তোমরা যারা এবারের এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষা পাশের সনদ পাওয়ার অপেক্ষায়, তাদের জানাচ্ছি আন্তরিক অভিনন্দন। জানি, পরীক্ষা ছাড়া সবাই পাশ করলেও সমান সন্তোষ্ট হবে না সবাই। ফলাফল যাই হোক বিনা পরীক্ষায় পাশ কোনো দিনই গৌরবময় হয় না, হবে না কারো জন্য। যাদের প্রস্তুতি ভালো ছিল, পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলে আরও ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনা ছিল, তাদের মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। তাই বলে মন খারাপ করে বসে থাকলে তো আর চলবে না। হাজারো প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হয় জীবন চলার পথে। সৃষ্টির শুরু থেকেই সংগ্রাম করে, লড়াই করে, কৌশল করে, প্রতিকার করে, প্রতিরোধ করে টিকে থাকতে হয়েছে, হচ্ছে মানুষকে। দুই পা এগিয়ে যাওয়ার জন্যই কখনো কখনো পিছিয়ে আসতে হয়েছে, হচ্ছে এক পা। তেমনি মহামারি করোনা থেকে জীবন রক্ষার জন্য মানব জাতিকে আজ নিতে হচ্ছে নানান কৌশল। কিছু দিনের জন্য হলেও থামিয়ে দিতে হয়েছে চাকা, পাখা, বল, কল। তোমাদের জীবন রক্ষার জন্যই বন্ধ করে দিতে হয়েছে তোমাদের এইচএসসি পরীক্ষা। এটিকে মেনে নিয়ে, মনে নিয়ে এগিয়ে যাও নতুন উদ্যমে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারাও বড় একটি যোগ্যতা। বর্তমান কঠিন বাস্তবতার সুরঙ্গে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যত আলোর ঠিকানায় যাওয়ার প্রত্যয়ে এখন নিতে হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। তাই উত্তম পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাও পরবর্তী শিক্ষায় বা কর্মে।
উচ্চ শিক্ষায় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য কোচিং সেন্টারে যাবার কোন প্রয়োজন নেই। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির সিলেবাসভুক্ত বিষয় ও অধ্যায়গুলো পড়ে বুঝে আয়ত্তে রাখাই যথেষ্ট। তবে ভর্তির ক্ষেত্রে সঠিক বিষয় নির্বাচন বেশ জটিল। এজন্য পরামর্শ করো বড়দের সাথে। তৈরি করো পছন্দক্রম। ভালোভাবে জেনে নাও তোমার পছন্দের প্রতিটি বিষয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কে। প্রয়োজনে নিয়ে নাও ইন্টারনেটের সহযোগিতা। জেনে নাও, কোনো বিষয়ে ভর্তি হয়ে কী পড়তে হবে তোমাকে। ভেবে দেখো, তা কি তোমার জন্য কঠিন হবে না সহজ হবে। গত পরীক্ষায় যে বিষয়ে বেশি নম্বর পেয়েছো, তা তোমার জন্য সঠিক বিষয় না-ও হতে পারে। বরং যে বিষয় তুমি নিজেই পড়ে বুঝতে পারো, যে বিষয়ের গভীরে যেতে তোমার ভালো লাগে, যে বিষয় নিয়ে গবেষণা করতে তোমার আগ্রহ জাগে সেটিই হতে পারে তোমার উপযোগী উচ্চ শিক্ষার বিষয়। পছন্দের প্রতিষ্ঠানে পড়ার চেয়ে পছন্দের বিষয়ে পড়া, নিজের ও দেশের জন্য অধিক মঙ্গলজনক। মনে রাখতে হবে, উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু উচ্চ বেতনে চাকরি করাই নয়; বরং নিজের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়ে সত্যিকারের মানুষ হয়ে অতি উচ্চ মাত্রায় দেশ ও জাতির সেবা করা।
বিভিন্ন কারণে যাদের যাওয়া হবে না উচ্চ শিক্ষায় তারা এমন ভেবো না যে এখনই হেরে গেছো জীবনে। জীবন অনেক বড়। তুমিও হতে পারো অনেকের চেয়ে অধিক সফল। সাহস রাখো, উদ্যম রাখো, আস্থা রাখো নিজের উপর। বাস্তবতাকে স্বীকার করে তৈরি করো নতুন পরিকল্পনা। মোটেও পার করা যাবে না বেকার সময়। অবসর মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা। দীর্ঘ অবসরে ও বেকারত্বে নিজের অজান্তেই তুমি আক্রান্ত হতে পারো বিষন্নতায়। দুষ্টুসংঘে চলে যেতে পারো ভুল পথে। হয়ে যেতে পারো মাদকাসক্ত। অবশ্যই নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে এসব থেকে। নিয়োজিত করতে হবে উত্তম কর্মে। উত্তম কর্মেই উত্তম হয় মানুষ। নিজের যোগ্যতা ও আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করতে হবে আধুনিক যুগপোযোগী কর্মমুখী পরিকল্পনা। গ্রহণ করতে হবে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। সরকারি যুব উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে পছন্দমতো প্রশিক্ষণ নিয়ে তুমিও হতে পারো উদ্যোক্তা। গড়তে পারো কৃষি খামার, করতে পারো মত্স চাষ, স্থাপন করতে পারো ক্ষুদ্র শিল্প এবং আরও অনেক কিছুই। হতে পারো ফ্রিল্যান্সার। গড়ে তুলতে পারো আইটি ফার্ম। আন্তরিক প্রচেষ্টায় বিন্দু থেকে হয়ে উঠতে পারো সিন্দু। করতে পারো নিজের এবং হাজারো বেকারের কর্মসংস্থান। সাধন করতে পারো দেশ ও জাতির অশেষ কল্যাণ।
যারা বিদেশে গিয়ে কাজ করতে চাও, তারাও বাড়াতে পারো নিজের দেশ, জাতি ও পরিবারের সমৃদ্ধি। অর্জন করতে পারো বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। এগিয়ে যাও বৈধ পথে। জেনে নাও সরকারি বিধি-বিধান। সক্ষমতা ও প্রত্যাশিত বেতন অনুসারে পছন্দ করো দেশ ও কাজ। নিয়ে নাও সে কাজের উপযোগী উত্তম প্রশিক্ষণ। অর্জন করো অধিক দক্ষতা। শিখে নাও সে দেশের ভাষা। তবেই তুমি হবে উত্তম কর্মী। নিশ্চিত পাবে পছন্দের কাজ ও প্রত্যাশিত বেতন। অর্জিত হবে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা। তোমার কর্মদক্ষতায় বিদেশের মাটিতে বৃদ্ধি পাবে দেশের মর্যাদা। তোমাকে নিয়ে গর্বিত হবে সবাই।
লেখক:সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
মহামারি করোনার ভয়াবহ বিরুপ পরিস্থিতিতে যখন প্রায় ঘরবন্দি অদম্য মানবজাতি। তখন শিক্ষা-কার্যক্রম চালানোর জন্য অনলাইন ক্লাসের গুরুত্ব অপরিসীম। এমনকি এই অবস্থার উন্নতি হলেও ডিজিটাল সুবিধার কারণে স্বাভাবিক ক্লাসের পাশাপাশি অবশ্যই চলমান থাকবে অনলাইন শিক্ষা-কার্যক্রম। তাই অপরিহার্যভাবেই চলমান রাখতে হবে অনলাইন ক্লাসের উৎকর্ষ সাধন। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, আপনাদের মেধায় ও প্রচেষ্টায়ই ক্রমাগত সাধিত হবে সেই উৎকর্ষ। শিক্ষকের যোগ্যতা ও দক্ষতার পাশাপাশি আরও অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে একটি অনলাইন ক্লাসের সফলতা। চলুন লক্ষ করা যাক কয়েকটি সাধারণ করণীয় বিষয়:
*প্রয়োজন অনুসারে বোর্ড, মার্কার, ডাস্টার, স্টিক, লাইট, কম্পিউটার, প্রজেক্টর, স্মার্ট প্যাড ও অন্যান্য অভিনব শিক্ষা উপকরণ রেডি করে রেকর্ডিং বা লাইভ শুরু করতে হবে। রেকর্ডিং শুরু করে এসব ঠিকঠাক করা অশোভন।
*নিজে ভালোভাবে তৈরি হয়ে ক্যামেরার সামনে আসতে হবে। সবার সামনে এসে বার বার নিজেকে ঠিক করা দৃষ্টিকটু ও বিরক্তিকর। এতে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ পাঠের বাইরে চলে যায়। তাই চুল, চশমা, এয়ারফোন, জামাকাপড় ইত্যাদি এমনভাবে সেট করে আসতে হবে যেনো ক্লাস চলাকালে বার বার ঠিক করতে না হয়।
*স্বাভাবিক সাজপোশাক ধারণ করে নিজে অত্যন্ত পরিপাটি থাকতে হবে এবং ক্লাসের ব্যাকগ্রাউন্ড সুন্দর রাখতে হবে।
*এমন ক্যামেরা ও নেট কানেকশন সেট করতে হবে যেনো ছবি ও সাউন্ড পরিস্কার থাকে এবং খেয়াল রাখতে হবে যেনো সেখানে বাড়তি কোন নয়েজি না থাকে।
*সুবিধা ও সক্ষমতা বিবেচনা করে Zoom, Google Class Room, Edmodo, Facebook Live ইত্যাদি যে কোন এক বা একাধিক অ্যাপ ব্যবহার করে ক্লাস ও পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সম্ভব হলে অধিক ইন্টারেক্টিভ অ্যাপ ব্যবহার করাই উত্তম। অ্যাপ ইন্টারেক্টিভ হোক বা না হোক, এমন মনে করতে হবে যে, ক্লাসে সকল শিক্ষার্থী উপস্থিত আছে এবং তারা সবাই দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে।
*শিক্ষার্থীদের সাথে সীমিতভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করা যাবে। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, স্বাগতম ভুল, স্বাগত সঠিক। এজন্য অতি অল্প সময় ব্যয় করা উচিত এবং একান্ত ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে আলোচনা করা উচিত নয়।
*সম্বোধন করার সময় ছাত্রীরা, মেয়েরা, ছাত্ররা, ছেলেরা -এভাবে না বলে প্রিয় শিক্ষার্থীরা বলা উত্তম।
*অবশ্যই প্রথমে বোর্ডে বা স্লাইডে ক্লাসের তারিখ, শিক্ষকের নাম, শ্রেণি-শাখার নাম, বিষয় ও অধ্যায়ের নাম ইত্যাদি লেখা এবং বলা প্রয়োজন।
*ক্লাসের শুরুতে শিখন ফল লেখা ও বলা আবশ্যক। হতে পারে তা অতি অল্প কথায়।
*নিয়মমাফিক পাঠটিকা তৈরি করে ও অনুসরণ করে ক্লাস নিতে হবে। হতে পারে তা অলিখিত ও সংক্ষিপ্ত। ক্লাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সঠিক সময় বিভাজনের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। *অতি দ্রুত বা অতি ধীরে ক্লাস পরিচালনা করা উচিত নয়। অতি দ্রুত হলে যেমন সকল শিক্ষার্থী বুঝতে পারে না, তেমনি অতি ধীর হলেও অনেক শিক্ষার্থী বিরক্ত বা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
*প্রতিটি বর্ণ, শব্দ ও বাক্য শুদ্ধভাবে বড় অক্ষরে লিখতে এবং সঠিক উচ্চারণে উচ্চ স্বরে বলতে হবে। যেনো সকল শিক্ষার্থী তা স্পষ্টভাবে দেখতে, শুনতে ও বুঝতে পারে।
*একসাথে অনেক কথা বা একাধিক পয়েন্ট লেখা/বলা/উপস্থাপন করা অনুচিত। এতে শিক্ষার্থীরা কোনটির প্রতিই মনোযোগ দিতে পারে না। পৃথক পয়েন্ট বা শিরোনাম লেখায় একাধিক কালার ব্যবহার করা উত্তম।
*আলোচ্য বিষয়ের উপযোগিতা অনুসারে বোর্ডে ও/বা স্লাইডে পাঠ উপস্থাপন করা উচিত। যেমন- গণিত ধাপে ধাপে বোর্ডে লিখে ও বলে বুঝানো উত্তম এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া ভিডিওতে দেখানো উত্তম। আবার বোর্ডে এঁকে বা স্লাইডে দেখানো যেতে পারে ফুল-ফলের ছবি।
*নিজে অত্যন্ত উদ্যমী, প্রাণোচ্ছল ও হাসিখুশি থাকতে হবে। এতে পাঠের প্রতি শিক্ষার্থীর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। শিক্ষার্থীর অর্থাৎ ক্যামেরার সামনে এসে কথা বলা উত্তম।
*আলোচিত পাঠের সম্ভাব্য প্রশ্ন ও উত্তর নিজে নিজেই একাধিক বার লেখা এবং বলা অত্যাবশ্যক।
*ক্লাস শেষ করার আগে একাধিক বার পাঠের মূল অংশ বা শিখন ফল পুনরুল্লেখ করা ও লেখা আবশ্যক। যেনো আলোচিত পাঠটি শিক্ষার্থীরা ক্লাস থেকেই আয়ত্ত করতে পারে।
*রেকর্ডিং বা লাইভ ক্লাস শেষ করে নিজের ক্লাস নিজেই একাধিকবার দেখা প্রয়োজন। যদি মনে হয় কোন ক্লাস মানসম্মত হয়নি তো সেটি অনলাইনে আপলোড করা বা রাখা ঠিক না। পরবর্তীতে আরও ভালো করে এই ক্লাসটি অনলাইনে রাখা উচিত।
সর্বোপরি একজন আদর্শ শিক্ষকের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এমনভাবে সকল ক্লাস পরিচালনা ও পাঠদান করতে হবে যেনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষার সংজ্ঞা "মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের উন্মোচন" সাধিত হয়।
লেখক: সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
এমপিও নীতিমালা সংশোধন চূড়ান্ত করার পূর্বে খসড়া প্রকাশ করা উচিত
মো. রহমত উল্লাহ্
সাম্প্রতিক দেশকাল, ২০ নভেম্বর ২০২০
>বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও নীতিমালা সংশোধন কার্যক্রম চলছে বর্তমানে। জানা যাচ্ছে, প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে এমপিও নীতিমালা সংশোধনের কাজ। একদিকে কাজ করছে কমিটি অন্যদিকে আলোচনা সমালোচনা করছেন শিক্ষকরা। কোন বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা অগ্রিম জানার আগ্রহ সবার। এমপিও নীতিমালা সংশোধন কমিটির বেসরকারি সদস্যরাও বিভিন্ন আলোচনায় এসে দিচ্ছেন কিছু কিছু তথ্য।
পত্রপত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের পদোন্নতিতে অনুপাত প্রথা আর থাকবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোট শিক্ষকের ৫০ পার্সেন্ট সহকারী অধ্যাপক হবেন। এই সংবাদে খুশি হচ্ছেন শিক্ষকরা। কেননা, এই অনুপাত প্রথা বাতিলের দাবি দীর্ঘদিনের। অপরদিকে বিভিন্ন আলোচনায় শোনা যাচ্ছে, এই পদন্নতির ক্ষেত্রে ২:১ নীতি অনুসরণ করা হতে পারে। যদি তাই হয় তো আবারো জটিলতা তৈরি হবার সম্ভাবনা থাকবে। যেমন, বিদ্যমান নীতিমালায় ৫:২ নীতি অনুসরণ করে মোট (৫+২) ৭ জন শিক্ষক থেকে ২ জনকে সহকারী অধ্যাপক করা হচ্ছে। আসন্ন সংশোধিত নীতিমালায় যদি আগের হিসাব কৌশল অনুসারে ২:১ নীতি প্রণয়ন করা হয় তো মোট (২+১) ৩ জন শিক্ষক থেকে ১ জন সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন। যা মোট শিক্ষক সংখ্যার ৫০% হয় না, ৩৩.৩৩% হয়। এমতাবস্থায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনুপাত প্রথা সম্পূর্ণ বাতিল করে শুধুমাত্র শতকরা হার প্রবর্তন করাই উত্তম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এবং সহকারী অধ্যাপক এর পাশাপাশি সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করার দাবি জানাচ্ছি।
এছাড়াও শোনা যাচ্ছে, ইন্টারমিডিয়েট কলেজ/ আলিম মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক পদ বিলুপ্ত করে সিনিয়র প্রভাষক পদ সৃষ্টির পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বাস্তবে যদি তাই হয় তো এটি হবে শিক্ষকদের মধ্যে আরো এক নতুন অসন্তোষের কারণ। এ পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যদি সহকারী অধ্যাপকের পদ বিলুপ্ত করা হয়, তাহলে যারা বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক পদে আছেন তাদের অবস্থান কী হবে? তারা কি আবার সিনিয়র লেকচারার হয়ে যাবেন? কী অপরাধে তাদের পদাবনতি হবে? যদি তাই হয় তো তারা এটিকে মেনে নিবেন কীভাবে? সিদ্ধান্তটি যদি এমন হয় যে, যারা সহকারী অধ্যাপক হয়েছেন তারা এ পদেই থাকবেন, কিন্তু নতুন করে আর কেউ সহকারী অধ্যাপক হতে পারবেন না তো নতুনদের মনের অবস্থা কেমন হবে? তারাই বা এটিকে মেনে নিবেন কীভাবে? আসলে কোন যুক্তিতে কী হচ্ছে, তা আমরা জানিনা। এক্ষেত্রে যদি এমন ভাবা হয় যে, ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের সব সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেহেতু সহকারী অধ্যাপকের পদ নেই, সেহেতু এই লেভেলের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও তা থাকা উচিত নয়; তাহলে ডিগ্রি লেভেলের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ দেয়া উচিত।
বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির বিষয়েও শোনা যাচ্ছে অনেক কথা। বিদ্যমান এমপিও নীতিমালা ২০১০ এ বলা আছে, সরকার ইচ্ছা করলে নীতিমালা প্রণয়ন করে বেসরকারি শিক্ষকদের বদলির ব্যবস্থা করতে পারেন। অসহনীয় কষ্টে নিমজ্জিত বদলি প্রত্যাশী শিক্ষকরা প্রত্যাশা করছেন, এমপিও নীতিমালা সংশোধনের জন্য গঠিত বর্তমান কমিটি একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে বদলির ব্যবস্থা করবেন। সরকার চাইলেই তারা তা করতে পারবেন, সরকার না চাইলে তাদের কিছুই করার থাকবে না। এদিকে উচ্চ আদালত সম্প্রতি একটি রায়ে বলেছে, এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য সুযোগ দিতে হবে। 'বদলি' বা 'প্রতিষ্ঠান বদল' যে নামেই হোক শিক্ষকদের কাঙ্ক্ষিত সুবিধাজনক এলাকায় গিয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ দেয়া সরকারের দায়িত্ব। নীতিমালার জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্যই নীতিমালা।
অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান অংশের পূর্ণ বেতন-ভাতা নিশ্চিত করা এবং এমপিওভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। অথচ তাদেরকে এমপিওভুক্ত করার কোনো প্রস্তাব নীতিমালায় যুক্ত করা হচ্ছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার বলা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও এমপিওভুক্ত হবার কোনো সুযোগ তারা পাবেন না- এটি খুবই কষ্টকর বিষয়। শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য সরকার ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মতিক্রমে তাদেরকে এমপিওভুক্ত করার জন্য নীতিমালায় প্রয়োজনীয় ধারা সংযুক্ত করা আবশ্যক।
এমপিও নীতিমালা সংশোধন সংক্রান্ত এমন আরো অনেক বিষয় আছে যা নিয়ে বিভিন্ন কথা হচ্ছে। তাই এই সংশোধন চূড়ান্ত করার পূর্বে একটি খসড়া প্রকাশ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের জানিয়ে, বুঝিয়ে, মানিয়ে নেয়াই উত্তম। কেননা, এটিতো শিক্ষা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণার্থেই করা হচ্ছে। শিক্ষার সংজ্ঞা অনুসারে শিক্ষার্থীদের "সুস্থ দেহে সুস্থ মন" গঠন নিশ্চিত করার জন্যই দূর করতে হবে শিক্ষকগণের মনের কষ্ট। তা না হলে শিক্ষক সমাজ যদি এক বা একাধিক বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন; তবে কমবেশি বিনষ্ট হবে "শিক্ষা বান্ধবখ্যাত" বর্তমান সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইমেজ।
প্রকাশিত: নভেম্বর ১৮, ২০২০ , ১১:১৫ অপরাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ১৮, ২০২০ , ১১:১৫ অপরাহ্ণ
করোনা মহামারির এই দুর্যোগকালে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শহরভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে অনলাইন ক্লাস ও পরীক্ষা। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ধরে রাখার জন্য এটি মন্দের ভালো একটি ব্যবস্থা। যদিও এতে অর্জিত হচ্ছে না সরাসরি ক্লাসের পরিপূর্ণ সুফল। তাই পরিতৃপ্ত হচ্ছে না ছাত্র, শিক্ষক, অভিভাবক। টিউশন ফি দিতে চাচ্ছেন না অভিভাবকরা। তাছাড়া করোনা মহামারির বিরূপ প্রভাবে চরম অনটনে আছেন অনেক অভিভাবক। তাই অনটনে পড়ে গেছে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে নন-এমপিও বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংকট সর্বাধিক। প্রতিষ্ঠানের অর্থাভাবে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে আছে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনভাতা। এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানেও পড়েছে এর প্রভাব। চরম সংকটে দিনাতিপাত করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, সচ্ছল প্রতিষ্ঠানগুলোও এই দুর্দিনে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে চাচ্ছে না, দিচ্ছে না। এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যাদের ফান্ডে কোটি কোটি টাকা জমা থাকার পরও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বন্ধ করে দিয়েছে অথবা আংশিক দিচ্ছে। অথচ বিভিন্নভাবে মেসেজ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে টিউশন ও অন্যান্য ফি। শিক্ষার্থীরাও ওই বিশেষ বিশেষ প্রতিষ্ঠানে নিজের ভর্তি টিকিয়ে রাখার জন্য পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছে সব ফি। শিক্ষকরা পরিশ্রম করে অতিরিক্ত আয় করে, প্রাপ্যের অতিরিক্ত না নিয়ে, অতীতে জমা করেছেন বলেই তো সচ্ছল হয়েছে ওইসব প্রতিষ্ঠান। তাদের তহবিলে জমা হয়েছে কয়েক লাখ থেকে কয়েকশ কোটি টাকা। মাসে মাসে অর্জিত হচ্ছে বিপুল অঙ্কের লাভ। তারাই আবার নিচ্ছে সর্বাধিক সরকারি অনুদান ও প্রণোদনা। তাছাড়াও সারাদেশে এমন অনেক স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা রয়েছে, যাদের টিউশন-ফি ছাড়াও আছে নিয়মিত আয়ের অনেক অনেক উৎস। এই মহামারি করোনাকালেও প্রতিদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। শিক্ষকরা প্রতিদিন নিচ্ছেন অনলাইন ক্লাস আর কর্মচারীরা প্রতিদিন করছেন অফিস। তাহলে প্রতিষ্ঠানের তহবিলে কোটি কোটি টাকা জমা থাকার পরও তারা বেতন-ভাতা পাবেন না কেন? অনাহারে, অর্ধাহারে থাকবেন কেন পরিবার-পরিজন নিয়ে? এ তো চরম বিচারহীনতা! শিক্ষা প্রশাসনের অবশ্যই এগিয়ে আসা উচিত শিক্ষক-কর্মচারীদের এই দুর্দিনে। তারা চাইলেই নিশ্চিত করতে পারে অন্তত সচ্ছল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। প্রশাসন ইচ্ছে করলেই একটি ফরম ছেড়ে দিয়ে জেনে নিতে পারে, কোন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সচ্ছলতা কতটুকু? কোন প্রতিষ্ঠানে কতজন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত? কোন প্রতিষ্ঠানে কত বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে? কোন প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে না? প্রশাসন প্রতিনিয়মিত অনলাইন ক্লাসের তথ্য নিচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্টের তথ্য নিচ্ছে, অথচ শিক্ষকদের অসচ্ছলতার তথ্য নিচ্ছে না! কর্মের খবর নিচ্ছে, পারিশ্রমিকের খবর নিচ্ছে না! শিক্ষকদের জন্য এটি বড়ই পীড়াদায়ক বিষয়! প্রতিষ্ঠানে টাকা থাকার পরও যারা নিয়মিত প্রাপ্য বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না তারা এই ই-মেইলে অবহিত করুন। এরূপ একটি আদেশই এখন নিশ্চিত করতে পারে সচ্ছল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হাজার হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর ন্যূনতম জীবন ধারণ। শিক্ষকরা তো শিক্ষা প্রশাসনেরই মাঠ পর্যায়ের কর্মী। তারা এখন সরকারি নিয়ম মেনে টিউশনি করেও কোনো টাকা আয় করতে পারছে না। এই মহামারিকালে, এই কঠিন দুঃসময়ে, তাদের বাঁচিয়ে রাখা তো সরকারি প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব।
অধ্যক্ষ কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। rahamot21@gmail.চম
সম্প্রতি অসংখ্য ধর্ষণ ও বলাৎকার সংবাদে বিব্রত, লজ্জিত, মর্মাহত ও বিক্ষুব্ধ সমগ্র জাতি। ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে যখন সোচ্চার দেশের নারী-পুরুষ উভয়ই, তখন গত ১৩ অক্টোবর ২০২০ তারিখে এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের স্থলে ‘মৃত্যুদণ্ড’ বা ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ নির্ধারণ করেছে বর্তমান সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহেই দ্রুত জারি হয়েছে এই অধ্যাদেশ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, এ্যাসিড নিক্ষেপকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। কারণ, সেখানে আমরা আইন সংশোধন করেছিলাম। পার্লামেন্টে অনুমোদনের পর এটি আইনে পরিণত হয়েছে ইতোমধ্যে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্ষণ একটা পাশবিকতা, মানুষ পশু হয়ে যায়। যার কারণে আমাদের মেয়েরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সে জন্য আমরা ধর্ষণ করলে যাবজ্জীবনের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইনটি সংশোধন করে পাস করেছি। এ বিষয়ে অল্প কথায় প্রায় সব কথাই বলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সর্বস্তরের মানুষ।
এদিকে এই অধ্যাদেশ জারির পর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক কথা ও একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বার বার। তা হলো-ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলে বলাৎকারের শান্তি কি? বলাৎকারও তো ধর্ষণের মতোই জঘন্যতম অপরাধ। সকল ধর্মেই বলা আছে তা। বাস্তবে ধর্ষণের চেয়েও বেশি মাত্রায় এটি সংঘটিত হচ্ছে আমাদের দেশে। বিশেষ করে কিছু আবাসিক মাদ্রাসা ও আবাসিক কর্মস্থলে প্রতিনিয়ত বলাৎকারের শিকার হচ্ছে অনেক নিষ্পাপ ছেলেশিশু! যার প্রায় শতভাগই থেকে যাচ্ছে গোপন। দারিদ্র্য, লোকলজ্জা, সামাজিক মর্যাদা হানি, কর্ম/ছাত্রত্ব হারানোর ভয় ইত্যাদি কারণে মুখ খুলে না নির্যাতিত শিশু ও তার পরিবার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এসব অবুঝ শিশু ও তাদের অধিকাংশ অভিভাবক জানেই না এই অপরাধের শাস্তি কি বা আদৌ কোন শাস্তি আছে কি না? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই কেউ কেউ উত্তর দিয়েছেন এই প্রশ্নের। বলেছেন- ধর্ষণ ও বলাৎকারের শাস্তি একই। কেননা, যা ধর্ষণ তা-ই বলাৎকার। এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন অনেকেই। আর এ কারণেই এই লেখার সূত্রপাত।
আভিধানিক বা আইনগত অর্থ যা-ই থাকুক, সমাজের প্রায় সর্বস্তরের মানুষ ধর্ষণ ও বলাৎকার এই দুটি শব্দের প্রায়োগিক অর্থ এক মনে করে না, বলাৎকার বলতে শিশুর বা নারীর বা পুরুষের বা হিজড়ার পায়ুপথে পুরুষাঙ্গ দ্বারা নির্যাতন করা বুঝে থাকে। আর ধর্ষণ বলতে মেয়ে শিশুর বা নারীর গোপনাঙ্গে নির্যাতন করা বুঝে থাকে। আমাদের সাহিত্যে, পত্রপত্রিকায় এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতেও এ দুটি অপকর্মকে এরূপ পৃথকভাবে ধর্ষণ ও বলাৎকার বোঝানো হয়ে থাকে। গুগল এবং ইউটিউবেও তাই দেখা যায়। সবার ধারণায় এবং মুখেমুখেও তাই প্রচলিত আছে। এটি একটি ভাল দিক যে, এ দুটি শব্দের প্রায়োগিক অর্থকে আমরা সর্বজনীনভাবে আলাদা করতে পেরেছি। এতে আমাদের বাংলা ভাষার সুনির্দিষ্টকরণ শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। যে আইনটিতে এখন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড সংযুক্ত করা হয়েছে, সেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ৯ ধারাতেও সরাসরি মেয়েদের বা নারীদের কথাই বলা হয়েছে। যেমন, ‘যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন তা হইলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হইবেন।’ সেখানে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এভাবে-‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত [ষোলো বছরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে ও ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা [ষোলো বছরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।’ এই আইনে ‘নারী’ অর্থ যে কোন বয়সের নারী এবং ‘শিশু’ অর্থ অনধিক ষোলো বছর বয়সের কোন ব্যক্তি। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এই আইনের ব্যাখ্যার শুরুতেই বলা হয়েছে ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত অর্থাৎ, এখানে পরিষ্কার মেয়ে বা নারীকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা, ছেলে বা পুরুষের সঙ্গে পুরুষের বিবাহ বন্ধন সম্ভব নয়। যদিও শিশু বলে ছেলেমেয়ে উভয়কেই বোঝানো সম্ভব ছিল। এখানে তাও করা হয়নি। বার বার বলা হয়েছে, নারীর সহিত, নারীর সহিত, নারীকে। এখানে ধর্ষণ বলতে ছেলে বা পুরুষকে বলাৎকার বোঝার কোন সুযোগ নেই। জানা মতে, আমাদের দেশের আদালতেও ধর্ষণ এবং বলাৎকার এ দুটিকে পৃথকভাবেই উপস্থাপন করা হয়। এমনকি এসব মামলার রায়েও ধর্ষণকে বলাৎকার এবং বলাৎকারকে ধর্ষণ বলে অভিহিত করা হয়েছে এমন কোন সংবাদ দেখিনি। প্রায় সবাই মনে করে বলাৎকার ধর্ষণের মতো বড় অপরাধ নয়। সাধারণ মানুষের ধারণাও এমনই। ধর্ষণের প্রতিবাদে মিছিল, মিটিং, পোস্টার, লিফলেট, লেখালেখি ইত্যাদি হলেও বলাৎকারের প্রতিবাদে কিন্তু এসব হয়নি, হচ্ছে না। তাই তারা ধরেই নিচ্ছে যে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও বলাৎকারের শাস্তি তা নয়। এ বিষয়ে প্রকাশিত কোন সংবাদেও তা স্পষ্ট করা হয়েছে বলে জানা নেই। ফলে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের কথা জানাজানি হলেও বলাৎকারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কি না, সেটি আমাদের অনেকেরই অজানা। দুটি শব্দের প্রায়োগিক অর্থের ভিন্নতায় আইনের এই অস্পষ্টতা হেতু বলাৎকারের শাস্তি কি, তা পরিষ্কারভাবে না জানার কারণে অনেক নির্যাতিত চাইতেই যাচ্ছে না, যাবে না এর বিচার। এই সুযোগে বলাৎকারকারীরাও চালিয়ে যাচ্ছে, চালিয়ে যাবেই তাদের অপকর্ম! এটি অনুধাবন করেই বলাৎকারকে পরিষ্কারভাবে ধর্ষণ গণ্য করে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সরকারকে আইনী নোটিস দিয়েছে ‘ল এ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন’ নামক একটি মানবাধিকার সংগঠন। গত ২৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখে দেয়া ওই নোটিসে বাংলাদেশ দণ্ড বিধির ৩৭৫ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ নম্বর ধারা সংশোধন করে বলাৎকারের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করতে বলা হয়েছে।
সর্বাধিক জনসম্পৃক্ত একটি ফৌজদারি আইনে ব্যবহৃত শব্দ, সংজ্ঞা ও এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সাধারণ মানুষের মাঝে যতটা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা যাবে, তত বেশি মানুষ এই আইন সম্পর্কে সচেতন হয়ে তা মেনে চলতে চেষ্টা করবে। অপরদিকে এই আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষ সোচ্চার হয়ে পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। মুখ খোলার সাহস ও পরিবেশ পাবে নির্যাতিতরা। ফলে সমাজ থেকে হ্রাস পাবে অপরাধ প্রবণতা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে আইনের সফলতা। তাই আলোচিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণ ও বলাৎকারের প্রায়োগিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা উচিত এবং এর ধারায় ও ব্যাখ্যায় ‘ধর্ষণ’ শব্দটির স্থলে ‘ধর্ষণ বা বলাৎকার’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করে আরও পরিষ্কার বিশ্লেষণ দিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো উচিত। অথবা, ‘বলাৎকার দমন আইন’ নামে স্বতন্ত্র একটি আইন প্রণয়ন করা উচিত। সেইসঙ্গে এই অপকর্ম সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য ক্ষেত্রসমূহে চালু করা উচিত আধুনিক ও কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা, যাতে সুনিশ্চিত হয় এই আইনের অধিক সুফল।
লেখক : সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ
"জানতে চাইলে রাজধানীর কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ ভোরের কাগজকে বলেন, দুইভাবে দেশজুড়ে টেস্ট পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। একটি হচ্ছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলবে, আগামী এতদিনের মধ্যে অনলাইনে অথবা সশরীরে স্কুলে হাজির হয়ে বা প্রশ্ন বাড়িতে নিয়ে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নেবে শিক্ষার্থীরা। অথবা বর্তমানে অ্যাসাইনমেন্ট নির্ভর যে মূল্যায়ন ব্যবস্থা চলছে সেটিও ব্যবহার করা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলতে হবে, ১০/৫ টি অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে টেস্ট পরীক্ষা নেয়া হবে। শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেই অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করে স্কুলে জমা দেবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত ঘোষণা দিয়ে বিষয়টি জানিয়ে দেয় তাহলে টেস্ট পরীক্ষা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হবে না।"
‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো, এমপিও নীতিমালা ২০১৮’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা বিষয়ক দেশের একমাত্র জাতীয় পত্রিকা দৈনিক শিক্ষা ধারাবাহিকভাবে মতামত প্রকাশ করে আসছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বিষয় পরিমার্জন ও সংযোজনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো।
মাধ্যমিক (৬ষ্ঠ-১০ম) বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে:
(ক) সহকারী শিক্ষক (বাংলা)- ১ জন, সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি)- ১ জন, সহকারী শিক্ষক (গণিত)- ১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু যেহেতু বাংলা (দুইপত্র), ইংরেজি (দুইপত্র) ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থী অকৃতকার্যের হার বেশি বিধায় অতিরিক্ত ক্লাসের প্রয়োজন হয়; সেহেতু প্রতি বিষয়ে একাধিক শিক্ষককে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
(খ) সহকারী শিক্ষক (ভৌতবিজ্ঞান)- ১ জন ও সহকারী শিক্ষক (জীববিজ্ঞান)-১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু যেহেতু ভৌতবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে ব্যবহারিক আছে সেহেতু এ দুটি বিষয় মিলে ১ জন ল্যাব সহকারিকেও এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
(গ) অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর-১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু অফিস সহকারিকে যেহেতু নিজেদের অফিসিয়াল কাজ ও আর্থিক হিসাব ঠিক রেখে অনেক সময়ই অন্যান্য অফিসে যেতে হয় সেহেতু এই ১ জনের পাশাপাশি আরও ১ জন অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারীকে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
(ঘ) নিরাপত্তাকর্মী- ১ জন, নৈশপ্রহরী- ১ জন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী- ১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু নিরাপত্তাকর্মী/নৈশপ্রহরী ২ জনের স্থলে ৩ জনকে এবং শ্রেণি শাখা/ শিক্ষার্থীর সংখ্যানুপাতে ১ বা একাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাশাপাশি ১ বা একাধিক পিয়ন/ অফিস সহায়কে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
উচ্চ মাধ্যমিক (৬ষ্ঠ-১২শ) বিদ্যালয়/কলেজের ক্ষেত্রে:
(ক) সহকারী শিক্ষক (বাংলা)- ১ জন, সহকারী শিক্ষক (ইংরেজি)- ১ জন ও সহকারী শিক্ষক (গণিত)- ১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু যেহেতু বাংলা (দুইপত্র), ইংরেজি (দুইপত্র) ও গণিত বিষয়ে শিক্ষার্থী অকৃতকার্যের হার বেশি বিধায় অতিরিক্ত ক্লাসের প্রয়োজন হয়; সেহেতু প্রতি বিষয়ে একাধিক শিক্ষককে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
(খ) প্রদর্শক (পদার্থ, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে ল্যাব চালু থাকলে প্রতি বিষয়ে- ১ জন করে) এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় অনেক বিষয়ে/প্রতিষ্ঠানেই এত বেশি সংখ্যক প্রদর্শক রাখা আর্থিক অপচয়। তাই পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণীবিজ্ঞান ৩টি বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যানুপাতে ১/২ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে ১ জন = মোট ২/৩ জন প্রদর্শককে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন। যা স্নাতক পাস কলেজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
(গ) গবেষণাগার/ ল্যাব সহকারী (পদার্থ, রসায়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণিবিজ্ঞান বিষয়ে ল্যাব চালু থাকলে প্রতি বিষয়ে-১ জন করে) এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু বাস্তনে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী না থাকায় অনেক বিষয়ে/ প্রতিষ্ঠানেই এত বেশি সংখ্যক ‘গবেষণাগার/ ল্যাব সহকারী’ রাখা আর্থিক অপচয়। তাই পদার্থ, রসায়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞান/ প্রাণীবিজ্ঞান ৩টি বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যানুপাতে ১/২ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে ১ জন = মোট ২/৩ জন ল্যাব সহকারীকে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন। যা স্নাতক পাস কলেজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
(ঘ) নিরাপত্তাকর্মী- ১ জন, নৈশপ্রহরী- ১ এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী- ১ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার আলোকে নিরাপত্তাকর্মী/নৈশপ্রহরী ২ জনের স্থলে ৩ জন এবং শ্রেণি শাখা/ শিক্ষার্থীর সংখ্যানুপাতে ১ বা একাধিক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পাশাপাশি ১ বা একাধিক পিয়ন/ অফিস সহায়ককে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
(ঙ) শুধু উচ্চ মাধ্যমিক (১১শ-১২শ) কলেজে অফিস সহাকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর- ২ জনকে এমপিও প্রদানের বিধান বিদ্যমান। বাস্তবে ২টি মাত্র শ্রেণি (১১শ-১২শ) বিদ্যমান থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলে বা অতিরিক্ত শ্রেণি/শাখা বিদ্যমান না থাকলে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ২ জনের স্থলে ১ জন করা উচিত। অপরদিকে হিসাব রক্ষণ কাজের জন্য ১ জন ‘হিসাব সহকারি কাম কম্পিউটার অপারেটর’কে এমপিও প্রদানের বিধান করা প্রয়োজন।
অতিরিক্ত শ্রেণি/শাখা খোলার ও চালু রাখার ক্ষেত্রে:
নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একক শ্রেণির/শাখার শিক্ষার্থীর সংখ্যা হবে ৫০ জন। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ জনের অধিক হলে পরবর্তী ৪০ জনের জন্য ২য় শাখা খোলার বিধান বিদ্যমান। বাস্তবে যেহেতু এত অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে ক্লাস ফলপ্রসু হয় না। সেহেতু ৪০ জন পর্যন্ত একক শ্রেণি/শাখা এবং ৫০ – ৮০ জন হলে ২য় শাখা, ৯০ – ১২০ জন হলে ৩য় শাখা এইরূপভাবে অতিরিক্ত শ্রেণি শাখা/ বিষয়/ বিভাগ খোলার ও চালু রাখার বিধান করা প্রয়োজন।
নতুন বিষয় খোলার ক্ষেত্রে:
‘উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণত প্রতি বিভাগে চারটি বিষয় (Subject) থাকবে, তবে ৫ম বা ততোধিক বিষয় খুলতে হলে ঐ বিষয়ে কমপক্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ১০০ জন হতে হবে’ -এইরূপ বিধান বিদ্যমান। বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানেই নতুন বিষয়ে ২০/২৫ জন আগ্রহী শিক্ষার্থী পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ১০০ জন থাকে না বিধায় নতুন বিষয় খুলা যায় না। ফলে আগ্রহীরা ঐ বিষয় পড়ার সুযোগ পায় না। তাই ৫ম বা ততোধিক বিষয় খুলতে হলে কমপক্ষে ২০ জন শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ৬০ জন নির্ধারণ করা উচিত।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে:
‘এমপিও ভুক্ত প্রভাষকগণ প্রভাষক পদে এমপিও ভুক্তির ০৮ (আট) বছর পূর্তিতে ৫:২ অনুপাতে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবেন। এতে মোট পদসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে না’ –এইরূপ বিধান বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক এই অনুপাত প্রথার কারণে অনেক অনেক প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র প্রভাষক পদোন্নতি পাচ্ছেন না। আবার অন্য প্রতিষ্ঠানের জুনিয়র প্রভাষক পদোন্নতি পাচ্ছেন। তাও মাত্র সারা জীবনে একটি। এমতাবস্থায় এমন বিধান করা উচিত যে, কাম্য যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার ও প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে প্রভাষকদের মধ্য থেকে ১ঃ১ অনুপাতে সহকারি অধ্যাপক হবেন। অতপর সহকারি অধ্যাপকদের মধ্য থেকে কাম্য যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা ও বিভাগীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে ১:১ অনুপাতে সহযোগী অধ্যাপক হবেন এবং একইভাবে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক হবেন। অপরদিকে স্কুল পর্যায়েও সিনিয়র শিক্ষক পদ থাকা উচিত।
অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত রাখা:
‘কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত জনবলকাঠামোর অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োজিত রাখলে অতিরিক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি ও আনুষভ্গিক সুবিধাদি ১০০% সংশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে’ –এইরূপ বিধান বিদ্যমান। এই বিধানের পাশাপাশি এমন বিধান করা উচিত যে, প্রাতিষ্ঠানিক বেতন/ ভাতায় নিয়োগকৃত অতিরিক্ত শিক্ষকদের (নিয়মিত ও চুক্তিভিত্তিক) যোগ্যতা অবশ্যই এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে কাম্য যোগ্যর অনুরূপ হতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন:
‘ইনডেক্সধারী শিক্ষক/ কর্মচারী এক ধরনের প্রতিষ্ঠান হতে অন্য ধরনের প্রতিষ্ঠানে সমপদে/ সমস্কেলে চাকরিতে যোগদান করলে পূর্ব অভিজ্ঞতা গণনাযোগ্য হবে’ –এইরূপ বিধান বিদ্যমান। এক্ষেত্রে-
(ক) ইনডেক্সধারী শিক্ষক/ কর্মচারী এক প্রতিষ্ঠান হতে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদান করলে অভিজ্ঞতা গণনার পাশাপাশি পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের ছুটির হিসাব ও এসিআর বর্তমান প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের বিধান থাকা উচিত।
(খ) পরিবর্তীত প্রতিষ্ঠানে যোগদানের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশকাল থাকা অনুউচিত। বিশেষ করে প্রশাসনিক পদের ক্ষেত্রে।
(গ) পরিবর্তীত প্রতিষ্ঠানে তার জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বেতন-ভাতা ফিক্সেশনের বিধান উল্লেখ থাকা উচিত।
(ঘ) পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের বা পদের কোন বকেয়া অর্থ পরিবর্তীত প্রতিষ্ঠানে বা পদে এসে দাবি করতে পারবেন না। এইরূপ বিধান থাকা উচিত।
‘বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ প্রাপ্তির জন্য আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীগণ একই সাথে একাধিক পদে চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোন পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না’ –এইরূপ কথা বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে এমন কথা লেখা উচিত যে, এমপিওভুক্ত/ নিয়মিত কোন শিক্ষক-কর্মচারী একইসাথে একাধিক পদে চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোনপদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না এবং কোন ব্যবসাবাণিজ্য, বেতনভুক্ত সংবাদাতা বা প্রাইভেট টিউশনি/ কোচিংয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেন না। কোন খন্ডকালীন কাজে নিয়োজিত থাকতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। জন প্রতিনিধি নির্বাচিত হলে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে:
‘বেসরকারী স্কুল ও কলেজে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যে সমগ্র শিক্ষাজীবনে “পরিশিষ্ট-ঘ” মোতাবেক একটি তৃতীয় বিভাগ/ সমমান গ্রহণযোগ্য হবে’ –এরূপ বিধান বিদ্যমান। বর্তমানে যেহেতু অধিক শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন লোকের ঘাটতি নেই এবং যেহেতু অধিক যোগ্য শিক্ষক অত্যন্ত প্রয়োজন; সেহেতু কোন ৩য় বিভাগ/ সমমান আর গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। তবে ইনডেক্সধারীদের ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য হতে পারে।
বদলির প্রসঙ্গে:
‘সরকার এমপিওভুক্ত শিক্ষক/ কর্মচারীদের প্রয়োজনবোধে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করেত পারবে’ –একথা বিদ্যমান। এক্ষেত্রে বদলি নীতিমালাটি হতে পারে-
(ক) পারস্পরিক বদলি (মিউচুয়াল ট্রেন্সফার): সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সমঅভিজ্ঞ ইন্ডেক্সধারী শিক্ষকগণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এনটিআরসিএ এর বরাবরে যেকোন সময় আবেদন করে মিউচুয়াল ট্রান্সফার নিতে পারবে।
(খ) স্বেচ্ছায় বদলি: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শূন্য আসনে নতুন নিয়োগের পূর্বে সেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ প্রয়োজনমত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। বিজ্ঞপ্তি অনুসারে সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সমঅভিজ্ঞ ইন্ডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকগণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে চয়েজ দিয়ে আবেদন করতে পারবেন। তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কারো চাকরি নিরবিচ্ছিন্ন ও সন্তোষজনক ভাবে ৫ বছর পূর্ণ না হলে তিনি বদলির/ পুনঃবদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। একই প্রতিষ্ঠানের একই বিষয়ে ও পদে একাধিক আবেদনকারীর মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষণ, সহশিক্ষা ইত্যাদি (জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের নীতি অনুসারে) বিবেচনা করে অধিক পয়েন্ট প্রাপ্ত শিক্ষক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলির সুযোগ পাবেন। এভাবে বদলি কার্যকর হবার পর যেসকল প্রতিষ্ঠানে শূন্য আসন সৃষ্টি হবে সেগুলোতে বিধিমোতাবেক নতুন নিয়োগ প্রদান করা হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গ্রেডিং এর ক্ষেত্রে:
‘একাডেমিক স্কীকৃতির তারিখ ২৫ (প্রতি ২ বছরের জন্য ৫, ১০ বা তদু্র্ধব বছর হলে ২৫)’ নম্বর দেওয়া হবে এরূপ লেখা আছে। এখানে হওয়া উচিত- একাডেমি স্বীকৃতির প্রতি ২ বছরের জন্য ৫ নম্বর হারে অনধিক ২৫ নম্বর।
তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে:
‘অসত্য তথ্য প্রদান, তথ্য গোপন করা, ভুয়া বা জাল কাগজপত্র দাখিল, প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও আবেদনপত্র প্রেরণ করার কারণে বেতন-ভাতাদির সরকারি অংশ ছাড়করণে অনিয়মের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান/ শিক্ষক-কর্মচারী/প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি-গভর্নিং বডি দায়ী থাকবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ –এইরূপ বিধান বিদ্যমান। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাকর্মকর্তাদেরও দায় থাকা উচিত।
নতুন প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে:
ভৌগলিক দূরত্বভিত্তিক প্রাপ্যতা ও জনসংখ্যা ভিত্তিক প্রাপ্যতা নির্ধারণের সময় সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা এই তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে পৃথকভাবে বিবেচনা না করে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা উচিত। যাতে কোন প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীর অভাব না হয়।
অধ্যক্ষ পদে নিয়োগের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে:
উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে/কলেজে অধ্যক্ষ পদের জন্য ‘কলেজে উপাধ্যক্ষ/ সহকারী অধ্যাপক পদে ০৩ বছরে অভিজ্ঞাতাসহ প্রভাষক/ সহকারী অধ্যাপক পদে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা’ থাকার বিধান বিদ্যমান। বিষয়টি খুবই অষ্পস্ট। এক্ষেত্রে লেখা উচিত- কলেজ পর্যায়ে উপাধ্যক্ষ/ সহকারী অধ্যাপক পদে ৩ বছরসহ সর্বমোট ১২ বছরের শিক্ষকতা।
বিদ্যমান বিধান বহির্ভূত কিছু অতিরিক্ত প্রস্তাব:
(ক) প্রশাসনিক পদে নিয়োগের দায়িত্ব এনটিআরসিএ –এর উপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পৃথক বাছাই প্রকৃয়া প্রণয়ন করা আবশ্যক যা এন্ট্রি পোস্টে নিয়োগের বাছাই প্রকৃয়া থেকে সম্পুর্ণ আলাদা হবে। (জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচনের নীতি অনুসারে হতে পারে।
(খ) সংযুক্ত প্রাথমিক শাখা (৫ম শ্রেণি পর্যন্ত) থেকে যেহেতু প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটিতে প্রতিনিধি নিয়োজিত থাকে; সেহেতু এই স্তরে পাঠদানকারী শিক্ষকদের যোগ্যতা ও স্টাফ প্যাটার্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনুরূপ নির্ধারণ করা এবং তাদের এমপিওভুক্ত করা উচিত।
(গ) যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকার থেকে শতভাগ বেতন ও আংশিক ভাতাদি পান এবং যেকোন সময় জাতীয়করণের সম্ভাবনা থাকে সেহেতু সর্বক্ষেত্রে নিয়োগের পূর্বে পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট দেখে নেওয়া উচিত। (ঘ) যেকোন স্তরের শিক্ষক পদে প্রথম নিয়োগ লাভের পরবর্তী ৫ বছরে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পিটিআই/ বিএড/ এমএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। ৫ বছরে ব্যর্থ হলে আরো ২ বছর সময় পাবেন। ৭ বছরে ব্যর্থ হলে অযোগ্যতার কারণে চাকরিচ্যুত হবেন। এমপিও নীতিমালা সংশোধনে সংশ্লিষ্টরা উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করবেন আশাকরি।
মো. রহমত উল্লাহ্, শিক্ষাবিদ এবং অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।