শিশুপাঠ্য গল্প- 'মার্বেল' -যায়যায়দিন- ১৫ জুন ২০১৬

শিশুপাঠ্য গল্প- 'মার্বেল' -যায়যায়দিন- ১৫ জুন ২০১৬
IMG_20180425_152647_1যায়যায়দিন লিংক
যায়যায়দনি, ১৫ জুন ২০১৬, বুধবার

মার্বেল
মো. রহমত উল্লাহ্
মার্বেল খেলছে হানিফ, শিমুল, শাওন, পলাশ। বটতলায়। টনটনে মাটি। উঠানের মতো। ঘাস নেই। সমান জায়গা। তাদের মার্বেল খেলার মাঠ। মার্বেল যেমন ছোট। মাঠও তেমন ছোট।
প্রথমে একের দান। চারজনে জমা দেয় মার্বেল। একের দানে একটি করে। জমা হয় চারটি। মেলায় একের দান। খেলায় নামে হানিফ। হাতে নেয় পাঁচটি মার্বেল। একের দানের চারটি। নিজের আরো একটি। দাঁড়ায় নির্ধারিত দাগে। মাঠে ছড়ায় চারটি মার্বেল। হাতে রাখে একটি। এটিকেই ছুড়তে হবে। এটির নাম গুলি। লাগাতে হবে মাঠের একটিতে। যেটি দেখাবে প্রতিযোগীরা। লাগাতে হবে ঠিক সেটিতেই। সেটির নাম শিকার। সাদা মার্বেলটি দেখায় পলাশ। বলে, এটি শিকার। একমত হয় সবাই। নিশানা ঠিক করে হানিফ। না, ঠিক থাকে না। কেঁপে ওঠে হাত। ঠিক করে আবার। মারে। না, লাগে না। শেষ হয় না একের দান। বদল হয় খেলোয়াড়।
এবার শিমুলের পালা। হাতে নেয় মার্বেল। একের দানের চারটি। সঙ্গে নেয় নিজের একটি। এটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় মার্বেল। চারটি মাঠে। আর গুলিটি হাতে। মাঠের লালটি দেখায় শাওন। বলে, এটি শিকার। এতে একমত হয় সবাই। গুলি ছুড়তে হবে এটিতে। নিশানা ঠিক করে শিমুল। ভয় ভয় লাগে তার। নড়ে যায় নিশানা। আবার ঠিক করে। টুক টুক করে বুক। হাত কাঁপে। বল পায় না মনে। ভাবে, পারবে না। হারবে হানিফের মতোই। কিছুটা সময় নেয়। দম নেয়। ছুড়ে মারে গুলি। আহ হা। লেগেছে অন্যটিতে। হেরে গেছে শিমুল। হারিয়েছে তার গুলিটি। সেটি এখন দানের মার্বেল। মন খারাপ হয় তার। শেষ হয় না একের দান। একটা বাড়ে দানের মার্বেল। আরো চলবে এ দানের খেলা। আবার বদল হয় খেলোয়াড়।
এবার পালা শাওনের। হাতে নেয় ছয়টি মার্বেল। একের দানের পাঁচটি। আর নিজের একটি। নিজেরটা তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দান। মাঠে পাঁচটি মার্বেল। নীল মার্বেলটি দেখায় শিমুল। বলে, এটি শিকার। এতে সায় দেয় সবাই। নিশানা ঠিক করে শাওন। ভয় পায় না। ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক শিকারে। হাহ্ হা। জিতে যায় শাওন। দুই হাতে কুড়ায় মার্বেল। ঢোকায় নিজের পকেটে। শেষ হয় একের দান।
এবার খেলবে পলাশ। দুয়ের দান। মার্বেল দেয় দুটি করে। চারজনে দেয় আটটি। পলাশ হাতে নেয় নয়টি। আটটি দুইয়ের দানের। একটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দান। মাঠে আটটি মার্বেল। হলুদটি দেখায় হানিফ। বলে, এটি শিকার। তাতে একমত হয় সবাই। নিশানা ঠিক করে পলাশ। ভাবে না তেমন। ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক ঠিক। হাহ্ হা। জিতে যায় পলাশ। কুড়িয়ে নেয় সাতটি মার্বেল। পকেটে রাখে আর হাসে। শেষ হয় দুয়ের দান।
শিমুল খেলবে আবার। এবার হবে তিনের দান। মার্বেল দেয় চারজনে। একেকজনে দেয় তিনটি করে। তেরোটি মার্বেল শিমুলের হাতে। বারোটি তিনের দানের। আর একটি তার গুলি। দাঁড়ায় দাগে। ছড়ায় দানের মার্বেল। মাঠে বারোটি। শিমুলের হাতে একটি। সবুজ মার্বেলটি দেখায় পলাশ। বলে, এটি শিকার। একমত হয় সবাই। হাত তাক করে শিমুল। ভাবে, জিততে হবে এবার। এটি তিনের দান। মার্বেল বেশি। আবার শুরু হবে একের দান। সেটিতে জিতে লাভ নেই। মার্বেল থাকে কম। খেলতে হবে সাহস করে। যেমন খেলে শাওন। যেমন জেতে পলাশ। ভয় পেলে চলবে না। শাওন পারে, আমিও পারব। পলাশ পারে, আমিও পারব। সাহসে ভরে ওঠে বুক। একটুও কাঁপে না হাত। ঠিক করে নিশানা। ছুড়ে মারে গুলি। টুস। লাগে ঠিক ঠিক। হাহ্ হা। হুর রে। জিতে যায় শিমুল।

গল্প- আতঙ্ক -আজকের কাগজ-১৯ মে ২০০৪


শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির প্রয়োজন কী?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির প্রয়োজন কী?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালনা কমিটির প্রয়োজন কী?

মো. রহমত উল্লাহ্‌ |দৈনিক শিক্ষা, জুন ১৪, ২০১৬ | মতামত
Rahamat Ullah
মো. রহমত উল্লাহ্‌
সম্প্রতি ঘোষিত আদালতের একটি রায়ে মনে হয় খুব খুশি হয়েছেন বেসরকারি শিক্ষকগণ। তাদের হাসি দেখে মনে পড়ছে, সেই প্রবাদের কথা- বোকার তিন হাসি: একটা দেখে/শুনে, আরেকটা বুঝে/নাবুঝে, অন্যটা এমনিতেই। এই প্রবাদের কথা বলছি এই কারণে যে, আদালতের রায়ে আসলে তাদের খুশি হবার মত কিছুই ঘটেনি।
এই রায়ের ফলে এমপিগণ সভাপতি হতে পারবেন না, এমনটি নয়। রায়ে যা বলা হয়েছে তার অর্থ হচ্ছে, এমপিগণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে হলে কমিটির সদস্যগণের ভোটে নির্বাচিত হতে হবে। তারা এখন আর চারটি মাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নয়, যত ইচ্ছা ততটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারবেন।
কেননা, কমিটির সদস্যগণ তাদেরই লোক। তারা তাদের পেয়ারের নেতাকেই সভাপতি বানাবেন। অন্য কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগই দিবেন না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হবেন এমপিগণ। তারা এখন হবেন এলাকার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি। তাই যারা এমপিগণ বা এমপিগণের কর্মীগণ সভাপতি/সদস্য থাকছেন না মনে করে খুশি হয়েছেন, তাদের হাসি হচ্ছে বোকার হাসি।
প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটিতে এমপিগণের সভাপতিত্ব বিলোপ হচ্ছে এমন ধারণায় শিক্ষকগণ খুশি হবার কারণ কী? কারণ, কমিটি গুলোকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আর কল্যাণকর মনে করেননা অনেকেই। তারা মনে করেন কমিটি হচ্ছে রাহু। কমিটি নামক এই রাহুর কবলে পড়ে আজ অধিকাংশ বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার প্রধান এবং শিক্ষকগণ অতিষ্ঠ। যা প্রকাশ করার সাহস ও সুযোগ থাকে না শিক্ষকদের। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত কমিটির অশিক্ষিত, কুশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত লোকদের মন মতো কাজকর্ম না করলে, প্রতিদিনই প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষকদের চাকরি খান দুই তিন বেলা। সব কমিটির সব লোকই যে এমন মন্দ তা নয়। তবে ভালোর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। এই কথাগুলো আমি আগেও বলেছি আমার একাধিক লেখায়।
এমন একসময় ছিল, যখন কমিটির লোকজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করত, নিজেরা জমি দিত, টাকা দিত, শিক্ষকদের বেতন দিত, ঘর তৈরি করে দিত, শিক্ষাসামগ্রী দিত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সহায়তা দিত। তারপর এমন একসময় গেছে, যখন কমিটির লোকেরা নিজেদের অযোগ্য সন্তানদের বা টাকা খেয়ে অন্যের অযোগ্য সন্তানদের অথবা দলীয় ক্যাডারদের শিক্ষক বানাতো। সেই অযোগ্যদের কারণেই আজ যোগ্য শিক্ষকের বড় অভাব এই দেশে। যা খোদ শিক্ষামন্ত্রীও স্বীকার করেছেন কিছুদিন আগে। কমিটির নিকট থেকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা অতিসম্প্রতি কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রই স্বীকার করে নিয়েছে যে, কমিটি শিক্ষক নিয়োগে চরম অনিয়ম করত। আর এখন কমিটি অলিখিত অঘোষিতভাবে শুরু করেছে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের বা বদলের অনিয়ম। কমিটির লোকদের এখন আর কাজ কী?
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকার শতভাগ বেতন দেয়। সাধ্যমতো ভাতা দেয়। প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো তৈরি করে দেয়। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়। বিনামূল্যে বই দেয়। শিক্ষাসামগ্রী দেয়। আর শিক্ষার মান যাচাই করার জন্য, শিক্ষকদের কাজ তদারক করার জন্য প্রতি থানায়/উপজেলায় রয়েছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, সহকারী অফিসার ও পরিদর্শক। সরকারের পক্ষে তারাইতো পারে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক দেখবাল করতে। এ ছাড়াও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কার্যবিবরণী অনলাইনের মাধ্যমে জমা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে।
ডায়নামিক ওয়েব এপ্লিকেশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও একাডেমিক কাজের সচ্ছতা। ভর্তি হচ্ছে অনলাইনে, ভর্তি ফি নির্ধারণ করছে সরকার, টিউশন ফি নির্ধারণ করছে সরকার। শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। তাহলে এখন আর কেন প্রয়োজন পরিচালনা কমিটি নামক এই রাহু? কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত নিজেদের মালিক আর শিক্ষকদের তাদের কেনা গোলাম ভেবে অহেতুক দাবড়ানো ছাড়া তাদের আর ভালো কাজ কী এখন? তারা অনেকেই মনে করেন প্রতিষ্ঠানের টাকা মানেই তাদের টাকা।
তারা প্রতিষ্ঠানের পুকুরের মাছ নেয়, খামারের ফসল নেয়, গাছের ফল নেয়, দোকানের ভাড়া নেয়, জমির দখল নেয়, গাছপালা নেয়, ফ্যান-লাইট নেয়, ইটা-বালি-সিমেন্ট নেয়, ঠিকাদারি নেয়, সাপ্লাই কাজ নেয়, ছাপা কাজ নেয়, টিফিন সাপ্লাই দেয়, শিক্ষকদের ডিউটির টাকার ভাগ নেয়, টিএ-ডিএ নেয়, মিটিং করার দিন সম্মানীর নামে টাকা নেয়, নিজেদের কাজে প্রতিষ্ঠানের গাড়ি নেয়, প্রতিষ্ঠানে আয়া-পিয়ন বাসায় নেয়, ফেল/বখাটে শিক্ষার্থীর পক্ষ নেয়, নিজের পছন্দের শিক্ষকদের ইংরেজি/অঙ্ক ক্লাস দেয়, ক্লাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সামনেই শিক্ষকের ভুল ধরার নামে বকাবকি করে, কথায় কথায় সোকেস (সোকজ বলতে জানেনা) দেয়, নিজেদের সন্তানদের বিনা টাকায় প্রতিষ্ঠানে এমনকি প্রাইভেটেও পড়াতে বাধ্য করে। আরো কত কী যে করে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি/সদস্য হওয়া এখন আর সেবামূলক কাজ নয়; বিভিন্নমুখী লাভজক কাজ। তাই তা হওয়ার জন্য সবাই মরিয়া। এমপিরা-মন্ত্রীরা এই পদ/পদের ক্ষমতা ছাড়তে চান না। তারা নিজেরা বা তাদের কর্মী-সমর্থকদের দখলে রাখতে চান কমিটির সব পদ। আবার ডিসি-ইউএনওরাও হতে চান সকল প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। তারা ২০/৩০ টি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হতে পারলে প্রতি প্রতিষ্ঠানের প্রতি মিটিং এ সম্মানী বাবদ পেয়ে যান হাজার হাজার টাকা। তাদের দপ্তরে গিয়ে করতে হয় মিটিং। তাই খুশি রাখতে হয় তাদের অফিস ম্যানদের। সেখানেও ব্যয় হয় প্রতিষ্ঠানের। শিক্ষকগণ বেতন-ভাতা পাক বা না পাক এই সব সম্মানী পরিশোধ করতে হয় প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে। সভাপতি নিজেই নির্ধারণ করেন তিনার সম্মানীর পরিমান। যে প্রতিষ্ঠান বেশি টাকা দিতে সক্ষম সে প্রতিষ্ঠানের কাজ হয় দ্রুত। ঝাড়ি খেতে থাকেন গরিব প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ। এসব জেনেও যেন না জানার ভান করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
তাছাড়া প্রতিষ্ঠান থেকে যে সামান্য ভাতাদি পান শিক্ষকগণ, তা যেন কমিটির লোকদের দয়ার দান। শিক্ষামন্ত্রী নিজে শিক্ষকদের স্যার বলেন কিন্তু কমিটির লোকেরা শিক্ষকদের স্যার বলতে চান না; বরং তারা চান যে শিক্ষকরা ও প্রধানরা জনসম্মুখে তাদের স্যার স্যার করুক। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকুক। তাদের কথায় কান ধরে উঠবস করুক এবং তাই হয় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে। তারা ভুলে থাকেন যে শিক্ষকরা তাদের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত। এমনকি যে শিক্ষার্থীর বাবা-মা কমিটির সদস্য হন সেই শিক্ষার্থীও খবরদারি করেন শিক্ষকগণের ওপর। শুধু তাই নয়, কমিটির সভাপতি/সদস্যের দলের, বয়সের, বাড়িঘরের সবাই খবরদারি করেন শিক্ষকদের ওপর এবং তা মানতে বাধ্যও হন শিক্ষকরা। না হলে চোখ মুখ বন্ধ করে মেনে নিতে হয় এই শ্যামল কান্তির মতো পরিণতি। আমি আবারো বলছি, সব কমিটির সব লোকই যে মন্দ তা নয়। তবে ভালোর সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
এহেন পরিস্থিতিতে প্রচলিত কমিটির মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিধান বাতিল করে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নির্বিঘ্নে শিক্ষকতা করার ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করার পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সেইসাথে প্রয়োজন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ।
লেখক: শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ- কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

প্রবন্ধ: আমাদের একটি জাতীয় শপথ থাকা জরুরি। কালের কন্ঠ- ১৫ মে ২০১২



কালের কন্ঠ- ১৫ মে ২০১২
আমাদের একটি জাতীয় শপথ থাকা জরুরি

মো. রহমত উল্লাহ্‌

আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি ভাবে নির্ধারিত কোন শপথ আছে কিনা তা জানার চেষ্টা করতে গিয়ে গত ২০১১ সালে কথা বলেছি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষক গণের সাথে । ফোন করেছি বিভিন্ন দপ্তরে ও প্রতিষ্ঠানে। কেউই দিতে পারেননি নিশ্চিত তথ্য। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদশর্ক জানান- স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত কোন শপথ আছে এমনটি তাঁর জানা নেই। ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন- আমার অফিসে এই মর্মে কোন সার্কুলার আদৌ আছে কি না আমি বলতে পারবো না।

এমতাবস্থায় দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তব্যে ও ভাষায়  শিক্ষার্থীদের শপথ বাক্য পাঠ অস্বাভাবিক নয়। হয়ত সে কারণেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ডায়রিতে বিভিন্ন রকম শপথ বাক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সাধু বা চলিত অথবা মিশ্র ভাষায় লিখিত বাক্য গুলো মোটামুটি নিম্নরূপ: “আমি অঙ্গীকার করিতেছি যে, মানুষের সেবায় সব সময় নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। দেশের প্রতি অনুগত থাকিব। দেশের একতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখিবার জন্য সচেষ্ট থাকিব। হে আল্লাহ্, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন দেশের সেবা করিতে পারি এবং বাংলাদেশকে একটি আদর্শ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে গড়িয়া তুলিতে পারি। আমীন।”  অথবা “আমি শপথ করছি যে, কলেজের সকল নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলব। নিষ্ঠা ও মনোযোগসহকারে লেখাপড়া করব। কলেজের সুখ্যাতি ও মান-উন্নয়নে সচেষ্ট থাকব। দেশ ও মানুষের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখব। স্বধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলব। হে আল্লাহ্, আমাকে শক্তি দিন। আমি যেন কলেজের ভাবমূর্তিকে উজ্জল করতে পারি। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের সেবা করতে পারি। আমীন।”

আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের ডায়রিতে কোন শপথ বাক্য নেই। দেশের লাখো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কোন ডায়রি নেই। অন্য কোথাও লিখিত কোন শপথ বাক্য নেই। শপথ বাক্য পাঠের কোন আয়োজন নেই। সুনির্দিষ্ট শপথ বাক্য পাঠের কোন বাধ্য-বাদকতা নেই। এমতাবস্থায় বিশেষ করে যেসকল প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সদা মারতে ও মরতে প্রস্তুত, তারা কী (সৃজণশীল?) শপথ গ্রহণ করে তা গভীর ভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন।

সচেতন ও দায়িত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ মনে করেন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান, যেমন ইচ্ছে তেমন শপথ দেশ ও জাতির জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। প্রথমত: এতে করে ভিন্ন ভিন্ন মন-মনসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে নতুন প্রজন্ম। ক্রমে বেড়েই চলছে আমাদের ও আমাদের উত্তরাধিকারদের বিভক্তি। আদর্শ হীন, দয়ীত্ব-কর্তব্যহীন, দেশপ্রেমহীন, মানবতাহীন, চরিত্রহীন হচ্ছে আমাদের অধিকাংশ সন্তান।

দ্বিতীয়ত : আমাদর সকল ক্লাসের পাঠ্য বই ও সাহিত্য চলতি ভাষায় রচিত। বি.সি.এস. পরিক্ষাসহ সকল পরিক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর চলতি ভাষায়। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ও রণ সঙ্গীত চলতি ভাষায়। জাতীয় সংসদ সদস্যদের শপথ হয় চলতি ভাষায়। ছড়া, কথা, গান, কবিতা, বিতর্ক, বক্তৃতা সবই হয় চলতি ভাষায়। অথচ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শপথ বাক্য হবে তাদের অপরিচিত দুর্বুদ্ধ সাধু ভাষায় তা মেটেও যৌক্তিক নয়। যার ভাব/বক্তব্য ও দায়িত্ব/কর্তব্য প্রাথমিক-মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী; এমন কি এস.এস.সি. পাস প্রাথমিক শিক্ষক গণের পক্ষেও অনুধাবন করা কঠিন। তৃতীয়ত: এই শপথ বাক্য গুলো মনে হয় সামরিক বাহিনীর জন্য অধিক উপযোগী।

জীবনের শুরুতে সকলের জন্য চাই- সুশিক্ষা অর্জনের শপথ। সঠিক ভাবে নিজেকে ও নিজের বিবেককে তৈরি করার শপথ। সৎ ও নীতিবান থাকার শপথ। দুর্নীতি মুক্ত থাকার শপথ। জাতীয়তা বোধ তৈরির শপথ। যেই মজবুত শপথ বুকে নিয়ে সহজেই সম্ভব  দেশ, জাতি ও মানুষের সত্যিকার কল্যাণ।

শুধু মাত্র নিচের ক্লাসের অবুঝ শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের পাঠের জন্যই নয়, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্যই বাধ্যতামূলক থাকা চাই একটি সহজবুদ্ধ অর্থবহ নিরপেক্ষ শপথ। যা হবে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের মতই জতীয় শপথ। এই শপথ থাকতে পারে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্য বইয়ের শুরুতে। সরকারি-বেসরকারিসহ সকল প্রতিষ্ঠানের  প্রোসপেকটাস ও বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ম্যাগাজিন, পত্র, পত্রিকায়। সকল প্রশিক্ষণ একাডেমিতে। আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে। বিভিন্ন  জাতীয়দিবসে আমাদের জাতীয় সংগীতের আগে/পরে ছাত্র, শিক্ষক, চাকুরে, সাংসদ, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রষ্ট্রপতিসহ সর্বস্তরের মানুষ খুলা ডানহাত বাম বুকে(হৃদয়ে) অথবা ভূমির সমান্তরালে(ভূমিতে) রেখে বার বার গ্রহণ করতে পারেন আমাদের নির্ধারিত জাতীয় শপথ। নবীন বরণ, বিদায়, সমাবর্তনসহ বিভিন্ন ছোট-বড় অধিবেশন ও অনুষ্ঠানের শুরুতে ধর্মগ্রন্থ পাঠের পর পরই হতে পারে, ভালো হওয়ার ও ভালো করার সুদৃঢ় শপথ। যাতে বার বার জাগ্রত হয় আমাদের বিবেক, শানিত হয় আমাদের চেতনা, উজ্জীবিত হয় দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ। সঞ্জীবিত হয় প্রতিবাদ-প্রতিরোধের অসীম শক্তি। সেই শপথটি হতে পারে এই রূপ: [‘আমি শপথ করছি যে, -সদা সত্য কথা বলবো ও সৎ পথে চলবো। ছোটদের স্নেহ ও বড়দের মান্য করবো। সুশিক্ষা অর্জনে আমরণ আন্তরিক থাকবো। প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও স্বধর্মের সকল বিধি-বিধান মেনে চলবো। ভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবো। আমাদের জাতীয় চেতনা, একতা ও স্বাধীনতা সুরক্ষায় সর্বদা সক্রিয় থাকবো। হে সর্বশক্তিমান, আমাকে শক্তি দিন, আমি যেন সুনাগরিক হয়ে- প্রতিষ্ঠান, মাতৃভূমি ও মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারি।’ ] আমিন (প্রার্থনা পূর্ণ হোক)

 

[লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ছড়াকার, এবং তালিকাভুক্ত গীতিকার- বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার।
অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা। Web ID: rahamot21@gmail.com, Cell- +88 017 11 14 75 70]

লিখিত- ২৭ জানুয়ারি ২০১১
পরিমার্জিত- ০৫ অক্টোবর ২০১৫