয়াদবি করা, মস্তানি করা ছাত্ররা এখন বসে প্রতিষ্ঠানের বড় বড় চেয়ারে। অর্থাৎ স্যারদের ফেল করা ছাত্রই এখন স্যারদের স্যার! কী অবাক ব্যাপার! কী অসহ্য ব্যাপার! এসব মেনে নিয়েই চাকরগিরি করতে হয় উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের। প্রতিবাদ করতে গেলে, প্রতিকার চাইতে গেলে, পিটিয়ে তাড়িয়ে দেবেন। তাই হাসি মুখ করে বলতে হয়, না না কোনো সমস্যা নেই, খুব ভালো আছি! এই হলো আমাদের দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের প্রায় সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। আমি যদি সত্যি সত্যিই বলি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে তেমন খারাপ কিছুই হচ্ছে না, আমরা আসলেই ভালো আছি, তো এই কথা বিশ্বাস করার মতো শিক্ষক সারাদেশে খুব কমই পাওয়া যাবে। শিক্ষকদের মনের অবস্থা যদি এমন থাকে তো শিক্ষা কেমন হবে তা ভাবনার বিষয়!

দূর অতীতে এমন এক সময় ছিল যখন এলাকার ধনাঢ্য ব্যক্তিরা নিজেদের উদ্যোগে, নিজেদের অর্থে, নিজেদের সম্পদে, নিজেদের জমিতে, নিজেদের চেষ্টায় সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ মনোভাব নিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে কোনো লাভ পাওয়া, পদ পাওয়া, ক্ষমতা পাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল না তাদের। নিজের এলাকার, সমাজের, দেশের মানুষের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করাই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। জাতিকে শিক্ষিত করা, কর্মক্ষম করা, সমৃদ্ধ করা, উন্নত করা, আধুনিক করার মনোভাব ছিল তাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা দিতে আসতেন, নিতে আসতেন না। খাওয়াতে আসতেন, খেতে আসতেন না। শুধু শিক্ষক-কর্মচারীদের নয় শিক্ষার্থীদেরও খাওয়াতেন চিড়া, মুড়ি, বাতাসা ও বিস্কুট। প্রয়োজনে নিজের পকেট থেকে দিতেন শিক্ষকদের সম্মানী। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিতেন না কোনো ফি। সেসব ত্যাগী মানুষরাই তখন পরিচালনা করতেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষকদের প্রতি তাদের যেমন ছিল সর্বোচ্চ সম্মান, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রতিও ছিল অফুরন্ত দরদ। বর্তমানে তেমন নিঃস্বার্থ ক’জন আছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায়? অতীতের মতো কি দায়িত্ব পালন করে বর্তমান কমিটি? শিক্ষক-শিক্ষার্থী তথা শিক্ষার কি কল্যাণ সাধন করেছেন তারা?

বাস্তবতা হচ্ছে, কমিটির প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, বিদ্যমান বিধিমালায় সরাসরি কমিটির অধীনেই চাকরি করতে হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের। আরো একটি বাস্তবতা হচ্ছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নেতাকর্মীরাই থাকেন পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য। অনেকেই মনে করেন, তারা উচ্চশিক্ষিত হলে, শিক্ষাবান্ধব হলে, কিছুটা সহায়ক ভ‚মিকা পালন করতে পারতেন শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে। তাদের দ্বারা এত বেশি অপমানিত হতেন না শিক্ষকরা। তারা কিছুটা হলেও বুঝতেন, রাখতেন শিক্ষকদের মর্যাদা। কমবেশি মানসম্পন্ন হতো তাদের কথা ও কাজ। কিছুটা হলেও জানতেন, মানতেন, সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুন। শিক্ষার সংজ্ঞা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে থাকত ন্যূনতম ধারণা। কম বেশি বুঝতেন, শিক্ষকতা একটি উঁচু মাপের মননশীল কাজ। এর জন্য অবশ্যই প্রয়োজন শিক্ষকদের মানসিক প্রশান্তি, সার্বিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সম্মান ও আর্থিক সচ্ছলতা।

এসব বিষয় তথা শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করেই শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে প্রাথমিক ও স্নাতক/স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সদস্যদের। উভয় ক্ষেত্রেই সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে ন্যূনতম ডিগ্রি পাস। অথচ গত ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আইনি নোটিস দেয়ার পরও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি এখনো। যা অত্যন্ত অযৌক্তিক ও দুঃখজনক! এ পর্যায়ের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় সভাপতি ও সদস্য হওয়ার জন্য এখনো কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। এমনকি নেই কোনো বয়সের বার। ফলে সরকারি দলের অধিকাংশ অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত অল্পবয়স্ক নেতাকর্মীরা এখন জেঁকে বসেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দলের প্রভাব খাটিয়ে বারবার হচ্ছে কমিটির সভাপতি ও সদস্য। দুর্দান্ত প্রতাপে তারা দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সম্মানিত শিক্ষকদের। অসহায় শিক্ষকরা মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছেন ‘খুব ভালো আছি’। আর তাদের অন্তরে অবস্থিত অদেখা ক্ষোভ গিয়ে পড়ছে বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর ওপর। এটি মোটেও শুভ লক্ষণ নয়! শিক্ষকদের মনে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া এই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাঝে। মনের কষ্টে পাঠদানে আগ্রহ হারাচ্ছেন শিক্ষকরা। সঠিকভাবে গঠিত হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের সুস্থ মন। পূর্ণতা পাচ্ছে না শিক্ষার সংজ্ঞা। অথচ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী বড় দলে তো সুশিক্ষিত লোকের কোনো অভাব নেই। তাছাড়া দলের সক্রিয় নেতাকর্মীকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য করতে হবে তারও কোনো যুক্তি নেই। এলাকার আদর্শবান বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য করাই অধিক মঙ্গলজনক। তারা হতে পারেন নিরপেক্ষ বা দলের সমর্থক। তবে অবশ্যই হতে হবে ন্যূনতম ডিগ্রি পাস এবং চল্লিশোর্ধ্ব বয়স। যেন কিছুটা হলেও রক্ষা পায় শিক্ষকের সম্মান, কিঞ্চিৎ হলেও উন্নত হয় শিক্ষার পরিবেশ। আশা করি বিষয়টি শিগগিরই বিবেচনা করবে বর্তমান সরকারের শিক্ষা প্রশাসন।

মো. রহমত উল্লাহ : লেখক ও শিক্ষক।
rahamot21@gmail.com


মূল পত্রিকার লিংক

আরো ধীরে এগোতে হবে শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়ন। Jagonews24.com, 6 ডিসেম্বর 2020

পত্রিকার লিংক


আরও ধীরে এগোতে হবে শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নে

জাগোনিউজ২৪.কম। সম্পাদকীয় ডেস্ক | প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০২০


আরও ধীরে এগোতে হবে শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নে

মো. রহমত উল্লাহ্

শিক্ষামন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, আমাদের শিক্ষায় বড় পরিবর্তন আসন্ন। সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ২০২২ সাল থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বস্বীকৃত একমুখী শিক্ষার আওতায় পর্যায়ক্রমে অনুসরণ করা হবে নতুন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি। নবম ও দশম শ্রেণিতে থাকবে না বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রবর্তন করা হবে নতুন আঙ্গিকের বই, আধুনিক শিখন কৌশল ও সার্বিক মূল্যায়ন পদ্ধতি।


জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রস্তাবিত পরিবর্তিত জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রবর্তিত হলে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত এই চারটি শ্রেণিতে কোনো সামষ্টিক মূল্যায়ন তথা বার্ষিক বা আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা থাকবে না। তাদের শিক্ষাকালীন তথা শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে মূল্যায়ন হবে শতভাগ। নম্বরের পরিবর্তে লেটার গ্রেড বা ওয়ার্ডে প্রদান করা হবে মূল্যমান। থাকবে না শ্রেণি রোল নম্বর, থাকবে না প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় স্থান। প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের জন্য প্রত্যেকের থাকবে পৃথক আইডি নম্বর।


চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হবে শিখনকালীন তথা শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষা মূল্যায়ন এর পাশাপাশি সামষ্টিক মূল্যায়ন তথা বার্ষিক বা আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে থাকবে ৭০ শতাংশ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে থাকবে ৩০ শতাংশ নম্বর। ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রতি বিষয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে থাকবে ৬০ শতাংশ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে থাকবে ৪০ শতাংশ নম্বর।


অনুরূপভাবে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিখনকালীন মূল্যায়নে থাকবে ৫০ শতাংশ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে থাকবে ৫০ শতাংশ নম্বর। একইভাবে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিখনকালীন মূল্যায়নে থাকবে ৩০ শতাংশ নম্বর এবং সামষ্টিক মূল্যায়নে থাকবে ৭০ শতাংশ নম্বর।


এনসিটিবি কর্তৃক প্রস্তুতকৃত স্তর ভিত্তিক মূল্যায়ন কৌশল এর সারসংক্ষেপ:





শিখনকালীন মূল্যায়ন অনানুষ্ঠানিক ও ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। দেখা হবে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, আগ্রহ, আচরণ, অংশগ্রহণ, দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা, নৈতিকতা, দূরদর্শিতা ইত্যাদি। বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল যথাযথভাবে প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ভিত্তিক এই মূল্যায়নটি শিক্ষক নিজেই সম্পন্ন করবেন।


শিখনকালীন মূল্যায়ন অবশ্যই একটি উত্তম ব্যবস্থা। তবে আমাদের দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখনই তা সঠিকভাবে কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকগণের হাতে যে পরিমাণ নম্বর প্রদানের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে তা তারা সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হবেন। কেননা, বিভিন্ন কারণে শিক্ষকগণের পছন্দ-অপছন্দের প্রভাব পড়তে পারে এর উপর। কোন শিক্ষক অনৈতিক হলে এই নম্বরের বিনিময়ে শিক্ষার্থীকে বাধ্য করতে পারেন প্রাইভেট পড়ার জন্য বা টাকা প্রদান করার জন্য। তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, পারিপার্শ্বিক দুরবস্থার বিরূপ প্রভাব কম/বেশি পড়বে শিক্ষকগণের উপর।


সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কমিটির সভাপতি, সদস্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে পড়লে আদর্শ শিক্ষকগণও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হবেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অযোগ্য বা দুর্বল শিক্ষার্থীদরও পূর্ণ নম্বর দিতে বাধ্য হবেন। এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য শক্ত অবস্থান নিতে গেলে শিক্ষকের চাকরি ও জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যে সকল শ্রেণির শিক্ষা মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে সরকারি সনদ ও বৃত্তি প্রদান করা হবে সে সকল শ্রেণির শিক্ষকগণ অধিক চাপের সম্মুখীন হবেন এবং কেউ কেউ হয়ত স্বেচ্ছায় অনৈতিক হবেন।


এমতাবস্থায় শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকগণের হাতে যে অধিক পরিমাণ নম্বর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে তার পুরোটাই যদি শিক্ষকগণ ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় অযোগ্য শিক্ষার্থীদের দিতে বাধ্য হন, তাহলে মূল্যায়ন ব্যবস্থাটি অকার্যকর হয়ে, প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে, মুখ থুবড়ে পড়বে! যেমন, বর্তমানে প্রেকটিকেল বিষয়গুলোর প্রায় পূর্ণ নম্বর পেয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ শিক্ষার্থী। ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ব্যবহারিক শিক্ষার মূল্যায়ন।


এইরূপ অবস্থার সম্প্রসারণ কারো কাম্য নয়। তাই শিখনকালীন ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পা রাখার প্রথম কয়েক বৎসর শিক্ষকগণের হাতে এত বেশি পরিমাণ নম্বর প্রদানের ক্ষমতা না রেখে; আরো অল্প পরিমাণ নম্বর প্রদানের ক্ষমতা রাখা উচিত। নিরপেক্ষ ভাবে মূল্যায়ন করে নম্বর প্রদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকগণ যদি সফলতা দেখাতে পারেন, তাহলে দুইএক বছর পর ধীরে ধীরে শিক্ষকগণের হাতে নম্বর প্রদানের ক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।


লেখক : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।


https://www.jagonews24.com/opinion/article/627740

একমুখী শিক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিষয় যুক্ত থাকা আবশ্যক। এডুকেশন বাংলা, 3 ডিসেম্বর 2020

পত্রিকার লিংক

একমুখী শিক্ষায় ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিষয় যুক্ত থাকা আবশ্যক

মো. রহমত উল্লাহ্

এডুকেশন বাংলা, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০


আগামী ২০২২ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া একমুখী শিক্ষায় মাধ্যমিক স্তরে (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে) পাঠদানের জন্য এনসিটিবি যে দশটি কমন বা বাধ্যতামূলক বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সে গুলো নিম্নরূপ:



লক্ষণীয় যে উপস্থাপিত ছকে উল্লিখিত বাংলা, ইংরেজি, গণিত, জীবন ও জীবিকা, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভালো থাকা, ধর্ম শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতি এই বিষয়গুলোর মধ্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞান বিভাগ এবং মানবিক বিভাগের বিষয়াদি যুক্ত আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের (হিসাববিজ্ঞান, ব্যবসায় উদ্যোগ এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং) কোন বিষয় প্রত্যক্ষভাবে তো যুক্ত নেই-ই পরোক্ষভাবেও যুক্ত আছে বলে মনে হচ্ছে না। ‘জীবন ও জীবিকা’ বিষয়টিতে যদি ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিষয় সীমিত পরিসরে যুক্ত থাকে তো ভালো, যদি না থাকে তো ভাবতে হবে। বর্তমান বিশ্বে উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যতীত টিকে থাকা অসম্ভব। 


 যেহেতু আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আরো গতিশীল করার জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান করা তথা ছোট-বড় উদ্যোক্তা তৈরি করা, কৃষি-শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি করা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা জরুরি; সেহেতু অন্যান্য বিভাগের বিষয়াদির মত ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বিষয়ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের কমন বা একমুখী পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। এসব বিষয়ে পাঠদান করার জন্য মাধ্যমিক স্তরে নিয়োগকৃত ব্যবসায় শিক্ষা শাখার শিক্ষকগণই যথেষ্ট। নতুন করে বিষয় খোলার বা শিক্ষক নিয়োগ করার প্রয়োজন হবে না। বরং এসব বিষয় যুক্ত করা না হলে উল্লিখিত শিক্ষকগণ ওএসডি বা কর্মহীন হয়ে পড়বেন। 


এমতাবস্থায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়কে কাজে লাগিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ জাতীয় অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে ব্যবসায় শিক্ষা শাখার বিষয়সমূহ একমুখী শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। 


মো. রহমত উল্লাহ্: সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ – কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।