শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি:
সৎ, শিক্ষিত, নিরপেক্ষ, শিক্ষানুরাগীদের অগ্রাধিকার দিন
মো. রহমত উল্লাহ্
দৈনিক বাংলা, ১৬.০৩.২০২৬
>বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দেশের অধিকাংশ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নীতি বাস্তবায়ন, জবাবদিহিতা ও মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে সভাপতি ও সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা-পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই তাঁদের মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যরা অসৎ, কম শিক্ষিত, পক্ষপাতদুষ্ট ও অদূরদর্শী হলে সম্ভাব্য অসুবিধা-
১. শিক্ষাব্যবস্থার জটিলতা অনুধাবনে সীমাবদ্ধতা: আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা শুধু পাঠদান নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কারিকুলাম উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বিকাশ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং মানোন্নয়ন কার্যক্রম। পর্যাপ্ত শিক্ষাগত ভিত্তি না থাকলে এসব বিষয় গভীরভাবে অনুধাবন করা ও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়।
২. নীতি ও সংস্কার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা: বর্তমান সময়ে শিক্ষা খাতে নানা ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, নতুন কারিকুলাম, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বিকাশ ইত্যাদি। এসব পরিবর্তন মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নেতৃত্ব যদি শিক্ষাগতভাবে প্রস্তুত না থাকে, তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনীহা বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকে।
৩. অযৌক্তিক বা আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তের ঝুঁকি: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা অনেক সময় সূক্ষ্ম ও জটিল সিদ্ধান্তের বিষয়। পর্যাপ্ত জ্ঞান, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও দূরদর্শিতা না থাকলে সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্থানীয় প্রভাব বা আবেগের ভিত্তিতে নেওয়া হতে পারে -যা সুশিক্ষার জন্য সহায়ক নয়।
৪. প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের আশঙ্কা: পরিচালনা কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক তদারকি। সৎ, সুশিক্ষিত ও দক্ষ নেতৃত্ব না থাকলে এসব ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি, অস্বচ্ছতা, অনিয়মের বা দুর্নীতির ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। শিক্ষক-কর্মচারীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বর্তমানে অনেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হতে আসেন না; বরং বিভিন্ন স্বার্থ হাসিলের জন্য আসেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই সভাপতি বা সদস্য হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন! তারা দলীয় হলে, শিক্ষা অনুরাগী না হলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাচর্চার চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকান্ড বেশি হয়।
৫. মানব সম্পদ উন্নয়নে অনাগ্রহ:
কম শিক্ষিত ও কম দূরদর্শী নেতৃত্ব অনেক সময় মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে সরাসরি অর্থসংশ্লিষ্ট বস্তুগত উন্নয়নে অধিক আগ্রহী থাকেন। তারা নতুন শিক্ষাপদ্ধতি, প্রযুক্তি বা দক্ষতা উন্নয়নমূলক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারেন না। শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝতে পারেন না। ফলে প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারে না।
৬. শিক্ষক সমাজের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র। এখানে শিক্ষকরা পেশাগত দক্ষতা ও জ্ঞান দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যান। নেতৃত্ব যদি শিক্ষাগতভাবে দুর্বল হয়, নিরপেক্ষ না হয়, শিক্ষানুরাগী না হয়, তবে অনেক সময় শিক্ষক সমাজের সঙ্গে সমন্বয় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এলাকায় এমন লোক আছেন যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও সদস্য হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকগণ অসম্মানিত বা নিগৃহীত হবার সম্ভাবনায় আতঙ্কিত থাকেন।
৭. আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে অনাগ্রহ: বর্তমান যুগে ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় নিয়োজিতরা বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অজ্ঞ থাকলে, অনাগ্রহী থাকলে, প্রতিষ্ঠান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে ব্যর্থ হয়। শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিক্ষা ও কাঙ্খিত যোগ্যতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়।
৮. প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় দুর্বলতা: একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে উন্নত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন হয়। অত্যন্ত যোগ্য-দক্ষ নেতৃত্ব ব্যতীত অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উৎকর্ষতা বৃদ্ধি, সহশিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে সৎ, নিরপেক্ষ, দূরদর্শী, উচ্চশিক্ষিত সভাপতি ও সদস্য থাকলে সম্ভাব্য সুবিধা-
১. শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য ও দর্শন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা: উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিরা সাধারণত শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন। ফলে তারা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারেন।
২. শিক্ষাসংস্কার বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা: সরকার বা শিক্ষামন্ত্রণালয় যে নতুন নীতি ও পরিবর্তনের কথা বলছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষিত, তথ্যসমৃদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্ক, দূরদর্শী নেতৃত্ব এসব নীতির গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।
৩. পরিকল্পিত ও দূরদর্শী নেতৃত্ব:
উচ্চশিক্ষিত যথাযোগ্য সভাপতি ও সদস্যরা সাধারণত তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। কেননা, তারা জাতীয় শিক্ষানীতি ও আন্তর্জাতিক মান সম্পর্কে কম/বেশি জ্ঞান রাখেন। এতে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সহজ হয়।
৪. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি: যখন পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বে শিক্ষিত, সচেতন, মননশীল, শিক্ষানুরাগী, গুণীমানুষ থাকেন, তখন শিক্ষকরা পেশাগতভাবে সম্মানিত বোধ করেন। কেননা, তারা সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকদের পুরস্কার ও তিরস্কার প্রদান করে ভালোদের উৎসাহিত করতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য কাঙ্খিত অনুকূল শিক্ষাপরিবেশ তৈরি হয়।
৫. প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি: উচ্চশিক্ষিত দায়িত্বশীল নেতৃত্ব সাধারণত আইন, নীতি ও প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে সচেতন থাকে। নিজের এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে অবহিত থাকেন। ফলে ইচ্ছে করলে তারা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে পারেন।
৬. আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার: ডিজিটাল শিক্ষা, স্মার্ট ক্লাসরুম, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে শিক্ষিত নেতৃত্ব সাধারণত অধিক আগ্রহী থাকে। এতে প্রতিষ্ঠান আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হবার দিকে এগিয়ে যায়।
৭. সমাজে শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি:
যখন একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটিতে সুশিক্ষিত, সম্মানিত ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিরা থাকেন, তখন সমাজেও শিক্ষার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং অভিভাবকদের আস্থা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকগণ অধিক সম্মানিত বোধ করেন। শিক্ষার্থীরা অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব খুঁজে পায় এবং তাদের জীবনের লক্ষ্য ঊর্ধ্বমুখী হয়।
৮. স্থানীয় উন্নয়ন ও জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা: শিক্ষিত ও সচেতন নেতৃত্ব স্থানীয় সমাজের উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের মানবিক মূল্যবোধ গঠন এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সমন্বিত করতে পারে। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়িত্ব অধিক পূর্ণতা পায়।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল পাঠ্যক্রম পরিবর্তন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সৎ, যোগ্য, দক্ষ, সচেতন, দূরদর্শী, দায়িত্বশীল শিক্ষানুরাগী নেতৃত্ব -যাদের অবশ্যই থাকতে হবে যৌক্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা। মাঠপর্যায়ে সেই নেতৃত্বে নিয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ও ক্ষমতাবান অংশ হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি। তাই সে কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষা, সততা, দক্ষতা, নিরপেক্ষতা, দূরদর্শিতা ও আন্তরিকতা নিশ্চিত করা মানেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান, জবাবদিহিতা ও সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা -যা শিক্ষার্থীদের সুশিক্ষা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত।<
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিষয়ক লেখক


0 মন্তব্য(গুলি):