শরীরের ওজনের সমপরিমান মেধাবৃত্তি কতটা শোভনীয়?

শরীরের ওজনের সমপরিমান মেধাবৃত্তি কতটা শোভনীয়?


শরীরের ওজনের সমপরিমান মেধাবৃত্তি কতটা শোভনীয়?

মো. রহমত উল্লাহ্‌ | মার্চ ১৭, ২০১৬ - ১১:৩৪ পূর্বাহ্ণ

মো. রহমত উল্লাহ্: অধ্যক্ষ, লেখক ও শিক্ষাবিদ।


দৈনিকশিক্ষাডটকমে গত ১৪ মার্চে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম এরকম শরীরের ওজনের সমপরিমান টাকা বৃত্তি। প্রতিবেদনে জানা যায়, দুই শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় ঝালকাঠি জেলায় সর্বোচ্চ ফল অর্জন করায় শরীরের ওজনের সমপরিমাণ টাকা বৃত্তি দিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ডাব্লিউ ডাব্লিউ ফাউন্ডেশন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নলছিটি উপজেলার মার্চেন্টস মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০১৩ সালে মাইনুল হাসান ও ২০১৪ সালে মো. মাসরুর হাসান তমাল ঝালকাঠি জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে।আয়োজক সংস্থা পাঁচ টাকার ধাতব মুদ্রা দিয়ে তাদের শরীরের ওজন নির্ণয় করে। এতে মাইনুল হাসান ৫৮ কেজি ওজনে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা এবং মাসরুর ইসলাম তমাল ৭৮ কেজি ওজনে ৪৯ হাজার টাকার চেক পান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ এম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি ঝালকাঠির সন্তান। এ জেলায় এসএসসি পরীক্ষায় যে সবচেয়ে ভালো ফল করবে, তার শরীরের ওজন নির্ণয় করে সমপরিমাণে টাকা দেওয়া হবে।

আমাদের সমাজের কিছু বিত্তবান ব্যক্তি যুগে যুগে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করেছেন। কেউ শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা করেছেন। কেউ বই কিনে দিয়েছেন। কেউ সেচ্ছায় পাঠদান করছেন। এই যে আমাদের ঐতিহ্যবাহী বড় বড় স্কুল কলেজ মাদ্রাসা এগুলোর প্রতিষ্ঠাতা কোননা কোন বিত্তবান মানুষ। বিএল কলেজ, আনন্দমোহন কলেজ, এমসি কলেজ, এমনকি ঢাকা কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কোননা কোন ব্যক্তির সহায়তায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য সাবেক হওয়া সফল গভর্নর আতিউর রহমান সাহেবও পড়ালেখা করেছেন এলাকার মানুষের আর্থিক সহায়তায়। কিন্তু অতীতে এমন খবর কেউ শুনেছেন বলে আমার জানা নেই।
যে ব্যক্তি এই অভিনব কৌশলে বৃত্তির টাকার পরিমান নির্ধারণ করেছে, তিনি কীভাবে টাকার মালিক হয়েছেন, কতটুকু শিক্ষা লাভ করছেন, তার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কী, তার এমন করার উদ্দেশ্য কী, তার অতীত কী ইত্যাদি আমার জানার সুযোগ হয়নি এখনো। যতটুকু ধারণা করছি তা হলো, তিনি প্রচার চেয়েছে। এখানে তিনি সফল। যদিও ধর্মীয় ভাবে বলা আছে, তোমরা এমন ভাবে অন্যকে সাহায্য সহযোগীতা করো যেন তোমার বাম হাতও তা জানতে না পারে।
এই বৃত্তিদাতার উদ্দেশ্য যদি মহৎ হতো তবে তিনি এই বৃত্তির টাকার পরিমাণ অন্য অনেকভাবেই নির্ধারণ করতে পারতেন। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি ধরে ২১ হাজার বা ৫২ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে পারতেন। আমাদের শিক্ষা আন্দোলনকে ভিত্তি ধরে ৬৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে পারতেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি ধরে ৭১ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে পারতেন। হয়ত তিনি এ সকল চেতনার ধারক বাহক নন। তাই তিনি তা করেন নি। তিনি গরু ছাগল হাস মুরগির মত ওজন করে মানুষ কিনতে চেয়েছেন। কিনেছেন। জানান দিতে চেয়েছেন। দিয়েছেন। প্রচার পেতে চেয়েছেন। পেয়েছেন। মেধাবীদের বোকা বানাতে চেয়েছেন। পেরেছেন।
মেধাবীরা, তাদের অভিভাবকেরা, তাদের শিক্ষকেরা সবাই বোকা বনেছেন। তা না হলে তারা এইভাবে নিজেকে পাল্লায় তুলতে যেতেন না, তাদের বাবা মা তাদের যেতে দিতেন না, তাদের শিক্ষকেরা সেই অনুষ্ঠানে থাকতেন না। মানুষের গোশতের মূল্যইতো নির্ধারিত হলো। যার শরীরে গোশত বেশি সে টাকা পেলো বেশি, আর যার শরীরে গোশত কম সে টাকাও পেল কম। যে কম টাকা পেল সে হয়ত আপসোস করেছে। তার বাবামা হয়ত মনেমনে বলেছে, আহ আমাদের ছেলেটা যদি আরো মোটাতাজা হতো তাহলে আরো বেশি টাকা পেতাম। যেমন কোরবানির হাটে আপসোস করে দুর্বল গরু ছাগলের রাখাল। মেধাতো সমানই ছিল। টাকাতো সমান হলোনা। তাহলে মেধার মূল্যায়ন হলো কেমন করে? এখন একটু হিসেব করলেই জানাযাবে, মানুষের গোশত কত টাকা কেজি? জী, মাত্র ৬২৯ টাকা কেজি। যা গরু ছাগলের চেয়ে সামান্য বেশি আরসিং মাগুরের চেয়ে বেশ কিছুটা কম।এই দুই মেধাবীর কেউ যদি মেয়ে হতো তাহলে নিশ্চয়ই তাকেও অনুরূপ পাল্লায় তোলা হতো।
এই মেধাবীদের অভিভাবকদের কি এতই অভাব ছিলো টাকার। তারাও তো বলতে পারতো আমাদের সন্তানদের ওজন করতে দিবনা। আপনি নিজেকে ওজন করুন। আমরা পন্য না। কিন্তু আমরা মেধাবীরা, মেধাবীদের ভাই বোনেরা, বন্ধু বান্ধবেরা, অভিভাবকেরা, হিতাকাংখিরা, এমনকি শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা কেউই তা পারলাম না। টাকার কাছেই কি হেরে গেলো আমাদের বিবেক বিবেচনা, জ্ঞান বুদ্ধি, মান সম্মান? এতই কি অধঃপতন হয়েছে আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের? না, তা হতে পারেনা। তা হতে দেওয়া যায়না।
কেননা- মানুষকে পাল্লায় মাপা ও সমপরিমান টাকা দেওয়া আইডিয়াটি দৃষ্টিকটু।
আমার মতে ওরা আজও শিক্ষিত হতে পারেনি। স্বশিক্ষিত মানুষ কখনও এমনটা করতে পারে না। দাতার অহংকার প্রকাশিত হয়েছে।  এমনটা আদৌ গ্রহণ করার মত নয়।
ওজন দিয়ে মেধার মূল্যায়ন হয় না।  এটা কোন বৃত্তি বলে আমার মনে হয়নি।

প্রবন্ধ- শিক্ষার্থীদের টিসি বিষয়ক হয়রানি আর কতদিন -ইত্তেফাক- ০৭ ফেব্রুয়ারি২০১৬


প্রকাশ: দৈনিক ইত্তেফাক, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬


শিক্ষার্থীদের টিসি বিষয়ক হয়রানি আর কতদিন

মো. রহমত উল্লাহ্‌


বিভিন্ন কারণে প্রায় সারাবছর ধরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করতে হয় স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা বাবা -মায়ের বদলিযোগ্য চাকরির কারণে এবং আরো ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ইচ্ছায় বার বার বদল করে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই বদল যে কেবল শিক্ষা বর্ষের শুরুতেই হয় তা নয়। বছরের প্রথমার্ধে, মাঝামাঝিতে, শেষার্ধে তথা যেকোনো সময় হতে পারে।


এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে অধ্যয়নরত থাকাবস্থায় কোনো শিক্ষার্থী যদি বছরের মাঝামাঝি অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে একই শ্রেণিতে ভর্তি হতে চায় তো তার বর্তমান প্রতিষ্ঠান থেকে টিসি নেয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে। কেননা সে এই শেণিতে বর্তমানে পড়ছে এর প্রমাণ হচ্ছে টিসি। সেক্ষেত্রে বর্তমান প্রতিষ্ঠানে যে মাস পর্যন্ত বেতন-ফি পরিশোধ করে যায় তার পরের মাস থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান বেতন-ফি চার্জ করা যুক্তিযুক্ত হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। শিক্ষার্থীদের অতি তাগিদে যেহেতু নতুন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে সেহেতু তাদের জিম্মি করে বছরের শুরু থেকে হিসাব করে সকল ফি আদায় করছে তার নতুন প্রতিষ্ঠান। তদুপরি এমনও হয় যে, তার ছেড়ে আসা প্রতিষ্ঠান চলতি বছরের শেষদিন পর্যন্ত বেতন-ফি আদায় না করে টিসি দিতে চায় না। ফলে একজন শিক্ষার্থী বদলির কারণে তার অভিভাবককে অনেক সময়ই গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ/তিনগুণ টাকা।


শিক্ষা বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করার পর কোনো শিক্ষার্থীর প্রতিষ্ঠান বদল করার প্রয়োজন হলে আগে যে হারে ঘাটে ঘাটে ভোগান্তি ও বৈধ অবৈধ পথে অর্থ ব্যয় হতো এখন অনলাইন ব্যবস্থা চালু হবার ফলে তা কিছুটা কমেছে। যদিও এই ব্যবস্থাটি আরো বেশি গতিশীল হবার দাবি রাখে। তবে এইরূপ আবেদনকারী শিক্ষার্থীর নিকট থেকেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে পূর্বাপর উভয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই যুক্তিযুক্ত প্রাপ্যের অধিক টাকা আদায় করে থাকে। বোর্ডের ইস্যুকৃত টিসির আদেশে এই সংক্রান্ত নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন যে কোনো প্রতিষ্ঠান কোন মাস পর্যন্ত বেতন-ফি নিতে পারবে।


শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন ইস্যুতে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয় জানুয়ারি মাসে। নতুন বছরের শুরুতে বিভিন্ন কারণে অনেক বেশি শিক্ষার্থী বদল করে থাকে প্রতিষ্ঠান। সেক্ষেত্রে শুধু একটি টিসি পেপার সংগ্রহ করার জন্য পূর্ণ বছরের সেশন ও অন্যান্য চার্জ এবং জানুয়ারি মাসের বেতন দিয়ে তাদেরকে ভর্তি হতে হয় আগের প্রতিষ্ঠানে। তদুপরি টিসি ফি দিয়ে টিসি পেপারটি নিয়ে গিয়ে অনুরূপ বেতন-ফি আবার পরিশোধ করে পুনরায় ভর্তি হতে হয় কাঙ্ক্ষিত নতুন প্রতিষ্ঠানে। এসংক্রান্ত দুই-একটা বাস্তব উদাহরণ দিই, যা এই চলতি জানুয়ারি মাসেই আমি প্রত্যক্ষ করেছি এবং এই লেখাটির তাগিদ অনুভব করেছি। নাম প্রকাশ পেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী আরো বেশি হয়রানির শিকার হতে পারে এমন ধারণা হচ্ছে বিধায় তাদের ও তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রাখছি।


উদাহরণ-১। ঢাকা শহরের লালবাগ এলাকায় অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় একজন কোমলমতি শিক্ষার্থী অত্যন্ত ভালভাবে পাস করেছে। ২০১৬ সেশনে সে খুলনায় অবস্থিত অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭ম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষাসমূহে অংশ নিয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই ঢাকার লালবাগে অবস্থিত তার আগের প্রতিষ্ঠানটিতে সে ২০১৬ সেশনে ৭ম শ্রেণিতে আর ভর্তি হয়নি এবং হবে না; কিন্তু খুলনায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠান তাকে ভর্তির জন্য টিসি চাওয়ার কারণে বেকায়দায় পড়েছে সে। কারণ খুলনায় টিসি ছাড়া তাকে ভর্তি করবে না, আর ঢাকায় আবার ভর্তি না হলে তাকে টিসি দেয়া হবে না! ঢাকার প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হচ্ছে- আমাদের এখানে ভর্তিই যদি না হয় তো আমরা টিসি দিব কীভাবে? অর্থাত্ তাদের নির্ধারিত অ্যাডমিশন ফিসহ আর্ট-ক্রাফট, বিএনসিসি, বেজ, বুকলিস্ট, ক্যালেন্ডার, ক্লাস টেস্ট, কম্পিউটার, ডেভেলপমেন্ট, ডায়রি, গার্সগাইড, আইডি কার্ড, লাইব্রেরি, মেডিক্যাল, প্রগ্রেস রিপোর্ট, পোস্টেজ, রিসিপ্ট বুক, রিপেয়ার, মেইনটেনেন্স, সাইন্স, স্কাউট, সোল্ডার স্টেপ, স্পোর্টস, সিলেবাস, টিউশন, ওয়েল ফেয়ার ইত্যাদি ফি বাবদ প্রায় দশ হাজার টাকা দিয়ে ভার্তি হয়ে তাদের শিক্ষার্থী হবার পরে তারা টিসি দিবে। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, এই শিক্ষার্থী তো এখানে ক্লাস করবে না, পড়বে না, তাহলে তাকে এতসব মাসিক ও বার্ষিক ফি দিতে হবে কেন? তাছাড়া সে ভর্তি না হবার ফলে ঢাকার প্রতিষ্ঠানে যে আসনটি খালি হবে সেটিতো আর একবছর ফাঁকা থাকবে না। ওয়েটিং লিস্ট থেকে টেনে আরেক জনকে ভর্তি করা হবে এবং তার নিকট থেকেও উল্লিখিত বেতন-ফি আদায় করা হবে। একই আসনের বিপরীতে একই সেশনে দুইজন শিক্ষার্থীর নিকট থেকে টাকা আদায় করা কি বাণিজ্য নয়? সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি এইরূপ অন্যায় বাণিজ্য করতে পারে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে? তাদের উত্তর হচ্ছে- এত কথা বলে লাভ নেই, এটিই এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম! অপরদিকে খুলনার সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য হচ্ছে- আমাদের এখানে ভর্তি করতে হলে টিসি লাগবে। সেখানে প্রশ্ন হচ্ছে- এই শিক্ষার্থী তো এখন কোথাও ভর্তি নেই, তো তাকে টিসি দিবে কে? কিংবা তাকে ভর্তি করতে টিসি লাগবে কেন? সে/তার অভিভাবক যদি লিখে দেয় যে, সে অন্য কোথাও ভর্তি নেই তাহলে কি চলবে না? কিংবা তার আগের প্রতিষ্ঠান যদি লিখে দেয় যে, “অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যাপারে তাদের কোনো আপত্তি নেই” তাহলে কি তাকে ভর্তি করা যায় না? [যদিও বিনা টাকায় এমনটি তারা দিবে কি-না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই] সেখানে তাদের উত্তর হচ্ছে, এত কথা আমাকে বলে লাভ নেই, টিসি ছাড়া এখানে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয় না, এটাই এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম! এখন না পারলে, পরে হলেও দিতে হবে।


[অথচ, শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডটির কোনো একটি কলামে যদি এমন লেখা থাকে যে, “সে এই প্রতিষ্ঠানের... শ্রেণিতে ভর্তির যোগ্য। তবে, তার অন্যত্র ভর্তির ব্যাপারে আমাদের কোনো আপত্তি নেই এবং থাকবে না।” আর সেটির ভিত্তিতে যদি অন্য প্রতিষ্ঠান তাকে ভর্তি নিত; তাহলে তো আলাদা করে অনাপত্তিপত্র বা টিসির প্রয়োজন হতো না।]


উদাহরণ-২। ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুরে অবস্থিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে জেএসসি পাস করেছে একজন শিক্ষার্থী। সে ২০১৬ সেশনে ৯ম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য ফার্মগেট এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে সিলেক্ট হয়েছে; কিন্তু তারা টিসি ব্যতীত তাকে ভর্তি করবে না। এদিকে যে প্রতিষ্ঠান থেকে সে জেএসসি পাস করেছে সেই প্রতিষ্ঠানেও ভর্তি না হলে তারা টিসি দিবে না। এখানে পড়ুক বা না পড়ুক- টিসি নিতে হলে নির্ধারিত সকল ফি দিয়ে এক মিনিটের জন্য হলেও ভর্তি হতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, জেএসসি/পিইসি/এসএসসি/এইচএসসি পাসের সরকারি সনদ থাকার পরেও তাকে ভর্তি করার জন্য টিসি লাগবে কেন? যে সনদ এখন অনলাইনে দেখা যায়, পাওয়া যায়, প্রিন্ট করা যায়- সেই সনদের কপি সত্যায়িত করা লাগবে কেন আগের প্রতিষ্ঠান প্রধানের? কেন বাড়তি টাকা দিয়ে আগের প্রতিষ্ঠান থেকে আনতে হবে প্রশংসাপত্র? সে খারাপ হলে তো তাকে পরীক্ষা দেয়ার পূর্বেই বহিষ্কার করে দিত আগের প্রতিষ্ঠান। কিংবা দিত না তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ। সরকারি সনদই যথেষ্ট নয় তার নতুন ভর্তির জন্য? উত্তর, এত কথা বলে লাভ নেই, এটাই নিয়ম!


সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, আপনারাই বলুন, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠান বদলের ক্ষেত্রে ও উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত এই নিয়মগুলো কি আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহের ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত চরম অনিয়ম নয়? এই অনিয়ম রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কি কিছু করণীয় নেই?

লেখক :অধ্যক্ষ,

 কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ, ঢাকা।

E-mail: rahamot21@gmail.com

উপ-সম্পাদকীয়> 'শিক্ষক বিদ্বেষীরাই বিতর্কিত করছে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের ভাবমূর্তি' >ভোরের কাগজ >২৭ ডিসেম্বর ২০১৫

উপ-সম্পাদকীয়> 'শিক্ষক বিদ্বেষীরাই বিতর্কিত করছে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের
ভাবমূর্তি' >ভোরের কাগজ >২৭ ডিসেম্বর ২০১৫











শিক্ষক বিদ্বেষীরাই বিতর্কিত করছে শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকারের ভাবমূর্তি

ভোরের কাগজ»মুক্তচিন্তা 

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫





মো. রহমত উল্লাহ্

>শিক্ষা ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধনে আন্তরিকতার পরিষ্কার স্বাক্ষর রাখার পরও বারবার বিতর্কিত হচ্ছে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি। বেশি পেছনে না গিয়ে অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার কথাই বলছি আজকের এই লেখায়







যেমন- সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কোনোরকম পূর্বালোচনা না করে এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই চলতি বাজেট প্রণয়নের সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো ভ্যাট। এর প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এল হাজার হাজার শিক্ষার্থী। যারা কোনোদিন জানত না আন্দোলন কাকে বলে, কীভাবে করতে হয়; তারা শিখে গেল সফল আন্দোলন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অচল করে দিল সারা ঢাকা শহর। তাদের পক্ষে সমর্থন দিল অনেকেই। এই আন্দোলন দানা বাঁধার সময় অর্থমন্ত্রী শক্ত শক্ত কথা বলার কারণে আরো চাঙ্গা হলো তা এবং সরকার বাধ্য হলো সেই ভ্যাট প্রত্যাহার করতে। দীর্ঘদিন পরে কোনো একটি ডেকে আনা আন্দোলনের কাছে হার মানতে বাধ্য হলো শেখ হাসিনা সরকারকে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে কি উদ্দেশ্য ছিল অহেতুক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক সচেতন মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার? আবার তিনি বলে দিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞানের অভাব। নিয়ে শুরু হলো সমালোচনা প্রতিবাদ। সেই সঙ্গে সমালোচিত হলো বর্তমান সরকার। শেষে কিছু ব্যাখ্যা দুঃখ প্রকাশ করলেন তিনি

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর শুরু থেকে এখনো থেমে নেই বিভিন্ন স্তরের শিক্ষকদের আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র প্রফেসরদের পদমর্যাদা বেতন গ্রেড নির্ধারণ করা হলো সচিবদের নিচে। শুরু হলো তাদের প্রতিবাদ আন্দোলন। তৈরি হলো অশান্তি। বিঘ্নিত হলো শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া। বিতর্কিত হলো সরকার। শিক্ষামন্ত্রী অনেক দরবার করে, অনেক অনুরোধ করে, অনেক কৌশল করে নানান কথা বলে থামালেন সেই শিক্ষকদের। তারপর মানা হলো তাদের দাবি, কিন্তু সেখানেও রাখা হলো বিতর্কের সুযোগ। জাতীয় অধ্যাপকদের দেয়া হলো না যথাযথ মর্যাদা

এদিকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর প্রথম কপিতে ব্লুক করে দেয়া হলো সরকারি কলেজের শিক্ষকদের সর্বোচ্চ ধাপে যাওয়ার রাস্তা। শিক্ষকরা হারাতে বসলেন মাউশি সহশিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন দপ্তর-অধিদপ্তরের প্রধান হওয়ার যোগ্যতা। এমনকি সরকারি কলেজের প্রফেসররা হারাতে বসলেন ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ পদে বসার যোগ্য পদোন্নতি পাওয়ার উপায়। শুরু হলো প্রতিবাদের ঝড়। আসতে শুরু করল আন্দোলনের বিভিন্ন হুমকি কর্মসূচি। যেমন- সাধারণত সরকারি কলেজের অধ্যাপকরা চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড থাকায় এতদিন মোট অধ্যাপকদের মধ্যে ৫০ শতাংশ অধ্যাপক গ্রেড-- যেতে পারতেন। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় এখন এই পথ বন্ধ হয়ে গেল

১৫ ডিসেম্বর বেতন স্কেলের প্রজ্ঞাপনে বিষয় সুরাহা না হওয়ায় আবারো আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন সরকারি কলেজের শিক্ষকরা। [দৈনিক শিক্ষা ডট কম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৫] এতে কমবেশি বিনষ্ট হবে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ। সমালোচিত হচ্ছে সরকার। অবশেষে হয়তো আরো আশ্বস্ত করা হবে এবং যুক্তিযুক্ত হলে দাবিও মেনে নেয়া হবে তাদের। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে- হবে বারবার?

অন্যদিকে এই পে-স্কেলের প্যাঁচকলে বারবার আটকে দেয়া হলো এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবন। অতীতে শেখ হাসিনা সরকার যতবার জাতীয় বেতন স্কেল দিয়েছে, ততবারই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই স্কেল পেয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। সে মতে সবারই ধারণা ছিল এবারের বর্ধিত বেতন স্কেলেও আগের মতোই স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অন্তর্ভুক্ত হবেন তারা। কিন্তু নতুন স্কেলে প্রথমে অস্পষ্ট রাখা হলো তাদের বেতনভাতা বর্ধিত করার কথা। বিক্ষুব্ধ হলেন, বিবৃতি দিলেন, সভা করলেন, কর্মসূচি দিলেন বেসরকারি শিক্ষক সমাজ; যারা এই দেশের মোট শিক্ষকের প্রায় নব্বই শতাংশ। এরপর জুড়ে দেয়া হলো আরেক শর্ত। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের থেকে অর্জিত আয় সরকারকে জমা দিয়ে তারপর নিতে হবে বর্ধিত হারে সরকারি অংশের বেতনভাতা। আবার ক্ষুব্ধ হলেন দেশের সর্ববৃহৎ বেসরকারি শিক্ষক সমাজ। তাদের অধিকাংশই যুক্তিযুক্তভাবে বললেন, তাদের চাকরি জাতীয়করণ করে তারপর নিয়ে নেয়া হোক প্রতিষ্ঠানের আয়। তা না হলে শর্তহীনভাবে দিয়ে দেয়া হোক বর্ধিত স্কেলের মূল বেতন। কেননা কেবল শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন দিয়ে পূর্ণ ভাতাদি, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস পদোন্নতি এবং পর্যাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষক না দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সব আয় নিয়ে নিলে প্রতিষ্ঠান চলতে পারবে না। লেখালেখি হলো পত্রপত্রিকায়। সমালোচনা হলো সর্বত্র। অসন্তোষ দেখা দিল শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। তারপর গত ২০ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এল এক প্রজ্ঞাপন। যাতে লেখা হলোএমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করিয়া তাহাদের যোগ্যতা ভিত্তিক অনুদান-সহায়তা বৃদ্ধির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগ কর্তৃক মূল্যায়নক্রমে প্রাপ্য অনুদান-সহায়তা নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের তারিখ অর্থাৎ ০১ জুলাই ২০১৫ তারিখ হইতে কার্যকর করা সমীচীন হইবে। ২। এমতাবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুদান-সহায়তা নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের তারিখ অর্থাৎ ০১ জুলাই ২০১৫ হইতে কার্যকর হবে।এটিতেও রাখা হলো অনেক মারপ্যাঁচ। কি যোগ্যতার ভিত্তিতে কারা কখন থেকে পাবেন এই বর্ধিত সুবিধা আর কি অযোগ্যতার কারণে কারা বঞ্চিত হবেন? অর্থাৎ শর্তহীনভাবে নতুন স্কেলে সবার সঙ্গে বেতন পাবেন কি না, তা পরিষ্কার করে বলা হয়নি এই সার্কুলারে। এতে যে কিছু মারপ্যাঁচ আছে এটির আরো প্রমাণ হচ্ছে- ডিসেম্বরে বেতনের সঙ্গে বর্ধিত বেতন পাচ্ছেন না তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি সূত্র বলেছে, সরকারি স্কুল-কলেজ শিক্ষকদের তুলনায় দুএক মাস দেরিতে হাতে নগদ পাবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। মন্ত্রণালয় শিক্ষা অধিদপ্তরের অদক্ষতা উদাসীনতাকে দায়ী করে বক্তব্য দিচ্ছেন শিক্ষকরা। [দৈনিক শিক্ষা ডট কম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৫] সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আয় সরকারি কোষাগারে দিতে হবে কি না- এর জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, টাকা যাতে স্বচ্ছভাবে ব্যয় হয়, জন্য আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ওই টাকা সরকারি কাজে চলে আসবে কিনা, সেটা আইনে বলা হবে। মাসের মধ্যে আইন পাশের জন্য সংসদে উঠবে বলে জানান তিনি। [দৈনিক শিক্ষা ডট কম, ২২ ডিসেম্বর ২০১৫] সবচেয়ে পীড়াদায়ক হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্কুলারটিতে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনভাতা প্রদানের জন্য প্রস্তাবিত বর্ধিত টাকাকে বারবার লেখা হয়েছেঅনুদান-সহায়তা অথচ দীর্ঘদিন ধরেই এমপিও আদেশে লেখা হয় বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি অংশের বেতনভাতা। বেসরকারি শিক্ষকরা কি বিনা কাজে টাকা চাচ্ছেন যে তাদের প্রদত্ত সরকারি টাকাকে বেতনভাতা না বলে অনুদান-সহায়তা বলা হলো?

বারবার শিক্ষকদের মর্যাদা ক্ষুণœ করার এহেন অপচেষ্টা করে সরকারের ওপর অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে কোনো বিশেষ আমলা, নেতাদের কারসাজি আছে কিনা এমন প্রশ্ন জাগা এখন নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক নয়? তা না হলে, যা হওয়ার তা সঠিক সময়ে না করে এবং যা না হওয়ার তা বারবার করে কেন ক্ষেপিয়ে তোলা হচ্ছে শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী, অভিভাবক তথা শিক্ষা ক্ষেত্রের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে? শিক্ষা ক্ষেত্রে এত এত শুভ কাজ করার এবং হাতে নেয়ার পরও কেন বারবার বিতর্কিত হয়ে, জনরোষে পড়ে, মাথা হেট করে বদল করতে হচ্ছে সরকারি সিদ্ধান্ত?

মো. রহমত উল্লাহ্ : অধ্যক্ষ, কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা