প্রয়াত মাহেরিন চৌধুরীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা:
খুব বেশি প্রয়োজন মানবিক শিক্ষক
মো. রহমত উল্লাহ্
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ জুলাই ২০২৫
>মানবিক গুণাবলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পরোপকার। অর্থাৎ স্বার্থহীন ভাবে অন্যের উপকার করা। অন্যের দুঃখ-কষ্ট অনুভব করা। তার প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সচেষ্ট হওয়া। কেউ বিপদগ্রস্ত হলে তাকে উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়া। সমাজে পরোপকারী মানুষের সংখ্যা যত বেশি হয় ততই মঙ্গলজনক। তাই শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলী অর্জন অপরিহার্য। কেননা, শিক্ষার্থীরা মানবিক গুণাবলী অর্জন করলেই মানবিক হয় দেশ ও জাতি।
সততা, ভদ্রতা, সংযম, সহানুভূতি, দয়াশীলতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ, দায়িত্ববোধ, কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যাদি মানবিক গুণাবলীর দ্বারাই পরোপকার নিশ্চিত হয়। এ সকল গুণাবলীর অভাব দেখা দিলে একজনের বিপদে এগিয়ে আসে না অন্যজন। সমাজে নেমে আসে চরম স্বার্থপরতা, অস্থিরতা, হানাহানি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, বিশৃঙ্খলা! শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী প্রথিত করার প্রধান দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষক। এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সর্বপ্রথম শিক্ষককেই হতে হয় মানবিক। নিজেকে উজাড় করে দিতে হয় শিক্ষার্থীদের জন্য। শিক্ষার্থীদের প্রতি হতে হয় সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল, কর্তব্যপরায়ণ, সহানুভূতিশীল। শিক্ষক মানবিক হলেই স্বার্থহীন হয়, উন্নত হয়, চিরস্থায়ী হয়, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষক অমানবিক হলে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক হয় দুর্বল, ভঙ্গুর, ব্যাহত হয় সুশিক্ষা। সঠিক পাঠদানের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলী অর্জন, প্রয়োগ ও সঞ্চালনের মাধ্যমেই একজন শিক্ষক হয়ে ওঠেন প্রকৃত শিক্ষক।
সম্প্রতি আমাদের সামনে এসেছে একজন সর্বোচ্চ মানবিক শিক্ষকের উদাহরণ। তিনি হলেন মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের মাহেরিন চৌধুরী ওরফে মাহিরিন মিস। বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান তাদের প্রতিষ্ঠানে বিধ্বস্ত হয়ে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের গায়ে আগুন লেগে গেলে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন উদ্ধার কাজে। বারবার আগুনে গিয়ে নিজে দগ্ধ হয়ে যতক্ষণ পেরেছেন ততক্ষণ উদ্ধার করেছেন শিশুদের। মৃত্যুর আগে বলেছেন, "ওই বাচ্চাগুলোও আমার বাচ্চা। ওদের মুখে আমার বাচ্চাগুলোর ছবি ভাসতেছিল। আমি আমার সর্বোচ্চ দিয়ে যতগুলা পারছি প্রায় ২০-২৫ জনকে টেনে বের করে দিছি। এরপরে কী হলো আমি জানি না"! সে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন মাসুকা নামে আরও একজন শিক্ষক এবং অনেক কোমলমতি নিষ্পাপ শিক্ষার্থী। স্পটডেড না হলে হয়তো মাসুকা মিসও ঝাঁপিয়ে পড়তেন প্রিয় শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর জন্য। জাতীয়ভাবে আলোচিত মাহেরিন আমাদের দেখিয়ে গেছেন কীভাবে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারেন একজন পরোপকারী মানুষ, মানবিক মানুষ, উত্তম শিক্ষক। একজন মানবিক মানুষের দ্বারা কীভাবে উপকৃত হয় চরম অসহায় মৃত্যু পথযাত্রী অগণিত মানুষ।
মাহেরিন মিসের সংস্পর্শে নিশ্চয়ই মানবিক গুণাবলী অর্জন করেছে অনেক শিক্ষার্থী। তিনি প্রচন্ড ভালোবাসতেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। অনেক সময় ও শ্রম দিতেন প্রতিষ্ঠানের কাজে। নিভৃতে নিবেদিত ছিলেন অন্যের কল্যাণে। প্রতিদিন স্কুল ছুটির পর প্রতিটি শিশুকে তার অভিভাবকের দায়িত্বে তুলে দিয়ে পরে ফিরে যেতেন নিজের বাসায়। বেঁচে থাকলে অবশ্যই তাঁর সান্নিধ্যে আরো বেশি পাঠ্যবিষয় ও মানবিক গুণাবলী অর্জন করত অগণিত শিক্ষার্থী। আমাদের শিক্ষকদের স্বার্থহীন হয়ে ওঠার জন্য, মানবিক হয়ে ওঠার জন্য, পরোপকারী হয়ে ওঠার জন্য এবং শিক্ষার্থীদের অনুরূপ গুণে গুণান্বিত করে তোলার জন্য মাহেরিন ম্যাডামের দেওয়া এই শিক্ষা চির অনুকরণীয়, অনুসরণীয়।
শুধু শিক্ষক-শিক্ষার্থী নয়, সবার জন্যই তা শিক্ষণীয়। উনার এ মহামূল্যবান গুণ মনেপ্রাণে ধারণ করলে, লালন করলে এবং শিক্ষার্থী তথা সন্তানদের মধ্যে সঞ্চারিত করলেই উত্তম হয়ে উঠবো আমরা, উত্তম হয়ে উঠবে আমাদের সমাজ। সবার মানবিকতায় চিরদিন বেঁচে থাকবেন মানবিক মাহেরিন চৌধুরী।
লেখক: অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক
পত্রিকার লিংক:
https://epaper.ittefaq.com.bd/m/469119/6884dfd349909
*ভালো লাগলে শেয়ার করতে পারেন।


0 মন্তব্য(গুলি):